কর্মচঞ্চল সেই ধলেশ্বরী এখন বিপন্ন

cfমোজাম্মেল হোসেন সজল: একদা মুন্সীগঞ্জের ধলেশ্বরী নদী ছিল কর্ম-ব্যস্ত। কার্গো আর হুইসেলের শব্দে ছিল মুখরিত। দেশের দক্ষিণবঙ্গসহ বিভিন্ন জেলা থেকে ধান-চাল বোঝাই করে আসতো বড় বড় পালতোলা নৌকা। ধলেশ্বরী নদীর তীরে দ্বিতীয় কলকাতা খ্যাত মিরকাদিম নদী বন্দরে আসতো যেতো ওইসব পালতোলা নৌকা, স্টীমার-কার্গো। ধান-চালের মহাজনদের ভিড়ে দিন রাত মুখরিত থাকতো এ নদী। কিন্তু এখন আর সেই কোলাহল-হুইসেলের শব্দ নেই। সময়ের বিবর্তনে থমকে গেছে মিরকাদিম নদী বন্দরের পুরণো কর্ম-চঞ্চল্যতা। সেই সঙ্গে মুন্সীগঞ্জ শহরতলী লাগোয়া ধলেশ্বরী নদী এখন আর আগের মতো মুখর হয়ে উঠে না। স্বচ্ছ-টলটলে পানিও দুষিত হয়ে গেছে।

মুন্সীগঞ্জের চরমুক্তারপুরে বিভিন্ন টেক্সটাইল মিলসের কেমিক্যাল মিশ্রিত তরল বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলে বায়ু দূষণ করে চলেছে। মুক্তারপুর ও চরমুক্তারপুরে সিমেন্ট ফ্যাক্টরীর অ্যাশ ও ডাইং ও প্রিন্টিংসহ অংসখ্য শিল্প প্রতিষ্ঠান পানি ও বায়ু দূষণ করে প্রাকৃতিক পরিবেশ বিপন্ন করে তুলেছে। সিমেন্ট, টেক্সটাইল ও ডাইং ফ্যাক্টরীর অ্যাশ ও বিষাক্ত বর্জ্যে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে মুন্সীগঞ্জের ধলেশ্বরী নদী। ঢাকার বুড়িগঙ্গার পর মিরকাদিম নদী বন্দরের ধলেশ্বরী দিন দিন বিপন্ন হয়ে উঠেছে। ইতিমধ্যে ধলেশ্বরীর পানি দূষিত হয়ে নিকষ কালো রং ধারণ করেছে।

মিরকাদিম নদী বন্দর ঘাট থেকে শুরু করে শহরের কাছে চরকিশোরগঞ্জ এলাকা পর্যন্ত দীর্ঘ ২ কিলোমিটার এলাকায় ধলেশ্বরী নদীর পানি পঁচে গেছে। ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। এ পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় নদী পাড়ের বাসিন্দাদের গোসল করার ক্ষেত্রে হচ্ছে সমস্যা। মাছও নেই নদীতে। জেলেরা এখন আর এ নদীতে মাছ শিকারে আসে না। আগে নদীতে কিছু সময় পরপর শুশুম মাছ ভেসে উঠতো। তা আবার ডুবে যেতো। কিন্ত সেই শুশুম মাছ তথা ডলফিন মাছ এ নদীতে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।


শহরের উপকন্ঠ মুক্তারপুর এলাকায় ধলেশ্বরী নদীর দু’পাড় ঘেঁষে গড়ে উঠা একাধিক টেক্সটাইল ও ডাইং মিলের নির্গমনকৃত বিষাক্ত বর্জ্য গিয়ে পড়ছে ধলেশ্বরীর বুকে। এ নদীর পাড়েই গড়ে উঠেছে সিমেন্ট তৈরির বেশ কয়েকটি ফ্যাক্টরী। যার ক্লিংকার ও অ্যাশ উড়ে এসে পড়ছে ধলেশ্বরীর পানিতে। এভাবেই কারখানার বর্জ্য ও সিমেন্টের অ্যাশ ধলেশ্বরীকে বিপন্ন করে তোলেছে বলে খোদ পরিবেশ অধিদপ্তর ও নদীর পাড়ের বাসিন্দারা দাবি করছেন।

পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্র মতে, শহরের উপকন্ঠ মুক্তারপুর এলাকায় গড়ে উঠা টেক্সটাইল, ডাইং মিল ও সিমেন্ট তৈরির ফ্যাক্টরী গুলোর বিষাক্ত বর্জ্য নির্গমনের পরিবেশ বান্ধব কোন ব্যবস্থা নেই। ফ্যাক্টরী গুলোতে বর্জ্য পরিশোধিত ট্রিমেন্ট প্লান্ট না থাকার কারণে সরাসরি ওই বিষাক্ত বর্জ্য ফেলা হচ্ছে নদীতে। তাছাড়া সিমেন্ট ফ্যাক্টরীগুলোর অ্যাশ উড়ে সরাসরি নদীতে গিয়ে পড়ছে।

সিমেন্ট ফ্যাক্টরীতে খোলা মেলাভাবে ক্লিংকার ও অ্যাশ জাহাজে লোড-আনলোড করা হচ্ছে। সিমেন্টের অ্যাশ উড়ে এসে শহর লাগোয়া ধলেশ্বরী নদীর তীরবর্তী হাটলক্ষীগঞ্জ, নয়াগাঁও, মীরেশ্বরাই, মুক্তারপুর, চরমুক্তারপুরসহ আশপাশ এলাকার পরিবেশ দূষণ করে চলছে বলে অভিযোগ করেছেন ওই সব এলাকাবাসী। সামান্য বাতাসেই সিমেন্ট ফ্যাক্টরীর অ্যাশ দ্বারা আশাপাশের সমস্ত এলাকা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।

এ প্রসঙ্গে মুন্সীগঞ্জ জেলা পরিবেশ অধিদপ্তর জানায়, ইতিমধ্যে ধলেশ্বরী নদীকে বিপন্ন হওয়ার হাত থেকে রক্ষার স্বার্থে সিমেন্ট ফ্যাক্টরী ও টেক্সটাইল কারখানা গুলোতে পরিবেশ অধিদপ্তর বেশ কয়েক দফায় অভিযান চালিয়েছে। ওই ফ্যাক্টরীগুলোকে জরিমানা করার পাশাপাশি বিষাক্ত বর্জ্য নির্গমনে বর্জ্য পরিশোধনের ট্রিমেন্ট প্লান্ট বসাতে বলা হয়েছে। গত বছরের ২ জুলাই চর মুক্তারপুরে আইডিয়েল টেক্সটাইল মিলস ও বর্ণালী ফ্যাবিক্সকে কেমিক্যাল মিশ্রিত তরল বর্জ্য অপরিশোধিত অবস্থায় মাটির নীচে নির্মিত পাইপ লাইনের মাধ্যমে সরাসরি ধলেশ্বরী নদীতে ফেলার অভিযোগে ৩৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করে পরিবেশ অধিদপ্তর। ওই সময় পূর্ণাঙ্গভাবে পানি পরিশোধন প্ল¬ান্ট (ইটিপি) স্থাপন না করা পর্যন্ত ডাইং ও প্রিন্টিং কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়া হয়। এর পর আর মুক্তারপুরে টেক্সটাইল মিলসগুলোতে পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযানের খবর পাওয়া যায়নি। ব্যাপক মাত্রায় বায়ুদূষণের অপরাধে পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে সম্প্রতি ক্রাউন্ট সিমেন্ট, প্রিমিয়ার সিমেন্ট, শাহ সিমেন্টসহ বিভিন্ন কলকারখানার মালিকদের জরিমানা ও সর্তক করে দেয়া হয়।
cf
শহরের উপকন্ঠ নয়াগাঁও এলাকার বাসিন্দা ইউপি সদস্য রাশেদুল হাসান জানান, পশ্চিম ও পূর্ব মুক্তারপুর, নায়াগাঁও, হাটলক্ষ্মীগঞ্জ এলাকার নারী-পুরুষ ও শিশুরা ব্রংকাইটিস, নিমোনিয়াসহ শ্বাস প্রশ্বাস ও চর্ম রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এছাড়া গাছপালা ও ফসলাদির ক্ষতি হচ্ছে। ইতিমধ্যে ধলেশ্বরী নদীর তীরে বড় বড় অনেক গাছ মারা গেছে। এদিকে সম্প্রতি পঞ্চসার ইউনিয়ন পরিষেদের উদ্যোগে ওই অঞ্চলের নদীর পাড়ে বৃক্ষ রোপন করা হয়েছে বায়ুদূষণের হাত থেকে পরিত্রাণের আশায়। এছাড়া নদীর তীরে গড়া ফ্যাক্টরীগুলো নদী দখল করে নিচ্ছে।

শহরের উপকন্ঠ চর মুক্তারপুর এলাকায় ধলেশ্বরী-শীতলক্ষ্যা মোহনা দখল করে জাহাজ নোঙরের জন্য নির্মিত শাহ সিমেন্ট ফ্যাক্টরীর অবৈধ জেটি স্থাপন করা হয়েছে। গত বছরের ১৬ মে দুপুরে মুন্সীগঞ্জ নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট আব্দুল কাদেরের নেতৃত্বে বিআইডব্লিউটিএ শাহ সিমেন্ট ফ্যাক্টরীর ওই অবৈধ জেটি উচ্ছেদ করতে গিয়ে শাহ সিমেন্ট ফ্যাক্টরীর কর্তৃপক্ষ ও শ্রমিকদের বাঁধার মুখে ৬ ঘন্টা পর সন্ধ্যায় ফিরে আসে। এর পরদিন উচ্ছেদ অভিযানে নারায়ণগঞ্জ থেকে রুস্তম আনা হয়। কিন্ত রহস্যজনক কারণে সে উচ্ছেদ অভিযান আজো দেখা মেলেনি। ফ্যাক্টরীগুলো নদী দখল করে নেয়ায় ধলেশ্বরী নদী এখন সরু খালে পরিণত হয়েছে। দক্ষিণবঙ্গের ছোট-বড় লঞ্চসহ বিভিন্ন নৌযান রাতে ঝুঁকি নিয়ে চলছে।

মুন্সীগঞ্জবার্তা