পরিষ্কার কাপড় না পরে মনটাকে পরিষ্কার করা দরকার

akচিত্রশিল্পী আবুল খায়ের
চিত্রশিল্পী আবুল খায়ের এর সাক্ষাৎকার নেয়ার জন্য দুপুর গড়িয়ে আমরা তার বাড়িতে পৌঁছলাম ১ টার দিকে। তার বাড়ি মুন্সীগঞ্জ সদরের মিরকাদিম পৌরসভার বিনোদপুর গ্রামে। আগেই ফোন করে গিয়েছিলাম। একবার কলিংবেল চাপতেই গেট খুলে দিলেন। ভেতরে ঢুকতেই বোঝা গেল এটা একটা শিল্পীর বাড়ি। বাড়ির দেয়ালে লালনের কথা দিয়ে সুন্দর নকশা করা। ভেতরে হল রুমে গিয়ে বসলাম। এর আগেও আমি তার কাজের ঘরে এসেছিলাম। এবার দেখলাম অন্যরুপ। দশ ফুট তের ফুটের বিশাল তিনটি দেয়ালে লালন বাউল সাধকদের বিভিন্ন আকারের প্রায় ৪০টি মুখমন্ডল আকা। অপূর্ব এক চিত্রকলা, ছবির প্রত্যেকটা চোখই যেন আমার দিকে তাকিয়ে আছে। একপাশে একটি কম্পিউটারের টেবিল, ইজেল, ট্রাইপট। একপাশে রাখা আছে হরেক রকম বাদ্যযন্ত্র। ঢোল, তবলা, একতারা, মেন্ডোলিন, খঞ্জর, জিপসি, খমক, মন্দিরা সব কিছুই আছে। সারা ঘরের এখানে সেখানে ছড়িয়ে আছে লালনের বিভিন্ন রকম বই।

কথায় কথায় জানা গেল আজকাল উনি লালনের গানের সাধন করছেন। সাধকদের মুখমন্ডলের ছবিতে ভর্তি পুরো চিত্রকর্মটির নাম দিয়েছেন “সহজ মানুষ”। কথায় কথায় জানা গেল লালনের গানের চর্চা পুরোদমে করছেন পাশাপাশি একটা শর্টফিল্মও করছেন
কথাবার্তার এক পর্যায়ে বললাম- কিছু প্রশ্ন ছিল..
মুচকি হেসে বললেন, করেন।

মুন্সীগঞ্জ বার্তা : কেমন আছেন?
আবুল খায়ের : অনেকক্ষণ কথাবার্তার পর এমন প্রশ্ন শুনে হেসে উঠলেন। হাসিমুখে বললেন, ভালো।


মুন্সীগঞ্জ বার্তা : আপনি পেশায় একজন চিত্রশিল্পী, পাশাপাশি আপনি একজন দেশী ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার প্রাপ্ত ফটোগ্রাফার। ফটোগ্রাফার না হয়ে চিত্রশিল্পী কেন হলেন ?
আবুল খায়ের : দেখুন আমাদের পরিবারে চাকরিজীবী তেমন নাই। সবাই ব্যবসা করে। আমার ছবি আকার চর্চাটা ৩২ বছরের। ফটোগ্রাফি আমি সেই ফিল্মের আমল থেকেই করি। আমার মনে হয় ফটোগ্রাফিতে কোন প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ করতে গেলে একটা চাপ থাকে। পেশাদারিত্বের সাথে কোন স্টুডিও দিলেও কাস্টমারের মন-মর্জিমত ছবি তুলতে হতো। আর চিত্রকলায় আমার কোন চাপ নেই। নিজের মনমত আঁকা যায়। তবে এখন ফটোগ্রাফি আমার চিত্রকলায় খুব সাহয্য করে।

মুন্সীগঞ্জ বার্তা : ছবি আঁকা ছাড়া অন্য কোন পেশায় জড়িত আছেন?
আবুল খায়ের : হাসিমুখে বললেন, ছবি আঁকার পাশাপাশি আমি ছবিই আঁকি। যদিও ছবি একে সংসার চালানো যায় এটা অনেকে বিশ্বাসই করেনা। তবে আমি ভাল আছি।

মুন্সীগঞ্জ বার্তা : আপনার শিল্পী হয়ে ওঠার গল্পটা বলুন?
আবুল খায়ের : ২য়-৩য় শ্রেণীতে পড়ার সময় থেকেই বইয়ের ছবি দেখে ছবি আঁকি। তবে আমার যে ছবি দিয়ে রুটি-রুজির ব্যাবস্থা হবে এমনটা আমি বা আমার পরিবারের কেউ চিন্তাও করে নাই।

আমার বাবা ছিলেন একজন ঘোর ধার্মিক লোক। তিনি এই কাজে সমর্থন দেননি। নিজে নিজেই চর্চা করে আজ এ পর্যন্ত এসেছি। বাফায় ভর্তি হয়েছিলাম নামকাওয়াস্তে। অনেকটা কাকতালীয়। ১৯৮৪ সালের দিকে আমার এক ভাই ১০ টাকা দিয়ে একটা ফরম নিয়ে এসছিল। ও’ জানত আমি একটু আকটু আঁকা-আঁকি করি। ভর্তি হলাম বাফায়, ক্লাস করলাম। সে সময় আমার সাথে ছাত্র ছিল ৪৬ জন। কিন্তু আমি শিওর যে, তাদের মধ্যে ৪৫জনই ছবি আঁকার লাইনে নেই। সেখানে চলল ৩ বছর। প্রথম ওস্তাদ হিসেবে মানি সে সময়ে বাফার টিচার আব্দুল লতিফ।

আমার শিল্পী হয়ে উঠার গল্পটা এতটা সহজ ছিলনা। ছাত্র হিসেবে আমি ছিলাম মিডিয়াম। চরম দুষ্টও ছিলাম। দূরন্ত আর ডানপিটে হওয়ার কারনে লেখাপড়া শেষ করতে পারিনি। দুষ্টুমীর কারণে আমাকে ভর্তি করে দেয়া হয় মাদ্রাসায়। কিন্তু সেখানেও ছবি আঁকা থামাইনি। হুজুরে কইত অস্তাগফিরুল্লাহ। হা..হা..হা..

৮২ সালের আমার একটা HB পেন্সিল দিয়ে একটা ছবি এঁকেছিলাম আমার ভাতিজার। ছবির চুল দিয়েছিলাম কলমের কালি দিয়ে। আসলে নিজে নিজে এক্সপেরিমেন্ট করে করে আমি এ পর্যন্ত এসেছি। পেন্সিল, এনামেল রং, চুন সবকিছু দিয়েই একেছি।


৮৯ সালে মুন্সীগঞ্জ বার কাউন্সিলে নিজে নিজে রং বানিয়ে ছবি এঁকে একটা প্রদর্শনী করেছিলাম। ধীরে ধীরে নিজের অত্মপ্রত্যয়ের মাধ্যমে নিজেকে এই অবস্থায় আনতে পেরেছি।

মুন্সীগঞ্জ বার্তা : ছবি আঁকার কোন মাধ্যম ও ফর্ম আপনার প্রিয়?
আবুল খায়ের : আমি রিয়েলিষ্টিক ছবি আঁকতে পছন্দ করি। আমার আশেপাশের পরিবেশ সবকিছুই ছবিতে আনতে চেষ্টা করি। এবস্ট্রাক্ট ছবি আঁকতে আমার ভাল লাগেনা। যে ছবি সাধারণ মানুষ বুঝবেনা সেটা আমি সচরাচর আঁকিনি।

মুন্সীগঞ্জ বার্তা : কোন ফ্রেমের ছবি আঁকলে দর্শকের কাছে বেশি সাড়া পান?
আবুল খায়ের : অবশ্যই যে ছবি মানুষ সহজে বুঝতে পারে।

মুন্সীগঞ্জ বার্তা : দেশীয় দর্শনার্থীর কাছে বিমূর্ত ছবির আবেদন কি রকম?
আবুল খায়ের : একেক দর্শনার্থীর কাছে চাহিদা একেক রকম। তবে সাধারণ মানুষ সহজে বুঝতে পারে এমন ছবিই সবাই পছন্দ করে। ছবি হবে সবার জন্য। বিমূর্ত ছবি বোধহয় এখোনো তেমন জনপ্রিয় হয়নি।

মুন্সীগঞ্জ বার্তা : ৬০ এর দশকে বা ৭০ দশকে শিল্পীরা যে দেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে ছবি আঁকতেন, এখন কি সেটা কম হয় ? কোন বিষয় গুলো এখনকার দেশীয় শিল্পীকে বেশি তাড়িত করে ?
আবুল খায়ের : এখন দেশ প্রেম নাই বললেই চলে। স্বকীয়তা নেই বললেই চলে। এখন নেটেই লাখ লাখ পেইন্টিং পাওয়া যায়। সবকিছুই এখন অনুকরণ হয়। নিজের চাহিদা আর জীবিকার জন্যই সবাই ছবি আঁকে। সবার লক্ষ্য থাকে সার্টিফিকেট। কিছু করারও নেই পেটের চিন্তাওতো করতে হয়।

মুন্সীগঞ্জ বার্তা : রবীন্দ্রনাথের শিল্প ভাবনা সে সময়ে শিল্পী সমাজকে অন্য রকম ভাবে ভাবিয়ে ছিলও, প্রথম দিকে তাঁর শিল্প কর্মগুলোকে অনেকেই বুঝতে পারেননি যদিও। শিল্পের এই নতুন বিবর্তন তথা চিত্রশিল্পী রবীন্দ্রনাথকে আপনি কিভাবে দেখেন ?
আবুল খায়ের : ছবি আঁকতে অনেকেই ভালবাসেন। রবিন্দ্রনাথের অনেক চিত্রকর্ম আছে তার মধ্যে দু-একটি কাজ দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি। ছবি আঁকার ব্যাকরণ ভালভাবে জানা না থাকলে এমন ছবি আঁকা সম্ভবনা।

মুন্সীগঞ্জ বার্তা : কবি রবিন্দ্রনাথ জীবনের শেষ দিকে এসে চিত্রশিল্পী হিসাবে নিজেকে যেভাবে প্রকাশ করলেন, সেরকম হুমায়ুন আহমেদের ক্ষেত্রেও আমরা এই ব্যাপারটা খেয়াল করেছি, তিনিও শিল্প চর্চার মধ্য বয়সে এসে ছবি এঁকেছেন, কবি নির্মলেন্দু গুণের মুখেও আমরা শুনেছি তিনিও ছবি আঁকেন । শিল্পী সত্তার এটা কি কোন ধারাবাহিক পরিবর্তন ?
আবুল খায়ের : আমি মনে করি কোন সৃজনশীল মানুষ এক জায়গায় স্থির থাকেনা। এটা সেটা করতে চাইবে। শিল্পসত্ত্বা একটা অপরের সাথে সম্পর্কযুক্ত। শিল্পীদের শিল্প অঙ্গনের সবকিছুই ভাল লাগতে পারে। ছবি আঁকা, ফটোগ্রাফি, গান, বাজনা সবই একটা আরেকটার সাথে সম্পর্কযুক্ত। ১৮ বছর প্রচুর ছবি আঁকছি। এখন আমার ব্যস্ততা একটা শর্টফিল্ম আর গান নিয়ে। কথায় কথায় জানা গেল, শিল্পী আবুল খায়ের মার্শাল আর্টও শিখেছেন।

মুন্সীগঞ্জ বার্তা : শিল্পের এই জগতে আরও কি কি নতুন নতুন পরিবর্তন আসতে পারে বলে আপনার মনে হয় ?
আবুল খায়ের : হ্যাঁ, সবসময়ই শিল্প জগৎ পরিবর্তনশীল।

মুন্সীগঞ্জ বার্তা : শিল্পী সত্ত্বা কি কখনো কারও মাঝ থেকে হারিয়ে যেতে পারে ? বা ছেড়ে যেতে পারে ?
আবুল খায়ের : শিল্পসত্ত্বা হারিয়ে যাওয়ার মত নয়। তবে শিল্প জগৎ থেকে যদি পয়সা না আসে তাহলে এ অঙ্গনে টিকে থাকা যায়না।

মুন্সীগঞ্জ বার্তা : আপনার নিজের ক্ষেত্রে কোন জিনিসটা ছবি আঁকার ক্ষেত্রে বেশি প্রেরণা দেয় ?
আবুল খায়ের : প্রকৃতি আর মানুষ। আমার ছবি মানুষকে নিয়ে। আর লালনের মত বলতে গেলে, মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি..
ak
মুন্সীগঞ্জ বার্তা : কোন প্রিয় ছবির কথা কি আমাদের বলবেন।
আবুল খায়ের : সামসুদ্দোহা, এস এম সুলতান, জয়নুল আবেদিন, ভ্যানগগ। আমি সবার ছবিই দেখি। ভাল যে কোন ছবিই আমার ভাল লাগে।

মুন্সীগঞ্জ বার্তা : নতুন ফর্ম ও টেকনিকের সাথে পুরনো ফর্মের শিল্পীদের কাজ করতে কি কোন অসুবিধা হয় কখনো ? আপনি কি কখনো সে রকম ফিল করেছেন ?
আবুল খায়ের : না তেমনটা হয়না। একেক জন শিল্পীর ধরণ একেক রকম।

মুন্সীগঞ্জ বার্তা : আপনিতো অনেক দেশী ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার প্রাপ্ত ফটোগ্রাফার। এখন কি নিয়মিত ছবি তোলেন ?
আবুল খায়ের : নিয়মিতই ছবি তুলি। তবে ছবি আঁকতে আমার বেশি ভাল লাগে।

মুন্সীগঞ্জ বার্তা : বাংলাদেশের আর্থ সামাজিকতার প্রেক্ষাপটে ছবি আঁকা একমাত্র পেশা হিসেবে গ্রহণ করা কতটা চ্যালেঞ্জিং?
আবুল খায়ের : অনেক কষ্ট। ছবি এঁকে জীবিকা নির্বাহ করার মত অবস্থা আমাদের দেশে নেই।

মুন্সীগঞ্জ বার্তা : শিল্পী হিসেবে আপনার রাজনৈতিক ভাবনা কি?
আবুল খায়ের : আমি একজন শিল্পী। ব্যাক্তি হিসেবে রাজনৈতিক পছন্দ থাকবেই। তবে এই ব্যাপারে এখন আর কিছু বলার নাই। হা..হা..হা..

মুন্সীগঞ্জ বার্তা : আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি?
আবুল খায়ের : ছবি এঁকে যাওয়া। আর এ মুহূর্তে আমার মাথায় চেপে আছে শর্টফিল্ম আর গান। এই আরকি।

মুন্সীগঞ্জ বার্তা : আপনার পারিবারিক জীবন সম্পর্কে বলুন?
আবুল খায়ের : এক ছেলে, এক মেয়ে আর এক গিন্নী আছি ভালই।

মুন্সীগঞ্জ বার্তা : ব্যাক্তি খায়ের না শিল্পী খায়ের কোন সত্ত্বাকে আপনি বেছে নেবেন?
আবুল খায়ের : ব্যক্তি খায়েরই আমার ভাল লাগে। ব্যক্তি থেকেইতো শিল্পী খায়েরের উৎপত্তি। অনেক যায়গায় মানুষ যখন শিল্পী হিসেবে বাড়িয়ে পরিচয় দেয় তখন আমি বিব্রতবোধ করি।

মুন্সীগঞ্জ বার্তা : এখনকার তরুনদের শিল্পকর্ম, টেকনিক ও চিন্তাভাবনা সম্পর্কে আপনার মতামত কি?
আবুল খায়ের : আসলে এ সময়ে দাড়িয়ে এ সময়ের কথা বলা যাবেনা। আগামী ৫০/১০০ বছর পর এখনকার ছবিগুলো কেমন মূল্যায়ন হবে সেটাই বিষয়।

মুন্সীগঞ্জ বার্তা : ফটোগ্রাফির পাশাপাশি অন্য কোন শখ আছে?
আবুল খায়ের : শিল্পীর শখের কোন লিমিটেশন নাই। যা ভাল লাগে তাই করি।

মুন্সীগঞ্জ বার্তা : এবার অন্য বিষয়ে যাই, আপনার তারুণ্যের রহস্য কি?
আবুল খায়ের : ছুনু পাউডার মাখিনা। আসলে সাদা হওয়ার ইচ্ছা আমার নাই। মানুষের মন পরিস্কার করা দরকার আগে। পরিষ্কার কাপড় না পরে মনটাকে পরিষ্কার করা দরকার। বাউল বেশ নেয়ার চেষ্টা করছিলাম কিন্তু পারিনি।

মুন্সীগঞ্জ বার্তা : ছবি আঁকা নিয়ে ভবিষৎ পরিকল্পনা কি ?
আবুল খায়ের : ছবি আঁকতেই থাকব।

মুন্সীগঞ্জ বার্তা : বর্তমান শিক্ষা কারিকুলামে প্রথম শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত ছবি আঁকা বিষয়টা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে । এর প্রয়োজনীয়তা কতটুকু ?
আবুল খায়ের : সব ঠিক আছে কিন্তু প্রসেস ঠিক নাই। সাবজেক্ট আছে কিন্তু শিক্ষক নেই। আর্টের ক্লাস নেয় বাংলার শিক্ষক। এটাতো একটা ভাষা। একটা স্কুলে ইংরেজী, শারীরিক শিক্ষার টিচার থাকলেও আর্টের নেই। আর্ট ছেলেমেয়েদের সুস্থ চিন্তার বিকাশ ঘটাতে সাহয্যে করে। তাই ছবি আঁকা শিক্ষার প্রসার ঘটানো দরকার।

মুন্সীগঞ্জ বার্তা : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ ।
আবুল খায়ের : আপনাদেরও ধন্যবাদ।

(সাক্ষাৎকার নিয়েছেন- মো. আল মামুন , ফটোগ্রাফি- রাজিব মজুমদার , সিনেমাটোগ্রাফি- মাহামুদুল হাসান অপু।)

মুন্সীগঞ্জবার্তা