নির্বাচনের পর কী হবে?

sড. মীজানূর রহমান শেলী
দশম জাতীয় সংসদের মোট আসনের অর্ধেকেরও বেশি আসনে নির্বাচন ২০১৩ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই সম্পন্ন হয়ে গেছে। নির্বাচনকালীন সরকারের রূপ কী হবে- এ বিতর্কের নিরসন না হওয়ার ফলে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির নেতৃত্বে ১৮ দলীয় জোট নির্বাচনে অংশ নেয়নি। ফলে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩টিতেই আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছে। বাকি আসনগুলোর নির্বাচনের ফলাফলেও দেখা যাবে যে আওয়ামী লীগের প্রবল প্রাধান্য আরো মজবুত হয়েছে।

এদিকে বিএনপি ও তার মিত্রদের আহূত নির্বাচন প্রতিরোধ আন্দোলন হরতাল ও অবরোধে রূপ নেয়। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার তারিখ অর্থাৎ ২০১৩ সালের ২৫ নভেম্বর থেকে ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ দফার প্রতিটি দফায়ই প্রায় সপ্তাহব্যাপী মহাসড়ক, রেলপথ ও নৌপথে অবরোধ চলে। এ অবরোধে দেশের বিভিন্ন জেলায় তুমূল আন্দোলন দানা বাঁধে এবং অনেক ক্ষেত্রেই প্রবল সহিংসতায় পরিণত হয়। ঢাকায় সরকারের নির্দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুল সমাবেশ ঘটে। তাদের সতর্ক পাহারায় রাজধানীতে বিরোধী দলের আন্দোলন বিশেষ সাফল্য লাভ করতে পারেনি। তবে এখানেও ভয়াবহ সহিংসতার ঘটনা ঘটে, পেট্রলবোমার শিকার অনেক বাসযাত্রী অগ্নিদগ্ধ হয়ে করুণ মৃত্যুবরণ করে। বিপুলসংখ্যক বাস, টেম্পো ও অটোরিকশার যাত্রী হয় মারাত্মকভাবে আহত।
s
অন্যদিকে দেশের অর্থনীতি হয় ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। শিল্প উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়, দিনমজুররা হয় তাদের নিত্যদিনের উপার্জন থেকে বঞ্চিত। মহাসড়ক, রেলপথ ও নৌপথ অবরোধের ফলে স্বাভাবিক ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রবাহে বিপুল বাঁধা পড়েছে। আমদানি হ্রাস পেয়েছে, রপ্তানি বাণিজ্যে সৃষ্টি হয়েছে বিশাল প্রতিবন্ধক। সব মিলিয়ে রাজনৈতিক টালমাটাল অবস্থার কারণে জাতীয় অর্থনীতির ক্ষতি হয়েছে এক লাখ কোটি টাকারও বেশি, যা আমাদের বার্ষিক জাতীয় বাজেটের প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি। দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগে সৃষ্টি হয়েছে মারাত্মক মন্দা। গত বছরের নভেম্বর মাসের মধ্যেই চীনের একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ১০ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ বিনিয়োগ স্থগিত করেছে। অনুরূপভাবে, কক্সবাজারে উপকূলের কাছে প্রস্তাবিত সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দরের প্রাথমিক কাজকর্মের জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাত যে অর্থসংস্থান করার প্রস্তাব দিয়েছিল, তাও চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে মূলতবি করা হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সঙ্গে দেশি বিনিয়োগকারীরাও হাত গুটিয়ে নিয়েছেন। সবাই অপেক্ষা করছেন ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর কী হয় তা দেখার জন্য। ব্যবসা-বাণিজ্যে, শিল্পে কোনো লগ্নির কার্যকর সুযোগ নেই। তাই ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় পড়ে আছে ৮৪ হাজার কোটি টাকার অলস তহবিল।


সামাজিক ক্ষেত্রেও অস্থির রাজনীতি এনেছে অস্থিতিশীলতা। বেকারের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। শিক্ষাক্ষেত্রে সৃষ্টি হয়েছে ভয়াবহ অনিশ্চয়তা ও বিভ্রাট। অলস, কর্মহীন তরুণরা বিভ্রান্ত, তাদের অনেকেই অপরাধজগতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়ে পড়ছে, অনেকে আবার স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক নেতাদের ক্রীড়নক হিসেবে জড়িয়ে পড়ছে ভয়াবহ সহিংসতায়। বিচ্ছিন্ন হলেও রাজধানী ঢাকাসহ বহু জনপদে নির্মম খুন, জখম, রাহাজানি ও লুটপাটের ঘটনার সংখ্যা বেড়েই চলছে। সামাজিক শৃঙ্খলা ও ভারসাম্য ব্যাহত ও বিঘিœত হয়ে শান্তিপ্রিয় নিরীহ জনগণকে করে তুলছে উদ্বিগ্ন ও শঙ্কিত। অতিসম্প্রতি অর্থনৈতিক, সামাজিক বা পারিবারিক কারণে ঢাকার গোপীবাগে একজন কথিত পীরসহ ছয়জনকে জবাই করা হয়েছে। খ্যাতনামা ফটো সাংবাদিক আফতাব আহমেদকে তাঁর বাসভবনে হাত-পা বেঁধে হত্যা করা হয়েছে। পুলিশ সন্দেহ করছে এ হত্যাকাণ্ডের পেছনেও রয়েছে তাঁরই পরিচিত ব্যক্তিদের অর্থলোভ।

সন্দেহ নেই যে দীর্ঘ এবং দৃশ্যত সমাধানহীন রাজনৈতিক বিতর্ক, দ্বন্দ্ব, সংঘর্ষ ও সহিংস সংঘাত আমাদের সমাজকে পর্যুদস্ত করে চলছে। সব দিক দিয়ে বাংলাদেশ আজ বিশাল হুমকির সম্মুখীন। অথচ এ রাজনৈতিক বিভক্তি ও প্রবল অস্থিরতা এবং সংঘাত সৃষ্টি হওয়ার আগে এ দেশ অর্থনৈতিক ও সামাজিক খাতে দ্রুত এবং বিস্ময়কর উন্নতি অর্জন করছিল। রপ্তানি খাতে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্জন চমকপ্রদ বললে অত্যুক্তি হবে না। রাজনৈতিক বিভ্রাটের আগে থেকেই তৈরি পোশাক রপ্তানি করে বাংলাদেশ আয় করেছে বার্ষিক ২০ বিলিয়ন ডলার। একইভাবে জনশক্তি রপ্তানির মাধ্যমে গত বছরেই অর্জিত হয় ১৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এ বিপুল আয় আমাদের জনসংখ্যার তুলনায় যথেষ্ট না হলেও আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি এবং আমাদের প্রাপ্য বার্ষিক বৈদেশিক ঋণ ও মঞ্জুরির মোট পরিমাণের চেয়ে প্রায় ১৬-১৭ গুণ বেশি। দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবিদদের প্রাক্কলন অনুযায়ী কয়েক বছরের মধ্যেই তৈরি পোশাক শিল্পের রপ্তানি আয় প্রায় ৫২ বিলিয়ন ডলারের মাত্রায় পৌঁছাতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও সংঘাত এ সম্ভাবনাকে ম্লান করে তুলেছে। গত বছরের শেষ দিকে এ শিল্প থেকে প্রতি মাসে যে প্রায় দুই বিলিয়ন ডলার আয় হতো, তা প্রায় এক বিলিয়ন ডলার পরিমাণ কমে গেছে। এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। কারণ অস্থির রাজনীতির দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের ফলে উৎপাদন ও সরবরাহ বিঘিœত হয়েছে। তাই বিদেশি ক্রেতারা ভারত, মিয়ানমার, ভিয়েতনামসহ অন্যান্য প্রতিবেশী দেশে তাদের ক্রয়াদেশ সরিয়ে নিয়েছে। ডিসেম্বর মাসে এক ভারতেই চলে গেছে ৫০ কোটি ডলারের ক্রয়াদেশ।


সামাজিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রভূত সাফল্য লাভ করছিল। শিক্ষার বিস্তার হয়েছে বিপুল। এ ক্ষেত্রে বিশেষত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে নারী-পুরুষের সমতাও অর্জিত হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতেও এসেছে উল্লেখযোগ্য উন্নতি। মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার অনেক কমে এসেছে। বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু এসে পৌঁছেছে ৬৯ বছরের কোঠায়। পত্রিকায় প্রকাশিত আইএমএফের একটি প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে যে একটি জনবহুল ও নিম্ন আয়ের দেশ হিসেবে বাংলাদেশ যেভাবে প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর সঙ্গে দারিদ্র্য দূর করতে এবং বৈষম্য কমাতে সক্ষম হয়েছে, তা অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। প্রবৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন উদাহরণ দেওয়ার মতো একটি দেশ। আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংক একটি পরিসংখ্যান উপস্থাপন করে দেখিয়েছে, প্রধান ১২টি সূচকের মধ্যে ১০টিতেই বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া এবং নিম্ন আয়ের অন্যান্য দেশের তুলনায় এগিয়ে গেছে বা যাচ্ছে। দারিদ্র্য মোচনসহ অন্যান্য সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য বা ‘মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল’ অর্জনে বাংলাদেশ ভারতসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে বেশ কয়েক ধাপ এগিয়ে রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের তৈরি করা তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে এখন গড় মাথাপিছু আয় ৫২৮ ডলার।

১০৪৪ ডলার নিয়ে দক্ষিণ এশিয়াকে প্রায় ধরে ফেলেছে বাংলাদেশ। সাফল্য আছে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমানোর প্রচেষ্টাতেও। বাংলাদেশের এখন এ হার মাত্র ১.৩ শতাংশ। আর দক্ষিণ এশিয়ার গড় ১.৪ শতাংশ। নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে এ গড় অনেক বেশি, ২.১ শতাংশ। নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে এক হাজার নবজাতকের মধ্যে মৃত্যুর হার ৭০ জন, দক্ষিণ এশিয়ায় ৫২, আর বাংলাদেশে ৩৫ জন। মেয়েরা সবচেয়ে বেশি স্কুলে যাওয়ার পরিসংখ্যান বাংলাদেশেই অর্জিত হয়েছে।

যোগাযোগ, বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়নে আওয়ামী লীগের সরকার গত পাঁচ বছরে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করতে পেরেছে। অথচ রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ত্র“টিপূর্ণ এবং ভ্রান্ত পদচারণ ২০১৩ সালের শেসাশেষি দেশটিকে নিয়ে এসেছে গভীর খাদের প্রান্তসীমায়। অর্থনৈতিক ও সামাজিক দিক থেকে দেশ ও জাতি আজ ভয়াবহ বিপদের সম্মুখীন। প্রধান বিরোধী দলের সঙ্গে প্রবল মতানৈক্য, বিশেষত নির্বাচনকালীন সরকারের প্রশ্নে দেশ ও জাতিকে শুধু বিভক্তিই করেনি, ভয়ংকর সার্বিক সংকটেও ফেলেছে। কার্যকর কৌশল ও রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগ ক্ষমতাসীন দলকে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় আপাতত সফল করেছে বলে মনে হলেও এ সাফল্য অত্যন্ত ভঙ্গুর ভিত্তির ওপর নির্মিত এবং স্বল্পস্থায়ী। একতরফা নির্বাচন ক্ষমতাসীনদের জন্য বয়ে আনতে পারে নিরঙ্কুশ বিজয়। কিন্তু তাতে জনসমর্থন কতটুকু আছে, সে প্রশ্ন থেকেই যাবে। এ পরিপ্রেক্ষিতেই সম্ভবত আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলছেন যে একাদশ সংসদের নির্বাচন কেমনভাবে সবাইকে নিয়ে করা যায়, তা সংলাপের মাধ্যমে মীমাংসা হতে পারে। যদি সেই উদ্যোগ ক্ষমতাসীন দল নিতে পারে, তাহলে দেশ ও জাতির জীবনে যে ফাটল সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং একতরফা নির্বাচন সৃষ্টি করেছে, তা জোড়া লাগানো সম্ভব হতে পারে। এ ব্যাপারে কালক্ষেপণের অবকাশ নেই, এরই মধ্যে পথে পথে অনেক দেরি হয়েছে। ফাটল আরো গভীর হলে সব প্রাসাদ ভেঙে পড়তে পারে। ভঙ্গুর জিনিসে সবলে হাত দিতে নেই। দরকার আছে সযতœ সতর্ক স্পর্শের। কবি এ জেড এম ওবায়দুল্লাহ খান যথার্থই লিখে গেছেন : ’ও চুড়ি ধরলে ভাঙ্গে, ভাংলে জোরে না যে।’

লেখক : সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ, বাংলাদেশের (সিডিআরবি) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এবং আর্থসামাজিক ত্রৈমাসিক ‘এশিয়ান অ্যাফেয়ার্সের’ সম্পাদক।

এফএনএস