এই নির্মম রসিকতার শেষ কোথায় – ইমদাদুল হক মিলন

Milonশীতের সকালে গাছপালা ঘেরা রাস্তার ধারে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে স্কুলের ছোট ছেলেমেয়েরা। তখনো রোদ পড়েনি রাস্তায়, ফলে শীতের প্রকোপ তীব্র। শীতের কষ্টে হু হু করে কাঁপছে ছেলেমেয়েরা। কেন এভাবে দাঁড়িয়ে আছে তারা? না বললেও আমরা অনুমান করতে পারি। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত হওয়া কোনো এমপি অথবা সদ্য মন্ত্রিত্ব পাওয়া কোনো মন্ত্রী এই এলাকায় আসবেন। তাঁদের সংবর্ধনা দেওয়ার নামে, তাঁদের মনোযোগ আকর্ষণ করার কারণে স্কুল ছুটি দিয়ে ছেলেমেয়েদের নিয়ে আসা হয়েছে রাস্তায়। এটুকু ছেলেমেয়েদের নাশতা হয়েছে কি না, সকালবেলার পড়াটা তারা পড়তে পেরেছে কি না, সেদিকে কারো নজর নেই। এমপি-মন্ত্রীকে খুশি করতে পারলেই স্কুল কমিটি খুশি।

এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে কোনো কোনো ছাত্রছাত্রী অজ্ঞান হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে। অসুস্থ হয়ে যায় অনেকেই। তবু টনক নড়ে না এলাকার ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের, তবু টনক নড়ে না স্কুল কর্তৃপক্ষের; যদিও কোনো অতিথিকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের রাস্তার পাশে না দাঁড় করানোর বিষয়ে নির্দেশনা আছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। শিক্ষামন্ত্রী আমাদের সবার প্রিয় এবং শ্রদ্ধেয়জন নুরুল ইসলাম নাহিদের এ বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা আছে। তাঁর সেই নির্দেশনাও মানা হচ্ছে না।

সকাল আটটা-নয়টা থেকে বারোটা-একটা পর্যন্ত একটানা দাঁড় করিয়ে রাখা হচ্ছে ছাত্রছাত্রীদের। স্কুল কর্তৃপক্ষ এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে হেডমাস্টারদের কাছে কারণ জানতে চাওয়া হলে তাঁরা বলেন, শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশনার কথা তাঁরা জানেন না। আবার কেউ কেউ বলেন, ‘আমাদের স্কুলের অবস্থা খুবই খারাপ, এ জন্য এমপি কিংবা মন্ত্রী মহোদয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে ছেলেমেয়েদের রাস্তায় দাঁড় করিয়ে। যদি তাঁরা দয়াপরবশ হয়ে স্কুলটির দিকে একটু নজর দেন তাহলে স্কুলের উন্নতি হবে।’

আমরা এ ধরনের উন্নতি চাই না। স্কুলের ছোট ছাত্রছাত্রীদের শীতের কষ্টে কিংবা প্রচণ্ড গরমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় দাঁড় করিয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষ যদি মনে করে এতে স্কুলের উন্নয়ন ঘটবে, এমপি-মন্ত্রীরাও যদি সংবর্ধনার নামে এই দৃশ্য দেখে খুশি হন, সেটা খুবই বেদনার কথা। এ রকম দৃশ্য আমরা আর দেখতে চাই না। আমরা এমপি-মন্ত্রীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। এ বিষয়ে তাঁরা কঠোর হবেন। সংবর্ধনার নামে পড়ালেখার ক্ষতি করিয়ে ছাত্রছাত্রীদের এ রকম শাস্তি দেওয়ার বিষয়টি সহৃদয়তার সঙ্গে বিবেচনা করবেন।


কোথাও এ ধরনের ঘটনা ঘটলে তাঁরা যেন স্কুল কর্তৃপক্ষকে তিরস্কার করেন এবং এ ধরনের কাজ থেকে বিরত রাখার ব্যবস্থা নেন। স্কুল কর্তৃপক্ষও যেন এ ধরনের কাজ আর না করে। রাজনৈতিক ডামাডোলের কারণে, লাগাতার হরতাল-অবরোধের কারণে দেশের অন্যান্য খাতের মতো শিক্ষা খাতও ব্যাপকভাবে এলোমেলো হয়েছে। লেখাপড়ায় অনেক পিছিয়ে গেছে আমাদের ছেলেমেয়েরা। এখন রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এক ধরনের শান্তিপূর্ণ অবস্থান চলছে, এক ধরনের সুবাতাস বইছে দেশে। এই অবস্থায় একটি মিনিটের জন্যও লেখাপড়ার ক্ষতি হোক কোনো ছাত্রছাত্রীর, আমরা তা চাই না। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশনা মেনে স্কুলগুলো পরিচালিত হবে, ছাত্রছাত্রীরা গভীর আনন্দ-উৎসাহে লেখাপড়া করবে আর তাদের মুখের আলোয় আলোকিত হবে বাংলাদেশ, আমরা তা-ই চাই। ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে এ ধরনের নির্মম রসিকতা যেন আর না করা হয়।

আমাদের কালের কণ্ঠে লেখা হয়েছে, ‘ব্যবসায়ীদের টাকা, শিক্ষার্থীদের ঘাম’। ছাত্রছাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় দাঁড় করিয়ে আর এলাকার ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা তুলে মন্ত্রী-এমপিদের সংবর্ধনা দেওয়ার কালচার অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। টানা অবরোধ আর হরতালে দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো একেবারেই ভেঙে পড়েছে। ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে। বড় বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বসে গেছে, মাঝারি মানের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চোখে অন্ধকার দেখছে আর ছোট ব্যবসায়ীরা অনেকেই গেছেন নিঃস্ব হয়ে।

এই অবস্থায় দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পর দেশ যখন একটা স্থিরতার মধ্যে এসেছে, দেশের মানুষ যখন হাঁফ ছেড়ে নতুন উদ্যমে শুরু করেছে তাদের কাজ, দেশের বড় বিনিয়োগকারীরা, শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা আগের ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য যখন নতুন উদ্যোগ নিয়েছেন, তখন একটি বড় রাজনৈতিক দলের কঠোর ও ধ্বংসাত্মক কর্মসূচির কথা আমাদের কানে আসছে। তারা নাকি কঠোর কর্মসূচির দিকে যেতে পারে। শুনে আমরা বিশেষভাবে চিন্তিত হয়েছি। যে রাজনীতি এবং রাজনৈতিক কর্মসূচি সর্বার্থে দেশ ধ্বংস করে দেয়, সেই রকম কর্মসূচি কোনো দায়িত্বশীল দল দেবে না-এটাই আমরা সেই দলের কাছে আশা করি। আমরা চাই, সেই দল বা দলগুলো নিয়মতান্ত্রিকভাবে তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করুক।

হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচি তারা যেন না দেয়। দেশ ও মানুষের কল্যাণের কথা ভেবেই কর্মসূচি দেওয়া উচিত দলগুলোর। মানুষ হত্যার রাজনীতি আমরা চাই না, দেশ ধ্বংসের রাজনীতি আমরা চাই না। আমরা চাই শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ। যদি কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি দিতেই হয়, তা যেন দেওয়া হয় ছুটির দিনগুলোতে, শুক্র-শনিবারে। কার্যদিবসগুলো রাজনৈতিক কর্মসূচির আওতার বাইরে রাখতে হবে এবং কোনো রকম ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি দেওয়া যাবে না। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি দেওয়া হলে মানুষ তা গ্রহণ করবে। দেশ এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের বাইরে যেসব দল আছে, তাদেরও রয়েছে বিশাল ভূমিকা। তারা সেই ভূমিকায় থাকবে। দেশ ও মানুষের অকল্যাণ করে এমন কোনো কর্মসূচি দেবে না। আমরা তা-ই আশা করি। গত কতকগুলো মাসে টানা অবরোধ-হরতালে নৃশংসভাবে মৃত্যুবরণ করেছে বহু সাধারণ মানুষ। আবার ওই ধরনের কর্মসূচি দিয়ে মানুষের জীবন নিয়ে নির্মম রসিকতা যেন আর না করা হয়। আমাদের যেন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে না হয়, এই নির্মম রসিকতার শেষ কোথায়!

কালের কন্ঠ