ভাটির পুরুষ কথা: হাবিবের করিম সন্ধান

sakarimশাকুর মজিদ
শাহ আবদুল করিম [২০০৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত শাহ আবদুল করিমকে অনুসরণ করে শাকুর মজিদ বানিয়েছিলেন তথ্যচিত্র ‘ভাটির পুরুষ’। এ তথ্যচিত্র নির্মাণের সময় করিম সংশ্লিষ্ট যে সকল চরিত্রের মুখোমুখি হয়েছিলেন তারই একটি অধ্যায় এখানে পত্রস্থ হলো। ১২ সেপ্টেম্বর বাউল শাহ আবদুল করিমের মৃত্যু দিন। বাউলের সম্মানে এ লেখাটি বাংলানিউজের পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হল ]

২০০৩ সালের জুন মাসে একটা অডিও সিডি বাজারে আসে। সিলেটের ফোক গানগুলোকে আধুনিক যন্ত্র অনুসঙ্গে গাওয়া। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, হাবিব নামে এক তরুণ এর সঙ্গীতায়োজন করেছেন। হাবিব হচ্ছেন বিখ্যাত শিল্পী ফেরদৌস ওয়াহিদের ছেলে। ফেরদৌস ওয়াহিদের একটা অডিও ক্যাসেট আশির দশকে গোড়ার দিকে আমাদের কাছে খুব জনপ্রিয় ছিল। তখন এই তরুণের জন্মও বোধহয় হয় নাই।

এই ক্যাসেটে বেশ ক’জন মরমী সাধকের গান আছে। গীতিকাররা সবাই ভাটি অঞ্চলের। শাহ আবদুল করিমের লেখা গান আছে তিনটি। ২০০৩ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে আমি আবদুল করিমের কাছে যাচ্ছি। তাঁর কথাবার্তা ও গান রেকর্ড করছি। বেশ ক’বার জিজ্ঞেসও করেছিলাম যে, তিনি কি হাবিব বা কায়া কারো নাম শুনেছেন বা ঐ অ্যালবামের গান কি শুনেছেন? করিম সাহেব বলেন, না -তার রেডিও টেলিভিশন নাই তিনি শুনেননি। তবে লোক মুখে শুনেছেন অমুক অমুক তার গান গাইছে, এমনই।
sakarim
হাবিবের সুর করা কায়া’র গাওয়া গানগুলো আমার কাছে ভালো লেগে যায়। অনেকে নাক সিঁটকে বলেছেন যে, করিমের গানের সঙ্গে আধুনিক যন্ত্রের মিশ্রণ ঠিক হয়নি। আমার কাছে সে রকম কিছু কখনোই মনে হয়নি। বরং মনে হয়েছে যে, করিমের গানের কথাগুলোকে আরেকটি ভিন্ন মাত্রায় যোগ করেছে এই সুরের গান গুলো। তা না হলে-এই প্রজন্মের কাছে করিমকে আনা যেতো না।

আমি কৌতুহলী হয়ে পরি হাবিবের সঙ্গে কথা বলার জন্য। ২০০৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর ধানমন্ডির এক বাসায় দোতলার ছোট্ট একটা স্টুডিওতে আমি আবিস্কার করি হাবিবকে।

শুরুতে তার কাছ থেকে জানতে চাই, কী করে এই ‘কৃঞ্চ’ অ্যালবামটি এলো।
habib 3
হাবিব বলেন, ‘আমি যখন প্রথম ইংল্যান্ডে যাই সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এবং অডিও প্রোডাকশনের উপরে পড়াশোনা করতে তখন কিছু সিলেটি লোকজনের সাথে আমার পরিচয় হয় যারা অনেকদিন ধরেই গান বাজনা করে। সিলেট অঞ্চলের বাউলদের গান তারা গায়। ইংল্যান্ডে যাওয়ার আগে বাউলগানের উপরে আমার তেমন ঝোক ছিল না। আমার পরিচয় হলো কায়া নামে একজন লোকের সাথে। যে আমার এই ‘কৃঞ্চ’ অ্যালবামের গানগুলি গেয়েছেন। আমার ইচ্ছা ছিল, আমি কিছু গান সংগ্রহ করবো, যে গানের কথা সুন্দর হবে, সুর সুন্দর হবে, সেটাকে আমি মডার্ন মিউজিক টাচ দিয়ে একটু ভিন্ন আঙ্গিকে শ্রোতাদের সামনে উপস্থাপন করব। কায়াকে আমি বললাম, তোমার যে গানগুলো ভালো লাগে, সেই গানগুলো থেকে আমাকে কিছু গান শোনাও। কায়া আমাকে প্রায় দশ থেকে বারোটা গান শোনালো। তার মধ্যে ‘কৃঞ্চ’ ছিল, জালাল খাঁ সাহেবের গান ছিল । যখন আমাকে গান শোনাচ্ছিল তখন তাকে জিজ্ঞেস করেছি কোনটা কার লেখা বা সুর করা। ` আমি কুল হারা কলঙ্কিনি`, `গান গাই আমার মনরে বুঝাই`, `কেমনে ভুলিবো আমি` এই তিনটা গান শাহ আবদুল করিমের। গানগুলো শোনার পরে গানগুলো খুব ভালো লাগে আমার। তখন চিন্তা করলাম এই গানগুলো এতোদিন কোথায় ছিল? আমি যখন বাংলাদেশে ছিলাম তখন এই গানগুলো তেমন শুনিনি। নিজেকে প্রশ্ন করলাম, এই গানগুলো আমি শুনিনি কেন? তারপর এ গানগুলো নিয়ে কাজ শুরু করি।

‘এই গান গুলোর সুর আপনি কিভাবে নেন?’

‘আসলে অরিজিনাল সুরের গান আমি একটাও শুনিনি। শাহ আবদুল করিমের গলায় আমি গানগুলো কোনো ক্যাসেটে রেকর্ডেড আকারেও শুনিনি। আমি শুনেছি শুধু কায়ার গলায়। খালি গলায় শুনেই আমার কাছে গানগুলো ভালো লাগে এবং আমি কায়াকে বলি, তুমি একটা সিঙ্গেল বিট বা কর্ডের উপরে গানগুলো রেকর্ড কর। কায়া একটা বিটের উপরে গানগুলো গেয়ে গেলো। তারপর এটাকে আমি নিজের মতো করে নিজের চিন্তাধারা মতো একটা একটা করে মিউজিক এটার উপরে দিতে থাকলাম এবং একসময় একটা ট্র্যাক তৈরি হয়ে গেলো। এভাবেই আমি কাজগুলো শুরু করি।


‘বাউল ঘরানার গান আমাদের দেশে প্রচলিত আছে অনেকদিন ধরেই। আপনি এটার সাথে পশ্চিমা মিউজিক সংযোজন করেছেন। এটা কি উদ্দেশ্যে করেছেন?’

‘জিনিসটা আসলে খুব সিম্পল। ওখানে ওয়েস্টার্ন মিউজিক সম্পর্কে আমার একটা ভালো ধারণা জন্মে গিয়েছিল। অন্যদিকে আমার যে বন্ধুবান্ধব ছিল তারা পুরোদস্তুর বাউল গানের স্টাইলে ছিল। আমি দুইটার মাঝখানেই ছিলাম। একদিকে ইস্টার্ন ফ্লেভার অন্যদিকে ওয়েস্টার্ন ফ্লেভার। আমার মনে হলো আমি দুইটার একটা সংমিশ্রণ করি, দেখি কি হয়। দুইটারই মোটামুটি একটা ধারণা আমার হয়ে গিয়েছিল। আমি শুধু একটা এক্সপেরিমেন্ট চালাতে চেয়েছি আর কিছু না।’

‘আপনি কি সন্তুষ্ট আপনার প্রোডাকশনে?’

‘আমার সন্তুষ্টিটা অবশ্যই গুরুত্বপুর্ণ। আমি যতক্ষণ পর্যন্ত সন্তুষ্ট না হবো ততক্ষণ পর্যন্ত জিনিসটাকে বাজারজাত করব না। গুরুত্বপুর্ণ যেটা হচ্ছে শ্রোতাদের সন্তুষ্টি। দিনশেষে জিনিসটা তারাই শুনছে। তাদের যদি পছন্দ না হয় তাহলে মনে করব আমার পরিশ্রম বৃথা। কারণ আমি তো এটা শুধু নিজের শোনার জন্য করিনি।’

‘শাহ আবদুল করিমের গানে কি আপনি মৌলিক কিছু খুঁজে পেয়েছেন?’
sak
‘আমি মনে করি এটা ভেরি স্পেশাল। শাহ আবদুল করিমের লিরিক আমি ভুলবো না। এটা একেবারে আপনার অন্তরকে ছুঁয়ে যাবে। উনি যেভাবে কথা লেখেন বা কথার সাথে সুরটাও তিনি করেন। দুটো যেন একে অপরের সাথে বিনিসুতোয় গাঁথা।

তার কথা এবং সুর মিলে আমার মধ্যে বড় ধরনের একটা অনুভূতির জন্ম দেয়। তার কথা এবং সুরে যদি এই জিনিসটা না থাকতো তাহলে শুধু আমার মিউজিক দিয়ে ওই ফিলিংসটা পেতাম না।

তার কথায় আমি আমাদের মাটির গন্ধ পাই। বাংলাদেশে গ্রাম এবং গ্রামের মানুষ যে কত সহজ সরল সেটা এইসব গানে বোঝা যায়। সিম্পিলিসিটি ইজ দ্যা বেষ্ট। আমার মনে হয় অন্তরের ভিতর থেকে এই জিনিসগুলো বেরিয়ে এসেছে।’

আমার ডকুমেন্টারিতে দেড় দু’মিনিটের ক্লিপিং যাবে হাবিবের। সুতরাং আমি আর বেশি কথা বলিনা।

এর বেশ কিছুদিন পর পত্রিকার খবরে দেখি, হাবিব এবং তার বাবা ফেরদৌস ওয়াহিদ দিরাই উজানধল গ্রামে গিয়ে করিম সাহেবের সঙ্গে দেখা করেছেন এবং তাঁর অ্যালবামে শাহ করিমের যে গানগুলো ব্যবহার করেছিলেন, গীতিকার সন্মানীর টাকাটা তাঁর হাতেই পৌঁছে দিয়েছেন।

লেখক : নির্মাতা ও লেখক
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর