আলুর দামে দুশ্চিন্তায় আছেন চাষীরা

p1শুক্রবার রাজধানী ঢাকাতে পাইকারি বাজারে উত্তরাঞ্চলের লাল ছোট আলু ৪ টাকা ও খুচরা বাজারে ৬টা আর মুন্সিগঞ্জ এলাকার ডায়মন্ড আলু পাইকারি ৬টাকা আর খুচরা বাজারে তা ১০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছে। এই আলু দেশের বিভিন্ন জেলায় কৃষক বিক্রি করছেন ১টাকা কেজি বা তার চেয়েও কম দামে। একটানা হরতাল অবরোধে নতুন আলু উঠার সময় বাজার ধরতে না পারা, আলু চাষের সময় নিম্নমানের সার ও ঔষধের শিকার হয়ে সর্বশেষে বাজারে আলুর দাম একদম পড়ে যাওয়ায় সারা দেশে এবার আলু চাষীরা ভীষণ অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ফলে গত কিছুদিন ধরেই বিভিন্ন মিডিয়ার খবর হচ্ছে,‍আলু চাষীদের মাথায় হাত। তবে বরাবরেই মতো কৃষি প্রধান দেশে কৃষি বা কৃষকের খবর কমই গুরুত্ব পাচ্ছে।

চাঁদপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বিশেষ করে কচুয়া উপজেলায় চলতি মৌসুমে আলু চাষে চরম বিপর্যয় দেখা দিয়েছে বলে ঐ অঞ্চলের সাংবাদিকরা এরিমধ্যে খবর প্রকাশ করেছেন। তাঁরা জানিয়েছেন,এতে করে পুঁজি ও সর্বস্ব হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের মাথায় হাত।

শীত মওসুমের শুরুর দিকে কয়েকটি জেলার মাঠ পর্যায়ের সাংবাদিকদের প্রতিবেদনে কয়েকটি তথ্য জানা গেছে। তা হলো,চলতি বছরে বেশকিছু এলাকায় কয়েক একর জমিতে আলু চাষে ব্যাপক বিপর্যয় লক্ষ্য করা গেছে। কৃষকদের অভিযোগ, স্থানীয় সার ডিলারদের দেয়া নিম্নমানের সার, নিম্নমানের ঔষধ দেয়ার ফলেই ফসলি জমিতে আলুর চারা এখনো গজাচ্ছে না। তখন কৃষকের এই বক্তব্যের বিপরীতে স্থানীয় ইউনিয়ন বিসিআইসি সার ডিলার, খুচরা বিক্রেতা, উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা ও উপজেলা কৃষি অফিসারদের বক্তব্য ছিলো, বৈরী আবহাওয়া, মোজাইক রোগ (ভাইরাস) ও খারাপ বীজ রোপনের ফলেই এ বিপর্যয়।
p2
মাঠ থেকে আলু সংগ্রহ করছেন চাষিরা

আলু চাষের শুরুতে সাধারণ কৃষকের আরো জানিয়েছিলেন, সরকার কর্তৃক বিসিআইসি ইউরিয়া, বিআরডিসি টিউনিশিয়া ও এমওপি সারের পাশাপাশি বেসরকারিভাবে সারের ডিলাররা এবছর টিএসপি নেবালন, মরক্কো টিএসপি, টিউনিশিয়া এলসিসহ বেশকিছু দেশীয় নিম্নমানের সার কৃষকদের মাঝে বিক্রি করেছেন। কৃষি অফিস কর্তৃক কোন মনিটরিং না থাকায় সাধারণ কৃষকরা এসব নিম্নমান ও ভেজাল সরের শিকার হন। বছরের পর বছর এ অভিযোগ উঠলেও এর প্রতিকার তেমন দেখা যায়না।

দেশের কিছু জায়গায় আলু চাষের শুরুতে জমিতে আলু গাছ (চারা) উঠতে দেখা যায় নি। কিছু কিছু আলুর চারা মাটির উপরে দেখা গেলেও রোগাক্রান্ত ও জীর্ণ-শীর্ণ হলদে হয়ে মাটির উপর পড়ে থাকতে দেখা গেছে।তখন এমন সংবাদও জানা গেছে মিডিয়া মারফত। এবার আলু চাষীরা বীজ,সার, কীটনাশকের দাম বৃদ্ধি থেকেই মাশুল দিচ্ছেন।

এরপর গত ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে যখন কোন কোন এলাকায় আলু উঠা শুরু হলো তখন হরতাল আর ধর্মঘটের কবলে পড়লেন সাধারণ কৃষকেরা। মাঠ পর্যায়ের কৃষকেরা বড় নগরের বাজার আর ধরতে পারলেন না। হরতালের মাঝে সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবারে ঝুঁকি নিয়ে কৃষিপণ্য নিয়ে ঢাকায় আসার পথে বেশকিছু ট্রাককে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তখন রাজশাহীতে আলুভর্তি ট্রাক পুড়িয়ে দেওয়ার খবর প্রচার হয়েছে মিডিয়াতে।

অবশেষে আলুর বাম্পার ফলনের খবর হলো। জানা যাচ্ছে এবছর আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় ফলন ভাল হয়েছে। দেশে কোন ফসলের বাম্পার ফলন মানেই সে সফল চাষীদের মাথায় হাতের খবর। এবার আলু চাষীদের মাথায় হাত। গত মৌসুমে পটল চাষীদের এমন অবস্থা হয়েছিলো। এবার আলু বিক্রি করে চাষীদের মূলধন ঘরে ফিরে আসছে না। একেবারে যাঁরা প্রান্তিক কৃষক দুই এক বিঘা জমিতে চাষ করেছিলেন তাঁরা এই ক্ষতি পোষাবেন গায়ে গতরে খেটে,রিক্সা চালিয়ে। কিন্তু যাঁরা ১৫-২০ বা তারো চেয়ে বেশি জমিতে আলু চাষ কেরেছিলেন ব্যবসার লক্ষ্যে তাঁরা সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ব্যাংক,সমিতি বা মহাজনি ঋণ নিয়েছিলেন আসলসহ সুদের টাকা পরিশোধের দুশ্চিন্তায় কাটছে তাঁদের দিন। বিঘাপ্রতি কমপক্ষে ৭ হাজার লোকসান হবে বলে জানা গেছে। অনেক বর্গা চাষী উচ্চ-সুদে মহাজনদের নিকট থেকে দাদন নিয়েছেন দুশ্চিন্তা তাঁদের আরো বেশি।
p3
উপযুক্ত দাম না পাওয়ায় আলু চাষিদের প্রতিবাদ

জয়পুরহাট জেলার ক্ষেতলাল থেকে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ক্ষেতলাল উপজেলায় ৮হাজার ৫শ হেক্টর জমিতে আলু উৎপাদনের লক্ষ্য মাত্রা নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে উৎপাদন হয়েছে তার চেয়েও বেশি। উপজেলার বড় হাট ইটাখোলায় আলু বিক্রি হচ্ছে প্রতি মন ৮০ থেকে ৯০ টাকা মণ। অথচ গত বছর এই সময় প্রতি মন আলু বিক্রি হয়েছিলো কমপক্ষে ৭শো টাকায়। সরকারের কৃষি বিভাগের লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে প্রকৃতপক্ষে মাঠের চিত্র কখনোই মেলেনা। দেশে মোট খাদ্য চাহিদার সঙ্গে মিলিয়ে কৃষি জমির যথাযথ ব্যবহার হয়না। প্রতি মৌসুমে কোন সব্জি চাষ না হওয়ায় ফলে তার দাম অনেক বেশি আর কোনটিতে সারা দেশের কৃষক একসঙ্গে ঝাপিয়ে পড়ায় তার দাম একেবারে কম হয়। এমন ঘটনা প্রতিবছরেই কোন না কোন ফসলের ক্ষেত্রে দেখা যায়। কিন্তু তার কোন প্রতিকার নেই। বাংলাদেশের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের লোকবল আসলে কি কাজ করেন?

‘আলু রফতানির নানা উদ্যোগ’ শিরোনামে আজ শুক্রবার সমকালে একটি রিপোর্ট ছাপা হয়েছে । তাতে বলা হয়েছে,প্রথমবারের মতো এবার রাশিয়ায় আলু রফতানি করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। চলতি সপ্তাহে ২০ হাজার টন আলুর প্রথম চালানটি রাশিয়া যাবে। আলুর দরপতন ঠেকাতে ইউরোপ, সৌদি আরব, দুবাই, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও শ্রীলংকায় আলু রফতানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগের সুফল প্রান্তিক কৃষকের হাত পর্যন্ত পৌছাবে তো ? নাকি তাঁর হাত মাথাতেই থাকবে ?

টাইমস্ ২৪

One Response

Write a Comment»
  1. যেখানে ইতিহাস কথা বলে, আর তা হল ‍মুন্সীগঞ্জ। আমার দাদা আমার বাবাকে বলে ছিল জন্মের পর থেকেই আলুর সাথে পরিচিত। যেমনটি আমার বাবা আমাকে বলেছিল। আমিও বলব আমার পরবর্তী প্রজন্মের কাছে। প্রতি বছরই আমরা আলু উৎপাদন করি। কিন্তু কখনই হতাশা ছিলনা। কেননা নিজেদের জমি, নিজেদেরই আলু। কিন্তু এই বছর যে আলুর দামের অবস্থা তা থেকে মনে হয় উপরোল্লিখত ইতিহাস হয়ে থাকবে। তবে আমাদের বিক্রমপুর এর ঐতিহ্য অনুযায়ী আলু চাষ ছাড়া আর কোন বিকল্প পথ নেই। কেননা এই আলু দিয়েই আমরা আমাদের জীবিকা নির্বাহ করে থাকি। তাই সরকারের উচিত যাতে কৃষক বাচে সে ব্যবস্থা করতে হবে। কেননা বাংলাদেশ তো কৃষি প্রধান দেশ।