হিরোশিমা দিবস: কমছে প্রত্যক্ষদর্শীর সংখ্যা

মনজুরুল হক
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষত এখনো বয়ে বেড়াচ্ছে জাপানিরাপ্রতিবছর ৬ ও ৯ আগস্ট জাপানের জনগণের পাশাপাশি সারা বিশ্বের মানুষকে মনে করিয়ে দেয় যুদ্ধের ভয়াবহতার কথা। ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট সকাল আটটার অল্প পরে জাপানের হিরোশিমা শহরের ওপর দিয়ে বয়ে গিয়েছিল ধ্বংসের এক তাণ্ডবলীলা। এর ঠিক তিন দিন পর পশ্চিম জাপানের অন্য আরেক শহর নাগাসাকিকেও আণবিক বোমা হামলার শিকার হতে হয়। সারা বিশ্বে সেটাই ছিল প্রথমবারের মতো যুদ্ধের দোহাই দিয়ে ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র ব্যবহার করে সাধারণ নিরীহ জনগণকে নির্বিচারে হত্যা করার প্রথম ঘটনা। হিরোশিমা-নাগাসাকির ধ্বংসযজ্ঞ অনেকটা চোখে আঙুল দিয়ে যুদ্ধের অসারতা এবং ভয়াবহ পরিণতি আমাদের দেখিয়ে দিতে পেরেছে বলেই হয়তো মারণাস্ত্রের সে রকম বাড়াবাড়ি রকমের ব্যবহার থেকে বিশ্বের অনেক দেশ এখনো নিজেকে সংযত রাখছে। যদিও আমরা জানি হিরোশিমার সেদিনের সেই বোমার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিধর বোমা বিশ্বের বেশ কিছু রাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারে এখন মজুত আছে।

যুদ্ধের একেবারে শেষ দিকটায় এসে কোণঠাসা হয়ে পড়া জাপানকে বধ করার জন্য আণবিক অস্ত্রের ব্যবহার কতটা যুক্তিসংগত ছিল, সেই প্রশ্ন অবশ্য অনেক আগে থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গবেষকেরা করে আসছেন এবং এ রকম সিদ্ধান্তেও তাঁদের অনেকে উপনীত হয়েছেন যে, আণবিক বোমা হামলার উদ্দেশ্য যতটা না ছিল জাপানকে কাবু করতে পারা, তার চেয়ে বেশি বরং ছিল যুদ্ধকালীন যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি থেকে দূরে থাকার কারণে বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়া দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সমরবল সম্পর্কে অন্যদের, বিশেষ করে সোভিয়েত ইউনিয়নকে সতর্ক করে দেওয়া। অন্যদিকে আণবিক বোমা হামলার পক্ষে সাফাই গাওয়া গবেষকেরা অবশ্য বলে থাকেন, আণবিক বোমা ব্যবহার না করা হলে যুদ্ধে প্রাণহানির সংখ্যা অনেক বেশিতে দাঁড়াত। তবে এসব কিছুই তো তাত্ত্বিকদের বলে যাওয়া তত্ত্বকথা, যে হিসাব-নিকাশের মধ্যে হিরোশিমা-নাগাসাকির বোমা হামলায় নিহত কিংবা আহত ব্যক্তিদের হাহাকার আর কান্না খুব একটা প্রতিধ্বনিত হতে শোনা যায় না। অথচ সেই আর্তি আর কান্নাই কিন্তু হিরোশিমা আর নাগাসাকিকে সারা বিশ্বের সাধারণ মানুষের মনের এতটা কাছে নিয়ে এসেছে। সেদিক থেকে ৬ আগস্ট হচ্ছে এমন এক দিবস, আমাদের মনের আবেগকে যা ধাবিত করে আগ্রাসী যেকোনো যুদ্ধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে, সেই যুদ্ধ যেখানেই হোক না কেন, মানবতার ভূলুণ্ঠিত হওয়া দেখতে আমরা নারাজ বলেই মানুষ হিসেবে সেই অনুভূতি আমাদের মনে হিরোশিমা দিবস এনে দেয়।


তবে হিরোশিমা-নাগাসাকির এই মানবিক বার্তা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়ায় অগ্রণী ভূমিকা যাঁরা রেখে চলেছেন, তাঁরা সবাই অবশ্যই হচ্ছেন বোমা হামলার ভুক্তভোগী এবং অন্যান্য আগ্রাসনের অসহায় শিকার হতে হওয়া মানুষজন। বিশ্বের কোথাও যেন আর সেই একই অন্যায়, একই তাণ্ডবের পুনরাবৃত্তি না ঘটতে পারে, সেই ব্রত নিয়ে ১৯৪৫ সাল থেকেই তাঁরা তাঁদের বেদনা আর দুঃখের কথা বিশ্ববাসীকে শুনিয়ে আসছেন। আর তাঁদের সেসব করুণ গাথার অনেকটাই আমাদের নানাভাবে আলোড়িত করছে। বোমা হামলার পরের সেই প্রথম দশকে তেজস্ক্রিয়ার দূষণে আক্রান্ত হয়ে আকালে প্রাণ হারানো সাদাকো সাসাকির বেঁচে থাকার আকুলতা আমাদের চোখ যেমন অশ্রুতে ভিজিয়ে দেয়, ঠিক একইভাবে আমরা আলোড়িত হই কমিকস চরিত্রে উঠে আসা খালি পায়ে দৌড়ে বেড়ানো বালক গেনের অসহায় অবস্থার কথা জানতে পেরে। হিরোশিমা-নাগাসাকির স্মৃতি এত দিন ধরে তাঁরাই জাগিয়ে রেখেছেন নানাভাবে তাঁদের সেই অসহায় অবস্থার কথা বলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে।

হিবাকুশা নামে পরিচিত আণবিক বোমা হামলার পর প্রাণে বেঁচে যাওয়া এসব লোকের অনেককেই সারা জীবন ধরে শারীরিক অসুস্থতায় ভুগতে হলেও মানবজাতিকে দ্বিতীয় হিরোশিমা-নাগাসাকির ভয়াবহতা থেকে মুক্ত রাখতে নিজেদের যন্ত্রণার কথা তাঁরা নিরলসভাবে অন্যদের শুনিয়ে গিয়েছেন। এঁদের অনেকেই এখন পর্যন্ত যুক্ত আছেন হিরোশিমা শান্তি স্মৃতি জাদুঘর এবং হিরোশিমা-নাগাসাকির বোমা হামলার স্মৃতি ধরে রাখা অন্যান্য বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে। বোমা হামলার পর কীভাবে তাঁরা প্রাণে বেঁচে গেছেন, কোন যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে বাকি জীবন তাঁদের কাটাতে হয়েছে, এসব কিছু অনেকটা যেন গল্প বলার ভঙ্গিতে আজও তাঁরা বর্ণনা করে যাচ্ছেন স্মৃতি জাদুঘর দেখতে আসা ভ্রমণকারীদের সামনে, কিংবা বিশেষভাবে আয়োজিত বিভিন্ন সমাবেশ ও অনুষ্ঠানে। বোমা হামলার শিকার সেসব প্রত্যক্ষদর্শীর নিজের বর্ণনায় উঠে আসা কাহিনি অনেক বেশি বাস্তব রূপ নিয়ে আমাদের সামনে ধরা দিচ্ছে এবং নিজের অজান্তেই চোখের জল ফেলে যুদ্ধের বিরুদ্ধে সামান্যতম হলেও অবদান রাখার ব্রত আমরা অনেকেই এখনো নিচ্ছি। ফলে হিরোশিমা-নাগাসাকির মূল যে বার্তা, অর্থাৎ আণবিক কিংবা পারমাণবিক বোমা হামলার পুনরাবৃত্তি থেকে বিশ্বকে মুক্ত রাখা, সেটা কিন্তু অনেক ভালোভাবে বিশ্বজুড়ে প্রতিধ্বনিত হয়েছে হিবাকুশাদের সেই দুঃখ-কষ্টের বর্ণনা তুলে ধরার মধ্য দিয়ে। এঁদের অনেকেই তাঁদের সেই বার্তা পৌঁছে দিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গিয়েছেন এবং শান্তি আন্দোলনে যোগ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা তাঁদের বক্তব্যে তাঁরা তুলে ধরেছেন। তবে সময় তো বসে নেই। সময়ের বহমান গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে হিরোশিমা-নাগাসাকির আণবিক বোমা হামলার শিকার লোকজনের সংখ্যাও এখন দ্রুত কমে আসছে। ফলে ধারণা করা যায়, আগামী কয়েক বছরে এরা পুরোপুরি বিদায় নিয়ে সরাসরি সেসব দুঃখদিনের বয়ান তুলে ধরার মতো কেউ আর অবশিষ্ট থাকবেন না, সবটাই তখন বেঁচে থাকবে কেবল পরোক্ষ স্মৃতিতে।
হিরোশিমা নগর প্রশাসনের সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, বোমা হামলার পর প্রাণে বেঁচে যাওয়াদের মধ্যে এখনো যাঁরা জীবিত আছেন, তাঁদের গড় বয়স হচ্ছে ৭৯ বছর। বোমা বিস্ফোরণ ঘটেছিল আজ থেকে ৬৮ বছর আগে। সেদিক থেকে খুব বেশি হলে আর মাত্র এক কিংবা দেড় দশকের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই এদের প্রস্থানের সময় উপস্থিত হবে। ফলে কেবল জাপানই নয়, একই সঙ্গে সারা বিশ্ব বঞ্চিত হবে কতটা দুঃখ-কষ্টের মধ্য দিয়ে এঁদের যেতে হয়েছে, সে কথা তাঁদের নিজের মুখে শোনার সুযোগ থেকে।

হিবাকুশাদের স্বাভাবিক বিদায় শান্তি আন্দোলনকে আদৌ প্রভাবিত করবে কি না, তা অবশ্য প্রশ্নসাপেক্ষ। তবে যে একটি বিষয় নিয়ে অনেকেই উদ্বিগ্ন তা হলো, আগামী প্রজন্মের কাছে হিরোশিমা-নাগাসাকির বার্তা সে রকম আস্থার সঙ্গে পৌঁছে দেওয়ার প্রক্রিয়া হয়তো কিছুটা হলেও বাধাগ্রস্ত হবে। সে রকম আশঙ্কা থেকে হিরোশিমা শান্তি স্মৃতি জাদুঘর গত বছর থেকে অভিনব এক প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যা কিনা হিবাকুশাদের মতো করে বোমা হামলার পরবর্তী সময়ের কাহিনি বর্ণনা করা নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিদের প্রস্তুত করবে। তিন বছর মেয়াদি সেই প্রকল্প এখন মাঝামাঝি পর্যায়ে রয়েছে, প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে আসা তরুণ-তরুণেরা যেখানে হিবাকুশাদের সঙ্গে কথা বলে এবং তাঁদের সঙ্গে শহরের বিভিন্ন জায়গায় যাওয়ার মধ্য দিয়ে অতীতের সেই বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা সম্পর্কে ভালোভাবে বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করছে। ভবিষ্যতে যখন হিবাকুশারা পৃথিবী থেকে স্বাভাবিকভাবে বিদায় গ্রহণ করবেন, তাঁদের সেই শূন্যস্থান পূরণে এরা তখন এগিয়ে আসবে। ফলে হিরোশিমা-নাগাসাকির বার্তা একেবারে হারিয়ে যাবে তা তো নয়।

তবে অনেকে আবার এ রকম আশঙ্কা করছেন যে, হিবাকুশাদের বিদায় যতটা না উদ্বেগের কারণ হয়ে দেখা দিচ্ছে, তার চেয়ে বড় উদ্বেগ হচ্ছে জাপানের রাজনীতির অঙ্গনে সাম্প্রতিক সময়ে বয়ে যাওয়া অস্থির হাওয়া। ক্ষমতাসীন উদার গণতন্ত্রী দল সংসদের উভয় কক্ষে শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করে নেওয়ার পর সংবিধান সংশোধন করে জাপানকে আবারও তারা এশিয়ার উল্লেখযোগ্য এক সামরিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে নেয় কি না, সেদিকে অনেকেই এখন সতর্ক দৃষ্টি রাখছেন। সে রকম কিছু হলে তা অবশ্যই হবে হিরোশিমা-নাগাসাকির ধ্বংসযজ্ঞ থেকে লাভ করা শিক্ষার পরিপন্থী, যে শিক্ষা কিনা যুদ্ধ আর সমরবলের অসারতার কথা আমাদের শোনায়, শান্তির প্রয়োজনীয়তার বার্তা আমাদের কাছে পৌঁছে দেয়।

মনজুরুল হক: শিক্ষক ও সাংবাদিক।

প্রথম আলো