শীতল পাটির গ্রাম টঙ্গিবাড়ীর পাইটালপাড়া

pathiপাইটালপাড়া বা পাটিকরপাড়া। পাইটাল মানে পাটি বুননের কারিগর, আবার পাটিকরের অর্থও পাটি বুননের কারিগর অর্থাৎ শীতল পাটি তৈরিকে যারা পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন তাদের পাইটাল বা পাটিকর বলা হয়। তাই পাটি বুননের কারিগরদের গ্রামের নাম পাইটালপাড়া বা পাটিকরপাড়া।

মুন্সীগঞ্জ জেলার টঙ্গিবাড়ীর একটি গ্রাম। গ্রামটি শীতল পাটির গ্রাম নামেও সারাদেশে সমধিক পরিচিত। শতাধিক পরিবারের পাঁচ শতাধিক পাইটাল দীর্ঘদিন ধরে বাঁচিয়ে রেখেছে ওই শীতল পাটির গ্রামকে। বাঁচিয়ে রেখেছে শীতল পাটি শিল্পকে। পাটিকরদের পরিবারের ধরন যৌথ পরিবার। যৌথ পরিবারের নারী-পুরুষ সবাই পাটি বুননে পারদর্শী। এখানে প্রতিটি মানুষের জীবন ও জীবিকার একমাত্র পথ পাটি বোনা। মুন্সীগঞ্জের শীতল পাটি দেশজুড়ে কদর থাকায় পৌঁছে যাচ্ছে দেশের নানা প্রান্তে।


সরেজমিনে শীতল পাটির গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, এখানে নারী-পুরুষ মিলেই পাটি তৈরির কাজ করে উভয়েই স্বনির্ভর জীবনযাপন করছেন। পারিশ্রমিকে নারী-পুরুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই এখানে। বেতন বৈষম্যহীনতার এক অনন্য উদাহরণ মুন্সীগঞ্জের শীতল পাটির গ্রাম। একদিকে এখানে পাটি তৈরির কাজে নারী-পুরুষ সমানভাবে অবদান রাখছে।
pathi
অপরদিকে সংসারের খরচ মেটাতেও নারী-পুরুষ সমানভাবে অবদান রেখে চলেছে। পাটি বুননের পাশাপাশি সংসারের কাজেও নারীকে সহযোগিতা করছে পুরুষরা। নারী-পুরুষের সমান পথচলায় মুন্সীগঞ্জের শীতল পাটির গ্রাম সত্যিই শীতল রূপ লাভ করেছে। এখানে পাটি তৈরিতে পুরুষ বেতি তোলার কাজ করে আর নারীরা বুননের মধ্য দিয়ে একটি পাটিকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেয়। এভাবেই বছরের পর বছর ধরে এখানে তৈরি হচ্ছে রকমারি পাটি।

পাইটাল পাড়া গ্রামের শতবর্ষী প্রবীণ পাটিকর সন্তোষ ভদ্র।

তিনি জানান, এ গ্রামে পাটি তৈরির ইতিহাস প্রায় ২০০ বছরের প্রাচীন। বেচু সাধুর আশ্রমকে ঘিরে এখানে পাইটালপাড়া গড়ে ওঠে ২০০ বছর আগে। হিন্দু সম্প্রদায়ের কায়স্থ গোষ্ঠীর নারী-পুরুষ পাটি তৈরির কাজ করে থাকেন বলে জানান তিনি।

শতবর্ষী বৃদ্ধ সন্তোষ ভদ্র এখনও বেতি তোলেন, তার স্ত্রী শ্যামলা রাণী ভদ্র তা দিয়ে বুনেন পাটি। সন্তোষ ভদ্রের ছেলে বিশ্বনাথ ভদ্র বাবার কাছ থেকে ছোট বেলায় কাজ শিখে নিয়েছেন। ছেলের বউ পুষ্প রাণী ভদ্র বুনন শিখেছেন শাশুড়ির কাছ থেকে।

সন্তোষ ভদ্র আরো জানান, তার বাবা বেতি তুলতেন তার মা বুনন করতেন। তার ঠাকুরদা-ঠাকুরমা (দাদা-দাদি) পাটি তৈরির কাজ করতেন। তার পূর্ব পুরুষেরাও এ পেশাতেই ছিলেন। এখানে কেউ বউ হয়ে এলে তাকেও পাটি বুননের কাজ করতে হয় বলে তিনি জানান।


জানা গেছে, একটি শীতল পাটি তৈরি করতে একজনের পাঁচ থেকে ছয় দিন সময় লাগে। শীতল পাটি তৈরিতে বেতি তোলায় একজন পুরুষ পারিশ্রমিক পান ৩০০ টাকা। আর নারীও পান ৩০০ টাকা। শীতল পাটি তৈরিতে ১০০ টাকার মুতরা দরকার হয়। সব মিলিয়ে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা খরচ হয় একটি শীতল পাটি তৈরিতে। সেই পাটি বাজারে বিক্রি করতে গেলে দাম পাওয়া যায় ৯০০ থেকে ১১০০ টাকা। এতে করে কাজের পারিশ্রমিক পাওয়ার পাশাপাশি পাটি বিক্রি করে যে মুনাফা পাওয়া যায় তার ভাগও পাচ্ছেন নারী-পুরুষ উভয়ে।

এছাড়া বড় আকারের একটি শীতল পাটি এক হাজার থেকে এক হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করা যায়। একটি চমৎকার শীতল পাটি তৈরির পর ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত লাভের মুখ দেখছেন তারা। বুননের সময় রঙ্গিন বেতির মাধ্যমে শীতল পাটিতে অঙ্গ সজ্জার কাজ করেন নারীরা। এতে সুন্দর হয়ে উঠে পাটি। রঙ্গিন বেতি দিয়ে শীতল পাটিতে নানা নকশার কাজ করা হয়।

নতুন বার্তা