অসুস্থ রাজনীতি : ‘মন পোড়ানো কয়লার বেপারি’

shellyড. মীজানূর রহমান শেলী
প্রেম-পিরিতের বিষয়েই কথাটি খাটে। রাজনীতির সঙ্গে ‘মন পোড়ানো কয়লার বেপারি’র কোনো সরাসরি সম্পর্ক সহজে খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু রাজনীতি যেখানে দূষিত, অসুস্থ ও পঙ্গু, সেখানে বোধ হয় সাধারণ মানুষ পথভ্রান্ত রাজনীতিবিদদের একাংশকে ওই নিষ্ঠুর বেপারির সঙ্গে তুলনা করতে পারে। বর্তমানের বাংলাদেশে জ্বালাও-পোড়াও এক নির্মম বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। সহিংসতা বেশ কয়েক মাস ধরেই রাজনীতিকে রক্তাক্ত করে তুলেছে। এই সহিংসতায় নির্দয় মার খাচ্ছে সাধারণ মানুষ, প্রত্যক্ষ রাজনীতির সঙ্গে যাদের কোনো সম্পর্কই নেই।

এখনকার রাজনীতির এই উগ্র-চণ্ডাল মূর্তির উৎস সন্ধানে বেশি দূর যেতে হয় না। নির্বাচনকালীন সরকারের রূপ ও কাঠামো নিয়ে দুই প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এবং তাদের মিত্ররা নিয়েছে পরস্পরবিরোধী এবং সাংঘর্ষিক অবস্থান। ক্ষমতাসীন দল সংশোধিত সংবিধানের ভিত্তিতে ঘোষণা করেছে যে বর্তমানে নির্বাচিত সরকারই নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভূমিকা পালন করবে। বিরোধী পক্ষের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের মুখে ক্ষমতাসীন দল কিছুটা ছাড় দিয়ে বহুদলীয় সরকারের আওতায় নির্বাচন করার আয়োজন করেছে। বিএনপির নেতৃত্বে বিরোধী দলগুলো এ ব্যবস্থা মেনে নিতে সুস্পষ্ট অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তারা নির্বাচনকালীন সরকার হিসেবে এক নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে অনড়। এ দাবির সমর্থনে ২৫ নভেম্বর নির্বাচনী তফসিল ঘোষিত হওয়ার পর বিরোধী দলগুলো দেশব্যাপী প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলেছে। সেই আন্দোলনের আওতায় চলছে দ্বন্দ্ব, সংঘাত, জ্বালাও-পোড়াও ও হত্যার নৃশংস প্রক্রিয়া। বাস, ট্রাক ও অন্যান্য যন্ত্রচালিত যানবাহনে চলছে আক্রমণ, ভাঙচুর এবং জ্বালাও-পোড়াও। চোরাগোপ্তা হামলায় ও পেট্রলবোমায় শুধু যানবাহনই পুড়ছে না, পুড়ছে নিরীহ নাগরিকরাও।

কয়েক সপ্তাহব্যাপী সহিংসতায় নিহত হয়েছে অর্ধশতাধিক, এর মধ্যে এক উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নাগরিক অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। যারা এমনি আগুনে পুড়ে আহত হয়েছে তাদের মধ্যে একজন গীতা রানী সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হাসপাতালে আহতদের দেখতে এলে সরল-সহজ ভাষায় গীতা রানী বলেন, ‘ওরা যে বোমাগুলো মারে বা যাই মারে, ওদের শনাক্ত করুন এবং যারা অর্ডার দেয় তাদের পরিবারের লোককে ধরে ধরে আপনারা আগুনে পুড়িয়ে দেন। আমরা আপনাদের তৈরি করছি, আপনারা আমাদের তৈরি করেন নাই। আমাদের স্বামীরটা আমরা খাই। আপনারা আমাদের নিয়ে ছিনিমিনি খেলছেন। ওনারে এক হইতে বলেন, আপনারা সবাই এক হন। হয়ে আমাদের রক্ষা করেন। আমরা ভালো সরকার চাই… আমরা অসুস্থ সরকার চাই না।


আমরা অসুস্থভাবে আমাদের সন্তানকে বড় করতে চাই না… ওরা কেন আমাদের মারে? আমরা তো ওদের ক্ষতি করি নাই। …আমরা খালেদারেও চিনি না, হাসিনার কাছেও যাই না। …আপনি এগুলোর বিচার করেন। আর সহ্য হয় না।’ দুঃখের কথা, অভিমানের কথা সন্দেহ নেই, তবে এর মধ্যেই ফুটে ওঠে নিষ্পিষ্ট, নিপীড়িত জনসাধারণের মর্মস্পর্শী দুঃখ ও যন্ত্রণা। আসলেই অসুস্থ রাজনীতির সন্ত্রাস, সংঘাত ও সংঘর্ষ নাগরিকদের নিত্যদিনের জীবনকে করে বিপর্যস্ত। সৎ ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ সামান্য আয়-উপার্জন করে কোনো রকমে দিনগুজরান করবে, সে অবকাশটুকুও এই হানাহানির রাজনীতি দেয় না। মানুষ তাই শুধু যে দৈহিকভাবেই বিপর্যস্ত তা নয়, তাদের মনও ডুবে যায় হতাশা ও নিরাশায়, মানসিকভাবে তারা হয়ে ওঠে পর্যুদস্ত। তাদের কাছে তাই বিবদমান রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের এক উল্লেখযোগ্য অংশ হয়ে ওঠে ‘মন পোড়ানো কয়লার বেপারি’। এতে অবশ্য সখ্য, প্রেমপ্রীতি, অভিমান বা বিরহের লেশমাত্র থাকে না। যা থাকে তা হলো, যন্ত্রণাসিক্ত, বেদনার্ত হতাশা ও ক্ষোভের বহ্নিশিখা।

ডিসেম্বরের প্রথমার্ধ প্রায় পার হয়ে এলেও নিরাশার অন্ধকারে আলোর দীপ্তি দেখা যায় না। এদিকে দেশি-বিদেশি উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা চলছে নির্বিরাম। তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য দুই পক্ষের মধ্যে আলাপ-আলোচনা এবং তার পরিণতিতে দেওয়া-নেওয়ার মাধ্যমে এক সমঝোতা। দেশি ও সুধীসমাজের অনুরোধ, উপদেশ ও আহ্বানের শেষ নেই। কিন্তু এই বিশিষ্ট সজ্জনদের কথা কেউ শুনছেন বলে মনে হয় না। সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতা বা কর্মীর তা যে পক্ষেরই হোক না কেন, যেন অব্যক্তভাবে বলেন,

‘অনেক কথা যাও যে বলি
কোনো কথা না বলি
তোমার ভাষা বোঝার আশা
দিয়েছি জলাঞ্জলি।’

বন্ধু ও মিত্র রাষ্ট্র এবং জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থার উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিরাও বাংলাদেশের এই অসুস্থ, অস্থির রাজনীতির অবসানের চেষ্টায় সদা নিরত। যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ের সরকারি নেতারা ও পররাষ্ট্রসচিবসহ মিত্র ভারতের উচ্চপদস্থ কূটনৈতিক প্রতিনিধিদল ডিসেম্বরের প্রথম দিক পর্যন্ত বাংলাদেশ সফর করে রাজনৈতিক সমঝোতার চেষ্টা করে গেছেন। এদিকে ৬ থেকে ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত জাতিসংঘের মহাসচিবের পক্ষে সহকারী মহাসচিব (রাজনৈতিক) অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো ও তাঁর সহকর্মীরা কয়েকবার শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃদ্বয় এবং তাঁদের উচ্চ পর্যায়ের সহকর্মীদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ ও আলোচনা করেন। তাঁদের লক্ষ্য একই- বিবদমান পক্ষদ্বয়কে সংলাপের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান ও সংকটের নিরসন। কিন্তু তাঁদের এ প্রচেষ্টাও বিশেষ কোনো ফল আনতে পারবে বলে মনে হয় না।

বর্তমান দ্বান্দ্বিক ও সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি একদিক থেকে দেখতে গেলে ক্ষমতার লড়াইয়ের বিষাক্ত ফল। ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনর্বহাল হওয়ার পর আজ প্রায় ২৩ বছর ধরে যে প্রধানত দ্বিদলীয় ব্যবস্থা দেশে চালু রয়েছে, তা কাঙ্ক্ষিত স্থিতি ও ভারসাম্য পায়নি। দুই দলই নির্দলীয় অন্তর্বর্তীকালীন ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের তদারকিতে পালাক্রমে ক্ষমতায় আসে। কিন্তু তাদের কোনো পক্ষই কাম্য ও বাঞ্ছিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও রেওয়াজ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। জাতীয় সংসদ রয়ে গেছে নিবীর্য ও অকার্যকর। প্রধান নির্বাহী লাভ করেছেন প্রায় নিরঙ্কুশ ক্ষমতা। দলীয় ব্যবস্থা বর্তমান থাকলেও রাজনৈতিক দলগুলো বাঞ্ছিত অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র অর্জন করতে পারেনি। এখানেও প্রধান নেতা সর্বোচ্চ ক্ষমতা রাখেন। আবার তিনিই সরকারের প্রধান নির্বাহী হিসেবে ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। এই সার্বিক পরিস্থিতির পরিণতিতে বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্র এক ‘প্রধানমন্ত্রী শাসিত’ ব্যবস্থার রূপ লাভ করেছে। এ সব কিছুর ফলে অঘোষিত স্বৈরশাসন আসলে দেশ ছাড়েনি। বিতাড়িত একনায়কতন্ত্র ভোল পাল্টে রূপান্তরিত হয়েছে নির্বাচনভিত্তিক একনায়কতন্ত্রে। এই একনায়কধর্মী, স্বৈরশাসকসুলভ রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ক্ষমতার লড়াই এবং প্রতিহিংসার রাজনীতি শিকড় গাড়লে তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।


রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও সংঘাতকবলিত আজকের বাংলাদেশে অসুস্থ ও সহিংস রাজনীতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির বিষয়টি। আদর্শের চেয়ে ক্ষমতা এখানে রাজনৈতিক ক্রীড়াকর্মে প্রধান নিয়ামক হয়ে দাঁড়ায়। ক্ষমতাসীন শীর্ষ নেতৃত্ব এবং তার অধীনে থাকা দল ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য রাষ্ট্রীয় শক্তি ও সম্পদকে লাগান চেলা সৃষ্টির কাজে। জনপ্রশাসন, স্থানীয় সরকারসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থায় কর্মরত ব্যক্তিদের লোভনীয় পদ ও সম্পদের ভাগ দিয়ে নিজ নিজ দলে টানার প্রবণতা প্রবল। এর ফলেই দুই দশক ধরে পৃষ্ঠপোষক ও পোষিতের বেড়াজাল সৃষ্টি করে দুই প্রধান রাজনৈতিক দলই কার্যকর গণতান্ত্রিক সমাজের বিকাশ প্রায় রুদ্ধ করেছে। এখানে দলগুলো সুঠাম-সুচারু রাজনীতিতে বিশ্বাস রাখতে পারে না, সঠিক চর্চার মাধ্যমে সৃষ্টি ও বিকশিত করতে পারে না নিজ নিজ দলকে। পক্ষান্তরে এ ধরনের রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রীরা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। তাঁরা মনে করেন, রাষ্ট্রক্ষমতায় না থাকলে তাদের এবং তাদের দলের অস্তিত্বই বিলীন হয়ে যাবে। এ অবস্থায় ক্ষমতার লড়াই সহিংস ও মারাত্মক রূপ ধারণ করলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। পথভ্রষ্ট, দুর্নীতিগ্রস্ত, ক্ষমতালিপ্সু রাজনীতির দারুণ প্রহারে মার খাওয়া সাধারণ মানুষ যদি রাজনীতিকদের ‘মন পোড়ানো কয়লার বেপারি’ হিসেবে চিহ্নিত করে, তাহলে বিস্মিত হওয়ার কোনো কারণ আছে কী? কিন্তু মনরাজ্যের এই জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড থেকে পরিত্রাণের উপায় আছে কি? যদি থেকেও থাকে, তাকে সহজে খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। সে অন্বেষার উত্তর খুঁজতে হবে বারান্তরে।

লেখক : সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ, বাংলাদেশের (সিডিআরবি) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এবং আর্থসামাজিক ত্রৈমাসিক ‘এশিয়ান অ্যাফেয়ার্সের’ সম্পাদক

mrshelley43@gmail.com

কালের কন্ঠ