পদ্মা গিলে খাচ্ছে মাওয়া : আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছে লোকজন

Mawa-1-Munshiganj1বিধ্বস্ত জনপদ এখন মাওয়া। প্রমত্তা পদ্মা নদী ভাঙনের শিকার মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার মাওয়ায় পদ্মাতীরবর্তী বাসিন্দাদের মধ্যে এখন বিরাজ করছে শুধুই নদীভাঙন আতঙ্ক। এতে করে বুধবারও নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছে শত শত পরিবার। ভাঙন কবলিত ও ক্ষতিগ্রস্তরা যে যেভাবে পারছেন সড়কের পাশে আশ্রয় নিচ্ছেন। সোমবার বিকেল ও সকালে উপজেলার মেদিনীমন্ডল ইউনিয়নের পরিত্যক্ত মাওয়া পুরাতন ফেরিঘাট এলাকায় দু’দফা ভাঙন দেখা দেয়ায় নদীভাঙন আতঙ্কে এখনো নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন এখানকার অর্ধ সহস্রাধিক পরিবার। রাক্ষুসী পদ্মার তান্ডব শুরু হওয়ায় গ্রাসে গিলে খাচ্ছে একের পর এক বসত ভিটা, পুরাতন স্থাপনা আর শত বছরের পুরনো গাছপালা আর ফসলী জমি। মঙ্গলবার দুপুরে এখানে ক্ষণিকের প্রবল বর্ষণ ও ঝড়ো হাওয়া দেখা দেওয়ায় মাওয়া ফেরিঘাট এলাকায় নতুন করে আবারো ভাঙন আতঙ্ক দেখা দেয়। ফেরিঘাট এলাকার মূল সড়কে রয়েছে আরো একটি ফাটল। ফাটলটি ধসে পদ্মা গর্ভে চলে যাবার আশঙ্কা রয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে মঙ্গলবার সেখানে লাল নিশানা টাঙিয়ে দেয়া হয়েছে।

এদিকে, মঙ্গলবার বেলা ১১ টার দিকে মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল হাসান বাদল ভাঙন কবলিত ক্ষতিগ্রস্থ এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে-১৩৪ টি পরিবার। লৌহজং ইউএনও মো. মো. অহিদুল ইসলামের মাধ্যমে তাদেরকে নগদ ১০ হাজার করে টাকা, ২০ কেজি করে চাল দেয়া হচ্ছে। মঙ্গলবার মাওয়ার পরিত্যক্ত পুরাতন ফেরিঘাট এলাকায় দু’দফা ভাঙন দেখা দেওয়ায় পুরাতন ফেরিঘাটের ফাটল এলাকায় শতাধিক লোক নিয়ে ৩০ ফুট ফাটলটি পাকাসড়কসহ নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এ সময় অজ্ঞাতনামা ২শিশুসহ কয়েকজন আহত হয়। তবে এখন পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভাঙনরোধের কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এদিকে, স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ,দফায় দফায় এসব এলাকায় বেশী ভাঙন দেখা দিলেও সরকারি ভাবে নদীশাসনের কোন ব্যবস্থাই নেয়া হচ্ছে না। সেতু কর্তৃপক্ষের অর্থায়নে বিআইডবি¬উটিএ গত মার্চ মাসে প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে ভাঙন রোধ বাঁধ তৈরি করা হয়। কিন্তু মাওয়ায় ভাঙনরোধে যে পরিমাণ বালুর বস্তা ফালানো হয়েছে তাতে কোন কাজেই আসছে না ।

রাক্ষুসী পদ্মার ভাঙনে গত ৪৮ ঘন্টার ব্যবধানে অব্যাহত ১৫টি বসতবাড়ি ও ৭টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পদ্মা গর্ভে চলে গেছে । এ সময় একটি মসজিদের অবশিষ্ট অংশ ও একটি মাজারও পদ্মা গর্ভে চলে যায়। নদী পাড়ের আতঙ্কিত লোকজন এখন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বাড়িঘরসহ স্থাপনা সরিয়ে নিচ্ছেন। গত শনিবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে আকস্মিক ভূ-কম্পনের কারণে দক্ষিণবঙ্গের প্রবেশ দুয়ার মাওয়া-কাওড়াকান্দি নৌরুটে মাওয়ায় পরিত্যক্ত পুরাতন ফেরিঘাট এলাকার সড়কে অসংখ্য ফাঁটল দেখা দেয়। এতে মাওয়া পুরাতন ৩ নং রো-রো ফেরিঘাট ও ২নং ফেরিঘাট এলাকায় দ্রুত নদী ভাঙন দেখা দেয়। এ সময় ফেরিঘাটের একটি মসজিদের অর্ধাংশ, ৩টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ অন্তত ৩৫-৪০ ফুট এলাকা নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যায়।এছাড়াও এখনো তীব্র হুমকির মুখে রয়েছে মাওয়া ফেরিঘাট এলাকার ২৫-৩০টি বাড়িঘর ও অর্ধ শতাধিক দোকানপাটসহ, মাওয়া নৌ পুলিশ ফাঁড়ি, বিআইডবি¬উটিএর টার্মিনাল, প্রকৌশলী অফিসসহ নির্মাণের পর অব্যবহৃত মাওয়া বন্দর অবহাওয়া অফিসের তিন তলা ভবনসহ সরকারি-বেসরকারি বহু স্থাপনা, আরো ২-৩টি মসজিদ, মাওয়া ১নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ অর্ধ সহস্রাধিক পরিবারের বসতভিটা। এই অংশে আরো রয়েছে মাওয়া যশলদিয়া ভাগ্যকূল সড়ক। সড়কটির মূল রাস্তা ভেঙে গেলে মাওয়ার সাথে ভাগ্যকুলে-দোহারের সরাসরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। ভাঙনের কারণে এখন এই রাস্তা দিয়ে লোকজন চলাচল করছে ভীতির মধ্যে। এরই মধ্যে গত ২৪ ঘন্টার ব্যবধানে ৫০-৬০টি দোকানপাটসহ ৭০-৮০ টি বাড়িঘর অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছেন ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্থরা ।

সূত্র জানায়, পদ্মা নদীর কবুতরখোলা পয়েন্টে পলি জমে জমে ডুবোচর এ এলাকার দিকে প্রসারিত হওয়ায় প্রদ্মা নদীর মূল স্রোতটি মাওয়া ঘেঁষে ঘেঁষে আঘাত হানছে। যে কারণে স্রোতের আঘাতে এ এলাকা চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে সংশি¬ষ্ট মহলের ধারণা। সূত্রটি আরো জানিয়েছে, কয়েক মাস আগে পদ্মা নদীর মূল স্রোতটি মাওয়া থেকে ৫০০-৭০০ ফুট নদীর ভেতরে প্রবাহিত হয়েছে। কিন্তু কবুতরখোলা পয়েন্টে ভাটির দিকে চর প্রসারিত হওয়ায় এখন মাওয়া পুরাতন ঘাটের তীর থেকে ১০০-১৫০ ফুটের মধ্যেই মূল স্রোত আঘাত হানছে ।
এদিকে, ফাটল-ভাঙনে বিধ্বস্ত এখন মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার দক্ষিণ মেদেনীমন্ডলের মাওয়ার পরিত্যক্ত পুরাতন ফেরিঘাট এলাকা। এর আগে সম্প্রতি কয়েক দফায় পদ্মার আকষ্মিক ভূমিধ্বসে উপজেলার মাওয়া পুরনো ৩টি ঘাটসহ অর্ধশতাধিক দোকানপাট, ১০-১৫ টি বসতভিটা, ১টি পরিত্যক্ত জামে মসজিদ, সড়ক ও জনপদ বিভাগের প্রায় ২-৩শ ফুট পাকা সড়কসহ বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। মাওয়ার পুরনো ঘাটে খাবার হোটেল, মুদি দোকান, কনফেকশনারী, তেলের দোকান, ইলিশ পরিবহনের অফিস, বাসের ৪টি টিকিট কাউন্টার, সি-বোট কাউন্টার, মাওয়া ফেরিঘাটে জেলা পরিষদ ভবন পুরোটাইসহ ১৫টি প্রতিষ্ঠান পদ্মার ভাঙনে একরাতে বিলীন হয়ে যায়। এছাড়া সে সময় মেদিনীম-ল ইউনিয়নের কান্দিপাড়া গ্রামের ৫টি বসত বাড়ি ও মাওয়া ১নং নতুন ঘাট সংলগ্ন ৭টি বসত বাড়ি, ১টি মসজিদসহ যশলদিয়ায় মোট ১৩টি বসত বাড়ি এক সপ্তাহের ব্যবধানে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গিয়েছে। একপর্যায়ে অতিবর্ষণের কবলে মাওয়া-কাওড়াকান্দি নৌরুটে মাওয়াঘাটে পুরাতন ২ নম্বর ফেরিঘাটে ফাটল এলাকার বিশাল অংশ আকষ্মিকভাবে ধ্বসে যায়। এ সময় বিআইডবি¬উটিএ’র জেটি ও লোহার ইস্পাত তলিয়ে গিয়ে একটি প্রাচীন বটগাছ, ৩ টি দোকান ও ২০ ফুট পাকা সড়কসহ অন্তত দেড়’শ ফুট লম্বায় এলাকা জুড়ে প্রমত্তা পদ্মা তীরে ভূমি ধ্বস নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। আগের দফায় ভাঙনে ৪ নং ফেরিঘাটের ২৫-৩০ ফুট বিস্তৃত এলাকা নিয়ে সড়ক ও জনপদ বিভাগের ২০০ ফুট পাকা সড়ক সম্পূর্ণ ভেঙে যায়। দক্ষিণ মেদিনীম-ল এলাকার এ সড়কের প্রায় ৫-৬ হাজার বর্গফুট অংশ পদ্মায় বিলীন হয়ে যায় ।

এছাড়াও বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই সম্প্রতি প্রথম দফায় কয়েকদিনের প্রবল বর্ষণে প্রমত্তা পদ্মার ভাঙনে বিলীন হতে চলে উপজেলার মেদিনীম-ল ইউনিয়নের ৪টি গ্রাম। তীব্র ভাঙনের কবলে পড়ে উপজেলার কান্দিপাড়া, দক্ষিণ মেদিনীম-ল, উত্তর যশলদিয়া, যশলদিয়া, কুমারভোগ ইউনিয়নের শিমুলিয়া গ্রামসহ নদী তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা। নদীভাঙন আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটে এসব গ্রামের অর্ধ সহস্রাধিক পরিবার। প্রমত্তা পদ্মার দফায় দফায় রুদ্রগ্রাসে ইতোমধ্যে এসব এলাকার কয়েকশ’একর ফসলী জমি, বসতভিটা ও শত বছরের গাছপালা নদীগর্ভে বিলিন হয়ে যায়। সে সময় কয়েকদিনের ভাঙনে সর্বনাশা পদ্মার ভাঙনে বিলীণ হয়ে গেছে মাওয়া ১নং পুরাতন ফেরিঘাটের দক্ষিণ মেদিনীম-ল গ্রাম থেকে উত্তর যশলদিয়া গ্রাম পর্যন্ত বির্স্তীণ এলাকা। ভাঙনের কবলে পড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ঘড়বাড়ি ভেঙে অন্যত্র আশ্রয় নেয় প্রায় অর্ধশতাধিক পরিবার। পদ্মার ভাঙনে ইতিমধ্যে নদীগর্ভে আরো চলে যায় ৭০-৮০ বছরের পুরনো সাড়ে ৩ শতাধিক কড়ই, আম, সুপারী, নারকেল গাছসহ বিস্তীর্ণ ফসলী জমি । তীব্র হুমকির মুখে রয়েছে ৪টি গ্রামের ৫শতাধিক বাড়িঘরসহ বিস্তীর্ণ এলাকা ।

এদিকে স্থানীয় বাসিন্দা ও ক্ষতিগ্রস্তরা জানান, দফায় দফায় এসব এলাকায় বেশী ভাঙন দেখা দিলেও সরকারিভাবে নদী শাসনের কোন ব্যবস্থাই নেয়া হচ্ছে না। সেতু কর্তৃপক্ষের অর্থায়নে বিআইডবি¬উটিএ গত মার্চ মাসে প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে ভাঙন রোধ বাঁধ তৈরি করা হয়। কিন্তু মাওয়ায় ভাঙনরোধে যে পরিমাণ বালুর বস্তা ফালানো হয়েছে তাতে কোন কাজেই আসছে না। অথচ মাওয়ার আগেই কম ভাঙন কবলিত শরীয়তপুরের জাজিরা এলাকায় সরকার নদীশাসনের কাজ শুরু করেছেন।

ঢাকা নিউজ এজেন্সি