মাওয়ায় নদীর পাড় ধসে নিখোঁজ ৬

padma2মোজাম্মেল হোসেন সজল: ফাটল-ভাঙনে বিধ্বস্ত এখন মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার মাওয়ার পরিত্যক্ত পুরাতন ফেরিঘাট এলাকা। একদিন পর সোমবার বিকেল ও সকালে দু’দফা ভাঙনে শতাধিক লোক নিয়ে ৩০ ফুট ফাটল নদী গর্ভে বিলীন। এ ঘটনায় নিখোঁজ রয়েছেন ৬ জন।

জানা গেছে, বিকেল ৫টার দিকে পুরাতন ফেরিঘাটের ফাটল এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকা শতাধিক লোক নিয়ে ৩০ ফুট ফাটলটি (চোরনটি) নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এ সময় অজ্ঞাতনামা ২ শিশুসহ কয়েকজন আহত হয়। এ রিপোর্ট লেখার সময় অন্তত ৫-৬ ব্যক্তি নিখোঁজ রয়েছে। তাদের উদ্ধার তৎপরতা চলছে। তাৎক্ষনিক তাদের নাম-ঠিকানা জানাতে পারেনি পুলিশ। বাকিরা সাতরিয়ে পাড়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে। এদিকে সকাল ৭টার দিকে এক পলকেই পদ্মা গর্ভে চলে গেছে ১৫টি বসতবাড়ি ও ৭টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এ সময় একটি মসজিদের অবশিষ্ট অংশ ও একটি মাজারও পদ্মা গর্ভে চলে যায়।

নদী পাড়ের আতঙ্কিত লোকজন এখন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বাড়িঘরসহ স্থাপনা সরিয়ে নিচ্ছেন। গত বছরও ভাঙনে বিপন্ন হয়ে পড়ে মাওয়াঘাট এলাকা। এরপর মাওয়ার পুরাতন ৩ নং রো রো ফেরিঘাটটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। গত শনিবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে আকস্মিক ভূ-কম্পনের কারণে দক্ষিণবঙ্গের প্রবেশ দুয়ার মাওয়া-কাওড়াকান্দি নৌ-রুটে মাওয়ায় পরিত্যক্ত পুরাতন ফেরিঘাট এলাকার সড়কে অসংখ্য ফাঁটল দেখা দেয়। এতে মাওয়া পুরাতন ৩ নং রো রো ফেরিঘাট ও ২নং ফেরিঘাট এলাকায় দ্রুত নদী ভাঙন দেখা দেয়।


এ সময় একটি মসজিদের অর্ধাংশ, ৩টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ অন্তত ৩৫-৪০ ফুট এলাকা নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এখনো হুমকির মুখে রয়েছে বিআইডব্লিউটিসির ভাসমান ওয়ার্কশপ। কিন্ত সোমবার বিকেল পর্যন্ত সেখানে ভাঙনরোধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এ অবস্থায় মাওয়া ৩ নম্বর পুরাতন পরিত্যক্ত ফেরিঘাট এলাকার পদ্মার রুদ্রমূর্তির হাত থেকে ফের বাঁচতে বাপ-দাদার বসত-ভিটে ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয়ে ছুটছে শতাধিক পরিবার। সরিয়ে নেয়া হচ্ছে আরো অর্ধশত দোকানপাট-বাড়িঘর। ভাঙনের মুখে রয়েছে আরো শতাধিক বসত-ঘর। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভাঙনরোধের কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ক্ষতিগ্রস্থদেরও আর্থিক সহযোগিতা করা হয়নি।

এ ব্যাপারে মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল হাসান বাদল বলেন, ক্ষতিগ্রস্থদের কিভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করা যায় সে জন্য আমরা তাদের তালিকা তৈরি করছি। ভাঙনরোধে বিআইডব্লিউটিএসহ সংশ্লিষ্টদের অবহিত করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

এ ব্যাপারে মাওয়াস্থ বিআইডব্লিউটিসির সহকারী মহাব্যবস্থাপক এসএম আশিকুজ্জামান জানান, ভাঙন আতঙ্কে লোকজন অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভাঙনরোধের কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ক্ষতিগ্রস্থদেরও আর্থিক সহযোগিতা করা হয়নি।

padma2

ফিরে দেখা ২০১২
মাওয়ায় অব্যাহভাবে গত বছর পদ্মার তান্ডবে লন্ডভন্ড হয়ে যায় মাওয়া ফেরিঘাট ও আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা। ওই বছরের ১৫ অক্টোবর সকালে ১ নম্বর ফেরিঘাট এলাকার ৫০ ফুট জায়গা ও একটি মসজিদসহ ১০-১৫ দোকান নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেলে ফেরি পারাপারে ৩ টি ঘাটের মধ্যে একমাত্র ৩ নম্বর ফেরি ঘাটটি সচল থাকে। এ ঘাটটির সংযোগ সড়কের মাটি সরে বিপদজনক হয়ে পড়লে ১৬ অক্টোবর সকালে ফেরি পারাপার বন্ধ করে মেরামত কাজ করা হয়।

সাড়ে ৬ ঘন্টা ফেরি পারপার বন্ধ থাকার পর বিকেল সাড়ে ৩ টার দিকে ফের চালু করা হয় ঘাটটি। পদ্মায় স্রোতের তোড়ে ফাটল দেখা দেওয়ায় গত ১০ অক্টোবর ১ নম্বর ফেরিঘাট ৪ ঘন্টা বন্ধ থাকার পর মেরামত কাজ শেষে ওইদিন সন্ধ্যা ৬ টায় ফের চালু করা হয়। এর ২ দিন আগে রাত ৭ টার প্রায় ১শ’ ফুট এলাকা নিয়ে আকস্মিক নদীবক্ষে হারিয়ে যায় ১ নম্বর ফেরিঘাটটি। ৬-৭টি দোকানঘর নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এ সময় পল্টুনে থাকা বিআইডব্লিউটিএ’র সহকারী পরিচালক আলী আজগরসহ আহত হয়েছেন অন্তত৭ জন। নিখোঁজ হয়ে পড়ে ৫-৭ ব্যক্তি।

এ ঘটনার পর থেকে মাওয়া ১ নম্বর ফেরিঘাট সম্পুর্ণ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এর আগে গত ৯ অক্টোবর সকাল সাড়ে ১০ টার দিকে মাওয়া ২ নম্বর ফেরিঘাটসহ সড়ক ও জনপথের ৩০ ফুট পাকা রাস্তা ও বিআইডব্লিউটিএ’র ২০ ফুট সংযোগ সড়ক ও ৬ টি দোকানঘর সম্পূর্ণ পদ্মা বিলীন হয়ে যায়। এ সময় ১৫-২০ দোকানঘর অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়। এ থেকে বন্ধ রয়েছে ২ নম্বর ফেরি ঘাটটি। ৪ অক্টোবর সকাল সাড়ে ১০ টার দিকে চাখের পলকে বিলীন হয়ে যায় মাওয়া পার্কিং ইয়ার্ডের প্রায় ১শ’ ২০ ফুট এলাকাসহ ২ টি দোকানঘর। স্রোতের তোড়ে ভেসে যায় জেলা পরিষদের লঞ্চ ঘাটের পল্টুন ও মাটির নীচে চাঁপা পড়ে ২টি সিবোট। ভাঙনের কবলে সেখানকার অন্তত ২৩ টি দোকান ঘর অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়। এসব ঘটনায় ভাঙনের দাবিতে স্থানীয়রা মাওয়া চৌরাস্তায় ব্যারিকেড, মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালন করলে স্থানীয় প্রশাসন ভাঙনরোধের প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্ত ভাঙন আর রোধ হয় না। সরকারের তরফ থেকে বাস্তবমুখী কোন পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না।

জাস্ট নিউজ