সাসপেন্ড কর্মচারীতে চলছে সাব-রেজিস্টার অফিস!

rrমুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ির আলদী এলাকার প্রায় ৭০ বছর বয়স্ক এক বৃদ্ধাকে দেখা গেল টঙ্গীবাড়ি সাব-রেজিস্টার অফিসের বারান্দার সিঁড়িতে বসে ঝিমাচ্ছেন। কথায় কথায় জানা গেল তিনি তার মেয়েকে একটু জায়গা রেজিস্ট্রি করে দিবেন। সাব-রেজিস্টার আসমা আক্তারের জন্য অপেক্ষা করছেন সকাল থেকে। সকাল গড়িয়ে দুপুর ১টা বাজে। কিন্তু এখনো সাব-রেজিস্টার না আসায় আক্ষেপ প্রকাশ করলেন।

অফিস চত্বর ঘুরে দেখা গেল তার মত এমন ভুক্তভোগীর সংখ্যা প্রায় একশ’র বেশি। এর মধ্যে বয়োবৃদ্ধের সংখ্যাই বেশি। সবাই অপেক্ষা করছে সাব-রেজিস্টারের জন্য। কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা গেল, দলিল রেজিস্ট্রি করতে আসলে সারাদিন এখানে থাকার প্রস্তুতি নিয়ে আসতে হয়। কখন সাব-রেজিস্টার আসবেন তার কোন নির্দিষ্ট সময় নেই। অসুস্থ, বয়স্ক, নারী আর শিশুদের নিয়ে সমস্যা একটু বেশি। কোন অভ্যর্থনা কক্ষ নেই আর টয়লেটের অবস্থাও ভাল না। সোনারং এর একজন জানালেন, বাবারে নিয়া আসছি সকালে। অসুস্থ তাই মসজিদে শোয়াইয়া রাখছি। ওই সাব-রেজিস্টার অফিসের এ চিত্র এখন প্রতিদিনের।


মঙ্গলবার সাব-রেজিস্টার আসলেন দুপুর দেড়টার দিকে। এসে কয়েকটা দলিল রেজিস্ট্রি করে নিলেন খাবারের বিরতি। অফিসের দরজার সামনে মানুষের উপচে পড়া ভিড়। ভুক্তভোগীদের হই-হট্টগোলে তার এজলাসের দরজা খুললেন বিকেল সাড়ে তিনটায়। অফিসের কেরানি অনাথ বাবু (বর্তমানে সাসপেন্ড কিন্তু অফিস করছেন) ধৈর্যহারা দলিল রেজিস্ট্রি করা অপেক্ষমাণদের কটূক্তি করেন। এ সময় অফিসের কর্মচারীদের সাথে জনতার উচ্চবাচ্য বিনিময় হয়। সে সময় উপস্থিত স্থানীয় একজন আওয়ামীলীগ কর্মী উত্তেজিত কণ্ঠে জানালেন, ওনারা মানুষকে মানুষ মনে করেনা। অফিসে আসছে দেড়টা বাজে এখন প্রায় দুই ঘণ্টা হয়ে যায় সাব-রেজিস্টার এখন পর্যন্ত লাঞ্চে আছেন। এই কথা বলতে গেলে আমরা খারাপ।

দলিল লেখক ও অফিস সূত্রে জানা যায় সাব-রেজিস্টাররা ইচ্ছেমত অফিসে আসেন কাজকর্ম করেন আবার চলে যান। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন দলিল লেখক বলেন, অফিসারদের স্বেচ্ছাচারিতার প্রতিবাদ করলে ভোগ করতে হয় নানারকম হয়রানি। এজন্য আমরা কিছু বলি না। তাদের স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ করতে মাঝেমধ্যে আন্দোলনও করতে হয়। তিনি আরো জানালেন, এ জন্যই গত বছরের ডিসেম্বরে কয়েকদিন কর্মবিরতিসহ আমরা আন্দোলন করতে বাধ্য হয়েছিলাম।

অনিয়মই এখানে নিময় :

এখানে দুর্নীতি যেন অনেকটা প্রকাশ্য। সকলেই জানে নির্দিষ্টহারে অফিসে অতিরিক্ত টাকা দিতেই হয়। সরকারি বিধি অনুযায়ী এন ফিস ২৫০ টাকার বদলে নেয়া হয় ৩১০ টাকা, হেবা ঘোষণার পে-অর্ডার ৩৫০ টাকার স্থলে নেয়া হয় ৪১০ টাকা। কমিশন দলিলে নির্ধারিত ফি কয়েকশ টাকা হলেও সাব-রেজিস্টারকে দিতে হয় ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা। এছাড়াও দলিলের রকম অনুযায়ী নির্দিষ্ট হারে টাকা দিতে হয়।

এখানে কমিশন বা ভিজিটে (দাতার অসুস্থতা বা প্রয়োজনে অফিসের বাইরে দলিল রেজিস্ট্রি করা) দলিল হয়না। হলেও অনেক টালবাহানা আর দিতে হয় অনেক টাকা। মঙ্গলবার এক দলিল লিখক তার স্ট্রোক করে প্যারালাইজড মক্কেল এর বাড়িতে ভিজিট যোগে দলিলের দরখাস্ত জমা দেন। সাব-রেজিস্টার আসমা আক্তার জানালেন, তিনি যেতে পারবেন না। তাকে বলা হল দলিলটা রেজিস্ট্রি হলে দলিল দাতা টাকা পাবে এবং তার চিকিৎসা হবে, দাতার অবস্থা সিরিয়াস। অফিসের কেরানী (সাসপেন্ড) অনাথ বাবুকে দায়িত্ব দিলেন কাউকে কমিশনে পাঠানোর জন্য। এরপর শুরু হয় অনাথ বাবুর টালবাহানা। সারাদিন গড়িমসি করে বিকেল ৫ টায় জানানো হল এই কমিশন হবেনা। নিয়ম মতো আছে কেন হবেনা সাব-রেজিস্টারের কাছে জানতে চাইলে রাগান্বিত স্বরে তিনি বলেন, “এটা আমার ইচ্ছা। যার কাছে খুশি রিপোর্ট করতে পারেন। এমনিতেও আপনাদের এখানে কাজ করার ইচ্ছা আমার নেই। বেশি কথা বললে আপনার এই দলিল রেজিস্ট্রি করবোনা।” এই বলে তিনি চলে যান। বাধ্য হয়ে পরদিন বুধবার দলিল প্যারালাইজড দাতাকে অফিসে নিয়ে আসা হয়। বুধবার সাব-রেজিস্টার আসলেন বিকেল ৩ টায়।

এদিকে, গত ১লা জুলাই থেকে ১৭ই জুলাই পর্যন্ত আগে গেজেট বহির্ভূতভাবে মুন্সীগঞ্জের অন্যান্য সাব-রেজিস্টার অফিসের মত এখানেও নেয়া হয়েছিল অতিরিক্ত ১%। পরবর্তীতে দৈনিক মানবজমিনে রিপোর্ট প্রকাশের পর সারা মুন্সীগঞ্জে আদায়কৃত অবৈধ অর্থ ফেরত দেয়া হয়। আইজিআর অফিস থেকে এর কারণ দর্শানোর জন্য বলা হয়। অফিস রিপোর্টে গেজেটের বাইরে টাকা নেয়া হয়নি বলে রিপোর্ট দিলেও কবে থেকে নেয়া হয়েছে এমন কিছু উল্লেখ করা হয়নি।

১৭ই জুলাই থেকে অতিরিক্ত ১% নেয়ার ঘোষণা হলেও এ বিষয়ে এখনও দলিল লেখদের কোন গেজেটের কপি দেখাতে পারেনি। আর টাকা উত্তোলনেও পাওয়া গেল অসঙ্গতি। মুন্সীগঞ্জ সাব-রেজিস্টার অফিসে এসআরও খাতে ৩% একটি পে-অর্ডারের মাধ্যমে নেয়া হয় আর টঙ্গীবাড়ি সাব-রেজিস্টার অফিসে নেয়া হচ্ছে ২% ও ১ % দুটি আলাদা পে-অর্ডারের মাধ্যমে। একই খাতে আলাদা পে-অর্ডার তার উপর একেক অফিসে একেক রকম উত্তোলনের কারণ জানেননা কেউ।

সাসপেন্ড কর্মচারী দিয়ে চলছে অফিস:

সরকারী সম্পত্তি রেজিস্ট্রি করার অপরাধে সাব-রেজিস্টারসহ এই অফিসের ৬ জন সাময়িক বরখাস্ত হয়ে আছে গত ৬ মাস ধরে। তবে বরখাস্তকৃত সাব-রেজিস্টার রফিকুল ইসলাম, সহকারী (কেরানী), মোহরার ও ৩ জন দলিল লেখক কাগজে কলমে বরখাস্ত থাকলেও অফিস করছেন নিয়মিত। বরখাস্ত থাকলেও বেতন বা উপরি সব ধরনের সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে ঠিকমতই।

সাব-রেজিস্টার অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ম লঙ্ঘনের কোন কার্যকরী শাস্তি হয়না। হলেও সেটা থাকে কাগজে কলমে। কোন অভিযোগ উঠলে একজন সাব-রেজিস্টার অনিয়ম-অভিযোগের তদন্ত করেন আরেকজন সাব-রেজিস্টার । মাঝে মাঝে আইজিআর অফিস থেকে তদন্ত হয়। সেক্ষেত্রে দোষ খুঁজে পাওয়া গেলে সাময়িক বরখাস্ত বা স্থান বদলে দেয়া হয়। তদন্তে অফিসের রিপোর্টকেই প্রাধান্য দেয়া হয় এবং বিষয়টি হয় লোকচক্ষুর আড়ালে তাই তদন্ত ও ফলাফল অফিসের মধ্যেই চাপা থাকে। কার্যকরী তেমন কোন শাস্তি না হওয়ায় সাব-রেজিস্টার অফিসের দুর্নীতি থামছে না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

তথ্য সংগ্রহের সময় বয়োজ্যেষ্ঠ একজন দলিল লেখক বললেন, এত লেখালেখি করে আর কি হইব? এই সেক্টরে প্রত্যেক টেবিলে টাকার ভাগ পায়। কে কার বিচার করব? কয়েকদিন আগেও পত্রিকায় লেখালেখি হইল, শুনছেন কারও চাকরি গেছে? আজ লেখবেন কয়েকদিন তোলপাড় এরপর সব আগের মত হয়ে যাবে।


জেলা রেজিস্টারের বক্তব্য:

এ ব্যাপারে মুন্সীগঞ্জ জেলা রেজিস্টার ভবতোষ ভৌমিক বলেন, সাব-রেজিস্টার রফিকুল ইসলাম,সহকারী (কেরানী), মোহরার ও ৩ জন দলিল লেখককে গত ৬মাস আগে দলিল নিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে বরখাস্ত করা হয়েছে। এ বিষয়ে গত ২৭ শে আগস্ট আইজিআর অফিস থেকে তাদের বিষয়ে তদন্ত হয়ে গেছে। বরখাস্তকৃত সাব-রেজিস্টার পুরনো কাগজ পত্রে হয়তো সই করছেন। কিন্তু উনার কাজ করার কোন এখতিয়ার নেই। যদি করে থাকেন-তা হবে অবৈধ। বর্তমান সাব-রেজিস্টার আসমা আক্তার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তিনি এক মাস হয়েছে এখানে যোগদান করেছেন। কর্মস্থলে তিনি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন না করে থাকলে তিনি বিষয়টি দেখছেন বলে জানান।

ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর