সাংবাদিকদের বিবেক আজ গুনপোকায় খেয়ে ফেলেছে

Masud-Ranaমাসুদ রানা: ১৬ই ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস ।আমাদের চূড়ান্ত বিজয়ের দিন। আর বর্বর পাকিস্তানী পাকবাহিনীর চূড়ান্ত পরাজয়ের দিন। ১৯৭১ সালের ১১ ডিসেম্বর মুন্সীগঞ্জ পাকবাহীনি মুক্ত হয়েছিল। সারা বাংলার মতো এ অঞ্চলের মানুষও মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিল। বিভিন্ন স্থানে খণ্ড খণ্ড ভাগে বিভক্ত হয়ে পাকবাহীনিকে প্রতিহত করে এ অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধারা। নদ নদী আর অসংখ্য খাল বিল ঘিরে ছিলো মুন্সীগঞ্জে তাই পাকবাহীনিকে এ অঞ্চলে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিহত করতে।

কালিঞ্জিপাড়া, রতনপুর, মহাখালি, চাম্পাতলা, এসব এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে পাকবাহীনির সাথে বেশকিছু খণ্ডযুদ্ধ হয়েছিল ।বেশীরভাগ ক্ষেত্রে পাকবাহীনি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধের মুখে পিছু হঠতে বাধ্য হয়। সাতানিখিল লোহারপুলটি মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় মুক্তিকামী জনতা সেসময় আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছিল।যদিও বর্তমানে সেই লোহারপুলটি আর নেই সেটাকে ইট বালু সিমেন্টে গড়া একটি ব্রীজ করা হয়েছে কিন্তু আজো সাতানিখিলের সেই ব্রীজটি লোহারপুল নামেই পরিচিত।১৯৭১ সালের ১১ই ডিসেম্বর এ অঞ্চলের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কঠিন প্রতিরোধ আর সাহসী ভূমিকার কাছে পাকবাহীনি পিছু হঠে, মুন্সীগঞ্জের পাকবাহীনি ক্যাম্প ছেড়ে ঢাকা চলে গেলে এ অঞ্চল হানাদারমুক্ত হয়। সেই থেকে এই দিনটিকে মুন্সীগঞ্জবাসী হানাদারমুক্ত দিবস হিসেবে পালন করে আসছে।


আমরা যারা স্বাধীনতার অনেক পরে জণ্মেছি আমরা যোদ্ধ দেখিনি আমাদের দাদা- দাদী ,নানা-নানি ও বয়োজৈষ্ঠদের মুখে শুনেছি পাকিস্থানিদের নীপিড়ন নির্যাতন,শোষন,নির্যাতন আর নিষ্ঠুর অমানবিক হত্যাযজ্ঞের কাহিনী। এরপর বই পুস্তক,ইতিহাস আমরা জেনেছি পড়েছি ও বুঝেছি। আমরা সেই চেতনাকে উপলব্দি করতে পেরেছি, আমরা সত্যিকারের বীরের জাতি চির সংগ্রামী জাতি।

আমরা অন্যায় অত্যাচার ,জুলুম নির্যাতন,দুঃশাসন আর শোষনের কাছে মাথা নত করিনি,আমরা মাথা উচু করে বীরের মতো লড়েছি ,বীর মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তে লাল হয়ে উঠেছিল বাংলার চির শান্ত সবুজ প্রান্তর ,লাখো যুবক কিশোর মৃত্যুর নেশায় উন্মাদ হয়ে উঠেছিল, তরুন তাজা জীবন বিসর্জন দিয়েছিল, বুলেটের সামন বুক পেতে দিয়েছিল হাসতে হাসতে এই প্রিয় জন্মভূমির জন্যে।মা-বোনদের ইজ্জত লুন্ঠিত করে পাপিষ্ঠ্য পাকবাহীনি ও ওদেরই জারজ সহযোগীরা।শহীদের রক্ত ও জীবন এবং মা-বোনদের ইজ্জ্বতের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা, অর্জিত আমাদের বিজয়।

পাকবাহীনির চূড়ান্ত পরাজয় নিশ্চিত হবার পূর্বে ১৪ই ডিসেম্বর পরিকল্পিতভাবে,বর্বর, নিষ্ঠুর, অমানবিক হত্যাযজ্ঞ চালায় এদেশের বুদ্ধিজীবিদের উপড়।যে গনহত্যা করা হয়েছিল তা মানব ইতিহাসের যেকোন বর্বরতাকে হারমানায়,লজ্জিত করে মনব সভ্যতা আর মানবতাকে। অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে সুদূরপ্রসারি অসৎ উদ্দেশ্যে বুদ্ধিজীবিদের উপড় গণহত্যা চালায়। কারনটা ছিল স্বাধীনতা অর্জনের পর একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় যেন আমরা ব্যর্থ হই।কেননা একটি রাষ্ট্রকে পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির উপড় দাড়াতে হলে গুনি, শিক্ষিত, যোগ্য, দক্ষ লোকবলের প্রয়োজনীয়তা দেখাদিবে, তা পূরনে সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রটির প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দূর্বল করা, রাষ্ট্র হিসেবে এর গতিশীলতা ব্যাহত ও বাধাগ্রস্ত করার দূরবিসন্ধি অসৎ পরিকল্পনা নিয়ে ১৪ই ডিসেম্বর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মচারি,ডাক্তার ও ইঞ্জিনিয়ার,সাংবাদিক ও লেখক, ইতিহাসবিদ ও গবেষক, নাট্যকার ও রাষ্ট্রীয় গুনীজন বুদ্ধিজীবিদের হত্যা করে বর্বর নিষ্ঠুর পাকিস্তানী বাহীনি ও রাজাকার, আলবদররা।

আমাদের জাতিকে মেধাশূন্য করার হীন উদ্দেশ্যেই সেদিনের সেই গণহত্যা চালানো হয়েছিল। আজো হয়ত আমরা শূন্যতা কাটিয়ে উঠতে পারিনি,মনে হয় সে শূন্যতা আজো বিদ্যমান আমাদের রাষ্ট্র্র ও সমাজের সকল স্তরে।

তাইতো আজো অপূর্ন স্বাধীনতার স্বপ্ন ,অপূর্ন স্বাধীনতার স্বাদ। মানবতা আজো করে যায় সমাজের প্রতিটি স্তরে নীরব আর্তনাত,প্রতিবাদ নেই,প্রতিবাদীরাও নেই,প্রতিরোধ নেই,নেই কোন প্রতিকার। রাজণীতিবীদরা আজ রাজনৈতিক পাস্পরিক সহনশীলতা,শিষ্টাচার,ও রাজনৈতিক মানদন্ড রক্ষায় ব্যর্থ। আদর্শহীন ,নীতিহীন নামকাওয়াস্তে নর্দমা থেকে বেড়ে উঠা রাজণীতিবীদরা রাষ্ট্রের মগজ গিলে খাচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চলে ভর্তি বানিজ্য শিক্ষক-ছাত্র মিলে করে সেন্ডিকেট। যোগ্যরা অবমূল্যায়িত হয় ।কেউ নেই প্রতিরোধ ও প্রতিবাদ করার। কিছু সাংবাদিকরা আজ মিথ্যাকে সত্য আর সত্যকে মিথ্যা বানানোর দোকান খুলে বসেছেন। জাতির বিবেক হিসবে পরিচিত সাংবাদিকরা ,সেই বিবেক আজ গুনপোকায় খেয়ে ফেলেছে,পুজিবাদীতন্ত্র আজ গোটা সমাজব্যবস্থাকে করছে কুলষিত।

অথচ আমাদের বিজয়ের স্বপ্ন ছিল শোষনমুক্ত সমাজ ,বৈষম্যমুক্ত সমাজ ,আইনের সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সকলের জন্য সমানভাবে ন্যায় বিচার নিশ্চিত করা,নাগরিক ও মানবিক অধিকার নিশ্চিত করা। আত্মনির্ভরশীল জাতি হিসেবে মাথা উচু করে বিশ্ব দরবারে সম্মান ধরে রাখা।

পাকিস্তানীরা নেই কিন্তু কেন জানি মনে হয় সেই শোষন আর দুঃশাসন আজো রয়ে গেছে,আজো ধনীরা গরীবকে শোষন করছে,মালিকরা শ্রমিকদের শোষন করছে,আইনের শাসন শুধু গরীব আর দূর্বলদের বেলায়, ধনীরা আইনের শাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। নাগরিক ও মানবিক অধিকার আজ বঞ্চিত। মানবতা লুন্ঠিত।আজো মা বোনের ইজ্জত নিরাপত্তা পায় না।যতদিন এসবকিছু পূর্ণপ্র্রতিষ্ঠিত না হবে ততদিন আমাদের বিজয়ের পূর্ণ স্বাদ অপূর্ণ থেকে যাবে।বিজয়ের স্বাদও স্বাধীনতার স্বপ্নের পূর্ণবাস্তবায়নে আরেকটি যোদ্ধ হয়তো আবশ্যম্ভাবি,হয়তো সময়ের দাবী।

[লেখক: ভারপ্রাপ্ত সাধারন সম্পাদক, মুন্সীগঞ্জ জেলা ছাত্রদল]

মুন্সিগঞ্জ টাইমস

One Response

Write a Comment»
  1. Good Job Brother…Carry On….