বিক্রমপুরের নৌকাবাইচ

boatসৈকত সাদিক
বর্ষায় এ অঞ্চলের নদী-খালগুলো পানিতে থৈ থৈ করে। তখন এসব নদীতে নিয়মিত নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা হয়। স্থানীয়রা নৌকাবাইচকে ‘বাইছখেলা’ বলে। সাধারণত এসব এলাকায় নৌকাবাইচের প্রচলন রয়েছে। তবে আড়িয়ল বিলের আশপাশের নদী-খালগুলোতে নৌকাবাইচ বেশি দেখা যায়।

নৌকাবাইচের মৌসুম শুরু হয় ভাদ্র মাসের প্রথম দিন থেকে। তারপর তা চলে পুরো ভাদ্রমাসজুড়ে। পর্যায়ক্রমে সিরাজদিখানের শেখরনগর, মরিচা, ভাঙভিটা খালে, শ্রীনগরের গাদিঘাট, মদনখালী, দোহার-নবাবগঞ্জের চুড়াইন, বক্সনগর, কোমরগঞ্জ, বান্দুরা ও দেওতলীসহ এর আশপাশের বিভিন্ন নদী-খালে নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হতো।

এ এলাকায় জন্ম হওয়ার সুবাদে শৈশব থেকে দেখে আসছি ভাদ্র মাসের প্রথম দিন সকালে মনসা দেবী বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শ্রীনগরের আলমপুর খালে ছোট পরিসরে বাইচের আয়োজন হতো। বেশির ভাগ শিশু-তরুণকে দেখা যেত খালি গায়ে প্রতিযোগিতায় নেমে পড়তে। কেউ আবার নৌকা নিয়ে মাঝ নদীতে ডুবেও যেত। নৌকার দলনেতা হালের সামনে বসে কাঁসা বাজাত। কাঁসার টুংটাং আওয়াজের তালে তালে নৌকার দাঁড় পানিতে পড়ত। আর তীরের গতিতে নৌকা সামনের দিকে ছুটত। কাঁসার আওয়াজের মাধ্যমেই দাঁড় নিয়ন্ত্রিত হতো। কত ধরনের গান বানত মাঝিরা।
boat
এক সময় এসব প্রতিযোগিতায় পুরস্কার হিসেবে পিতলের কলস, ঘড়ি, স্বর্ণের অলঙ্কার প্রদান করা হলেও দিন বদলের পালায় পুরস্কারের ধরনও পাল্টেছে। এখন পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হয় ফ্রিজ, টিভি, মোটরসাইকেলসহ নানা সামগ্রী। স্থানীয় সুধী বা যুবসমাজ এ পুরস্কারের ব্যবস্থা করে।

ভাদ্রের প্রথম দিনে এবারও নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হলো শ্রীনগরের আলমপুরে। ফুপাতো ভাই নূরে আলম রানার আমন্ত্রণ শহর ছেড়ে হাজির হই আলমপুরে। আলমপুরের ঘাসি নৌকা ও মাঝি-মাল্লাদের সুনাম রয়েছে পুরো মুন্সীগঞ্জ, দোহার-নবাবগঞ্জ ও মানিকগঞ্জজুড়ে। এখানকার নৌকা যেখানেই যেত, সেখান থেকেই পুরস্কার জিতে আনত।

এবারের প্রতিযোগিতায় রকেট ও মাসুদ রানা নামের নৌকা রয়েছে। এই বাইচকে ঘিরে গ্রামজুড়ে উৎসবের আমেজ লেগেছিল। নদীতে ছোট-বড় নৌকা, ট্রলার নিয়ে বাইচ দেখতে এসেছিল গ্রামের অনেকে। কেউ কেউ খালের ওপর নির্মিত সেতুতে দাঁড়িয়ে দেখেছে এই খেলা। বাইচকে কেন্দ্র করে নিমকি, চানাচুর, মিষ্টিসহ নানা পদের গ্রামীণ খাবার ও খেলনাসামগ্রীর দোকান বসেছিল মাঝনদীর নৌকায়। বড় নৌকা রকেট ও মাসুদ রানা ছাড়াও অনেক ছোট-বড় নৌকাও এ প্রতিযোতিায় অংশ নেয়। প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয় মাসুদ রানা। পুরস্কার হিসেবে তারা পায় টেলিভিশন।


প্রতিযোগিতা শেষে বাইচ নিয়ে আরও বিবরণ দেন আলমপুরের তরুণ রানা, লাভলু মোড়ল, মোসলেম মৃৃধা, ওহাব মৃধাসহ অনেকেই। তারা জানালেন, আলমপুর গ্রামে বাইচ প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার জন্য ৮০ জনের একটি দল রয়েছে। তারা যেখানেই বাইচে অংশ নিতে যান নৌকার মালিকের সঙ্গে একটা চুক্তি করে নেন। একটি বাইচে অংশ নিলে তাদের পেছনে মালিককে প্রায় লাখ টাকা খরচ করতে হয়। বেশির ভাগ প্রতিযোগিতায় তারা প্রথম স্থান অধিকার করেন বলে আলমপুর গ্রামের নৌকা ও মাল্লাদের চাহিদা রয়েছে মুন্সীগঞ্জ ও তার আশপাশের জেলায়। এখন তাদের মূল আগ্রহ ঢাকার বসিলার বাইচকে ঘিরে। তাদের পাশাপাশি এ বাইচ প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে বাড়ৈখালী গ্রামের মধুমাঝি, ঘনেশ্যামপুরের রকেটও প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

দরকারি তথ্য

এখানকার নদী-খালে নৌকাবাইচ হয় ভাদ্র মাসজুড়ে। ঢাকার গুলিস্তান থেকে সিরাজদিখান, শ্রীনগর, দোহার, নবাবগঞ্জ যাওয়ার বাস পাওয়া যায়।

আলোকিত বাংলাদেশ