মাদক মুক্ত বাংলাদেশ চাই একজন প্রবাসীর আকুতি

রাহমান মানি
সম্প্রতি বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া সন্তান কর্তৃক পিতা-মাতা হত্যা (বিচারাধীন) মামলার ঘটনায় পুরো সমাজকে নাড়া দিয়েছে। যার ধাক্কা এসে পড়েছে সুদূর প্রবাসে। পারিবারিক বন্ধনে থাকা একটি কিশোরী মাদক গ্রহনে বাধা মনে করে জন্মদাতা এবং গর্ভধারিনীকে হত্যা (?)ঘটনায় মাদক নিয়ে টেলিভিশনের টক-শো, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আলোচনা হচ্ছে, পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুক টুইটারে মত প্রকাশের ঝড় বইছে। সমাজ বিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানী, প্রগতিশীল, বুদ্ধিজীবী সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ থেকে শুরু করে চায়ের দোকানের কর্মচারীরা এই আলোচনায় অংশ নিচ্ছে। অনেকটা বিপ্লবই বলা যায় মাদক সমালোচনার। সবার আলোচনায় একটি বিষয় স্পষ্ট আর তা হল মাদক দ্রব্য। মাদকের ভয়াল থাবা থেকে দেশকে রক্ষ করতে হবে।

মাদকের ছোবল নিয়ে সবাই দুশ্চিন্তা গ্রস্থ। দেশজ সাংস্কৃতি ধর্মীয় অনুশাসনে পারিবারিক নৈতিক শিক্ষা গ্রহণকারীদের তুলনায় আকাশ সাংস্কৃতিক নামে পাশ্চাত্য সংস্কৃতি চর্চায় উচ্ছৃঙ্খল অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনে অভ্যস্ত পরিবারগুলো থেকে আসা শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাদক গ্রহণ প্রবণতা বেশি। মাদক গ্রহনের বিভিন্ন কারণগুলোর মধ্যে বন্ধুদের প্ররোচনা, কৌতুহল বশত, বিভিন্ন হতাশা থেকে, বাবা-মায়ের ঝগড়ার কারণে পারিবারিক অশান্তি, প্রেমে ব্যর্থতা, অসৎ সঙ্গ, বেকারত্ব প্রভূতি কারণে স্কুলের গণ্ডি পার হওয়ার আগেই কিশোর-কিশোরীরা সর্বনাশা কাণ্ডে জড়িয়ে পরে। তার সাথে রয়েছে প্রগতির নামে পশ্চিমা ঢংয়ের জীবনযাপনের চেষ্টায় ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি অনিহা।

ঐশীর ঘটনায় আরো একটি বিষয় সকলের চোখ খুলে দিয়েছে সর্বসাধারণের জান-মালের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মীরা যদি অবৈধভাবে উপার্জনে মনোনিবেশ করে তা হলে তাদের দ্বারা দেশ তো দূরের কথা নিজ জীবনও নিরাপদ নয়। একজন সরকারী কর্মকর্তা যদি আয়ের চেয়ে ব্যয়ের পরিমাণ অধিক-এ অভ্যস্ত হয়ে পড়েন তাহলে সহজ উপায়ে বাঁকা পথে অর্থ উপার্জনে নিজস্ব মোরালিটি হারিয়ে ফেলে। অর্থ উপার্জনই হয় তার একমাত্র নেশা। এ নেশাও মাদক আসক্তের মতো এক ধরনের আসক্তি। এই আসক্তি যদি দূর করা যায় তাহলে সমাজ থেকে কিশোর-কিশোরীদের মাদকাসত্ব এমনিতেই কমে যায়। অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনকারীদের সন্তানরা তুলনামূলকভাবে বৈধভাবে উপার্জনকারীদের সন্তানদের চেয়ে বেশি বিপথে পা বাড়ায়। এমনকি এসব সন্তানরা নিজে উদার হাতে খরচ করে বন্ধুদের উৎসাহিত করে বিপথে পা বাড়ানোর। তাদের পাল্লায় পড়ে প্রথমে শখের বশত এবং পরবর্তীতে সত্যি সত্যিই একদিন আসক্ত হয়ে যায়। এই জন্যই বলে সঙ্গ দোষে সর্বনাশ।

প্রবাসে আমরা যারা বসবাস করি তাদের মনটা সবসময় দেশের খবরাখবর জানার জন্য উদগ্রীব থাকে। দেশের ভালো খবরকে আমাদের যেমন আনন্দে উচ্ছৃসিত করে তেমনি খারাপ সংবাদে বুক ভেঙ্গে যায়। আমরা যারা নিজ সন্তানদের বাংলাদেশী সংস্কৃতি শিখাতে চাই, শেকড়ে সন্ধান করে বেড়াই, আমাদের সন্তানদের বাংলাদেশে নিতে চাই তারা আরো বেশি ব্যথিত হই। যখন দেখি আমাদের সন্তান তুল্য কিশোর-কিশোরীরা মাদকাসত্ব হয়ে জীবন ধ্বংস করে দিচ্ছে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে খুন-খারাপীর সাথে জড়িত হয়ে যাচ্ছে তখন সত্যিকার অর্থেই আমরা ভীত সন্তন্ত্র হয়ে নিরুৎসাহিত হই। সন্তানদের দেশে নেওয়ার উৎসাহ হারিয়ে ফেলি। একটি শিশুকে সঠিক বা ভুল পথে পরিচালিত করতে আরেকটি শিশু যতো সহজেই পারে বড়রা ততো সহজে পারে না। কাজেই বাংলাদেশে প্রবাসীদের সন্তানরা যখন যায় তখন তাদের সমবয়সীদের সাথে সহজেই মিশে যায়। সমবয়সি শিশুটি যদি কুপথে পরিচালিত হয় তা হলে বেড়াতে যাওয়া শিশুটির মধ্যেও তার প্রভাব পড়ে। তাই প্রবাসীরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন, সন্তান নিয়ে দেশে যাওয়ার। এতে করে যে কেবল প্রবাসী পরিবারগুলোই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তা কিন্তু নয়, ক্ষতি হচ্ছে দেশের।


কোন নেতা-নেত্রীর আদর্শ বাস্তবায়নের স্বপ্নের বাংলাদেশ হয়, সত্যিকার অর্থের সুজলা-সুফলা-শস্য-শ্যামলা বাংলাদেশ চাই যেখানে সন্ত্রাস থাকবে না, থাকবে না মাদকের ভয়াল ছোবল। সমাজ থেকে সন্ত্রাস এবং মাদকমুক্ত করতে পারলেই কবির ভাষায় বর্ণনা অনুযায়ী সোনার বাংলা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

rahmanmoni@gmail.com
টোকিও, জাপান