বাংলাদেশ অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় দাঁড়িয়ে

shellyড. মীজানূর রহমান সেলী
ড. মীজানূর রহমান সেলী বিশিষ্ট রাজনীতিক ও সমাজ বিশ্লেষক। সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ, বাংলাদেশ (সিডিআরবি) -এর চেয়ারম্যান। ড. সেলীর জন্ম ১৯৪৩ সালে মুন্সীগঞ্জের বিক্রমপুরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬২ সালে বি এ (অনার্স) এবং ১৯৬৩ সালে এম এ (মাস্টার্স) পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। ১৯৬৪ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করলেও ১৯৬৭ সালে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস (সিএসপি)-এর সদস্য হিসেবে চাকরি নেন। ১৯৯০ সালে মন্ত্রিসভায় টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পান। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থায় দায়িত্ব পালন করেন তিনি। যুক্ত আছেন সাংবাদিকতার সঙ্গেও। লিখছেন অসংখ্য বই। সম্প্রতি চলমান রাজনীতি নিয়ে মুখোমুখি হন সাপ্তাহিক-এর। সাক্ষাৎকারটি আমাদেরসময় ডটকমের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো –

সাপ্তাহিক : কোথায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ?

ড. মীজানূর রহমান সেলী : বাংলাদেশ অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় দাঁড়িয়ে। শুধু রাজনৈতিকভাবে নয়, অর্থনৈতিক এবং সামাজিকভাবেও বাংলাদেশ এই মুহূর্তে চরম সঙ্কটের মধ্যে রয়েছে। গত এক বছর থেকে ধারাবাহিক যে আন্দোলন তার ফলাফল থেকেই আজকের এ অবস্থা। ক্ষমতাসীন দল তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এর মধ্যে অতি স্পর্শকাতর বিষয় ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্তি করা। এই বিষয়টি বাংলাদেশকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

সাপ্তাহিক : তত্ত্বাবধায়ক তো অসাংবিধানিক ব্যবস্থা ?

ড. মীজানূর রহমান সেলী : দেখুন, আজ তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিলের জন্য আওয়ামী লীগ সকল কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। অথচ ১৯৯৬ সালে এই আওয়ামী লীগই বিএনপিকে বাধ্য করেছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা মেনে নিতে। জামায়াতে ইসলামীকে সঙ্গে নিয়েই আওয়ামী লীগ তখন বিএনপির বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিল। আওয়ামী লীগ টানা হরতাল-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়াকে একটি একমুখী নির্বাচন করিয়ে সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিলেন। বিএনপি যখন একই দাবিতে আন্দোলন করছে তা ইতিহাসের কারণে এক প্রকার বৈধতা পেয়ে যাচ্ছে। এই কারণেই দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে গোটা জাতির মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছিল। অসাংবিধানিক হলেও বাস্তবতা বুঝতে হবে।

সাপ্তাহিক : এরপরেও নির্বাচন হলো। সেই সঙ্কট কেটেছে নাকি ঘনীভূত হয়েছে?

ড. মীজানূর রহমান সেলী : নির্বাচনে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করা গেছে আপাতত। বিধি মোতাবেক সব কিছু হয়েছে বটে। কিন্তু সব কিছুই বিধি মোতাবেক হলেই সমাধান হবে, এটি মনে করার কোনো কারণ নেই। জীবন এবং বাস্তবতা যা বলে আইন এবং প্রথার মাধ্যমে তার প্রতিফলন নাও ঘটতে পারে তা আমাদের সবারই জানা।

সাপ্তাহিক : এই নির্বাচনে বাংলাদেশ কী পেল?

ড. মীজানূর রহমান সেলী : এরকম একটি অন্তঃসারহীন নির্বাচন, বিশ্বের ইতিহাসে এর নজির নেই বললেই চলে। অত্যন্ত স্বৈরাচারী-ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রেও এমন নির্বাচন হয় না। আফ্রিকার অসভ্য রাষ্ট্রে এমন নির্বাচন হয়ে থাকতে পারে। এই নির্বাচনে জনমতের প্রতিফলন যে ঘটেনি তা সরকার ভাষ্যমতেই প্রমাণিত। সরকারেরই দাবি ৪০ শতাংশ ভোট পড়েছে। কিন্তু মাঠের হিসাব আরও কম। অনেকে দশ শতাংশ বা পাঁচ শতাংশ ভোটের কথা বলেছেন। অর্ধশত কেন্দ্রে একটি ভোটও পড়েনি। এটি গভীর ভাবনার বিষয়। সরকার দলের এজেন্টদেরও ভোট দেয়ার সুযোগ ছিল। তারাও কেন ভোট দিল না এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন। ফলে এই নির্বাচন অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ এবং জনমতের বিরোধী বলেই মূল্যায়ন করতে হবে।

সাপ্তাহিক : এই সরকারের ভবিষ্যৎ কী?

ড. মীজানূর রহমান সেলী : ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়নি বলেই রাজনৈতিক দলগুলো একই ভুল বারবার করে থাকে। ‘৮৬, ‘৯৬-এর নির্বাচনের ফলাফল ভালো হয়নি। ওই দুটি সরকারের সঙ্গে এই সরকারের তুলনা করলে বলা যায়, সরকার খুবই কৌশলের সঙ্গে চলছে যা নৈতিকতার কষ্টি পাথরে অবৈধ। তবে আপাতত সরকার সফল।

সাপ্তাহিক : যেমন?

ড. মীজানূর রহমান সেলী : দীর্ঘ সময় ধরে বিরোধী দলকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে ঘুরপাক খাওয়ানোই সরকারের সফলতা। আদালত বলেছিল, সংসদ চাইলে আরও দুটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে পারে। কিন্তু সংসদে এ বিষয়ে কোনো আলোচনাই হয়নি। সরকারপ্রধান নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়ে কালক্ষেপণ করেছেন। কিন্তু বিরোধী দল এটি বোঝার দূরদর্শিতা এবং শক্তি দেখাতে পারেনি। এর কারণে তারা ব্যর্থ বলেই মনে হয়। এতে সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ। কারণ বিরোধী দলের আন্দোলনে সমর্থন না থাকলেও সরকারের প্রতি সাধারণের আস্থা ছিল না।

সাপ্তাহিক : নির্বাচনে লাভক্ষতির প্রশ্নে কী বলবেন?

ড. মীজানূর রহমান সেলী : আমি প্রথমত বলব, এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের ক্ষতি হয়েছে। বিরোধী দলেরও ক্ষতি হয়েছে। সর্বোপরি দশম জাতীয় নির্বাচনে দীর্ঘমেয়াদে আওয়ামী লীগের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে।

সাপ্তাহিক : তা কেন হবে? আওয়ামী লীগ তো সরকার গঠন করেছে?

ড. মীজানূর রহমান সেলী : আওয়ামী লীগের মতো একটি জনসমর্থনপুষ্ট, ঐতিহ্যবাহী, গণতান্ত্রিক সংগঠনের জন্য এই নির্বাচনের চেয়ে লজ্জার আর কিছু নেই। নানা কূটকৌশল এবং পুলিশি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেও অর্ধেকের বেশি আসনে নির্বাচন করতে পারেনি। বাকি আসনগুলোতেও লোক দেখানো নির্বাচন হয়েছে মাত্র। এর কোনো নৈতিক ভিত্তি নেই। এর চেয়ে লজ্জার আর কী আছে। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী সবসময় বলেন, তারা মানুষের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছে। আমি বলব, আওয়ামী লীগ এবার ভোটারদের নির্বাসনে পাঠিয়েছে।

সাপ্তাহিক : ভোটার উপস্থিতি কম হওয়ার জন্য সহিংসতাও দায়ী…

ড. মীজানূর রহমান সেলী : এটি একটি কারণ হতে পারে। কিন্তু সহিংসতার কারণেই ভোটার ভোট দেয়নি এটি কেউ বিশ্বাস করে না।

সাপ্তাহিক : এই অবস্থায় গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ কী?

ড. মীজানূর রহমান সেলী : সরকার যেভাবে চলতে চাইছে এতে গণতন্ত্র মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। গণতন্ত্র মানে একটি নির্বাচন নয়, মানুষের চলাফেরা, বাকস্বাধীনতা গণতন্ত্রের প্রথম শর্ত। কিন্তু এই স্বাধীনতা প্রতিনিয়ত লক্সিঘত হচ্ছে। এইভাবে চললে সরকারকে হোঁচট খেতে হবে। ছলাকলার রাজনীতি চলতে থাকলে, মানবাধিকার, সুশাসন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কোনোটিই এখানে থাকবে না। যদিও গণতন্ত্র এখন নেই বললেই চলে।

সাপ্তাহিক : নির্বাচন ছাড়া সরকারের আর কী বিকল্প ছিল?

ড. মীজানূর রহমান সেলী : বিকল্প হয়ত ছিল না। কিন্তু এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জাতি কী পেল? এখন কী হবে? এই নির্বাচন নিয়ে কেউ কি সন্তুষ্ট? খোদ সরকার দলের নেতারাও সন্তুষ্ট নন। ফলে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে এই মুহূর্তে সরকারকেই সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে। যে সংলাপ, সমঝোতার কথা দীর্ঘদিন থেকে আমরা শুনে আসছি তার জন্য সরকারকেই এখন উদ্যোগ নিতে হবে।

সাপ্তাহিক : বিরোধী দল এখন জাতীয় পার্টি। কার সঙ্গে সংলাপ হবে?

ড. মীজানূর রহমান সেলী : আসল বিরোধী দলকে সংসদের বাইরে রেখে আপনি গৃহপালিত বিরোধী দল দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারেন না। সরকার জাতীয় পার্টিকে নিয়ে যা করছে তাতে কুল রক্ষা হবে না। বিরোধী দলের অংশবিশেষ সরকারে থাকবে তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল ঘটনা। সরকারের গণবিরোধী অবস্থানের সমালোচনা করার কোনো পক্ষ নেই। অথচ বিশাল বিরোধী দল মাঠে নেই, সংসদেও নেই। এ যেন বিরোধী দলকে হাত-পা বেঁধে প্রেতাত্মা হিসেবে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। প্রেতাত্মার শক্তি কিন্তু বাড়ে। ফলে কী হবে বোঝা দায়।

সাপ্তাহিক : শুধু একটি নির্বাচনের মধ্য দিয়েই সমাধান সম্ভব? আরও বিষয় তো সামনে এসেছে?

ড. মীজানূর রহমান সেলী : যদি নির্বাচন না হয় তাহলে আমরা গণতন্ত্রের কথা বলি কেন? গণতান্ত্রিক পরিবেশে মানুষ যদি ইসলামপন্থিদের ভোট দেয় তা তো আপনি অস্বীকার করতে পারবেন না। অস্বীকার করতে পারেন আপনি মিসরের পথ অবলম্বন করে। মুসলিম ব্রাদারহুড ৫২ শতাংশ ভোট পেয়ে সরকার গঠন করল। আর সেনাবাহিনীর সহায়তায় গণঅভ্যুত্থান ঘটিয়ে একটি বৈধ সরকারকে উৎখাত করল। তাতে কি সমাধান হয়েছে? মিসরে এখনও রক্তপাত ঘটছে। বাংলাদেশে এখনও সেই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি। আপনি আপনার চিন্তা-চেতনা দিয়ে বিরোধী শক্তিকে মোকাবেলা করতে না পারলে পেশীশক্তি দিয়ে দীর্ঘদিন চলতে পারবেন না। এখানে মৌলবাদী শক্তি নগণ্য ছিল বলেই মনে করি।

সাপ্তাহিক : মৌলবাদী শক্তি তো এখনও নগণ্যই?

ড. মীজানূর রহমান সেলী : সরকার তার বিরোধী পক্ষকে যেভাবে কোণঠাসা করতে চাইছে তাতে এই মৌলবাদী শক্তি আরও প্রসারিত হবে। মানুষ বাঁচার তাগিদেই কট্টরপন্থি হয়ে উঠবে। তখন পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিতরাই মৌলবাদী ধারায় রাজনীতি করার পথ অবলম্বন করবে। যেমনটি হয়েছিল ইরানের শাহান শাহর আমলে।

সাপ্তাহিক : কিন্তু ইরানে তো গণতন্ত্র নির্বাসনে?

ড. মীজানূর রহমান সেলী : শাহান শাহর আমলে গণতান্ত্রিক ধারায় পরিচালিত উদারপন্থি, পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত শ্রেণীকে এমনভাবে নির্যাতন এবং কোণঠাসা করে রাখল তখন মোল্লাদের ছাড়া আর কাউকে কথা বলতে দেখা গেল না। এই কঠোর অবস্থানই মোল্লাদের বিপ্লবের জন্য সহায়ক হিসেবে কাজ করেছে। মানুষ বাঁচার জন্যই মোল্লাদের সমর্থন দিয়েছে। অনেক উদারপন্থি দল কট্টরপন্থি আয়াতুল্লাহ খামেনির কাছে দ্বারস্থ হলো। বিজ্ঞানমনস্ক নিয়ে যারা রাজনীতি করতেন তারাও কট্টরপন্থিদের কাছে গেলেন। এতে শেষ বিচারে আয়াতুল্লাহ খামেনিদের বিপ্লব ত্বরান্বিত হলো। উদারপন্থিদের জায়গা ছিল না বলেই কট্টর ইসলামপন্থিদের কাছে যেতে হলো।

সাপ্তাহিক : সেই তুলনায় বাংলাদেশ নিয়ে কী বলবেন?

ড. মীজানূর রহমান সেলী : বাংলাদেশের ইসলাম আর দশটি মুসলিম দেশের ইসলাম থেকে ভিন্ন। এখানে সুফী-সাধকদের মাধ্যমে ইসলাম প্রচার পেয়েছে। এখানে তরবারি দিয়ে ধর্মান্তরিত করা হয়নি। এ কারণেই ভারত উপমহাদেশে মুসলমানরা এখনও সংখ্যাগরিষ্ঠ নয়। ভালোবাসা এবং মানুষকে বুঝিয়ে অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে ইসলাম প্রচার করা হয়েছে। এ কারণে জামায়াতে ইসলাম এখনও ভোটের ব্যবধানে এগিয়ে যেতে পারেনি। কিন্তু আমরা রাজনৈতিক যে অস্থিরতা এবং দুর্বৃত্তায়ন দেখতে পাচ্ছি, তাতে জামায়াতের লাভ হবে বলে মনে করি। সরকারের এক মন্ত্রীর হলফনামায় দেখলাম, ২০ একর জমি থেকে ২৮৪০ একর জমি হয়েছে। এই বৈষম্য চলতে থাকলে ইসলামের নামেই হোক আর সমাজতন্ত্রের নামেই হোক, যারাই সাম্যবাদের কথা বলবেন তারাই লাভবান হবেন। প্রগতি আর মৌলবাদের কথা বলে তখন মানুষকে ঠেকানো যাবে না।

সাপ্তাহিক : তাই বলে মৌলবাদও গুরুত্ব পাবে?

ড. মীজানূর রহমান সেলী : ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে খাবারের নামই ভগবান। ভারতে পেঁয়াজের দাম বাড়ে বলেই বিজেপির জনপ্রিয়তা বাড়ে। কংগ্রেস বৈষম্য করছে বলেই বিজেপি আর মৌলবাদী দল হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে না। তখন বিজেপি উন্নয়নের দল হচ্ছে। এই বাস্তবতা আপনাকে বুঝতে হবে।

সাপ্তাহিক : বর্তমান পরিস্থিতি কি সেরকম কিছুরই ইঙ্গিত দিচ্ছে?

ড. মীজানূর রহমান সেলী : এই নির্বাচনে যাদের শিক্ষার অধিকার নেই, খাবারের অধিকার নেই তাদেরই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। কারণ তাদের একমাত্র ভোটের অধিকারটিও সরকার ছিনিয়ে নিয়েছে। এই অবস্থায় যারা ঘুমিয়ে না থেকে কাজ করবে তারাই লাভবান হবে। আওয়ামী লীগ-বিএনপিও যদি তাদের ভোল পাল্টিয়ে গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করে তাহলে তারাও সেই জায়গায় অবস্থান করতে পারবে।

সাপ্তাহিক : মূলধারার সংগঠনগুলো ব্যর্থ হলে কোন বলয় গুরুত্ব পাবে? ডান না বাম?

ড. মীজানূর রহমান সেলী : তন্ত্র-মন্ত্রের কথা বলে আর লাভ নেই। সব তন্ত্রের কথাই মানুষের জানা আছে। এখন যে বেঁচে থাকার নিরাপত্তা দিতে পারবে তারাই হবে আসল তন্ত্রী। জানমালের নিরাপত্তা দিতে পারলেই সমাজে টিকে থাকা যাবে।

সাপ্তাহিক : টিকে থাকার প্রশ্নে কারা আসবে এগিয়ে?

ড. মীজানূর রহমান সেলী : শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত তরুণ সমাজেই এর নির্ধারক হবে। যারা বিশ্বের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ রক্ষা করতে পারবে তারাই এগিয়ে যাবে। এখানে কারা এগিয়ে যাচ্ছে আমি সে ব্যাপারে বলতে চাই না।

সাপ্তাহিক : বিদেশিদের তৎপরতা বাড়ছেই? শেখ হাসিনার এই সরকারকে কোনো দেশ সমর্থন করলে সরকার তা বড় করে দেখছে, আবার কেউ সমর্থন না করলে বিরোধী দল তা নিজেদের বিজয় বলে দেখছে। আসলে কী হচ্ছে?

ড. মীজানূর রহমান সেলী : বিদেশিদের তৎপরতা আমাদের জন্য লজ্জার। যুক্তরাষ্ট্র নির্বাচন পর্যবেক্ষক পাঠায়নি বলে অনেকেই চিন্তিত। কিন্তু আমরা কী যুক্তরাষ্ট্রে পর্যবেক্ষক পাঠাতে পারি। এর কারণ হচ্ছে, আমরাই আমাদের নিজেদের ঘর সামলাতে পারছি না বলেই তাদের এত গুরুত্ব। এটি নিজেদের দেউলিয়াপনার কারণেই হচ্ছে।

বিদেশিদের সার্টিফিকেট না পেলে আমাদের আত্মতৃপ্তি হয় না। এটি বাঙালির মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা। রবীন্দ্রনাথকে নোবেল না দিলে হয়ত আমরা তাকে সেই অর্থে গুরুত্ব দিতাম না। আমরা নিজেরাই নিজেদের সম্মান করতে পারি না বলেই বিদেশিদের প্রভু মানতে উঠেপড়ে লাগি। সামান্য আত্মসম্মান বোধ থাকলে এইভাবে নিজেদের বিবেক বিকিয়ে দিতে পারি না। আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি কিন্তু নিজেদের সম্মান উপলব্ধি করতে পারিনি।

সাপ্তাহিক : সরকারের কাছে ভারত অধিক গুরুত্ব পাচ্ছে…

ড. মীজানূর রহমান সেলী : অত্যন্ত লজ্জা এবং উদ্বেগের কথা যে ভারত নাকি আমাদের হয়ে পররাষ্ট্র সম্পর্ক নির্ধারণ করবে। এটি ভারতের অনেক পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হয়েছে।

সাপ্তাহিক : ভারত এভাবে এগিয়ে আসার বিশেষ কী কারণ থাকতে পারে?

ড. মীজানূর রহমান সেলী : আওয়ামী লীগ এমন একটি নির্বাচন করেছে যা বিশ্বের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ। এ কারণেই ভারতের স্বার্থে এই সরকারকে টিকিয়ে রাখতে অন্য দেশের সঙ্গে ওকালতি করবে।

ড. মীজানূর রহমান সেলী : তাহলে আমরা কী ভারতের দ্বারস্থ হয়ে পড়ছি?

ড. মীজানূর রহমান সেলী : নিজেদের ইচ্ছায় হয়ত দ্বারস্থ হচ্ছি না। এখানে ষড়যন্ত্র আছে। পরিকল্পিতভাবেই আমাদের মেরুদ- ভেঙে দেয়া হয়েছে। আমরা সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছি না বলেই ভারত যা খুশি তাই করতে পারছে।

সাপ্তাহিক : তার মানে ভারতের মাতব্বরি আমাদের জন্য অনিবার্য হয়ে উঠল?

ড. মীজানূর রহমান সেলী : আমি এই মুহূর্তে ঠিক এইভাবে বলতে চাই না। কারণ ১৬ কোটি মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দিয়েই কথা বলতে হবে। মনে রাখতে হবে, দেশের মানুষ ভারতের এই হস্তক্ষেপ কতটুকু মেনে নেবে।

সাপ্তাহিক : মেনেই তো নিচ্ছি?

ড. মীজানূর রহমান সেলী : ভারত নিজেদের সমস্যা নিয়েই অস্থির। সেভেন সিস্টার এবং কাশ্মীর নিয়ে ভারত সুখে নেই। বিষয়টি হচ্ছে, আমরা নিজেদের মারামারিতে উপযাচক হয়ে যদি ভারতকে টানি তাহলে তো শুধু ভারতের নীতির বিরোধিতা করে লাভ নেই। এই অবস্থায় ভারত মাতব্বরি করলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। আগে নিজেদের নীতি ঠিক করতে হয়।

সাপ্তাহিক : ভোটের হিসাবে জনমত সরকারের বিপক্ষে। ভারত এমন সরকারকে সমর্থন দিয়ে পরিস্থিতি কতটুকু অনুকূলে রাখতে পারবে?

ড. মীজানূর রহমান সেলী : শুধু ভারত সমর্থন দেয়নি। যুক্তরাষ্ট্রও বলেছে, নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও এই সরকারের সঙ্গে কাজ করে যাবে। ফলে ভারত সমর্থন দিয়েছে বলেই মানুষ ভারতের নীতির পক্ষে চলে যাবে এটি মনে করার কোনো কারণ নেই। এই নির্বাচন নিয়ে কথা বলার কোনো সুযোগ নেই। এখানে সাধারণ মানুষ বঞ্চিত হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য সব কিছুতেই নিরাপত্তার অভাব। সহিংসতায় এক লাখ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এক লাখ কোটি অলস টাকা ব্যাংকে পড়ে রয়েছে। বিনিয়োগের পরিবেশ নেই। এই অবস্থায় ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সুযোগ নিতে চাইবে এটাই স্বাভাবিক।

সাপ্তাহিক : বিএনপির আন্দোলনে জনসমর্থন ছিল কিন্তু জনগণকে মাঠে নামাতে পারেনি। এ ব্যাপারে আপনার কী পর্যবেক্ষণ?

ড. মীজানূর রহমান সেলী : বিএনপির আন্দোলনের কলাকৌশলে ভুল ছিল বলে মনে হয়। নতুবা আন্দোলন পুরোভাগ বিএনপির হাতে ছিল না। বিএনপি আন্দোলনে ব্যর্থ হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

সাপ্তাহিক : এরশাদবিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়া সফল, এখন কেন ব্যর্থ?

ড. মীজানূর রহমান সেলী : সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং শ্রেণী চরিত্রের কারণেই বিএনপি আন্দোলনে মানুষকে মাঠে নামাতে পারেনি।

১৯৮৬ সালের পর খালেদা জিয়া এরশাদবিরোধী আন্দোলন করে যে সফলতা দেখিয়েছিলেন, ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় গিয়ে সে সফলতা ধরে রাখতে পারেননি। বিএনপির নেতাকর্মীরা দুবার ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে যে অর্থসম্পদের মালিক হয়েছেন তা আন্দোলন করে হারাতে চান না। আওয়ামী লীগের জন্যও একই মন্তব্য প্রযোজ্য।

সাপ্তাহিক : এই সরকারের মেয়াদ নিয়ে কী বলবেন?

ড. মীজানূর রহমান সেলী : রাজনীতিতে সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলা ঠিক হয় না। কী হতে পারে এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে বাস্তবতার ওপর। কে কী করতে পারবে তার ওপরই রাজনীতির মেরুকরণ নির্ভর করবে। এই অন্তঃসারশূন্য নির্বাচনে সরকার গঠন করে শাসক গোষ্ঠী যদি তার চরিত্র পরিবর্তন করতে না পারে তাহলে স্বল্প মেয়াদেই সরকারকেই বিদায় নিতে হবে।

সাপ্তাহিক : নতুন মন্ত্রিসভা নিয়ে অনেকেই আশ্বস্ত…

ড. মীজানূর রহমান সেলী : বৃক্ষের পরিচয় ফলে। মুখে বলেই তো সব সমাধান করা যায় না। প্রশাসনসহ সব কিছুতে দলীয়করণ করে সরকার একটি ভঙ্গুর অবস্থা তৈরি করেছে। এই নীতির পরিবর্তন করতে না পারলে সরকার ভালো কিছু করতে পারবে বলে মনে হয় না।

সাপ্তাহিক : এ ক্ষেত্রে আপনার পরামর্শ কী?

ড. মীজানূর রহমান সেলী : শেখ হাসিনার এই সরকার যদি নগ্নভাবে আর দলীয়করণ না করেন, দুর্নীতিবাজদের প্রশ্রয় না দেন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেন তাহলে আগের অবস্থা থেকে ফিরে আসার সুযোগ পেতে পারেন। গণমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। একইভাবে বিরোধী দলকে কথা বলার সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে।

সাপ্তাহিক : বিরোধী দল জাতীয় পার্টি নিয়ে আপনার কী মূল্যায়ন?

ড. মীজানূর রহমান সেলী : সরকারের গৃহপালিত বিরোধী দল জাতীয় পার্টিকে নিয়ে কেউ ভাবছে বলে মনে হয় না। আসল বিরোধী দলের কথা গুরুত্ব দিচ্ছি আমি। নির্বাচন করেই যদি সেই বিরোধী দলের মর্যাদা দিতে তাহলে নির্বাচন করতে হবে।

সাপ্তাহিক : যদি নির্বাচন না হয়?

ড. মীজানূর রহমান সেলী : যে সঙ্কট দেখা দিয়েছে তা আরও প্রসারিত হবে। তখন আর বেরিয়ে আসার উপায় থাকবে না।

সাপ্তাহিক : জামায়াত নিষিদ্ধের দাবি উঠেছে । আপনি কী বলবেন?

ড. মীজানূর রহমান সেলী : গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে যা করার তাই করতে হবে। পাকিস্তানে কমিউনিস্ট পার্টি বহু বছর নিষিদ্ধ ছিল। তাই বলে কী কমিউনিস্ট পার্টি পাকিস্তান থেকে উধাও হয়ে গেছে? বরং আরও বেশি শক্তিশালী হয়েছিল। মোকাবেলা করতে হলে ভালো করে করতে হয়। আপনি নিষিদ্ধ করে দিলেন আর তারা চুপ হয়ে গেল এটি মনে করা মহাভুল হবে। রাজনীতিকে রাজনীতি দিয়েই মোকাবেলা করতে হয়। নির্বাচনী নিবন্ধন বাতিল করলেই মানুষের মনের নিবন্ধন বাতিল হয় না।

সাপ্তাহিক