হাজার বছরের নৌকা তৈরীর কারিগররা হাট এখনো ধরে রেখেছে তার ঐতিহ্য

noukaশেখ মো:রতন: রাজধানী ঢাকার পাশের জেলা মুন্সীগঞ্জে বর্ষা মৌসুমে ব্যস্ত সময় কাটছে নৌকা-কোসা তৈরির কাজ। এ কাজে নিয়োজিত রয়েছে কয়েক হাজার নৌকা তৈরির শ্রমিক। এ শমিকরা বছরজুড়ে অন্যান্য মৌসুমে অন্নত্র দিনমজুরিও অন্যের জমিতে বদলি-বরগা খেটে কাটালেও বর্ষা শুরু হওয়ার পূর্ব মূহুর্ত থেকে নৌকা শ্রমিকরা নিজ-নিজ বাড়ির ওঠোনে ব্যস্ত সময় কাটান নৌকা তৈরির কাজে। এছাড়া নৌকা তৈরির কারখানাতেও দিন-রাত নৌকা তৈরির কাজ চলছে। বিশেষ করে জেলার সিরাজদিখান, টঙ্গিবাড়ী, শ্রীনগর ও লৌহজংয়ে প্রায় দুই হাজার পরিবার এই কোসা নৌকা তৈরির শিল্পের সাথে মিশে আছে হাজার বছর ধরে।

বর্ষা মৌসুমে এই শ্রমিকদের তৈরি নৌকা নিয়েই প্রতি মঙ্গলবার জেলার শ্রীনগর উপজেলার দেউলভোগ এলাকায় বসে নৌকার হাট। বড় পাইকাররা জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বাড়ি বাড়ি ঘুড়ে দরদাম করে কোসা-নৌকা কিনে নিয়ে আসেন দেউলভোগ হাটে বিক্রি করতে। এছাড়া অনেকে নৌকা তৈরি করে নিজেই বহন করে নিয়ে আসেন ওই হাটে বিক্রি করতে। নৌকা শ্রমিকদের সুনিপুন হাতের ছোঁয়ায় তৈরি নৌকা নিয়ে হাটে পসরা সাজিয়ে বসে দোকানিরা। বিকিকিনি ভাল হয় । ওই হাটে দেড় হাজার টাকা থেকে শুরু করে দশ হাজার টাকা পর্যন্ত নৌকা বিক্রি হয়ে থাকে।

সরেজমিনে দেউলভোগ নৌকার হাটে গিয়ে দেখা গেছে-জেলার বিভিন্ন অঞ্চলের নৌকার কারিগর ও বড় পাইকাররা নৌকা নিয়ে এসেছেন হাটে বিক্রি করতে। জেলার ৬টি উপজেলার ক্রেতা ছাড়াও নৌকা কিনতে হাটে এসেছের পাশের জেলা ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও ঢাকার দোহার নবাবগঞ্জ, কেরানীগঞ্জের ক্রেতারা। একটি ছোট আকারের কোসা-নৌকা বিক্রেতা তিন হাজার টাকা দাম হাকাচ্ছেন অবশেষে দর দাম করে সেই নৌকা বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার টাকা। বর্ষা মৌসুমে প্রতি মঙ্গলবার ভোর থেকে বসে নৌকার হাট চলে বিকেল পর্যন্ত। প্রতি হাটেই কমপক্ষে তিন শতাধিক কোসা-নৌকা বিক্রি হয় বলে জানালের বিক্রেতারা। বর্ষা মৌসুমে টানা চার মাস ধরে প্রতি মঙ্গলবার চলে এই নৌকার হাট।
nouka
নৌকার হাটের প্রবীন নৌকা বিক্রেতা পরিমল মন্ডল জানালেন, হাজার বছর ধরে শ্রীনগর উপজেলার দেউলভোগে বর্ষা মৌসুমের প্রতি মঙ্গলবার এখানে এই নৌকার হাট বসে। তার পূর্ব-পুরুষরা কোসা-নৌকা তৈরি করে এই হাটেই বিক্রি করতেন। তিনিও পূর্ব পুরুষের সেই ঐতিহ্যকেই ধরে রেখেছেন।

ওই হাটের বড় ব্যবসায়ী মনির হোনের জানান, প্রতি বছর তিনি প্রায় এক হাজার কোসা নৌকা তৈরি করে এই হাটে বিক্রি করেন। চলতি মৌসুমে তিনি এই পর্যন্ত পাঁচ শতাধিক নৌকা তৈরি করে হাটে বিক্রি করেছেন। আরও প্রায় ৫ শতাধিক নৌকা তৈরির কাজ চলছে। এই মৌসুমেই সবগুলো নৌকা বিক্রি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

এদিকে, নৌকা বিক্রেতা শেখ মোহন জানান, এই হাটে প্রতি মৌসুমে ১০ থেকে ১২ হাজার কোসা নৌকা বিক্রি হয়ে থাকে। খরচ ও মজুরি বাদ দিয়ে এক একটি নৌকা বিক্রি করে প্রকার ভেদে ৫শত টাকা থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত মুনাফা হয়ে থাকে। এতে করে বর্ষা মৌসুমে নৌকা বিক্রি করে এক বছরের আয় করা সম্ভব বলে জানান তিনি।


দেউলভোগের হাটের হরিপদ রায় জানান, এই হাটে বিক্রিত নৌকাগুলো অধিকাংশ চাম্বল ও কড়ই কাঠ দিয়ে তৈরি করার কারণে খরচ পড়ে কম। এতে করে ছোট কোসা নৌকার দামটা ক্রেতাদের হাতের নাগালেই থাকে। তবে লোহাকাঠ দিয়ে কিছু নৌকা তৈরি করা হয়। লোহা কাঠের এক একটি ছোট কোসা নৌকার দাম পড়ে কমপক্ষে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা।

বর্ষার পানিতে নিন্মাঞ্চল প্লাবিত হতে শুরু করলেই জমতে থাকে নৌকার হাট। মুন্সীগঞ্জ জেলার বিল অঞ্চলের মানুষের বর্ষা মৌসুমে চলাচলের একমাত্র ভরসা এই কোসা-নৌকা। এছাড়া প¦ার্শবর্তী ঢাকার দোহার, নবাবগঞ্জ, দক্ষিকেরানীগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুরের বিভিন্ন এলাকায় মুন্সীগঞ্জের তৈরি কোসা নৌকার বেশ কদর রয়েছে। তাই সারা বছর খুব একটা কাজকর্ম না থাকলেও বর্ষা মৌসুমে কোসা নৌকা তৈরি করে এক বছরের আয় ঘরে আসে ওই অঞ্চলের নৌকা শ্রমিকদের। এদিকে শ্রমিকদের পাশাপাশি ওই কোসা নৌকা হাটে বিক্রি করে লাভের মুখ দেখছেন পাইকাররা।

টাইমস্ আই বেঙ্গলী