বাপ কা বেটা : ফেরদৌস-হাবীব

habibwবাংলাদেশের দুই প্রজন্মের দুই জনপ্রিয় শিল্পী হচ্ছেন ফেরদৌস ওয়াহিদ ও হাবিব ওয়াহিদ। সম্পর্কে তারা পিতা-পুত্র। তাই অনেকেই হাবিব-ওয়াহিদের প্রশংসা করতে গিয়ে বলেন ‘বাপ কা বেটা’। অর্থাৎ, যেমন বাবা তেমন ছেলে। আজকের আড্ডাটা তাদের নিয়েই।

ফেরদৌস ওয়াহিদ। ‘এমন একটা মা দে না’ গানটি দিয়ে যিনি জয় করেছিলেন অগণিত শ্রোতার মন। আর এ গানটি নিয়ে ফেরদৌস ওয়াহিদের রয়েছে একটি মধুর স্মৃতি। চলুন ফেরদৌসের মুখেই শুনি সেই মধুর স্মৃতিকথা। অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ তখন টেলিভিশনে সপ্তবর্ণা নামে একটি অনুষ্ঠান করতেন। তিনি ঢাকা কলেজে আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন। একদিন তিনি আমাকে ডেকে বললেন, ‘ফেরদৌস, আমি টিভিতে একটি অনুষ্ঠান করছি। তখন আমি স্যারকে বললাম, স্যার, আমার একটি অনুরোধ রাখতে হবে। আমাকে আপনার অনুষ্ঠানের শেষ দিকে একটি গান করতে দিতে হবে। এবং গানটিতে আমি লিপসিং করতে চাই। বলে রাখা ভালো, তখনো টিভিতে লিপসিংয়ের চল ছিল না। সরাসরি গান রেকর্ড করা হতো। ‘এমন একটা মা দে না’র মাধ্যমে আমি প্রথম লিপসিং শুরু করি। প্রথমেই স্যারকে আমি গানটি গেয়ে শোনাই। স্যার উচ্ছ্বসিত হয়ে আমাকে বললেন, ‘গানটি তো আমি অনুষ্ঠানে রাখবই, আমার মনে হয় গানটি শুধু এখন নয়, আজ থেকে বিশ বছর পরও সমান জনপ্রিয় থাকবে।’ স্যারের সে অনুমান মিথ্যা হয়নি। গানটি ১৯৭৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর বিটিভিতে প্রচারিত হয়েছিল। প্রচারের পর থেকে গানটি হিট।’ নিজের জনপ্রিয়তার শুরু সম্পর্কে এভাবেই বললেন ফেরদৌস ওয়াহিদ।


এবার আসি হাবিবের প্রসঙ্গে। তার বয়স যখন সতের তখন বন্ধুরা মিলে ব্যান্ডগ্রুপ গঠন করেন। ব্যান্ডে বাজাতে বাজাতেই এক সময় তখনকার জনপ্রিয় ব্যান্ড আর্কে বাজানোর ডাক পান হাবিব। এত কম বয়সে এ প্রস্তাব পাওয়া হাবিবের কাছে ছিল স্বপ্নের মতো। আর্কে দু-এক বছর বাজানোর পরই পড়াশোনার জন্য হাবিব পাড়ি জমান লন্ডনে।

এর পরের গল্প হাবিবেব মুখ থেকেই শুনুন – ‘লন্ডন যাওয়ার পর আমি প্রথম সিলেটি লোকসংগীত শুনি। গানগুলো আমাকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করল। শুনলাম হাছন রাজা, শাহ আবদুল করিমের গান। এ সময় আমার মনে হলো, আমি নতুন একটি ভা-ারের সামনে দাঁড়িয়ে। লন্ডনে থাকতেই পরিকল্পনা করলাম, কোর্স শেষ হলে দেশে ফিরে আমি নিজে একটা স্টুডিও দেব। এখানে মানুষজন আসবে, মিউজিক হবে। কিন্তু অনেকটা খেয়ালের বশেই কায়ার গাওয়া কৃষ্ণ অ্যালবামটা করলাম। এই অ্যালবামের গানগুলোয় আমি আধুনিক মিউজিকের সঙ্গে ফোক মিউজিকের ফিউশন ঘটিয়ে দেখতে চেয়েছি কেমন লাগে শুনতে। দেখলাম, ভালোই লাগছে। ফলে অ্যালবামটি বের করলাম। এই কৃষ্ণ অ্যালবামই আমার ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট।’

ক্যারিয়ারের শুরু থেকে এ পর্যন্ত হাবিবের মোট চারটি একক অ্যালবাম বাজারে এসেছে। ২০১২ সালের ১৫ ডিসেম্বর বাজারে আসে হাবিবের সর্বশেষ একক স্বাধীন। অবশ্য বাজারে আসার এক মাস আগে ১২ নভেম্বর বাংলালিংক মিউজিক স্টেশনে প্রকাশ পায় অ্যালবামটি।

স্বল্প পরিচিত লোকগীতির ফিউশনের সঙ্গে টেকনো এবং শহুরে বিটের সমন্বয় ঘটিয়ে সাধারণ শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয় গ্রহণযোগ্য করে তুলেছেন হাবিব। তিনি মূলত হাসন রাজা, শাহ আবদুল করিম, আমির উদ্দীন প্রমুখ মরমী সঙ্গীত শিল্পীদের গানকে কিছুটা পরিবর্তনের মাধ্যমে জনপ্রিয় করে তুলেছেন। এ কারণে অনেকের কাছেই তিনি যেমন সমালোচিত হয়েছেন, ঠিক তেমনি তরুণ প্রজন্মের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে সমাদৃত হয়েছেন।

জনপ্রিয়তা কেমন উপভোগ করেন জানতে চেয়েছিলাম হাবিবের কাছে। তিনি বলেন, ‘এটা জনপ্রিয়তা কিনা জানি না; তবে আমি এ ব্যাপারটাকে শ্রোতাদের ভালোবাসা হিসেবেই ধরে নিয়েছি। শ্রোতাদের জন্যই তো গান গাইছি। তাদের ভালোবাসা যেন ধরে রাখতে পারি সে চেষ্টাটাই করে যাব।’

অনেকের অভিযোগ, নতুন ধারার মিউজিকের মাধ্যমে আপনি বাংলা গানের আবেদন নষ্ট করেছেন। এ ব্যাপারে আপনার ব্যাখা কি? ‘নতুন কিছুকে সবাই সহজভাবে গ্রহণ করতে পারে না। সবকিছুকেই সহজভাবে নিতে একটু সময় লাগে। এখন সবাই কিন্তু নতুন ধারার মিউজিকেই গান করছে। গানগুলো জনপ্রিয়ও হচ্ছে। গানের আবেদনও থাকছে।’- এভাবেই নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করলেন হাবিব।

ফেরদৌস ওয়াহিদ ৮০র দশক থেকে পপ গান করছেন, যদিও ছেলেবেলায় গান শুরু করেছিলেন রবীন্দ্রসংগীত ও পল্লিগীতির প্রশিক্ষণের মাধ্যমে।

ফেরদৌস ওয়াহিদের কৈশোর কেটেছে কানাডাতে। সে সময়ে এলভিস প্রেসলি, টম জোন্সের মতো শিল্পীদের গান ও অনুষ্ঠান দেখে তিনি খুবই অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন এবং তিনি একই আদলে বাংলায় পপ গান করতেন। এভাবেই পপ গানের প্রতি ব্যক্তিগত ভালো লাগা থেকেই তার পপ জগতে আসা। ফেরদৌস ওয়াহিদকে আধুনিক বাংলা পপ সঙ্গীতের পথদ্রষ্টাও বলা হয়।

ফেরদৌস ওয়াহিদ ও তার বন্ধুরা যখন পপ গান নিয়ে দেশ চষে বেড়িয়েছেন তখন দেশের পত্র-পত্রিকায় তাদের উদ্দেশ্য করে লেখা হয়েছিল ‘কোট-প্যান্ট পড়া মৌলভী’। এখনো বেঁচে আছেন অনেক প-িতরা সে সময় অত্যন্ত ন্যক্কারজনকভাবে বলেছিলেন ‘গেল, গেল, এরা দেশটাকে নষ্ট করে দিলো’ সেই তারাই কিন্তু এখন পপ সঙ্গীতের প্রসংশা করছেন। এর ব্যাখ্যা জানতে চাইলে ফেরদৌস ওয়াহিদ বলেন, ‘নতুনকে গ্রহণ করার মানসিকতা সবার থাকে না। সে সময় তারুণ্যের কাছে প-িতরা হেরে গিয়েছিল। যার কারণে আজ পপ গানের জয় জয়কার।’

এই বয়সে এসেও ফেরদৌস ওয়াহিদ প্লেব্যাক, বিজ্ঞাপন ও অ্যালবামে তার অর্ধেকেরও কম বয়সের শিল্পীদের সঙ্গে সমান তালে গান গেয়ে যাচ্ছেন।


একটা বিষয় নিয়ে ফেরদৌস ওয়াহিদের ভক্তদের খুব আগ্রহ। আর তা হচ্ছে সানগ্লাস। অর্থাৎ ফেরদৌস ওয়াহিদ যেখানেই যান কালো সানগ্লাস পরে যান। তাকে চোখে সানগ্লাস ছাড়া দেখা যায় না বললেই চলে। কি লুকিয়ে আছে সেই সানগ্লাসে জানতে চেয়েছিলাম ফেরদৌস ওয়াহিদের কাছে। তিনি বললেন, ‘এ ইতিহাসটা ৪০ বছরের। প্রথম যখন টিভি প্রোগ্রাম করতে যাই তখন লাইটের আলোয় আমার চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল। পরবর্তীতে ডাক্তারের শরণাপন্ন হই। ডাক্তার জানালো আমার চোখে কিছু সমস্যা আছে। রোদ্রে এবং আলোয় কাজ করার সময় চোখে কালো গ্লাস পরার সাজেশন দিলেন তিনি। সেই থেকে পরা, পরা থেকে অভ্যাস, অভ্যাস থেকে স্টাইল এবং সেটা কন্টিনিউ করে ৪০ বছরের কাছাকাছি চলে এসেছে। এখন চশমা পরে আমি সবকিছু দিনের আলোর মতই পরিষ্কার দেখি। আমার কাছে এখন মনে হচ্ছে সানগ্লাসের স্টাইলটা মন্দ না। এটার মধ্যে একটা পুরুষালি ভাব আছে বলেও আমার মনে হয়।’

কিছুদিন আগেই চলে গেল ঈদ। ঈদ নিয়ে পিতা-পুত্রের ব্যস্ততা কেমন ছিল জানতে চাইলে ফেরদৌস ওয়াহিদ বলেন, ‘গানের মানুষ, তাই গান নিয়েই ব্যস্ততাটা বেশি ছিল। বিভিন্ন চ্যানেলে গানের প্রোগ্রামে আমি পারফর্ম করেছি। পাশাপাশি চ্যানেলগুলোর ঈদকেন্দ্রিক আড্ডার অনুষ্ঠানেও উপস্থিত ছিলাম।’

আর হাবিব? ‘যারা আমার সম্পর্কে খোঁজ-খবর রাখেন তারা জানেন যে আমি খুব কম কাজ করি। সে কারণে এবারের ঈদে নতুন গান নিয়ে আমার সে রকম ব্যস্ততা ছিল না। তবে বিভিন্ন চ্যানেলের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম।

শীর্ষ নিউজ