একজন আব্দুর রহমান বয়াতী

Bayati-bg20130819024439বাউল সঙ্গীতশিল্পী আব্দুর রহমান বয়াতি (১৯৩৯-২০১৩)
বাউল একটি বিশেষ লোকাচার ও ধর্মমত। এই মতের সৃষ্টি হয়েছে বাংলার মাটিতে। বাউলকূল শিরোমণি লালন সাঁইয়ের গানের মধ্য দিয়ে বাউল মত পরিচতি লাভ করে। বাউল গান যেমন জীবন দর্শনে সম্পৃক্ত তেমনি সুর সমৃদ্ধ। তেমনি এক বাউল সঙ্গীতশিল্পী আব্দুর রহমান বয়াতী। তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই।


১৯ আগস্ট সকাল সোয়া ৮টার দিকে রাজধানীর ধানমন্ডির সাতমসজিদ রোডের জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন।

১৯৩৯ সালে ঢাকার সুত্রাপুরের দয়াগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন এই বরেণ্য শিল্পী। আব্দুর রহমান বয়াতী ছিলেন একাধারে অসংখ্য জনপ্রিয় লোকগানের শিল্পী, গীতিকার, সুরকার এবং সংগীত পরিচালক৷
Bayati-bg20130819024439
এই শিল্পীর গানের শুরুটা ছিল দয়াগঞ্জ বাজারে। তাঁর বাবা তোতা মিয়ার একটি হোটেল ছিল। সেখানে মাঝে মধ্যে অনেক গুণী বাউল শিল্পীর আসর বসত। ছোটবেলা থেকেই বাউল গানের প্রতি ছিল তাঁর অদম্য আকর্ষণ। যেখানে বাউল গানের আসর বসত সেখানেই ছুটে গিয়ে সামনের সারিতে বসে মনেপ্রাণে গান শুনতেন।

প্রখ্যাত বাউল শিল্পী আলাউদ্দিন বয়াতী, মারফত আলী বয়াতী, খালেক দেওয়ান, হালিম বয়াতী, রজ্জব আলী দেওয়ান, আলেক দেওয়ান, দলিল উদ্দিন বয়াতীসহ বহু শিল্পী প্রায়ই আসতেন গানের অনুষ্ঠান করতে। বাবার অনুপস্থিতিতে কোন কোন দিন মনভরে বাংলার বাউল গান শুনতেন এবং তালে তালে নিজেই গান গাইতেন। খুব সহজেই তিনি গান রপ্ত করতে পারতেন।
Bayati-inner

এ পর্যন্ত তার প্রায় পাঁচশ একক গানের অ্যালবাম বের হয়েছে। পাশাপাশি তিনটি মিশ্র অ্যালবামে গান গেয়েছেন তিনি। তার উল্লেখযোগ্য গাওয়া গানের মধ্যে রয়েছে, `মন আমার দেহঘড়ি সন্ধান করি’, ‘কোন মিস্ত্রি বানাইছে`, ‘গাড়ি চলে না’ ,`আমার মাটির ঘরে ইঁদুর ঢুকেছে`, মরণেরই কথা কেন স্মরণ কর না`, `মা আমেনার কোলে ফুটল ফুল`, `ছেড়ে দে নৌকা মাঝি যাবো নদীয়া`, `আমি ভুলি ভুলি মনে করি প্রাণের ধৈর্য মানে না’।


লোকসংগীতে অবদানের জন্য পেয়েছেন, সিটিসেল চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড, সোলস অ্যাওওয়ার্ড, টেলিভিশন দর্শক ফোরাম কর্তৃক লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড, ২০০৬ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর গুণীজন সংবর্ধনা, নজরুল একাডেমী সম্মাননা ২০০৪, সমর দাস স্মৃতি সংসদ অ্যাওয়ার্ড, বাংলাদেশ বাউল সমিতি আজীবন সম্মাননা অ্যাওয়ার্ড, মুন্সীগঞ্জ-বিক্রমপুর সমিতি আজীবন সম্মাননা অ্যাওয়ার্ড, ইউএসএ জাগরনী শিল্পীগোষ্ঠী অ্যাওয়ার্ড।

এছাড়া তিনি পেয়েছেন স্বরবীথি থিয়েটার বাংলা নববর্ষ ১৪১২ উপলক্ষে সংবর্ধনা ও সম্মাননা, কায়কোবাদ সংসদ আজীবন সম্মাননা, স্পেল বাউন্ড বিশেষ সম্মাননা, বাংলাদেশ বাউল সংগঠনের গুণীজন সম্মাননা পদক, বিক্রমপুর সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী পদক, জাতীয় যুব সাংস্কৃতিক সংস্থার সাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেন স্মৃতি স্বর্ণ পদক ও আজীবন সম্মাননা-২০০৫, সিটি কালচারাল সেন্টার কর্তৃক গুণীজন সম্মাননা পদক, বাউল একাডেমী পদক।

abdul-inter2

লোকসঙ্গীতে অসামান্য অবদানের জন্য স্বীকৃতি স্বরূপ লোকজ বাউলমেলা পদক ২০০৪ ও ওস্তাদ মোমতাজ আলী খান সঙ্গীত একাডেমী সম্মাননা পদক ২০০৬ ও শ্রেষ্ঠ বাউলশিল্পী অডিও ক্যাসেট পুরস্কার।

তিনিই প্রথম বাংলাদেশের বাউল সংগীত শিল্পী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের আমন্ত্রণে হোয়াইট হাউসে ডিনার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছিলেন।

বয়াতীর মেজো ছেলে আলম রহমান তার মৃত্যুতে ভেঙ্গে পরেছেন। তিনি বাংলানিউজকে বলেন, ‘ বাবা অসুস্থ হবার পর থেকে আমরা সবাই অনেক চেষ্টা করেছি তার সুস্থতার জন্য। কিন্তু বাবার কিসের যেন একটা ক্ষোভ মনে পুষে রাখছিলেন। শেষ সময়ে ঠিকমত ওষুধ খেতে চাইতেন না। বাবা আজ নেই, ভাবতেই পারছি না। বাবার কবর তার ইচ্ছেতেই দয়াগঞ্জে দাদা-দাদুর পাশেই দাফন করা হবে। সবার কাছে বাবার জন্য দোয়া কামনা করছি।’

তিনমাস ধরে বয়াতি ধানমন্ডির সাতমসজিদ রোডের জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর।

২০ আগস্ট দুপুর ১২ টা পর্যন্ত জাতীয় শহীদ মিনারে নেয়া হবে আব্দুর রহমান বয়াতীর মরদেহ। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের উদ্যোগে সেখানে সর্বসাধারণ তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাবেন বলে জানা গেছে। এরপর তাকে সুত্রাপুরের দয়াগঞ্জে দাফন করা হবে।

কামরুজ্জামান মিলু
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর