পদ বাঁচাতে তদবিরে ব্যস্ত খোকা!

khokaনির্দলীয় সরকারের দাবিতে বিএনপির চলতি আন্দোলনে ‘নিষ্ক্রিয়তার’ কারণে চেয়ারপারসনের শোকজ পাওয়ার পর এখন পদ বাঁচাতে তদবিরে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন সাদেক হোসেন খোকা। দলের ভাইস চেয়ারম্যান ও ঢাকা মহানগর বিএনপির এ আহ্বায়ক দলে ‘ম্যানেজ মাস্টার’ হিসেবে পরিচিত। তবে এখন এই চরম সঙ্কট মুহূর্তে এসে আর আগের মতো ‘ম্যানেজ’ করতে পারছেন না। অবস্থান ধরে রাখতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন তিনি।

গত ২৫ অক্টোবর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ১৮ দলীয় জোটের সমাবেশ থেকে নির্দলীয় সরকারের দাবিতে চূড়ান্ত আন্দোলন কর্মসূচির ঘোষণা দেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। এর পর তিন দফায় ২০৪ ঘণ্টা হরতাল দেয়ার ধারাবাহিকতায় সারাদেশে এই আন্দোলন তীব্র এবং সহিংস রূপ নিয়েছে।

কিন্তু খোদ রাজধানীতে আন্দোলনকে চূড়ান্ত রূপ দিতে রাজপথ দখল তো দূরের কথা নেতাদের টিকিটির দেখা মিলছে না। গত তিন দফার হরতালে সারাদেশে রাজপথ নেতাকর্মীদের দখলে থাকলেও রাজধানীতে কোনো দায়িত্বশীল নেতার নেতৃত্বে একটি মিছিলও বের হয়নি। বরং সর্বশেষ তৃতীয় দফার হরতাল ঘোষণার পরক্ষণেই পাঁচ নেতা আটক হলে গ্রেপ্তার আতঙ্কে আত্মগোপনে যান শীর্ষস্থানীয় সব নেতা।


এখন রাজধানীতে আন্দোলন জমাতে না পারায় দাবি আদায়ে সরকারের ওপর যথেষ্ট চাপ প্রয়োগ করতে পারছে না বিএনপি। ফলে তৃণমূল নেতাকর্মীরাও সুবিধা করতে পারছে না। আন্দোলন যাচ্ছে ঝিমিয়ে।

ঢাকা মহানগর নেতাকর্মীদের অভিযোগ, এর জন্য নগরের নেতারাই দায়ী। বিশেষ করে ঢাকা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সাদেক হোসেন খোকা ও আব্দুস সালামকে দায়ী করেছেন তৃণমূল নেতাকর্মীরা।

দলের নীতিনির্ধারক সূত্রে জানা গেছে, চেয়ারপারসনের নির্দেশ সত্ত্বেও সর্বশেষ ৮৪ ঘণ্টার হরতালে ঢাকা মহনগরকেন্দ্রিক নেতাদের কাউকেই মাঠে পাওয়া যায়নি। কিন্তু হরতাল শেষে গত বুধবার রাতে অনেকেই চেয়ারপারসনের গুলশানের কার্যালয়ে ভিড় জমান। এতে ভীষণ ক্ষুব্ধ হন চেয়ারপারসন বেগম জিয়া। পরের দিন বৃহস্পতিবার পাঁচ জনকে শোকজ করা হয়। এদের মধ্যে সাদেক হোসেন খোকা ও সালামও রয়েছেন।

সূত্র জানায়, মাঠে না থাকায় মহানগরের অনেক নেতাকে শোকজ লিস্টে রাখা হয়েছে। অনুপস্থিত নেতাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশসহ তাদের নাম তালিকাবদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে হাইকমান্ড। আগামী কর্মসূচিতে রাজধানীতে আন্দোলনে নির্দেশকৃত ভূমিকা পালন না করলে তাদের চিহ্নিত করার মাধ্যমে অধিষ্ঠিত পদ থেকে বহিষ্কার করা হতে পারে। পাশাপাশি ঢাকা মহানগরের নেতৃত্বে পরিবর্তন আনার বিষয়েও আলোচনা হচ্ছে।


শো’কজ ও নেতৃত্ব পরিবর্তনের বিষয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে বিএনপির পক্ষ থেকে অস্বীকার করে বিবৃতি দেয়া হয়। অবশ্য দলে এমন অনেক ঘটনাই ঘটে। হাইকমান্ড অনেক নেতার ওপর ক্ষুব্ধ হয়, ব্যবস্থাও নেয়। তবে বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে দলের ইমেজ নষ্ট হয় তাই পরে অস্বীকার করা হয়- এমন কথাই বলছে সংশ্লিষ্ট কিছু সূত্র।

সূত্রে জানা গেছে, চেয়ারপারসনের ক্ষুব্ধ হওয়া ও এসব গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়ার সাথে সাথেই নড়েচড়ে বসেন আত্মগোপনে থাকা সাদেক হোসেন খোকা। চেয়ারপারসনের কাছে ওকালতি করার অনুরোধ নিয়ে নেতাদের বাসায় ঘনঘন ঢু মারছেন। আন্দোলনে রাজপথে দেখা না গেলেও পদ বাঁচাতে এখন দলের নীতিনির্ধারকদের বাড়ি বাড়ি ছুটছেন। দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন। সঙ্গে সালামও ছিলেন বলে জানা গেছে।

‘ম্যানেজ মাস্টার’ খোকা
দলের একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ম্যাডামের শোকজ বা ক্ষুব্ধ হয়ে নেতৃত্ব পরিবর্তনের ইঙ্গিত, এসবে খুব একটা কিছু আসবে যাবে না খোকার। ‘এটা খোকা ভাইয়ের জন্য কোনো বিষয়ই না’। তিনি সবকিছুই ম্যানেজ করতে পারেন। বিতর্কিত এক-এগারোর পরে দলের দুর্দিনে ‘সংস্কারপন্থি’ ভূমিকা নেয়ার পরও খালেদা জিয়াকে ম্যানেজ করতে সক্ষম হয়েছেন। বহু বিতর্কের পরেও শুধু ‘ম্যানেজ’ যোগ্যতার গুণেই খালেদা জিয়া তাকে আহ্বায়কের দায়িত্ব দিয়েছেন।

মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকা বাম রাজনীতির মাধ্যমে তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরু করেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। নব্বইয়ের দশকের পর খালেদা জিয়ার প্রথম সরকারের সময়ে মহানগর বিএনপির সভাপতির পদ থেকে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মীর শওকত আলী পদত্যাগ করলে খোকাকে দায়িত্ব দেয়া হয়। তারপর থেকেই ওয়ান ইলেভেন পর্যন্ত টানা সময় মহানগর বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

এরপর বর্তমান ২১ সদস্য বিশিষ্ট মহানগর আহ্বায়ক কমিটিকে ম্যানেজ করে ১৬টি শীর্ষ পদই বাগিয়ে নেন খোকা। বাকি ৬টি পদ পান খোকার চির প্রতিদ্বন্দ্বী স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস গ্রুপের নেতারা। খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের পাশাপাশি আব্বাস, গয়েশ্বর ছাড়া স্থায়ী কমিটির সব নেতাকেই খোকা ম্যানেজ করতে সক্ষম হয়েছেন বলে জানা গেছে।

বিগত চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে ঢাকার মেয়রের পাশাপাশি এমপি নির্বাচিত হন খোকা। তখন ডিসিসির কমিশনারদের মধ্যে নিজের প্রভাব প্রতিষ্ঠিত করেন তিনি। ২০০৭ সালে আসে বিতর্কিত ওয়ান ইলেভেন। চারদিকে সংস্কার রব ওঠে। সময়ের সাথে পাল্টে যায় তার সুর। দলের সংস্কারপন্থিদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব খর্ব করতেও সচেষ্ট ছিলেন। কিন্তু খালেদা জিয়া কারাগার থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোল পাল্টিয়েছেন। হয়েছেন ম্যাডামের সবচেয়ে আস্থাভাজনদের একজন।

বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বিএনপির অধিকাংশ নেতাই কারাবন্দি হন। সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বক্তব্য দেয়ার কারণে বর্তমান সরকারের আমলে এ সময় পর্যন্ত দেশের ৯০ ভাগ রাজনীতিককে জেলে যেতে হয়েছে। কিন্তু সরকারের বিরুদ্ধে নানা জ্বালাময়ী বক্তব্য দিয়েও এক মুহূর্তের জন্য কারাগারে যেতে হয়নি খোকাকে। সরকারের একটি প্রভাশালী মহলের সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক রয়েছে বলে দলীয় পরিমণ্ডলে কথা চালু আছে।

দলীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, খোকা বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়ে ওয়ান-ইলেভেনের সময়ও গ্রেপ্তার ঠেকিয়েছেন। দলের এক সিনিয়র নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘বিএনপির রাজনীতির বিতর্কে মান্নান ভূঁইয়ার পরই খোকার অবস্থান। রাজনীতিতে টিকে থাকার জন্য তিনি সবকিছু করেছেন। বিএনপির সবাই জানে, খোকা মান্নান ভূঁইয়ার সঙ্গে মিশে দল করতে চেয়েছিলেন। এক-এগারোর সময় দলের প্রধানসহ সকলকে নিয়ে সমালোচনা করেছেন। এক-এগারোর হাত থেকে বাঁচার জন্য দেশের যে কয়েকজন লোক কৌশল অবলম্বন করেছেন, তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। তারপরও বিএনপিতে সংস্কারপন্থিরা পদবঞ্চিত ও পদ হারালেও তিনি দলের ভিতরে বাইরে আধিপত্য বিস্তার করে চলেছেন।’

বাংলামেইল২৪