প্রেমিকের মৃত্যু বেঁচে গেছে প্রেমিকা

mim‘আমার অন্য জায়গায় কাবিন হয়ে গেছে। বাবা-মা সেখানে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তুমি মাইন্ড করো না।’ প্রেমিক কিশোর প্রেমিক-প্রেমিকার মাঝে এই আলাপে পর সেদিনই দু’জনে পালিয়ে যায়। একপর্যায়ে তারা জীবন বিসর্জনের কথা ভাবে। সে অনুযায়ী শুক্রবার ভোরে তারা একে একে পানিতে লাফ দিলে প্রাণ যায় কিশোর এহসানুল হক তন্ময়ের। তবে বেঁচে যায় কিশোরী সেহরীনা রহমান মীম। প্রেমিকার অন্যত্র এনগেজমেন্ট হওয়ার খবরে হাতিরঝিলের ব্রিজ থেকে লাফ দিয়ে প্রাণ যাওয়া ষোল বছর বয়সী এ কিশোরের সঙ্গে কিশোরীর প্রেমের সম্পর্ক দীর্ঘ দু’বছরের। মেয়ের পরিবার সম্পর্কের কথা জানতে পেরে কিশোরীকে অন্যত্র বিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। একপর্যায় কাবিন করে রাখে।


পুলিশের কাছে কিশোরী সেহরীনা মীম স্বীকার করে, পরিবারের সদস্যরা তাদের প্রেমের সম্পর্ক মেনে না নেয়ায় তারা আত্মহত্যার চেষ্টায় পানিতে ঝাঁপ দেয়। পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, কিশোর-কিশোরী দু’জনই মগবাজারের প্রভাতী উচ্চ বিদ্যা নিকেতনের দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী। বেশ কিছুদিন ধরেই তাদের মন দেয়া-নেয়া চলে আসছিল। কিন্তু বিষয়টি টের পেয়ে মেয়ের পরিবার এ সম্পর্ক মেনে নেয়নি। তাই ভোরে তারা দু’জন হাতিরঝিলের ব্রিজের ওপর থেকে পানিতে ঝাঁপ দেয়। মেয়েটিকে আশপাশের নিরাপত্তাকর্মীরা উদ্ধার করলেও ছেলেটি পানিতে তলিয়ে যায়।
mim
পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা তার লাশ উদ্ধার করে। বাড্ডা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এমএ জলিল জানান, ঘটনার পর ভোর সাড়ে ছয়টার দিকে কিশোরের লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়। মেয়েটিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে আসা হয়। এ সময় উভয়ের পরিবারকেও ডাকা হয়। তদন্তের স্বার্থে তাদের কাছ থেকে কিছু ঘটনা জানার চেষ্টা করা হয়। এ সময় মেয়েটিকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে তাদের প্রেমের সম্পর্কের বিষয়টি পুলিশকে জানায়। বাড্ডা থানা পুলিশ জানায়, আত্মহত্যা ও আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেয়া-দুটিই আইনের চোখে অপরাধ। তাই মেয়েটির স্বীকারোক্তি মোতাবেক তারা দু’জন দু’জনকে এ অপরাধে উদ্বুদ্ধ করে। এ কারণে মেয়েটিকে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। এদিকে তন্ময়ের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য ঢামেক মর্গে নেয়া হলে সেখানে স্বজন ও সহপাঠীদের ভিড়ে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। মেয়েটি স্বীকার করে, পরিকল্পনা অনুযায়ী বৃহস্পতিবার বিকালে তারা যার যার বাসা থেকে বেরিয়ে আসে। শুক্রবার ভোর পৌনে ৫টার দিকে হাতিরঝিলের মাঝখানে একটি সেতুর ওপর থেকে তারা লাফিয়ে পড়ে। সে জানায়, তন্ময়ের সঙ্গে প্রেম থাকলেও ছয় মাস আগে মৌচাকের এক কাপড় ব্যবসায়ী যুবকের সঙ্গে তার বিয়ের কাবিন হয়। বাবা-মা তার সম্পর্ক জানার পর তড়িঘড়ি করে এ আয়োজন করে। পুলিশ জানায়, প্রাপ্তবয়স্ক না হলেও পরিবারের ইচ্ছায় কয়েক মাস আগে অন্য এক ছেলের সঙ্গে স্কুলছাত্রীর এনগেজমেন্ট হয়ে যায়। ১০ জানুয়ারি তাদের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। এ ঘটনাটি মেয়েটি তার সহপাঠী প্রেমিককে জানালে তারা তাদের সম্পর্ক পানিতে বিসর্জনের সিদ্ধান্ত নেয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে বাড্ডা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, ঘটনার সময় সেখানে উপস্থিত নিরাপত্তাকর্মী ও সেতুর ওপরে থাকা কয়েকজন রিকশা ও ভ্যানচালক বলেছেন, ভোর পৌনে ৫টার দিকে প্রথমে ছেলেটি ঝাঁপ দেয়। তারপর মেয়েটিও লাফ দেয়।

প্রত্যক্ষদর্শী ভ্যানচালক পুলিশকে বলেন, ভোর বেলা তিনি মেয়েটিকে পানিতে হাবুডুবু খেতে দেখে সেতুর ওপর থেকে ভ্যানের দড়ি খুলে পানিতে ফেলে দেন। মেয়েটি সেটি ধরে ফেললে তাকে টেনে তিনি পারে নিয়ে আসেন। পরে আরেকজন ছেলে আছে বলে মেয়েটি জানালেও তাকে আর পাওয়া যায়নি। কিছুক্ষণ পর তার লাশ ভাসতে দেখা যায়।

মেয়ের স্বজনরা জানান, তারা থাকেন হাতিরপুল এলাকায়। গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জে। পড়ালেখার জন্য নিউ ইস্কাটন রোডে পরিবারের সঙ্গে থাকত তন্ময়। দিলু রোডের একই স্কুলের শিক্ষার্থী তারা। পরিবার সূত্র জানায়, তন্ময়ের বাবা একরামুল হক কামাল ছোট মেয়ে সুমাইয়া হককে নিয়ে থাকেন পুরান ঢাকার কেএম দাস লেন রোডে। আর মা রুনা আক্তার ছেলেকে নিয়ে থাকেন ইস্কাটনে। দুই পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার বিকাল থেকে দু’জনই নিজ নিজ বাসা থেকে বের হয়ে যায়। তাদের কোনো খোঁজ খবর পাওয়া না গেলে তারা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে। কিন্তু পুলিশ মারফত তারা শুক্রবার সকাল সাড়ে আটটার দিকে তাদের সন্তানদের দুর্ঘটনার সংবাদ পান। তন্ময়ের বাবা একরামুল হক কামাল একজন ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, এ রকম ঘটনা মেনে নেয়া যায় না। তন্ময় ছিল তার বড় ছেলে। তাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল। এদিকে ঘটনার পর ছেলের পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

বাড্ডা থানার এসআই জাহাঙ্গীর জানান, প্রাথমিকভাবে মেয়েটি জানায় তারা কেউ সাঁতার জানত না। ওপর থেকে রশি ফেলে দেয়া হলে সে রশি ধরতে পেরেছে। আরও আগে ডুবে গেছে তন্ময়। তন্ময়ের মা শাহানাজ আক্তার রুনা বলেন, ছেলের সঙ্গে সহপাঠীর প্রেমের বিষয়টি তিনি জানতে পেরেছিলেন। কিন্তু এ রকম কিছু করে বসবে তা কখনও ভাবতেও পারেননি। তন্ময়ের মা আরও জানান, বৃহস্পতিবার বিকাল ৫টার দিকে বাসা থেকে বের হয় তন্ময়। রাত হয়ে যাওয়ার পরও বাসায় না ফেরায় তিনি বিচলিত হয়ে যান। একপর্যায় মোবাইল ফোন বন্ধ পেয়ে রাতেই রমনা থানায় জিডি দায়ের করেন। সকালে থানা থেকেই পুলিশ লাশ উদ্ধারের খবর দেয়।

যুগান্তর