জাপানের উচ্চকক্ষ নির্বাচনেও আবে’র সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ

রাহমান মনি
অবশেষে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে’র নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন জোট এবং একই সঙ্গে তার দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি বা খউচ) উচ্চকক্ষের নির্বাচনে সহজেই নির্বাচনী বৈতরণী পাড়ি দিতে সক্ষম হয়েছে। ২১ জুলাই ২০১৩ উচ্চ কক্ষের এই নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে’র দল দীর্ঘ ৬ বছর পর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে জয়ী হতে সক্ষম হয়। এই জয়ের ফলে ২৪২ আসনবিশিষ্ট কক্ষের নিয়ন্ত্রণও ক্ষমতাসীন জোটের হওয়ায় আইনসভার উভয় কক্ষে নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা পেয়ে প্রধানমন্ত্রী আবে’র অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নে বাধা দূর হলো। নির্বিঘেœ এখন তিনি তার সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে পারবেন।

২১ জুলাই রোববার ২৪২ আসনবিশিষ্ট উচ্চকক্ষের অর্ধেক আসন অর্থাৎ ১২১টি আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সকাল ৭টা থেকে একটানা রাত ৮টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলে। এবারের নির্বাচনে ৫২.৬১% ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেনÑ যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর তৃতীয় সর্বনিম্ন ভোট প্রদান। এর আগে ১৯৯৬ সালে সর্বনিম্ন ভোটার উপস্থিতির রেকর্ডটি ছিল। সেই সময় ৪৪.৫২% ভোটার ভোট প্রদান করেন। সেই সময়ও এলডিপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভে সক্ষম হয়। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর জাপানের উচ্চকক্ষের নির্বাচনে সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতি ছিল ১৯৮২ সালের নির্বাচনে। রেকর্ডসংখ্যক ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন সেই সময়। উক্ত নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৭৪.৫২%। সেই নির্বাচনেও বর্তমান ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভে সক্ষম হয়। সেই সময় ইয়াসুহিরো নাকাসোনের নেতৃত্বে দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভে সক্ষম হয়। প্রধানমন্ত্রী নাকাসোনের শাসন আমলের (১৯৮২ নভেম্বর ২৭ থেকে ১৯৮৭ নভেম্বর ৬) শেষ সময়ে জাপানের বাব্ল ইকোনমি (ডিসেম্বর ’৮৬ থেকে ফেব্রুয়ারি ’৯১, মোট ৫১ মাস)’র স্বর্ণযুগ বলা হয়। জাপান ২য় বৃহত্তম অর্থনৈতিক পরাক্রমশালী দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়। যদিও এখন ঐ রেকর্ডটি চীনের দখলে।

শিনজো আবে’র প্রধানমন্ত্রীত্বের প্রথম মেয়াদে ২০০৭ সালে জাপান পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের শোচনীয় পরাজয়ের পর সেই একই নেতা আবে’র ২য় মেয়াদে ২০১৩ সালে উচ্চকক্ষের নির্বাচন তারই নেতৃত্বে উচ্চকক্ষের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও জনগণের আস্থার আশীর্বাদ হিসেবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ দেখছেন।


২১ জুলাই নির্বাচনে আবে’র দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি ৬৫ আসনে জয়লাভ করে। তাদের জোটের শরিক দল নিউ কোমেইতো পার্টি জিতেছে ১১টি আসন। ১২১টি আসনের মধ্যে জোটগতভাবে তারা ৭৬টি আসনে জয়লাভ করে। ২০০১ সালের পর এলডিপির উচ্চকক্ষে সবচেয়ে বড় সাফল্য এটি। ইতোমধ্যে উচ্চকক্ষে ৫৯টি আসন তাদের রয়েছে। এই নির্বাচনের পর উচ্চকক্ষে তাদের আসন সংখ্যা সর্বমোট ১৩৫টি। যা আবে’র সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে এবং তার ক্ষমতাকে আরও সুসংহত করবে। জাপান পার্লামেন্ট নিম্নকক্ষের তুলনায় উচ্চকক্ষ ততটা শক্তিশালী নয়। তবে উচ্চকক্ষ সরকার প্রণীত আইন ঠেকিয়ে দিতে পারে।

জাপান পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষ উভয় কক্ষে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় এককভাবে সিদ্ধান্ত নিতে বেগ পেতে হবে না ক্ষমতাসীন এই দলটির। আগামী তিন বছর অর্থাৎ ২০১৬ সালের আগে জাপানে আর কোনো নির্বাচনের সম্ভাবনা নেই। সেই হিসেবে শিনজো আবে আরও ৩ বছর নির্বিঘেœ দায়িত্ব পালন করে যেতে পারেন। বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী জুনইচিরো কোইজুমির পর দেশটির সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের খাতায় নাম লেখাবেন আবে। কোইজুমি ছিলেন ২ টার্মে একনাগাড়ে। আবে হবেন ভিন্ন ভিন্ন মেয়াদে। এর পরেই আছেন ইয়াসুহিরো নাকাসোনে।

অব্যাহতি
ডিপিজে’র প্রধান উপদেষ্টা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাওতো কানকে আগামী তিন মাসের জন্য দলের সদস্যপদ কেড়ে নেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দলের প্রধান উপদেষ্টা পদ থেকেও অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। এই সময় তিনি দলীয় বা রাজনৈতিক কোনো কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকবেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি ২১ জুলাই উচ্চকক্ষের নির্বাচনের সময় দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে দল কর্তৃক প্রত্যাহারকৃত প্রার্থীকে সমর্থন অর্থাৎ বিদ্রোহী প্রার্থীকে সমর্থন দেন। দল থেকে বহিষ্কার করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল কিন্তু নীতিনির্ধারকগণ মতৈক্যে পৌঁছুতে পারেননি বলে তা সম্ভব হয়নি।


চীনের উদ্বেগ
অত্যন্ত কট্টরপন্থি জাতীয়তাবাদী নেতা শিনজো আবে’র উত্থানে চীন বরাবরই শংকিত ছিল। প্রথম মেয়াদে এক বছর ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার পর দেশটি হাফ ছেড়ে বাঁচে। সেনকাকু দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে দ্বিপক্ষীয় জড়িয়ে পড়ার পরবর্তী শিনজো আবে’র দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা গ্রহণ চীন ভালো চোখে দেখেনি। যা ইতোমধ্যে বিভিন্ন ঘটনাবলি বিশ্লেষণ করলে সহজেই বোঝা যায়। কিন্তু আবে গৃহীত সময়োচিত পদক্ষেপ তাদের আগুনে ঘি ঢালার কাজটি করেনি বলে বেশিদূর এগুতে পারেনি। চীন মনে করেছিল গত ৫ বছরে জাপানে ৬ জন প্রধানমন্ত্রী উপহার পাওয়ায় আবেও তাদের পূর্বসূরিদের পদাংক অনুসরণ করবে, তারা স্বস্তি পাবে।

কিন্তু আগামী আরও তিন বছর ক্ষমতায় থাকার নিশ্চিত হবার পর চীন ক্রমেই শংকিত হয়ে উঠেছে। চীন মনে করে আবে’র এই বিজয়ে জাপান আরও বেশি কট্টর জাতীয়তাবাদী হয়ে উঠবে। চীনা রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন এই বিজয়ের পর উভয় দেশের শীতল সম্পর্ক আরও শীতল হবে। চীনা মিডিয়াগুলো বিভিন্ন বিশ্লেষণধর্মী খবর প্রচার করছে। চীন আশঙ্কা করছে জাপানের রাজনীতি ক্রমশ ডানপন্থিদের হাতেই চলে যাচ্ছে।

আবে’র সাফল্যের কারণ
প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে’র নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন জোট সাফল্যের বিভিন্ন কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম কারণ আবে প্রশাসন গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ। দ্বিতীয় মেয়াদে আবে ক্ষমতা গ্রহণের পর বেশ কিছু পরিপক্ব পদক্ষেপ গ্রহণ। বিশেষ করে আবে’র ব্যক্তিগত ইচ্ছায় অর্থনৈতিক এবং শিক্ষা যাতে আবে গৃহীত পদক্ষেপ টনিক হিসেবে কাজ করে। জনগণ তা গ্রহণ করে সানন্দে এবং এই গ্রহণ করার পর প্রভাব পড়ে উচ্চকক্ষ নির্বাচনে।

আবেনোমিকস (আবে + ইকোনমিকস)
১৯৯২ থেকে জাপান বাব্ল ইকোনমিক্স ধস নামা শুরু হওয়ার পর দুই দশক মন্দার কবলে থাকা জাপান অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে একটি পরিকল্পনা ঘোষণার পাশাপাশি তা বাস্তবায়নে দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে কঠোর নীতি গ্রহণ করেন। পর্যবেক্ষকরা তার এই নীতিগুলো আবে’র নামানুসারে আবেনোমিকস নামে ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

গত ২১ জুন শুক্রবার আবেনোমিকস ইনচার্জ, ইকোনমিক রিভিটেলাইজেশন মিনিস্টার আকিরা আমারি জাপান ফরেন প্রেস সেন্টারে বিদেশি সাংবাদিক সম্মেলনে আবেনোমিকসের উপর প্রেস ব্রিফিং করেন। সেখানে বাংলাদেশ রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন উপস্থিত ছিলেন। প্রেস ব্রিফিংয়ে মন্ত্রী সামারি আবেনোমিকসের বিশদ ব্যাখ্যা এবং বিদেশি সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। আর্থিক নীতি, রাজস্ব প্রণোদনা এবং কাঠামোগত সংস্কার এই তিনটি মূল স্তম্ভের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত আবেনোমিকসের সারসংক্ষেপ নিম্নরূপ :
১. আর্থিক নীতি : প্রায় এক দশক ধরে চলা মুদ্রা সংকোচন থেকে জাপানকে বাঁচাতে জাপান কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ব্যাংক অব জাপান’ মুদ্রাস্ফীতি ২ শতাংশ করার লক্ষ্যে অনিয়ন্ত্রিত ইয়েন ছাপায়। যার মাধ্যমে ২ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতি অর্জন করা যায়।
২. রাজস্ব প্রণোদনা : প্রায় দুই দশক ধরে চলে আসা মন্দাভাবে জাপানে কোম্পানিগুলোর ব্যয় সংকোচন নীতি থেকে সরে এসে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে আবে সরকার জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাত্র চার মাসে ১১৪ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব প্রণোদনা ব্যয় করে। যদিও এখনও পর্যন্ত কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হয়ে ওঠেনি।
৩. কাঠামোগত সংস্কার : টিপিপি (ঞচচ) বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে আবে’র তৃতীয় বৃহৎ পরিকল্পনা হলো কৃষি, স্বাস্থ্য এবং বিদ্যুৎ খাতে কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ট্যারিফ কমিয়ে বাণিজ্য অব্যাহত রাখা।

আবেডুকেশন (আবে + এডুকেশন)
জাপানের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে আবে প্রশাসন একটি শিক্ষানীতি গ্রহণ করে। যার নাম দেয়া হয় আবেডুকেশন।

২৫ জুন ২০১৩ কালচার, স্পোর্টস, সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি মিনিস্টার হাকুবুন শিনোমুরা জাপান ফরেন প্রেস সেন্টারে আবেডুকেশন নিয়ে প্রেস ব্রিফিং-এ বলেন, আবেডুকেশন বা আবে’র শিক্ষানীতি পুরো শিক্ষা সিস্টেমকে বদলে দেয়ার লক্ষ্যে একটি আধুনিক নীতি গ্রহণ করেছেন। যার অন্যতম কারণ হচ্ছে জাপান শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও গ্লোবাল করা, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় ঞঙঊঋখ সিস্টেম, নৈতিক শিক্ষাকে মূল ধারায় প্রবর্তন, শিক্ষার্থীদের সকল প্রকার শাস্তি প্রদান থেকে বিরত রাখা। এক কথা জাপান শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও কঠিন করা। ঝুঁকি নিয়ে এই নীতি গ্রহণ করা হলেও শিক্ষা ব্যবস্থার স্বার্থে জনগণ তা মেনে নিয়েছে এবং ভোট দিয়ে সমর্থন জানিয়েছেন। আবে’র বিজয় মানে, তার গৃহীত নীতিরই বিজয়।

আমাদের শিক্ষণীয়
জাপানে নির্বাচনে হেরে গেলে দলীয় প্রধান বা শীর্ষস্থানীয় নেতা দায়ভার কাঁধে নিয়ে পদত্যাগ করেন। আর আমরা স্থূল কারচুপি, সূক্ষ্ম কারচুপি, ইলেকট ইঞ্জিনিয়ারিং, বিদেশিদের মদদ… ইত্যাদি শুনে অভ্যস্ত। দায়ভার কেউ নিতে চায় না। কেউ তো আবার ভোটারদের দোষারোপ করছেন সাম্প্রতিককালে।

দ্বিতীয় মেয়াদে শিনজো আবে আরও বেশি পরিপক্ব এবং গোছানো ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করে নিজ, দল ও দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বলের কাজ করছেন। আর আমাদের নেতারা দ্বিতীয় মেয়াদে আরও বেশি উগ্র হয়ে উঠছে। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিচ্ছেন না। বরং জনগণকে লেশন দিচ্ছেন।

rahmanmoni@gmail.com
সহযোগিতায় : রাহমান আশিকুর হিরোআকি
FPCJ ছবি : সাপ্তাহিক নিজস্ব
PM ছবি : ইন্টারনেট

সাপ্তাহিক