তিন তালাক – ব.ম শামীম

সকাল হতে অঝর ধারায় বৃষ্টি হচ্ছে। চেম্বারে একা বসে আছে স্বাধিন। সকাল হতে একটি লোকে আসেনি আজ চেম্বারে । বৃষ্টির কারনে পাখিকূলদের ও চেচাঁমেচি নেই একেবারে । নিস্তেব্দ পরিবেশে । ইজি চেয়ারটির উপর বসে বসে বিরামহীন বৃষ্টির স্রোত ধারার মধ্যে চেতনাগুলো হারিয়ে গেছে স্বাধিনের। এভাবে কত ঘন্টা পেরিয়ে গেছে তারও খেয়াল নেই তার। এরি মাঝে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেছে। বৃষ্টি থেমে পশ্চিম দিগন্তে সূর্যের আভা ছড়াচ্ছে প্রকৃতি। তবে মেঘ মালার সাথে যুদ্ধ করে যে টুকু সূর্য কিরন এসে পৃথিবীতে পৌচাঁছে তাতে এখোনো অন্ধকার প্রাকৃতি। একটা অলসতা গ্রাস করছে স্বাধিনকে একবারে জানালা দিয়ে চারপাশে চেয়ে আবারও ইজি চেয়ারটির ওপর শুয়ে রইলো ও ।

এর মধ্যে হঠাৎ চেম্বারের নিচে চেচাঁমেচির শব্দে দরজা বরাবব চোখ মেলে তাকিয়ে ইজি চেয়ারটার উপর শুয়ে রইলো ও। একবারে ৬-৭ জন পরিচিত মুখ একসাথে ধরা পড়ছে এইবার আর রক্ষা নাই বলে চেম্বারের ভিতরে ঢুকলো । ঢুকেই বলতে লাগলো কঠিন বিচার অইতে অইবো। লন স্যার সামনে রহিম হিমাগারের ভিতরে বিচার অইবো। আপনে লন স্যার হেনে বিয়াও পড়াইতে অইতে পারে । আমাগো লগে লন স্যার। স্বাধিন এতোগুলো মুখের এক সাথে চেচাঁমেচিতে উঠে একবারে নিস্তেব্ধ লোকের মতো বসে আছে। একবারে প্রাকৃতির মতো সহজ শুরু বললো কি ধরা পড়ছে কোথায় ধরা পড়ছে তার কিছুইতো বুঝতে পারছিনা আমি। যারা ধরা পরেছে তাদের আমার চেম্বারে নিয়া আসতে বলো। আগে দেখি বিষয়টা কি?

এদের মধ্যে হতে একজন ফোন করে বললো ওই ওদের নিয়ে স্যারের চেম্বারে চলে আয় যা হওয়ার এখানেই হবে। চেঁচামেচি চলছেই । স্বাধিন আধো ঘুমে আধো জাগ্রত অবস্থায় চেয়ারের মধ্যে নিশ্চুপ অবস্থায় বসে আছে। কিছুক্ষন পর চারজন বয়স্ক এবং ৩ জন অল্প বয়স্ক লোক সাথে একজন মেয়েকে নিয়ে চেম্বারে হাজির হলো। স্বাধিন এবার হামগুরি দিয়ে চেয়ারের মধ্যে উঠে বসলো। বসে এদের মধ্যে মেয়েটির সাথে দাড়িয়ে থাকা বয়স্ক দাড়ি পাকা ব্যাক্তিটিকে চেয়ারে বসতে বলে জিজ্ঞাসা করলো কি হয়েছে? মুরম্বী লোকটা বলতে শুরু করলো এ মেয়েটা আমার নাতনি ওর নাম কেয়া । ইটালি থাকে একটা ছেলের সাথে ফোনে বিয়া পড়াইছিলাম। কিন্তু পনের দিন হয় ওই ছেলেটার সাথে চইলা আসছে। ছেলেটি তার বাবার সাথে দাড়িয়ে ছিলো। ইশারা করে ছেলেটির বাবাকে দেখিয়ে বললো ওনি আমার আপ্তীয় হয় আপ্তীয়র ছেলের সাথেই চলে আসছে। তাই দু-জনে মিলা সিন্ধান্ত নিছি এখোনি ওদের ছাড়াছাড়ি করমু। আমি ছেলের পিতাকে জিজ্ঞাসা করলাম এ লোক যা বলছে ঠিক আছে? সে বললো হে।

আমি ছেলে মেয়েদের জিজ্ঞাসা করলাম তারা কি বিয়ে করছে কিনা । ছেলের ভগ্নিপতি একটি কাবিন নামা (র্কোট ম্যারিজ) বের করে আমার হাতে দিলো বললো হে ওরা কোর্ট ম্যারিজ করেছিলো। এখোন ছাড়াছাড়ি করতে চাই। আমরা দু-পক্ষ্যে একমত হয়ে এসেছি। আমি মেয়েটির দিকে তাকিয়ে দেখলাম ১৩-১৪ বছরের একটি মেয়ে । সেলোয়ার ও পায়জামা পরিহিত । লম্বা একটি ওড়না দিয়ে তার সমস্ত শরীর পেচাঁনো। ছিপছিপে শরীর, কৌতুহলী দৃষ্টি। সে দৃষ্টিতে ভাবনার লেশ মাত্র নেই। একবারে আবেগহীন মনে হলো রাজকুমারীকে এই মাত্র কেউ ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলিয়েছে। তাই তার চারপাশের প্রকৃতি ও বাস্তবতা সম্পর্কে বুঝতে দেরি হচ্ছে। ভাবলাম সংসার জীবন সমন্ধে এর অভিজ্ঞতা এখোনো হয়ে উঠেনি। তার উপর বিয়ের বয়সও হয়নি। আবেগের বসত হয়তো ভূল করে ফেলেছে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলে খারাপ হয়না।


আমি কাজি সাহেব কে ডাকলাম। কাজি সাহেব আসলেন যথারীতি দু-পক্ষ্যের অভিবাবকের সম্মতি নিয়ে বিবাহ বিচ্ছেদ করতে শুরু করলেন। মেয়েকে জিজ্ঞাসা করলেন বিবাহে বিচ্ছেদে তার সম্মতি আছে কিনা সে নিদ্ধিদ্বায় বললো হু। ছেলেকে জিজ্ঞাসা করা হলো তার ঠোট দুটো সুধু নড়লো কি বললো বুঁজা গেলো না । কাজি সাহেব বললেন ইস্পষ্ট শুরু বলেন উপস্থিত সকলে কয়েকবার ছেলেকে তার সম্মতি আছে শব্দটি স্পষ্ট করে বলতে বললো। অবশেষে অভিবাবকদের ধমকের পর কোনরুপ আধো অস্পষ্ট আধো ইস্পষ্ট শুরে মুখ হতে বের হলো হ্যা। মনে হলো এখানে আসার পূর্বে তার শরীর এবং মনের উপর দিয়ে অনেক ঝড় ভইয়ে দেওয়া হয়েছে। যে ঝড়ের তোড়ে সে রাজি হয়ে বিবাহ বিচেছদ ঘটাতে এসেছে। যাই হোক কাজি সাহেব তালাক রেজেষ্টি করতে বসলেন। প্রথমে ছেলেকে এক দুই তিন তালাক পড়ানোর কাজ শুরু করলেন। ছেলেকে বললেন বলো এক তালাক দিলাম ।

ছেলেটি কাজি সাহেবে কথার উত্তরে যে কি বলছে তা উপস্থিত সকলের বুজাঁ বড় দায় হয়ে পড়লো। তার কন্ঠস্বর দিয়ে শুধু একটা গোংগানির শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ বের হলোনা। অভিবাবকরা ধমকাচ্ছে আমি ছেলেটার চেহারার দিকে তাকিয়ে দেখছি চোখ দুটো পানিতে টলমল করছে। সে কোন রুপ বললো এক তালাক এরপর কাজি সাহেব বললো বলো দুই তালাক। দ্বিতীয়বার একই অবস্থা ছেলেটার ঠোট দুুটো লড়ছে কিন্তু কোন শব্দ বের হচ্ছেনা। ছেলেটির মুখের পানে চেয়ে আমার কান্না পাচ্ছিল । আমি ছেলেটির মুখের পানে তাকাতে পারছিলাম না। ছেলেটির মুখ হতে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে বহিরের পানে তাকাতে দেখি পুরো প্রকৃতি ঘারো অন্ধকার হয়ে আছে । আমার চেম্বারের ছেলেটির চেহারার ছায়া যেন আমি প্রকৃতির মধ্যে দেখলাম, একই অভয় বৃত্তে যেন ছেলেটি আর প্রকৃতি গাঁথা। যাই হোক আগের মতো স্বরেই দ্বিতীয় তালক শব্দটি কাজি সাহেব কোন মতে ছেলের মুখ থেকে আদায় করে নিলেন।

এর পর কাজি সাহেব একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, এভাবে বললে হবেনা স্পষ্ট শুরে বলেন, তিন তালাক দিলাম। এতোক্ষনে উপস্থিত ছেলে ও মেয়ে পক্ষ্যের লোকজনের চোখ রক্ত চোখ হয়ে গেছে। আমি ছেলেটির মুখের পানে চেয়ে দেখলাম ছেলেটির মুখ শুকিয়ে একবারে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। সে সবার মুখের দিকে তাকিয়ে ঠোট দুটি শুধু তার কাপছেঁ সে কি বলবে তার ভাষা হারিয়ে ফেলছে। কাজি সাহেব বার বার বলছে বলুন তিন তালাক দিলাম। ছেলেটা বলে উঠলো তিন তালাক দিলাম বলেই কেমন হতভম্ব হয়ে গেলো। আমার মনে হলো সে যেনো কি বলেছে তা সে বুঝতে পারছেনা। ছোট বেলা মা যখন বাচ্চাকে পড়ায় পরো বাবু ক । ক মানে কি বা এটা কি কাজে লাগে বাবু কিন্তু সে সময় এটা বুঁেজনা মায়ের সাথে বলে ক। তেমনি কাজির সাথে বললো ছেলেটি তিন তালাক এতেই যে তার তিলে তিলে গড়ে উঠা ভালোবাসা শেষ হয়ে গেলো তা সে যেন বুঝতে পাড়লো না।

এর পর কাজি সাহেব মেয়েকে বললেন বলেন, আমি তালাক কবুল করে নিলাম। মেয়েটি সহজেই বলে ফেললো আমি তালাক কবুল করে নিলাম।


আমার মনে হলো হায়রে মেয়ে তোমার ভালোবাসা যে ভালোবাসার টানে তুমি ঘর ছেড়েছো। বিভিন্ন স্থানে আতœগোপন করে থেকেছো। সেই ভালোবাসা তোমার এতো রুগ্ন এতো তুচ্ছ। যাই হোক ছাড়াছাড়ি পাল্লাটি শেষ। কাজি সাহেব মেয়েকে বলে দিলেন, তুমি ছেলের সাথে আর যোগাযোগ করবা না। মেয়েটি ঘার নেড়ে অবয় দিলো। ছেলেটিকে একই কথা বললো কাজি সাহেব। ছেলেটির চোখ বেয়ে কফোটা চোখের পানি পড়ে গেলো। পরে ছেলের বাবা আর মেয়ের দাদা কোলাকুলি করতে শুরু করলো। ছেলের বাবা কাদঁতে লাগলো আর বলতে লাগলো আপন মেয়ের চেয়ে বেশি আদর করছি আমি আপনার নাতনিকে আর আপনে বলে কাদঁতে লাগলো সে।

আমি বুঝলাম এর পিছনে কোন এক গভির রহস্য লুকিয়ে আছে। তারপর ছেলের বাবাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলাম, কাদঁতাছেনঁই যদি তাহলে ছাড়াছাড়ি করলেন কেন? ছেলের বাবা কাদতেঁ কাদঁেত বললো কি আর করমু, একটা জিডি কপি পকেট হতে বের করে আমায় দেখিয়ে বললো হেড়া বড়লোক এই যে দেহেন আমাগো বিরুদ্ধে মামলা করছে । কইতাছে আমাগো জেল খাটাইবো। তারপর জামাই কইলো কেস মামলা অইলে ১ লক্ষ টাহা কাবিন অইছে হেই টাহা দেওনোই লাগবো। নাইলে জেল খাটোন লাগবো। এহোন স্বেচ্ছায় আমরা মাইয়া হেগো তালাক দিয়া দিয়া দিলে টাহাও দেওন লাগবো না জেলও খাটোন লাগবো না।

তাই চার পাঁচ জনে মেরে পোলাডারে তালাক দেওনের কথা রাজি কইরা ওরে লইয়া আইছি। আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম বুকের মধ্যে কোন এক আগ্নি ধারার স্পন্দন অনুভব করলাম । সেই অগ্নিধারার ধুমের কুন্ডলির স্পন্দন যেন একটি দির্ঘশ্বাস এর মধ্যে দিয়ে বের হয়ে এলো আমার। চোখ বুজেঁ সৃষ্টিকর্তার সানিদ্ধ খোজঁলাম আমি আর মনে মনে ভাবলাম,হায়রে বিধাতা প্রেম নামের তোমার দানের দায়ভার বহন করা যদি অনেকের মনে এতো কষ্টকর করে তুলো । তবে কেন তুমি এ দান সকল মানুষের মনে ঢালো। ধনি-দরিদ, উচু-নিচু মানুষ গড়লে যদি তবে প্রেম কেন দেও সম প্রকৃতির।

লেখক পরিচিতিঃ
ব.ম শামীম
সাংবাদিক ও একজন শিক্ষানোবিস আইনজীবী
মোবাঃ ০১৮১৮৪০৫০৮৯