প্রকৃতির নিষ্ঠুর আঘাতে বিপর্যস্ত

রাহমান মনি
বিশ্ব উষ্ণতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ যে শিল্পোন্নত দেশগুলো তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আর জাপান হচ্ছে শিল্পোন্নত দেশগুলোর অন্যতম। জলবায়ুর পরিবর্তনের কুফল কম-বেশি সব দেশই ভোগ করছে। জাপানও তার বাইরে নয়। ফল ভোগ করছে জাপানও।

সম্প্রতি জাপান প্রাকৃতিক দুর্যোগে পড়ে অশান্ত হয়ে পড়েছে। মৌসুমে কোনো কোনো এলাকা বিশেষ করে পশ্চিম জাপানে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত যেমন জনজীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে তেমনি পর্যাপ্ত বৃষ্টির অভাবে পূর্ব জাপানে পান করার মতো পানির অভাবের আশঙ্কাও দেখা দিয়েছিল। পানি ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছিল।


২ সেপ্টেম্বর পূর্ব জাপান (টোকিও, সাইতামা, চিবা, ইবারাকি) অঞ্চলে অত্যন্ত শক্তিশালী ঋ-২ শ্রেণীর একটি টর্নেডো আঘাত হানে। টর্নেডোর আঘাতে শুধু সাইতামা প্রিফেকচারে ৭০ জন আহত হন যাদের মধ্যে ১ জন খুবই গুরুতর এবং ২ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। বাকিদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। ২,৭৫,০০০ বাড়ির বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখতে হয়েছে এবং ৬ শতাধিক বাড়ি সম্পূর্ণ বা আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
২ সেপ্টেম্বর টর্নেডোটি আঘাত হেনেছিল ২.১১-এ, অর্থাৎ মধ্য দুপুরে। ১১ মার্চ ২০১১ স্মরণকালের ভয়াবহ ভূমিকম্পটিও প্রায় একই সময় আঘাত হেনেছিল। যা জাপানের ইতিহাসে ভয়াবহ দুর্যোগ হিসেবে স্থান নিয়েছে। ২ সেপ্টেম্বর আঘাত হানা টর্নেডোটি যারা দেখেছেন তারা ১১ মার্চের ভয়াবহতার কথা স্মরণ করে সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনা করেছেন যেন ঐ রকম পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে না হয়।

স্থানীয় প্রশাসনগুলো সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবেলার প্রস্তুতি নিয়েছে সঙ্গে সঙ্গে। টর্নেডো পরবর্তী বজ্রপাতের কথা চিন্তা করে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ, হাসপাতালগুলোকে এলার্ট রাখা, অ্যাম্বুলেন্স তৈরি রাখা, আশ্রয় কেন্দ্র খোলাসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়ে প্রশাসন।

ভরদুপুরে টর্নেডোটি আঘাত হানায় বেশ দূর থেকেই তা প্রত্যক্ষ করা গেছে। ভিডিও ফুটেজ থেকে দেখা যায় ঘন কালো একটি বিশাল গাছ (ফানেল) যার চূড়া আকাশে এবং শেকড় মাটিতে স্পর্শ করেছে। কালো দৈত্য বললেও ভুল হবে না। প্রচণ্ড বাতাসে বাসাবাড়ির চালাগুলোকে বাতাসে তুলার মতো উড়াচ্ছে, রাস্তার দুই পাশে বৈদ্যুতিক খুঁটিগুলো উপড়ে ফেলেছে, বড় বড় ইমারতগুলোর কাঁচগুলো চুরমার হয়ে পড়ছে মেঝেতে, রাস্তায় চলাচলরত গাড়িগুলোর গ্লাস নষ্ট হয়েছে ভারী বস্তুর আঘাতে যা বাতাসে উড়ন্ত ছিল। কয়েক টনবিশিষ্ট একটি প্যানাগারকে অন্য একটি ভবনের উপর উড়িয়ে নিক্ষেপ করেছে।

টোকিও থেকে শুরু হয়ে সাইতামার কোশিগায়াতে মূল আঘাত থেকে ১৯ কিলোমিটারব্যাপী ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে চিবা’র নোদা হয়ে ইবারাকিতে ২.২০ এর সময় দুর্বল হয়ে পড়ে। এরই মধ্যে ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে টর্নেডোটি যা ১১ মার্চ ’১১ বিপর্যয় পরবর্তী ক্ষতি হিসেবেই দেখছে সংশ্লিষ্টগণ এবং স্থানীয় মিডিয়া।

৪ সেপ্টেম্বর আরও একটি টর্নেডো আঘাত হানে জাপানে। নৈসর্গিক সৌন্দর্যখ্যাত জাপানের তোচিগি প্রিফেকচারের সাইতা সিটির ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে টর্নেডোটি। লোকবসতি তুলনামূলক কম এবং প্রচুর গাছগাছালি থাকায় কোশিগায়ার মতো (২ সেপ্টেম্বর’১৩) ব্যাপক ধ্বংস করতে না পারলেও বহু ইমারতের চালা উড়ে যায়, জানালার গ্লাস ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিস্টেম ভেঙে পড়ে, ঝড়ের আঘাতে ট্রাফিক খুঁটিগুলোর ব্যাপক ক্ষতিসাধন হয়।

৪ সেপ্টেম্বর বুধবার সকাল ৯.১৯ এ টোকিও থেকে ৫৪০ কিলোমিটার দক্ষিণে ৬.৯ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। যার গভীরতা ছিল ৪০০ কিলোমিটার। তোরিশিমা দ্বীপে আঘাত হানা ভূমিকম্পে রাজধানী টোকিওসহ উত্তর-পূর্ব জাপান কেঁপে ওঠে। যার রেশ ছিল হোক্কাইডো পর্যন্ত। তবে ৬.৯ মাত্রার এই ভূমিকম্পে কোনো হতাহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। ফুকুশিমাতেও ভূমিকম্পের আঘাত অনুভূত হয়েছে।

rahmanmoni@gmail.com

সাপ্তাহিক