বাঙালি জাতি সম্পর্কে হুমায়ুন আজাদ

Humayun-azad-sm20130117094746চরিত্র সম্পর্কে বাঙালির ধারণাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘চরিত্রহীন’ বলতে বাঙালি বোঝে পরনারীতে আসক্ত পুরুষ; তার চোখে আর কেউ চরিত্রহীন নয়, শুধু পরনারী আসক্তিই চরিত্রহীন বা দুশ্চরিত্র। ঘুষ খাওয়া চরিত্রহীনতা নয়, গৌরব; কপটতা চরিত্রহীনতা নয়, মিথ্যাচার চরিত্রহীনতা নয়, এমনকি খুন করাও চরিত্রহীনের লক্ষণ নয়। শুধু নারী আসক্তিই চরিত্রহীনতা। তবে বাঙালি মাত্রই পরনারী আসক্ত; প্রকাশ্যে নয়, গোপনে।


‘বাঙালি পৃথিবীর সবচেয়ে অহমিকাপরায়ণ জাতিগুলোর একটি, বাস করে পৃথিবীর এককোণে; ছোটো, জুতোর গুহার মতো, ভূভাগে; খুবই দরিদ্র, এখন পৃথিবীর দরিদ্রতম। তার দেশ ছোটো; ছোটো ভূভাগে বাস করার একটি ফল মানসিকভাবে ছোটো, সংকীর্ণ হওয়া; কূপমণ্ডুকতায় ভোগা, যাতে ভুগছে বাঙালি অনেক শতাব্দী ধ’রে। বাঙালির এক অংশ প’ড়ে আছে এক বড়ো দেশের একপ্রান্তে, ভুগছে প্রান্তিক মানসিকতায়; এবং আরেক দারিদ্র বিশশতকের বড়ো কিংবদন্তী ও সত্য। আর্থিক দারিদ্র মানুষকে মানসিকভাবে গরিব করে, বাঙালির মনের পরিচয় নিলে তা বোঝা যায়। প্রতিটি বাঙালি ভোগে অহমিকারোগে, নিজেকে বড়ো ভাবার অচিকিৎসা ব্যাধিতে আক্রান্ত বাঙালি। ইতিহাসে বাঙালির যে-পরিচয় পাওয়া যায় তা গৌরবজনক নয়; এবং এখন যে-পরিচয় পাই বাঙালির, তা আরো অগৌরবের। প্রতিটি জনগোষ্ঠির রয়েছে একটি বিশেষ চরিত্র, যা দিয়ে তাকে শনাক্ত করা যায়; কিন্তু বাঙালির পাওয়া যায় না এমন বৈশিষ্ট্য, যার দিকে নির্দেশ ক’রে বলা যায় এ হচ্ছে বাঙালিত্ব। প্রতিটি জনগোষ্ঠির স্বভাবের রয়েছে একটি-দুটি প্রশংসনীয় বৈশিষ্ট্য; কোনো জাতি সরল, কোনো জাতি পরোপকারী, কোনো জনগোষ্ঠি উদার, বা মহৎ, বা আন্তরিক, বা কোনো জাতি স্বল্পভাষী, বা বিনয়ী, বা পরিশ্রমী, বা উচ্চাভিলাষী; কিন্তু বাঙালির নেই এমন কোনো গুণ, যার সংস্পর্শে এসে মনুষ্যত্বের প্রসার ঘটাতে পারে। বাঙালির জাতিকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যবেক্ষণ ও বিচার করা হয়েছে কি না, তা জানি না আমি; কিন্তু বোধ করি যে তা এখন জরুরি।


মানসিক এলাকাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু বাঙালি মানস উদ্ঘাটনের কোনো চেষ্টা হয় নি আজো। বাঙালির আচরণও বিশেষ পর্যবেক্ষণ ও বিচারের বিষয়। বাঙালি সাধারণত কী আচরণ করে, তার সামাজিক আচরণ কেমন; বন্ধুকে কতোটা প্রীতির সাথে গ্রহণ করে, শত্রুকে দেখে কতোটা ঘৃণার চোখে; কতোটা কথা বলে বাঙালি, কথায় বক্তব্য থাকে বা থাকে না, এবং আরো অনেক আচরণ সূক্ষ্মভাবে বিচার করা দরকার।’

‘বাঙালি গুছিয়ে কথা বলে না; এক কথা বারবার বলে; কথায় কথায় অতিশয়োক্তি প্রয়োগ করে। সাধারণ মানুষের বাক্যের ভাণ্ডার বেশ সীমাবদ্ধ; কিন্তু তারা ওই সীমাবদ্ধ ভাণ্ডারকে বারবার ব্যবহার ক’রে প্রায় অসীম ক’রে তোলে। বাঙালি মনে করে এক কথা বারবার বললে তা গ্রহযোগ্য হয়, তাতে ফল ফলে। এটা হয়তো মিথ্যে নয়, কিন্তু এতে কথার তাৎপর্য কমে, মূল্য বাড়ে পৌনঃপৌনিকতার। সাধারণ মানুষকে যদি ছেড়ে দিই, ধরি যদি মঞ্চের মানুষদের, বিচিত্র কথা বলা যাদের পেশা, তারাও একই কথা বারবার বলে। বাঙালি নতুনত্ব চায় না, বিশ্বাস করে পুনরাবৃত্তিতে। পুনরাবৃত্তিতে বাঙালির প্রতিভা কি তুলনাহীন? বাঙালির স্বভাবে রয়েছে অতিশয়োক্তি, সে কোনো আবেগ ও সত্য প্রকাশ করতে পারে না অতিশয়োক্তি ছাড়া। অতিশয়োক্তি ভাষাকে জীর্ণ করে, নিরর্থক করে, যার পরিচয় পাওয়া যায় বাঙালির ভাষিক আচরণে ও লিপিবদ্ধ ভাষায়। ‘দারুণ পছন্দ করি’, ‘ভীষণ ভালোবাসি’, ’শ্রেষ্ঠতম কবির’ মতো অতিশয়োক্তিতে বাঙালির ভাষা পূর্ণ। অতিশয়োক্তি লঘুতার লক্ষণ; এতে প্রকাশ পায় পরিমাপবোধের অভাব। বাঙালি লঘু, পরিমাপবোধহীন। বাঙালি সাধারণত কারো আন্তর গুরুত্ব নিজে উপলব্ধি করতে পারে না; অন্য কারো কাছ থেকে তার জানতে হয় এটা; এবং একবার অন্যের কাছে থেকে জেনে গেলে, বিচার না ক’রে, সে তাতে বিশ্বাস করে। বাঙালি ভাষাকে এক ধরনের অস্ত্ররূপেও ব্যবহার করে। কলহে বাঙালির প্রধান অস্ত্র ‘ভাষা-আগ্নেয়াস্ত্রে’র মতো বাঙালি ভাষা প্রয়োগ ক’রে থাকে।’

‘বাঙালি স্বভাবত ভদ্র নয়। সুবিধা আদায়ের সময় বাঙালি অনুনয়-বিনয়ের শেষ সীমায় যেতে পারে, কিন্তু সাধারণত অন্যদের সাথে ভদ্র আচরণ করে না। বাঙালি প্রতিটি অচেনা মানুষকে মনে করে নিজের থেকে ছোটো, আগন্তুক মাত্রকেই মনে করে ভিখিরি। কেউ এলে বাঙালি প্রশ্ন করে, ‘কী চাই?’ অপেক্ষা করার জন্যে বলে, ‘দাঁড়ান’। কোনো কর্মস্থলে গেলে বাঙালির অভদ্রতার পরিচয় চমৎকারভাবে পাওয়া যায়। যিনি কোনো আসনে ব’সে আছেন কোনো কর্মস্থলে, তাঁর কাছে কোনো অচেনা মানুষ গেলে তিনি সুব্যবহার পাবেন না, এটা বাঙালি সমাজে নিশ্চয়ই। অসীম কর্মকর্তা, তিনি যতো নিম্নস্তরেই থাকুন-না-কোনো, তিনি আগন্তকের দিকে মুখ তুলেও তাকাবেন না; তাকালে মুখটি দেখে নিয়েই নানা অকাজে মন দেবেন। তিনি হয়তো পান খাবেন, অপ্রয়োজনে টেলিফোন করবেন, পাশের টেবিলে কাউকে ডেকে বাজে কথা বলবেন, আগন্তুকের দিকে মনোযোগ দেবেন না। সামনে কোনো আসন থাকলেও আগন্তুককে বসতে বলবেন না। বাঙালি অন্যকে অপমান ক’রে নিজেকে সম্মানিত করে।’

‘বাঙালি কি সুন্দর, বাঙালি কি নিজেকে মনে করে রূপমণ্ডিত? বাঙালির অহমিকা আছে, তাই নিজেকে রূপের আধার মনে করে নিশ্চয়ই কিন্তু বাঙালির চোখে সৌন্দর্যের দেবতা অন্যরা। একটু ফরশা হ’লে বাঙালি তাকে বলে ‘সাহেবের মতো সুন্দর’; একটু বড়োসড়ো হ’লে বাঙালি তার তুলনা করে, বা কিছুদিন আগেও তুলনা করতো, পাঠানের সাথে। বাঙালি সাধারণত খর্বকায়, তবে সবাই খর্ব নয়; বাঙালির রঙ ময়লা, তবে সবাই ময়লা নয়, কেউ কেউ ফরশা।’ (হুমায়ুন আজাদ নির্বাচিত প্রবন্ধ পৃষ্ঠা ২৫৭)

‘বাঙালি ধর্মের কথা বলে অন্যদিকে ধর্মবিরোধী কাজ করে, প্রগতির কথা আওড়ায় আবার প্রগতিবিরোধী কাজ করে; মহত্ত্ব দেখাবার চেষ্টা করে আসল সময় পরিচয় পাওয়া যায় ক্ষুদ্রতার। বাঙালির বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মধ্যেও প্রচুর গরমিল, মুখে যা বলে, যা সে প্রকাশ করে, কখনো তা আচার-আচরণের সাথে মেলে না; বাঙালি শক্তিমানকে পিছনে নিন্দা করলেও মুখোমুখি হলে তাকেই তোষামোদ করে। বাঙালি শক্তিমানদের ত্রুটি সাধারণত দেখে না, তাদের অন্যায়কে অন্যায় মনে করে না। দুর্বলের অন্যায়কে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে। বাঙালি খুব পরনিন্দা প্রিয়, পরনিন্দায় বাঙালি আত্মতৃপ্তি পায়। আবার শক্তিমানকে পূজা দেয়, সমমান করে, ভক্তি-শ্রদ্ধা করে।’

‘বাঙালি খুবই স্বৈরাচারী; দেখতে এতোটুকু, কিন্তু সবাই ছোটোখাটো চেঙ্গিশ খাঁ। প্রতিটি পরিবারকে যদি একটি ছোটো রাষ্ট্র হিশেবে দেখি, তাহলে ওই রাষ্ট্রের একনায়ক পিতাটি। পল্লীসমাজে পিতার একনায়কত্ব খুবই প্রবল ও প্রচণ্ড; শহুরে মধ্যবিত্ত সমাজে কিছুটা কম। পিতার শাসন স্বৈরাচারে পরিবারটি সন্ত্রস্ত থাকে সারাক্ষণ; মা-টি হয় সবচেয়ে পীড়িত ও পর্যুদস্ত, সন্তানেরাও তাই। পিতার স্বৈরাচারের পরিচয় পরিবারের সদস্যদের সম্বোধন রীতিতে ধরা পড়ে। আগে, সম্ভবত এখনো, সন্তানেরা পিতাকে সম্বোধন করতো বা করে ‘আপনি’ ব’লে, কিন্তু মাকে সম্বোধন করতো বা করে ‘তুমি’ বলে।’ (হুমায়ুন আজাদ নির্বাচিত প্রবন্ধ পৃষ্ঠা ২৫৯)

‘বাঙালির প্রিয় দর্শন হচ্ছে বেশি বড় হোয়ো না ঝড়ে ভেঙে পড়বে, বেশি ছোটো হোয়ো না ছাগলে খেয়ে ফেলবে; তাই বাঙালি হ’তে চায় ছাগলের সীমার থেকে একটু উচ্চ,– নিম্নমাঝারি। বাঙালির এ-প্রবচনটিতে তার জীবনাদর্শ বিশুদ্ধরূপে ধরে পড়ে। এতে নিষেধ করা হয়েছে অতি-বড়ো হওয়াকে, কেননা তাতে ঝড়ে ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা, আর নিষেধ করা হয়েছে খুব ছোটো হওয়াকে, কেননা তাহলে সহজেই বিপন্ন হওয়ার সম্ভবনা। তাই মাঝারি হ’তে চায় বাঙালি; বাঙালি মাঝারি হওয়ার সাধক। মাঝারি হ’তে চাইলে হওয়া সম্ভব নিম্নমাঝারি; এবং বাঙালির সব কিছুতেই পরিচয় পাওয়া যায় নিম্নমাঝারিত্বের।

বাঙালি উদ্ভাবক নয়, তাত্ত্বিকও নয়। সম্ভবত কোনো কিছুই উদ্ভাবন করে নি বাঙালি, এবং বিশ্বের আধুনিক উদ্ভবগুলোতে বাঙালির সমস্ত ঋণ করা। আধুনিক বাঙালির জীবনে যে-সমস্ত তত্ত্ব কাজ করে, তার একশোভাগই ঋণ করা। বাঙালি সাধারণ সূত্র রচনা করতে পারে না, আন্তর শৃঙ্খলা উদঘাটন করতে পারে না; পারে শুধু বর্ণনা করতে। … বাঙালি গণতান্ত্রিক নয়, যদিও গণতন্ত্রের জন্যে প্রাণ দেয়। বাঙালি সুবিধাবাদী; সুবিধার জন্যে সব করতে পারে। বাঙালি পুজো করতে পছন্দ করে; প্রতিমা বা লাশ পূজোতেই বাঙালির সুখ। বাঙালি লাশের গলায় মালা দেয়, তবে জীবিতকে লাশে পরিণত করে।’ (হুমায়ুন আজাদ নির্বাচিত প্রবন্ধ পৃষ্ঠা ২৬৩-২৬৪)

’মনোবিজ্ঞানীর চোখ দেয়া দরকার এদিকে, যেমন চোখ দেয়া দরকার সমাজবিজ্ঞানীর। বাঙালির রুগ্নতা আর লুকিয়ে রাখা চলে না, ক্ষতস্থলকে ময়লা কাপড়ে মুড়ে রাখলে ক্ষত শুকোয় না তাতে পচন ধরে। পচন ধরেছে এর মাঝেই। বাঙালির চিকিৎসার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না; একটি জনগোষ্ঠি কি রুগ্ন থেকে রুগ্নতর হ’তে হ’তে লুপ্ত হয়ে যাবে?’ (হুমায়ুন আজাদ নির্বাচিত প্রবন্ধ পৃষ্ঠা ২৫৬)

ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর

Comments are closed.