মুন্সীগঞ্জের নির্বাচনী হালচিত্র

mpমোজাম্মেল হোসেন সজল: দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মুন্সীগঞ্জের দুইটি সংসদীয় আসনে নির্বাচন হচ্ছে। আর মুন্সীগঞ্জ সদর-৩ আসনের দলীয় প্রার্থী আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির উপ-দপ্তর সম্পাদক এডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস নির্বাচিত হয়েছেন বিনা বাঁধায়।

প্রধান বিরোধী দলসহ ১৮ দল ও জাতীয় পার্টির (এরশাদ) অনুপস্থিতির নির্বাচনে কোন উৎসাহ-উদ্দীপনা নেই ভোটারদের মধ্যে। কে প্রার্থী হয়ে লড়ছেন আর কে জয়ী হচ্ছেন-এ নিয়েও জানার আগ্রহ নেই কারো। ফাঁকা মাঠের এ নির্বাচন নিয়ে নিরুৎসাহিত মুন্সীগঞ্জের ভোটাররা।


জাতীয় পার্টিসহ মুন্সীগঞ্জের ৩ টি সংসদীয় আসনে ১৫ জন প্রার্থী নমিনেশন দাখিল করেছিলেন। এরমধ্যে জাপার ৪জনসহ ৭ জন প্রার্থীর মনোয়ন বাতিল ও মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেয়া হয়।

বর্তমানে মুন্সীগঞ্জ-১ ও মুন্সীগঞ্জ-২ আসনে ৩ জন করে মোট ৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। কিন্ত এ নির্বাচন নিয়ে ভোটাদের মাঝে কোন উৎসবের আমেজ নেই । তবে, মুন্সীগঞ্জ-২ আসনে আওয়ামী লীগ সমর্থিতদের মধ্যে ২ প্রার্থীকে নিয়ে ভোটের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে করে দলীয় প্রার্থী হুইপ সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলির বিজয়ে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন বিদ্রোহী প্রার্থী ঢাকা মহানগর বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি সাবেক এসপি মাহবুব উদ্দিন আহম্মেদ, বীর বিক্রম। দলীয় নেতাকর্মীরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে দুই প্রার্থীর পক্ষে ভোট যুদ্ধে নেমেছেন।

আর মুন্সীগঞ্জ-১ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী সুকুমার রঞ্জন ঘোষ পুনরায় নির্বাচিত হচ্ছেন-এটা একেবারে নিশ্চিত।

মুন্সীগঞ্জ-১ :জয়ের অপেক্ষায় সুকুমার

শ্রীনগর উপজেলার ১৪টি ও সিরাজদিখান উপজেলার ১৪টিসহ মোট ২৮টি ইউনিয়ন নিয়ে মুন্সীগঞ্জ-১ নির্বাচনী এলাকা গঠিত। এখানে মোট ভোটার ৩ লাখ ৭৯ হাজার ৭৫৬ টি। এরমধ্যে পুরুষ ১লাখ ৯১ হাজার ৫৭৬টি ও মহিলা ভোটার ১লাখ ৮৮ হাজার ১৮০টি রয়েছে।
mp
এ আসনে হেভিওয়েটদের মধ্যে বিএনপির সংসদ সদস্য ছিলেন-সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বর্তমানে বিকল্পধারার সভাপতি প্রফেসর একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী বিএনপি ও বিকল্পধারা হয়ে তার ছেলে মাহী বদরুদ্দোজা চৌধুরী, আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির হয়ে সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী বিএনপির বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন প্রমুখ।

সর্বশেষ ২০০৮ সালের নির্বাচনে এ আসনে প্রথমবারের মতো শ্রীনগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সুকুমার রঞ্জন ঘোষ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সংসদ সদস্য হওয়ার পর এলাকায় ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজ করে নিজের জনপ্রিয়তাকে আরো সুসংহত করেছেন। যদিও আড়িয়ল বিলের ঘটনায় তার ইমেজ ক্ষুন্ন হয়েছিলো। কিন্ত উন্নয়নের কারনে অতীত ভুলে গেছে এলাকার ভোটাররা।

এখানে বিএনপি কয়েকটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। আর এর নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছেন সংসদ সদস্য সুকুমার রঞ্জন ঘোষ। আর এখানে বিকল্প ধারার ভোট ব্যাংক একেবারে শূন্যের কোঠায়।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এখানে আওয়ামী লীগের সুকুমার রঞ্জন ঘোষ (প্রতীক নৌকা), জেলা জাসদের সভাপতি (ইনু) একেএম নাসিরুজ্জামান খান (প্রতীক মশাল) ও জেপির নূর মোহাম্মদ (বাইসাইকেল)। এ আসনে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য এডভোকেট শেখ মো. সিরাজুল ইসলাম তার মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। এখানে ওই ২ প্রার্থীর কোন ভোট ব্যাংক না থাকায় সুকুমার রঞ্জন ঘোষ পুনরায় নির্বাচিত হচ্ছেন। তবে, নামেমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বি থাকলেও এখানে ভোটের আমেজ নেই। নেই প্রার্থীদের গণসংযোগও।


মুন্সীগঞ্জ-২ : এমিলির বাঁধা এসপি মাহবুব

লৌহজং উপজেলার ১০টি ও টঙ্গীবাড়ি উপজেলার ১২টিসহ মোট ২২টি ইউনিয়ন নিয়ে মুন্সীগঞ্জ-২ নির্বাচনী এলাকা গঠিত। এখানে মোট ভোটার রয়েছে ২লাখ ৬৫ হাজার ৭২৪টি। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ১লাখ ৩৭ হাজার ২২০টি ও মহিলা ১লাখ ২৮ হাজার ৪৯৪টি রয়েছে।

এ আসনের ২টি উপজেলা এলাকার মধ্যে আগে মুন্সীগঞ্জ-২ এলাকার সঙ্গে লৌহজং উপজেলা ও সিরাজদিখানের আংশিক এবং মুন্সীগঞ্জ-৩ নির্বাচনী এলাকা হিসেবে টঙ্গীবাড়ি ও মুন্সীগঞ্জ সদরের আংশিক এলাকা ছিল। কিন্ত ২০০৮ সালের নির্বাচনে একটি আসন কমিয়ে মুন্সীগঞ্জে ৩টি আসন করা হয়। আসন কমে যাওয়ায় সাবেক মুন্সীগঞ্জ-২ আসনের দলীয় নেতারাই এখন এ আসনে নমিনেশন পাচ্ছেন।

গত ২০০৮ সালের নির্বাচনে এ আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির কোষাধ্যক্ষ ও সাবেক সাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী মিজানুর রহমান সিনহাকে হারিয়ে প্রথম বারের মতো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হন বর্তমান জাতীয় সংসদের হুইপ সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি। এবার বিএনপি নির্বাচনে না আসায় দলের মনোনীত প্রার্থী এমিলির (প্রতীক নৌকা) সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন দলের বিদ্রোহী প্রার্থী ঢাকা মহানগর বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি সাবেক এসপি মাহবুব উদ্দিন আহম্মেদ, বীর বিক্রম (প্রতীক আনারস)। তিনি শক্তপ্রার্থী হওয়ায় এমিলির বিজয় অনেকটা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

দলের একটি অংশ প্রকাশ্যে ও গোপনে এসপি মাববুবের পক্ষে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। এরই মধ্যে গত ১৩ই ডিসেম্বর লৌহজং উপজেলার কনকসার গ্রামের বাবু মুন্সীর ছেলের বৌ-ভাত অনুষ্ঠানে যোগদান শেষে টঙ্গীবাড়িতে ফিরছিলেন এসপি মাহবুব ও তার কর্মী সমর্থকরা। বিকেল ৪টার দিকে এমিলি সমর্থকরা উপজেলার ঘোড়দৌড় ব্রিজের ঢালে স্বতন্ত্র প্রার্থী এসপি মাহবুবের গাড়ি বহরে হামলা চালায়। এ সময় এসপি মাহবুব, টঙ্গীবাড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বাদল মল্লিকসহ কয়েক জন আহত হয়।

এদিকে, দলের বিদ্রোহী প্রার্থী এসপি মাহবুবের পক্ষে জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা ঢালী মোয়াজ্জেম হোসেন, লৌহজং উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ওসমান গণি তালুকদার, ভাইস চেয়ারম্যান জাকির বেপারী, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান রানু, টঙ্গীবাড়ি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার কাজী ওয়াহিদ, টঙ্গীবাড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বাদল মল্লিক, নিরু ভুইয়াসহ বেশ কিছু নেতাকর্মী কাজ করছেন। তবে, এখানে বিএনপি সমর্থকরা ভোট কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিলে এসপি মাহবুবের সঙ্গে এমিলির হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মনে করেন।

তবে, সেখানকার বিএনপির শীর্ষ নেতাদের মধ্যে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলী আজগর মল্লিক রিপন, টঙ্গীবাড়ি উপজেলা বিএনপির সভাপতি খান মনিরুল মনি পল্টন, সাধারণ সম্পাদক আমির হোসেন দোলন জানিয়েছেন, সংগ্রাম কমিটির মাধ্যমে ওই নির্বাচন প্রতিহত করা হবে। এদিকে, মুন্সীগঞ্জ-২ আসনে জাতীয় পার্টির নোমান মিয়া ও বিএনএফ’র বাচ্চু শেখের মনোনয়ন বাতিল হয়ে যায়। এখানে খেলাফত মজলিসের মো. আব্দুল ওয়াদুদ (প্রতীক রিকশা) নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

মুন্সীগঞ্জ-৩ : বিনা বাধায় মৃণালের জয়

মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলায় ২টি পৌরসভা ও ৯টি ইউনিয়ন এবং গজারিয়ায় ৮টি ইউনিয়ন নিয়ে মুন্সীগঞ্জ-৩ নির্বাচনী এলাকা। এখানে মোট ভোটার রয়েছে ৩ লাখ ৬২ হাজার ৫৭৩ টি। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ১লাখ ৮৫ হাজার ৭৬৮টি ও মহিলা ১লাখ ৭৬ হাজার ৮০৬টি রয়েছে।

এ আসনে জাপার ২জনসহ নমিনেশন দাখিল করেছিলেন ৬ জন। এরমধ্যে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে জেলা

আওয়ামী লীগ সভাপতি মোহাম্মদ মহিউদ্দিনের ছেলে মো. ফয়সাল বিপ্লব, জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক উপদেষ্টা আলহাজ কলিমউল্লাহ, জাতীয় পার্টির বিদ্রোহী প্রার্থী আব্দুল বাতেন, জেপি প্রার্থী নাজমুন্নাহার বেবী, বিএনএফ’র সৈয়দ মোখলেছুর রহমানের মনোনয়ন বাতিল ও প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। এতে করে আর কোন প্রার্থী না থাকায় ভোটার বিহীন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ও আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির উপ-দপ্তর সম্পাদক এডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস বিনা বাঁধায় জয়লাভ করেন।

এ আসনে আওয়ামী লীগ কয়েক গ্রুপে বিভক্ত। মহিউদ্দিনকে এ আসেনে ১৯৭৯ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত দলীয় নমিনেশন দেয়া হয়। কিন্ত বিএনপির প্রার্থী জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল হাইয়ের সঙ্গে প্রতিবারই তিনি পরাজয় বরণ করেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে এ আসন থেকে মুন্সীগঞ্জ বিএনপির কা-ারি আবদুল হাইকে সরিয়ে ঢাকা-৪ আসনে দলীয় নমিনেশন দেয়া হয়। এ আসনে প্রথমবারের মতো বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এম শামসুল ইসলামকে দলীয় নমিনেশন দেয়া হলে তিনি বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয় আওয়ামী লীগের নতুন মুখের প্রার্থী এম ইদ্রিস আলীর সঙ্গে।

তবে, সে নির্বাচনে আবদুল হাইকে সরানোর প্রভাব পুরা জেলায় পড়ে বলে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের দাবি। ২০০৮ সালের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো মুন্সীগঞ্জে বিএনপির সব’কয়টি (৩টি) আসন হাতছাড়া হয়ে যায়। আর বিএনপি নির্বাচনে না আসায় বিনা বাঁধায় ভোটার বিহীন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী এডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস জয় লাভ করেন।