বনভোজন, অপ্রীতিকর ঘটনা, অপপ্রচার এবং কিছু কথা

রাহমান মনি
১১ আগস্ট ২০১৩ ছিল চতুর্দশ টোকিও বৈশাখী মেলা পরবর্তী পিকনিক আয়োজন। এই পিকনিক আয়োজনে জাপান প্রবাসীরা অংশ নেয়। অংশ নেন টোকিওস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন। এক পর্যায়ে উপস্থিত ছিলেন সর্ব ইউরোপীয় বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক কাজী এনায়েত উল্লাহ। তিনি বর্তমানে জাপান সফররত।

গত ১১ আগস্ট রোববার টোকিওর অদূরে সাহতামা প্রিফেকচারের মিসাতো পার্কে গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহ উপেক্ষা করে প্রাকৃতিক ও নৈসর্গিক মনোরমা পরিবেশে আয়োজিত বনভোজন আয়োজনে সকাল থেকেই বিভিন্ন স্থান থেকে প্রবাসীরা জড়ো হতে থাকে।

রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন দুপুরে উপস্থিত হলে শুরু হয় ফুটবল খেলা। লাল ও সবুজ দল -এ বিভক্ত হয়ে প্রীতি ম্যাচে রাষ্ট্রদূত প্রবাসে সবুজ জার্সি গায়ে জড়িয়ে মাঠে নামেন। দ্বিতীয়ার্ধে লাল জার্সি গায়ে লাল দলে অংশ নেন। খেলায় লাল দল ২/১ গোলে জয়ী হন। প্রথমার্ধে লাল দলের ডিউক প্রথম গোলটি করেন। দ্বিতীয়ার্ধে সবুজ দলের সালেহ্ মো: আরিফ একটি গোল করে সমতা ফিরিয়ে আনেন। খেলা শেষ হবার কিছুক্ষণ আগে লাল দলের সৌম একটি গোল করলে লাল দল আবারও এগিয়ে যায় এবং জয়লাভ করে। খেলায় শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে লাল দলের ডিউক, মোন্না রেন এবং সৌম পুরস্কার পান। প্রবাসীদের সঙ্গে রাষ্ট্রদূত খালি পায়ে জার্সি পরে অংশ নিলে প্রবাসীদের আনন্দ শত গুণ বেড়ে যায় যা খেলোয়াড়দের স্মৃতিতে অম্লান হয়ে থাকবে।

দুপুরের মধ্যাহ্নভোজে রাষ্ট্রদূত অংশ নেন। খাবারের মেন্যু ছিল ভাতের সঙ্গে সবজি, মাংসের রেজালা, সালাদ এবং ঈদের ঐতিহ্যে সেমাই। সুস্বাদু এই খাবার পরিবেশন এবং রন্ধনের দায়িত্বে ছিলেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী বাদল চাকলাদারের নেতৃত্বে মুন্সীগঞ্জ-বিক্রমপুর সোসাইটির এক ঝাঁককর্মী। বাদল চাকলাদার মুন্সীগঞ্জ-বিক্রমপুর সোসাইটির সম্মানিত সভাপতি।

দুপুরের খাবারের পরে শুরু হয় বিভিন্ন বিনোদনমূলক আয়োজন। যার মধ্যে ছিল শিশু-কিশোরদের বিস্কুট দৌড়, রশি টানাটানি, মহিলাদের চোখ বেঁধে তরমুজ ভাঙা এবং সকলের জন্য উন্মুক্ত বিঙ্গোখেলা, আরও কিছু আয়োজন লিস্টে থাকলেও হঠাৎ করে বৃষ্টির আক্রমণে বাদ দেয়া হয়।
বনভোজনে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন বৈশাখী মেলা কমিটির প্রধান সমন্বয়ক ড. শেখ আলীমুজ্জামান এবং রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন। এক পর্যায়ে আয়োজন প্রাঙ্গণে কাজী এনায়েত উল্লাহ উপস্থিত হলে তাকে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখার অনুরোধ জানালে তিনি শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন। এটা জাপান প্রবাসীদের ঐতিহ্য।

বিকেল চারটার পর থেকে হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলেও প্রবাসীদের আনন্দের কমতি ছিল না। এ যেন বৃষ্টিভেজাও আনন্দের একটি অংশ। তবে বৃষ্টি বনভোজনে বিঘœ না ঘটাতে পারলেও বিঘœ ঘটে বিঙ্গো খেলার কমিটি থেকে একজনের নাম বাদ পড়াতে। নাম বাদ পড়া থেকে সামান্য ভুল বোঝাবুঝি থেকে সাময়িক উত্তেজনা, পরক্ষণেই আবার ঠিক হয়ে যায়।

কিন্তু আয়োজন প্রাঙ্গণ স্বাভাবিক হলেও প্রশমিত হয়নি কারও মনের ক্ষোভ। যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে। ১৩ আগস্ট ফেসবুকে মেলা কমিটির প্রধান সমন্বয়ক ড. শেখ আলীমুজ্জামান তার ক্ষোভ জানিয়ে একটি স্ট্যাটাস দিলে বিতর্কের শুরু হয়। দেশ বিদেশ থেকে বিভিন্ন মন্তব্য আসতে থাকে যা লুফে নেয় ইউরোপ থেকে প্রচারিত অনলাইন পত্রিকা প্রবাসীপত্র ডট কম। উক্ত পত্রিকায় মাঈনুল ইসলাম নাসিম (স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট) ১৩ আগস্ট ‘সুনামির পরও বেঁচে আছে জাপানের বোতল বাহাদুরেরা’ শিরোনামে খুবই আপত্তিকর একটি লেখা প্রকাশ করলে জাপান প্রবাসীরা ক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং তীব্র নিন্দা জানায়। উক্ত লিখায় তিনি এককভাবে শেখ আলীমুজ্জামানকে অপ্রাসঙ্গিক বিশেষণে বিশেষিত করলেও সার্বিকভাবে জাপান প্রবাসীদের হেয় করেছেন। লেখার সঙ্গে খুবই আপত্তিকর একটি ক্যাপশনও জুড়ে দিয়েছেন যা রুচিহীনতার বহিঃপ্রকাশ।

সেই দিনের প্রকৃত ঘটনা কি ছিল? ১১ আগস্ট পিকনিক আয়োজনের প্রাক প্রস্তুতি সভা হয় ৪ আগস্ট হিগাশি তাবাতে। সেখানকার সিদ্ধান্ত মোতাবেক কুপনধারীদের খাবার পরিবেশনার কথা এবং ১ হাজার ইয়েন এর মাধ্যমে কুপন সংগ্রহের প্রস্তাব গৃহীত হয়। খাবার দুপুরের লাঞ্চ হিসেবে নির্ধারিত হয়।

জাপানে সাধারণত লাঞ্চটাইম দুপুর ১২টা থেকে বেলা দেড়টা। কিন্তু এসব আয়োজনে সময়মতো খাবার সরবরাহ সম্ভব নয়। এটাই বাস্তবতা। তারপরও যেহেতু অর্থের বিনিময়ে খাবার নিতে হবে তাই সময়মতো খাবার পাবেন এমন আবদার থেকে কয়েকজন বারবার তাগাদা দিতে থাকেন। এক পর্যায়ে আজম খান সবাইকে শান্ত হতে বলে অপেক্ষার অনুরোধ জানান।


বেলা ২টার সময় খাবার এসে পৌঁছলেও সরবরাহে ঝামেলা দেখা দেয় কুপন সংগ্রহ না করার কারণে। কারণ খাবার এবং কুপন সংগ্রহে সমন্বয়হীনতা ছিল। আজম খান আপাতত কুপন ছাড়াই খাবার সরবরাহের অনুরোধ জানালে শেখ আলীমুজ্জামানের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়লে কাজী মাহফুজ লাল এসে আজম খানের সঙ্গে অশোভন আচরণ করেন এবং মাঠ থেকে বেরিয়ে যেতে বলেন। বিষয়টি আজম খানের ব্যক্তিত্বে আঘাত করলে শুরু হয় বিতর্ক। পরে কুপন এসে পৌঁছলে ঝামেলা মিটে যায়। কিন্তু আজম খান জাপান আওয়ামী লীগ সভাপতি সালেহ মো. আরিফের কাছে বিচার প্রার্থনা করলে আরিফ তাকে শান্ত হতে বলেন এবং বিষয়টি পরে দেখায় প্রতিশ্রুতি দেন।

এরপর বিঙ্গো খেলার কমিটি থেকে মোল্লা অহিদুল ইসলামের নাম বাদ পড়লে মোল্লা অহিদ উষ্মা প্রকাশ করে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এক পর্যায়ে শেখ আলীমুজ্জামান ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চান এবং বিঙ্গো খেলা শুরুর আগে মাইকে ঘোষণা দিয়ে ভুল সংশোধনের প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু কোনো রূপ ঘোষণা ছাড়াই বিঙ্গো খেলা শুরু হলে মোল্লা অহিদুল রাগান্বিত হয়ে গালিগালাজ করতে থাকেন। এ সময় বেশ কয়েকজন তার সমর্থনে পাশে এসে দাঁড়ায় যাদের অনেকেই বিয়ার পানরত ছিলেন। বিয়ার পানরত অবস্থায় এক পর্যায়ে কয়েকজন বিঙ্গো খেলা বন্ধের জন্য হুমকি দিতে থাকেন এবং পরিচালনাস্থলে এসে বন্ধ করতে বলেন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সালেহ মো: আরিফ, খন্দকার আসলাম হিরা এবং আরও কয়েকজনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হলে খেলা আবার শুরু হয়। পরে উভয় পক্ষ আরও কয়েক জনের মধ্যস্থতায় তাদের ভুল শুধরে ক্ষমা চেয়ে নেন এবং সুন্দরভাবে অনুষ্ঠান শেষ করার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা দেন শেখ আলীমুজ্জামান। বিষয়টি শেষ হওয়ার কথা এবং শেষ হতে পারত যদি না আলীমুজ্জামান ফেইস বুকে স্ট্যাটাস না দিতেন।

ঘোষণা দিয়ে যেমন আত্মহত্যা করা যায় না তেমনি ঘোষণা দিয়ে পদত্যাগ নাটকও সফল হয় না। প্রতি বছর বৈশাখী মেলা কমিটির বেশ কয়েকজন (প্রধানসহ) সদস্যপদ ত্যাগ করার ঘোষণা দেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন আবার প্রধান সমন্বয়কের সমালোচনায় মুখরিত থাকেন। জাপান প্রবাসীরা এতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। জাপান প্রবাসী মাত্রই জানেন শেখ আলীমুজ্জামান জীবিতাবস্থায় কোনোদিনই মেলা কমিটির প্রধান থেকে পদত্যাগ করবেন না। এ নাটক সবসময় তিনি মঞ্চস্থ করেন তার কয়েকজন অধীনস্তদের দিয়ে।

প্রবাসীপত্র পোর্টালে মাঈনুল ইসলাম নাসিম পুরো ঘটনা না জেনেই কেবল বিতর্কিত দুই জনের মুখে শুনেই রিপোর্ট করেছেন। আমার কাছে অবাক লাগে ইউরোপে থেকে তিনি মদ পানের সমালোচনা করে তাদের হাতে লালসবুজের পতাকা নিরাপদ নয় দাবি করেছেন। কোনো পক্ষের পক্ষ না নিয়ে আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে চাই ওই দিন যারা বিয়ার (মদ নয়) পান করছিলেন সেই বিয়ার জাপানে প্রকাশ্যে পান করা নিষেধ নয়। যেখানে সেখানে পাওয়াও যায় এমন কি আনাচে-কানাচে ভেন্ডিং মেশিনেও। দামও বেশি নয়। অনেকটা পানির দরে এবং পানির মতোই পান করা হয় এখানে। তাই বলে সবাই যে পান করে তা কিন্তু নয়।

মিসাতো পার্কে যে ঘটনা এবং যাকে নিয়ে ঘটনা তিনি কিন্তু অ্যালকোহল পান করেন না। পাঁচওয়াক্ত নামাজ পড়েন এবং ৩০টি রোজা পালনও করেন এ প্রবাসে। মোল্লা অহিদ পিকনিকের পূর্ব রাত থেকে পরিশ্রম করেছেন পিকনিক আয়োজনে। কিন্তু পরে দেখেন যারা কাজ করেননি তারাই সবকিছু তখনই তিনি ক্ষোভে ফেটে পড়েন এবং মাথা গরম করেন। তিনি তো বিয়ার পান করেননি। তাহলে মদের কথাটি আসলো কোথা থেকে। আর মদ যদি এত খারাপ হয়ে থাকে তা হলে শেখ আলীমুজ্জামান মদ পান করেন কেন?

আর সুনামির পর বেঁচে থাকা যাদের নিয়ে সমালোচনা করছেন মাঈনুল ইসলাম এবং শেখ আলীমুজ্জামানকে প্রফেসর রূপকার মুকুটহীন সম্রাট অভিহিত করেছেন তা কতটা যুক্তিযুক্ত? প্রফেসর কাকে বলে? টোকিও শহীদ মিনারের রূপকার বলতে কি বুঝাচ্ছেন? আর মুকুটহীন সম্রাট হলে প্রতিবার আয়োজন থেকে গণধোলাইয়ের ভয় থাকবে কেন? যেটি শেখ আলীমুজ্জামান নিজেই স্বীকার করেছেন তা স্ট্যাটাসে। একবার বিপদগ্রস্ত হয়েছিলেনও। তখন কিন্তু এইসব লোকই তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, সমবেদনা, সহানুভূতি জানিয়েছিল।

টোকিও শহীদ মিনারের রূপকার এককভাবে কেউ নন। যেমনটি নন বৈশাখী মেলার বা অন্য কোনো আয়োজনের। জাপানের প্রতিটি আয়োজনের পেছনে সকলেই অংশ নিয়ে থাকে। প্রতিটি আয়োজনেই ওইদিন যারা বিয়ার পান করছিলেন তাদের সকলেরই সক্রিয় অংশগ্রহণ আছে। শহীদ মিনার, বৈশাখী মেলা এবং পিকনিক আয়োজনে তাদের অবদান অনস্বীকার্য। এমন কি সুনামি পরবর্তী জাপান পুনর্গঠনেও। মেলা কমিটি থেকে ১০ লাখ ইয়েন এবং চ্যারিটি কনসার্ট থেকে ১২ লাখ ইয়েন সংগ্রহ করে জাপান রেডক্রসকে প্রদানসহ বিভিন্ন ভলান্টিয়ার কাজে অংশ নিয়ে জাপান পুনর্গঠনের কাজ করে যাচ্ছে এরাই।

লেখক একজনকে পচা শামুক আর অন্যজনকে বীর বাঙালি সম্বোধন করে জাপান প্রবাসীদের হেয় করেছেন। কারণ টোকিও শহীদ মিনারের প্রথম প্রস্তাবক ছিলেন মাছুম ইকবাল। তিনি একজন স্থপতি এবং বর্তমানে শিক্ষকতা করছেন। আর এই পচা শামুকেরা এবং বীর (?) বাঙালির সমন্বয়ে টোকিওতে শহীদ মিনার প্রতিষ্ঠা পায়। কাজেই শেখ আলীমুজ্জামান টোকিও শহীদ মিনারের রূপকার সর্বৈব মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছুই নয়।

জাপান প্রবাসীদের সুনাম সর্বজনবিদিত। এখানে রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও সহিংসতা নেই। এক টেবিলেই তারা বসেন দেশের স্বার্থে। টোকিও শহীদ মিনার, বৈশাখী মেলা, প্রবাস প্রজন্ম আয়োজন, প্রভাতফেরির মতো আয়োজনগুলো দল-মত নির্বিশেষে সকলের সহযোগিতা হয়ে থাকে। ওইদিন যে ঘটনা হয়েছিল যার শিরোনাম বোতল বাহাদুর দিয়েছেন লেখক সেখানেও কিন্তু আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি ও অন্যান্য সংগঠনের লোকও ছিল। এমন সমঝোতা এবং সহাবস্থান আর কোনো দেশে নেই। ইউরোপে তো নয়ই।

লেখক যাদের কুলাঙ্গার বলছেন, তারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। বিয়ার পান করলেই যদি কুলাঙ্গার হয়ে যায় তাহলে আমেরিকা, ইউরোপের সকলেই কুলাঙ্গার। যতটুকু জানি জার্মানরা বিশ্বে সবচেয়ে বেশি বিয়ার পান করে থাকে। তা হলে কি জার্মানরা সবচেয়ে বেশি কুলাঙ্গার।

অন্যের গীবত গাওয়া, মিথ্যা বলা কি পাপ না? তাহলে মাইনুল ইসলাম নাসিম না জেনে কাউকে উপরে ওঠাতে গিয়ে কাউকে নিচে নামালেন, কলঙ্ক লেপে দিলেন এটা কি পাপ নয়?

আওয়ামী লীগ জাপান শাখার অনন্য আয়োজন
রমজান মাসের পবিত্রতায় ইফতার মাহফিল বাঙালি সংস্কৃতির একটি অংশ হলেও এর ব্যাপকতা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় খুব সম্ভবত পতিত রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসন আমল থেকে। বলা যেতে পারে ’৮০ দশক থেকে বাংলাদেশে ইফতার মাহফিল এখন রীতিমতো প্রতিযোগিতার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। রাজনৈতিক দলগুলো তো বটেই বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোও এই প্রতিযোগিতায় শরিক হয়। কে কত বড় আয়োজন করতে পারে বা কার আয়োজনে কত বেশিসংখ্যক উচ্চ পদস্থদের অংশগ্রহণ করাতে পারে সেই প্রতিযোগিতা। সবই ছিল এরশাদের দৃষ্টি আকর্ষণে।

বাংলাদেশের বৃহৎ ২টি রাজনৈতিক দলও পৃথক পৃথকভাবে বিভিন্ন জনদের সম্মানার্থে ইফতার মাহফিলের আয়োজন করে থাকে। এতে আবার উভয়কে আমন্ত্রণও জানিয়ে থাকে। যদিও অংশ নেয়ার রেকর্ড নেই। প্রবাসেও প্রায় একই ধারা প্রচলিত। প্রবাসে দলাদলিটা একটু বেশিই হয়ে থাকে বলা যায়। কারণ এখানে সবাই নেতা। ঘোষণা দিলেই হয়। নিজ ঘরানার কয়েকজন নিয়েও ফলাও করে প্রচার করে ইফতার মাহফিলের আয়োজন করা যায়।

কিন্তু জাপান প্রবাসীদের ব্যাপারটা আলাদা। জাপান প্রবাসীদের যে কোনো আয়োজনেই সকলের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ থাকে। দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হয়ে যায় সকলের আয়োজন।

তেমনি একটি ইফতার মাহফিলের আয়োজন করেছিল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জাপান শাখা। উক্ত ইফতার মাহফিলে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়, আঞ্চলিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ সর্বস্তরের প্রবাসী, প্রবাসী মিডিয়া কর্মীবৃন্দ এবং জাপানিজ অতিথিবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন।

গত ২৮ জুলাই রোববার টোকিওর কিতা-সিটি হিগাশি তাবাতা চিইকি শিনকোউশিৎসুতে আয়োজিত জাপান শাখা আওয়ামী লীগের ইফতার মাহফিলে অংশ নিয়েছিলেন বর্তমানে জাপান সফররত বাংলাদেশের স্বনামধন্য একঝাঁক দেশবরেণ্য চিত্রশিল্পী। এর মধ্যে অংশ নিয়েছিলেন জনাব কাইয়ুম চৌধুরী, মুস্তফা মনোয়ার, হাশেম খান, রফিকুন নবী (রনবী), মাহমুদুল হক, আবুল মনসুর, নাজলী লায়লা মানসুর, ফরিদা জামান, মোহাম্মদ ইউনুস, খালিদ মাহ্মুদ মিঠু, কনক চম্পা চাকমা, বিশ্বজিৎ গোস্বামী প্রমুখ।

একটি রাজনৈতিক দলের আয়োজনে ইফতার মাহফিল যে ঝঞ্ঝাটমুক্ত, পরিচ্ছন্ন হতে পারে তা দেখে প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন আয়োজনে আগত প্রখ্যাত চিত্রশিল্পীবৃন্দ। সেই সঙ্গে বিদেশের মাটিতে একটি ধর্মীয় আয়োজনে সকল ধর্মের, সকল দলের অংশগ্রহণ দেখে সম্মানিত অতিথিবৃন্দ অভিভূত হন। বাংলাদেশেও যদি সকলের এমন সহাবস্থান থাকত তাহলে সত্যিকার অর্থেই সোনার বাংলা গড়া সম্ভব হতো বলে মন্তব্য করেন অনেকেই।


২৮ জুলাই হিগাশি তাবাতা আওয়ামী লীগের ইফতার মাহফিল সত্যিকার অর্থেই একটি পরিচ্ছন্ন, নির্ঝঞ্ঝাট ও এ যাবৎকালের সবচেয়ে সার্থক আয়োজন ছিল। রাজনৈতিক দলের আয়োজন সত্ত্বেও কোনো বক্তব্য বা আলোচনা পর্ব ছিল না। ছিল না কোনো বিশেষ আসন বা বিশেষ অতিথি। আগত অতিথিবৃন্দ ছিলেন সকলেই অতিথি হিসেবে। (প্রস্তাবিত) বর্তমান কমিটির সভাপতি ছালেহ মোঃ আরিফ এবং সাধারণ সম্পাদক খন্দকার আসলাম হিরা আয়োজক হিসেবে সকলের খোঁজ খবর নেন। যেটি বিগত কমিটির প্রধান করেননি। বরং তিনি নিজেই বিশেষ আসন নিয়ে বসে থাকতেন। প্রবাসীদের মন্তব্য ছিল জাপান শাখা আওয়ামী লীগে জগদ্দল পাথর হয়ে চেপে থাকা বিশেষ আসনপ্রিয় ঐ লোকটিকে সভাপতির পদ থেকে সরাতে পারাটাই আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় সার্থকতা। এখন থেকে আওয়ামী লীগ সাধারণ প্রবাসীদের সমর্থন পাবে। পেয়েছেও তাই। এই পর্যন্ত কোনো দিন আওয়ামী লীগের কোনো আয়োজনে দেখা যায়নি এমন লোকদেরও যোগ দিতে দেখা গেছে ২৮ জুলাই ইফতার মাহফিলে।

ইফতার পূর্ব সংক্ষিপ্ত মোনাজাতে বাংলাদেশ, প্রবাসীদের সুখ সমৃদ্ধি ও শান্তি কামনা করা হয়। ইফতার উত্তর এক নৈশভোজে সকলকে আপ্যায়ন করা হয়।

rahmanmoni@gmail.com

সাপ্তাহিক