গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির লক্ষ্যে – সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

sicউন্নত ব্যবস্থার জন্য একটি উন্নত সংস্কৃতি গড়ে তোলা চাই। সরকার, রাষ্ট্র, সমাজ- এরা প্রত্যেকেই জরুরি ও শক্তিশালী, কিন্তু চূড়ান্ত কাজটা সংস্কৃতিই করে। গণতন্ত্রের জন্যও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি প্রয়োজন। এই সংস্কৃতির প্রথম দাবি হচ্ছে তাকে যুক্ত হতে হবে সামন্তবাদী পিছুটান থেকে। কুসংস্কার, অশিক্ষা, অদৃষ্টবাদ, সঙ্কীর্ণতা এসব থাকলে গণতন্ত্র পাওয়া সম্ভব নয়।

দেশের ব্যাপারে যেমন বেতার-টেলিভিশনের ব্যাপারেও তেমনি, স্বাধীনতা তো চাই-ই, গণতন্ত্রও চাই। এই কথাটা স্পষ্ঠভাবে বলা হয়েছে বারবার। স্বাধীনতা না পেলে গণতন্ত্র সম্ভব নয়, কিন্তু স্বাধীন রাষ্ট্রে যেমন সামরিক শাসনও থাকতে পারে, যেমন অতীতে ছিল আমাদের এই বাংলাদেশেই; স্বাধীন বেতার-টেলিভিশনেও তেমনি অগণতান্ত্রিক মূল্যবোধের লালন ও সম্প্রচার অসম্ভব নয়। বেতার-টেলিভিশনের জন্য স্বাধীনতার দাবিটি তাই দীর্ঘদিনের।


এই জবাবদিহির ব্যাপারটা খুবই জরুরি। যেখানে জবাবদিহির দায় নেই, সেখানে গণতন্ত্র নেই, তা যতই যা বলা হোক না কেন। জবাবদিহি কার কাছে? হ্যাঁ, সংসদের কাছেই থাক, সেটা থাকা ভালো। কিন্তু সেটাই যথেষ্ট নয়। সংসদের বাইরে বেতার-টেলিভিশনকে জনমতের কাছে জবাব দিতে প্রস্তুত থাকতে হবে। এই দুই গণমাধ্যমের অনুষ্ঠানমালা সম্পর্কে শ্রোতাদের প্রতিক্রিয়া গণমাধ্যম দুটির মধ্যদিয়ে প্রচুর করার আবশ্যক, কখনো কখনো মুখোমুখি বসাও দরকার। গণতন্ত্র যে আছে সেটা শুধু বিশ্বাসের ব্যাপার হলে চলে না, প্রমাণের ব্যাপারও হওয়া চাই।

দেশে এখন এমন লোক কমই আছেন যিনি গণতন্ত্র চান না। সবাই চান। কিন্তু গণতন্ত্র বলতে সবাই এক জিনিস বোঝেন না। কারো কাছে গণতন্ত্র হচ্ছে সাধারণ নির্বাচন, কারো কাছে নির্বাচিত সরকার। কিন্তু নির্বাচিত সরকার যদি অগণতান্ত্রিক হয় তাহলে? নির্বাচিত স্বৈরাচার অনির্বাচিত স্বৈরাচারের চেয়ে স্বতন্ত্র নাও হতে পারে। বিশেষ করে সে যদি মনে করে তার পেছনে লোকের নৈতিক সমর্থন রয়েছে, কেননা সে বৈধ, ভোটের মধ্যদিয়ে এসেছে, জোর করে আসেনি।

গণতন্ত্রের বিখ্যাত সেই সংজ্ঞাটি যেটি আব্রাহাম লিঙ্কন দিয়েছিলেন সেটি সুন্দর বটে, কিন্তু পর্যাপ্ত নয়। বিশেষ করে এই যুগে। কেননা গণতন্ত্র বলতে জনগণের সরকার বোঝায় ঠিকই, কিন্তু কেবল সরকার গঠন দিয়েই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়, বরং এও বলা যায় যে, ওই রকমের একটি সরকার প্রতিষ্ঠাও সম্ভব নয় যদি রাষ্ট্র ও সমাজে গণতন্ত্র না থাকে। গণতন্ত্রের জন্য একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র চাই, অর্থাৎ সেই রকমের রাষ্ট্র দরকার যে নাগরিকদের মৌলিক অধিকারগুলোর নিশ্চয়তা দেবে, দেখবে যাতে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষার নূ্যনতম প্রয়োজন থেকে কেউ বঞ্চিত না হয়। তবে কেবল উপযোগী রাষ্ট্র নয়, উপযুক্ত সমাজও দরকার। তেমন সমাজ আবশ্যক যেখানে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটা শত্রুতার নয়, মৈত্রীর বটে। যেখানে পারস্পরিক সংহারের উন্মত্ত ব্যস্ততা নেই, রয়েছে সৌহার্দের উষ্ণ সহযোগিতা। দুর্বল যেখানে প্রবলের দ্বারা নির্যাতিত হয় না, সাহায্যপ্রাপ্ত হয়। পরিবেশ যেখানে অরণ্যের নয়, উদ্যানের। তবে আজকের দিনে বিশ্বের নানা অভিজ্ঞতার মধ্যদিয়ে প্রমাণিত হয়েছে যে, সমাজের চেয়েও বেশি শক্তি হচ্ছে সংস্কৃতির। সমাজ হলো আত্মরক্ষামূলক প্রতিষ্ঠান, সংস্কৃতি আত্মবিকাশের ধারা। সমাজে মানুষ আশ্রয় খোঁজে, সংস্কৃতির মধ্যদিয়ে মানুষ নব নব বিজয়ের প্রমাণ দেয়। সংস্কৃতি ইতিহাস পরিবেশ ও প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামে মানুষের বিজয়ের ইতিহাস।

সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর দুর্যোগ প্রমাণ করে সংস্কৃতি কত বেশি শক্তিশালী। সেখানে শ্রমিক শ্রেণি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছিল। পুরাতন রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে নতুন রাষ্ট্রও প্রতিষ্ঠা করেছিল। সমাজে সমাজতান্ত্রিক গুণ ও উপাদানের বিকাশও সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু দুর্বলতা রয়ে গিয়েছিল এক জায়গাতে। সেটা সমাজতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ার ক্ষেত্রে। সংস্কৃতির প্রভাব অনেক গভীর ও ব্যাপক। তাই পুরাতন রাষ্ট্র ও সমাজ সম্পর্কের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যে পুরাতন সংস্কৃতিও বদলে যাবে, এমন সরল ঘটনা ঘটে না। গাছটা পড়ে গেলেও তার শিকড় থাকে। অনুকূল আলো, হাওয়া, মাটি ও পানিতে সেই বিষবৃক্ষ আবার সতেজ হয়। ক্ষতির কাজ চলতে থাকে। সমাজতান্ত্রিক সমাজে পুঁজিবাদী ধ্যান-ধারণা থাকতে পারে। সবার মধ্যে না থাকুক, এককালে যারা গুরুত্বপূর্ণ মানুষ ছিল তাদের মধ্যে তো থাকবেই। সমাজের পশ্চাৎপদ অংশের মধ্যে সামন্তবাদী পিছুটানও বাস্তবিক সত্য। সংস্কৃতি যেমন কৃত্রিম, সমাজতন্ত্রও তেমনি কৃত্রিম এই অর্থে যে, তারা উভয়েই চেষ্টার ফল। মানুষ একটা সংস্কৃতির মধ্যে জন্মগ্রহণ করে, কিন্তু যেমন তাকে হাঁটতে শিখতে হয় চেষ্টা করে, তেমনি ওই সংস্কৃতির ভালো গুণগুলোও অর্জন করতে হয় অনুশীলনের মধ্যদিয়ে। মানুষ জন্মগতভাবেই স্বার্থপর, সেখানে সে একটি প্রাণী বটে, তার সামাজিক গুণগুলো বিকশিত হয় যত্নের ফলে। সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে সমাজতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে ক্রমাগত শক্তিশালী করে তোলার কাজটির প্রতি যথেষ্ট দৃষ্টি দেয়া হয়নি। তদুপরি একদিকে দেশের অভ্যন্তরে ঘটছিল আমলাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা, অন্যদিকে বাইরে থেকে ঘটছিল পুঁজিবাদী সংস্কৃতির আগ্রাসন। এরা উভয়েই সংস্কৃতির জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আমলাতন্ত্র হচ্ছে যুগপৎ বৈষম্যের ফল ও কারণ। পার্টির নামে বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছিল এবং সেই আমলাতান্ত্রিক বৈষম্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যকে পুষ্ট করে তুলেছিল। সমাজতান্ত্রিক দেশে সমাজতন্ত্র জনপ্রিয়তা হারিয়েছে এই আমলাতান্ত্রিক বৈষম্যের কারণে। কিন্তু সেটা একমাত্র কারণ নয়। পুঁজিবাদী সংস্কৃতি ক্রমাগত তথাকথিত উন্নত জীবনের আকর্ষণ প্রচার করছিল। নতুন প্রজন্ম তার মোহে পড়েছে। ভেভেছে আমেরিকান হবে, রাশান থাকবে না। সাম্রাজ্যবাদ সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোকে যুদ্ধের হুমকি দিয়ে অস্ত্র প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত রেখেছে। যার ফলে একদিকে সুবিধা হয়েছে সাম্রাজ্যবাদী দেশের অস্ত্র ব্যবসায়ীদের, অন্যদিকে সম্ভব হয়েছে সমাজতান্ত্রিক বিশ্বকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করে রাখা। নইলে যে সমাজতন্ত্রীরা আকাশে আমেরিকানদের হারিয়ে দেয়, তারা মাটিতে হারাতে পারত না, এটা ঠিক নয়। সুযোগ পায়নি। ওদিকে আকাশপথে ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া এসে আক্রমণ করেছে মানুষকে। এ আক্রমণ সিআইএর তৎপরতার চেয়ে অধিক কার্যকর ছিল, যেজন্য সিআইএর এখন সমালোচনা করা হচ্ছে এই বলে যে, এমনকি তারা কি ঘটাতে যাচ্ছে তার পূর্বাভাসটি পর্যন্ত ঠিকমতো দিতে পারেনি। সরাসরি যুদ্ধ বাধলে আমেরিকা যা যা পারত না, সংস্কৃতিক অন্তর্ঘাতের সাহায্যে তা প্রায় অবিশ্বাস্য সাফল্যের সঙ্গে সম্ভব করে ফেলেছে। অবশ্য কাজটা চলছিল একেবারে শুরু থেকেই এবং এ তো মানতেই হবে যে, মানুষের প্রাণিসত্তার কাছে আবেদন যতটা সহজে করা যায়, তার সামাজিক অনুভূতির কাছে আবেদন করা ততটা সহজ নয়। কখনো ছিল না, এখনো নেই।

উন্নত ব্যবস্থার জন্য একটি উন্নত সংস্কৃতি গড়ে তোলা চাই। সরকার, রাষ্ট্র, সমাজ- এরা প্রত্যেকেই জরুরি ও শক্তিশালী, কিন্তু চূড়ান্ত কাজটা সংস্কৃতিই করে। গণতন্ত্রের জন্যও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি প্রয়োজন। এই সংস্কৃতির প্রথম দাবি হচ্ছে তাকে যুক্ত হতে হবে সামন্তবাদী পিছুটান থেকে। কুসংস্কার, অশিক্ষা, অদৃষ্টবাদ, সঙ্কীর্ণতা এসব থাকলে গণতন্ত্র পাওয়া সম্ভব নয়।
কিন্তু গণতন্ত্রের প্রাণ কোথায় সেই সচেতনতাটি আরো বেশি প্রাথমিক। প্রাণ থাকে সাম্যে। সাম্য অর্থ এই নয় যে, সব মানুষ মেধায়, ওজনে, উচ্চতায় অথবা চেহারায় সমান হয়ে যাবে। কেননা সেক্ষেত্রে আমরা মানুষ না পেয়ে কতগুলো প্রাণী কিংবা পুতুল পাব। না, বৈচিত্র্য থাকবে, নানান ফুল ফুটবে ওই সামাজিক উদ্যানে। কিন্তু সব ফুলই ফুল হবে, ফুলের মর্যাদা ও অধিকার পাবে। অধিকারের সাম্য না থাকলে গণতন্ত্র আসে না, আসার উপায় নেই। অধিকারে সাম্য নষ্ট হচ্ছে পুঁজিবাদের কারণে- এটা খুব সহজ কথা। কিন্তু এই কথাটাকে অস্পষ্ট করে তোলা হয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইচ্ছা করে, বাকি ক্ষেত্রে বেখেয়ালে।

আসলে এরা সব সময়ই প্রচারমাধ্যম। যখন সরকারের মাহাত্ম্য প্রচার করে তখন আমরা ক্ষিপ্ত হই, কেননা সেটা চোখে পড়ে। কিন্তু অন্য সময়েও, বস্তুত সব সময়ই এরা কারো না কারো মাহাত্ম্য প্রচার করছে। এরা মোটেই নিরপেক্ষ নয়। সর্বদাই কারো না কারো পক্ষে বলে। খবর প্রচার না করলেও আদর্শ প্রচার করে। আর আদর্শের প্রচার যেমন সূক্ষ্ম তেমনি গভীর। বেতার-টেলিভিশন নিরপেক্ষ থাকবে এটা সম্ভব নয়, এ আমরা চাইবও না। আমরা চাইব এরা গণতন্ত্রের পক্ষে থাকুক।
অগ্রসর দেশগুলো স্যাটেলাইটের মাধ্যমে তাদের প্রচার জালকে ক্রমাগত এত বিস্তৃত করে তুলছে যে, এরপর মানুষ কতটা দেখবে সেটাও এক জিজ্ঞাসা হয়ে দেখা দিয়েছে। এই হচ্ছে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের একটি বড় দৃষ্টান্ত। ভারতের বাঙালিরা অভিযোগ করে, তারা হিন্দির আগ্রাসনে বড়ই অস্থির হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ওই টেলিভিশনের কারণে। টেলিভিশনের দরুণ হিন্দি ভাষা ও সংস্কৃতি এখন অন্তঃপুরে প্রবেশ করেছে। তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ খাড়া করার আর উপায় নেই। আমাদের জন্য হিন্দি না হলেও অন্য সংস্কৃতির আগ্রাসন তো ভবিষ্যতের ব্যাপার নয়, বর্তমানেও চলছে। এরমধ্যে আমরা আমাদের নিজস্বতাকে রক্ষা করতে পারব কী করে? পারব, যদি সংস্কৃতিতে দেশপ্রেম গড়ে তুলি। দেশপ্রেম মানে কেবল প্রকৃতিপ্রেম নয়, প্রধানত মানবপ্রেম। দেশবাসীর প্রতি ভালোবাসা দরকার। ভালোবাসা তখনই ফলপ্রসূ হয় যখন ভালোবাসার পাত্রটি ভালোবাসার উপযুক্ত হয়। মানুষে মানুষে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধি করে আমরা ভালোবাসার চর্চা করতে পারব না। ভালোবাসা ওই খাদ পার হতে ভয় পাবে, ভেতরে ভেতরে ঘেন্নাও পেতে পারে। সামাজিক ঐক্যের প্রয়োজনেও বৈষম্য বিমোচন আবশ্যক। আমরা বাংলা ভাষার জন্য লড়েছি, কিন্তু বাংলা ভাষা সর্বত্র চালু হয়নি। মূল কারণ ওই বৈষম্য; বৈষম্যের পথ ধরেই সাংস্কৃতিক আগ্রাসন এগিয়ে আসে। কাউকে রাখে অশিক্ষিত করে, কাউকে বিদেশি ভাষা ও সংস্কৃতির প্রেমিক করে।

বেতার-টেলিভিশনে গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি আমরা চাই ওই প্রতিষ্ঠান দুটির প্রয়োজনে নয়, আমাদের প্রয়োজনেই। গণতন্ত্রের অর্থাৎ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির স্বার্থে। কোনো প্রতিষ্ঠানই নিরপেক্ষ নয়। বেতার-টেলিভিশন নিরপেক্ষ থাকবে এমন অবান্তর ও অসম্ভব দাবি আমরা করব না। আমরা চাইব তারা জনগণের পক্ষে থাকুক। নিরপেক্ষ বেতার-টেলিভিশন নয়, জনগণের বেতার-টেলিভিশন দরকার।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: সাহিত্যিক ও অধ্যাপক

যায় যায় দিন