অচেনা সম্পর্ক – ব.ম শামীম

তারবির নামজ শেষ করে মসজিদের বারেন্দায় দাড়াতেই মোবাইলটা বেজেঁ উঠলো। পাঞ্জাবির পকেট হতে বের করতেই মোবাইলটা ততক্ষনে বেঁজে বন্ধ হয়ে গেছে। অচেনা একটি না¤া^র মসজিদের পাশের সরু রস্তাটি দিয়ে হাটছে বর্ণ আর ফোনটি আবার বেজেঁ উঠার পতিক্ষার প্রহর গুনছে। প্রতিক্ষায় আর অপেক্ষায় হাটতে হাটতে একেবারে ঘরের কাছে এসে পরেছে সে। না শিকড়ে বালি ফোনটা আর আসছে না । ঘরে ঢোকার পরে যদি আবার আসে তাহলে মায়ের এক ঝাক পশ্নের সন্মূখিন হতে হবে তাকে। এতো রাতে কে ফোন করেছে কেন করছে সারাদিন রোজা রেখে এমনি হাজারো প্রশ্নের জবাব দেওয়ার চেয়ে একটু বেক করে দেখাই ভালো মনে হলো তার। আঙিনার পাশে ছোট কাঠাল গাছটার নিচে দাড়িয়ে ফোনটা বের করে কল করতেই ও পাশ হতে একটি ঘুম ভাঙ্গা কন্ঠস্বর বলো উঠলো কেমন আছেন? বলেই একটি লম্বা দির্ঘনিঃশ্বাস। মেয়েলি কন্ঠ শুনে বর্ন হকচকিয়ে জিজ্ঞাসা করলো কে আপনি?

আমি সাথি ইন্টারমেডিয়েট সেকেন্ড ইয়ার পরি।

বেশতো ভালো আমার কাছে ফোন করেছিলেন কেন?

এমনি।


এমনি মানে!

আমি খাবার খেতে বসেছিলাম তো তাই ফোন করেছিলাম।

মানুষ খাবার খবে এটাই স্বাভাবিক খাবার খাওয়ার সাথে ফোন করার সম্পর্কটা কি?

না আমি যখন খাবার খাই তখন কোন না কোন ভালো ও গুনি ব্যাক্তির সাথে কথা বলি তাই ফোন করেছিলাম।

আমি যে গুনি ব্যাক্তি তা আপনাকে কে বলেছে?

আমি জেনিছি।

আপনার জানাটা ঠিক নাও হতে পারে ।

না আমি জেনেছি আপনি একজন সাংবাদিক এবং একজন সুদর্শন সু-পুরুষ।

সাংবাদিক এবং সুদর্শন হলেই বুঝি গুনি হওয়া যায়।

তা যায় কিনা জানিনা তবে আপনি যে একজন গুনি লোক তা আমি জানি।

কিভাবে জানলেন?

তা যাই হোক জেনেছি, আপনি কি ভাত খেয়েছেন?

না এখোনো খায়নি তবে খাব।

তাড়াতাড়ি করে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়–ন । আবার সেহেরী খেতে তো উঠতে হবে তাই্ না? একদম আর দেরী করবেন না। আজ তাহলে রাখি পরে কথা হবে বলেই লাইনটা কেটে দিলো সে।

একবারে বিজ্ঞ লোকের মতে পরিপাটি কথা মনে হয় যেন সংসার এবং জীবনকে খুব কাছ হতে দির্ঘদিন যাবৎ দেখে আসছে সে। অনেকদিন হয় এমন উপদেশ শুনেনি বর্ণ। যাই হোক এতোদিন পরে উপদেশগুলো শুনতে খারাপ লাগলোনা ওর।

পরের দিন ইফতার খেতে বসেছে বর্ণ । খাওয়া প্রায় অর্ধেক হয়েগেছে। এরি মধ্যে সে নাম্বার হতে আবার মিস কল আসলো। বর্ণ মোবাইটার দিকে চেয়ে নাম্বারটা দেখে মনে মনে ভাবলো কিছুটা হলেও বাচাঁ গেলো যে মেয়েটা ফোন না করে ছোট একটা মিসকল দিয়েছে। যার শব্দটা মা শুনতে পায়নি । যদি কল করে বসতো তাহলে মায়ের জিজ্ঞাসার মুখে রোজা রেখে একরাশ মিথ্যা কথার অঞ্জলী ছড়াতে হতো তাকে।

ইফতার সেরে বর্ন চিন্তা করলো মেয়েটিকে ফোন বেক করবে কিনা।

ভাবলো না কোথাকার কোন মেয়ে যেভাবে বিজ্ঞ লোকের মতো উপদেশ দেওয়া শুরু করে ফোন বেক করলে এখোন আবার কি উপদেশ দেয়। সারাদিন রোজা রেখে উপদেশ শুনতে এখোন আর ভালো লাগবে না ভেবে ফোন বেক করলো না ও।

একটু পরেই এশার নামাজের আযান হতে শুরু করলো বর্ন ঘর হতে পাঞ্জাবীটা পরে মাথায় টুপি দিয়ে মসজিদের দিকে হাটতে শুরু করলো। যাথারীতি তারাবির নামাজ শেষ না হতেই বর্ণের মোবাইলে দুটি কল আসলো। নামাজের মধ্যে মোবাইল সাইলেন্ট করা থাকলেও বর্ণ ঠিক বুঝতে পারছিলো কে যেন কল করছে। বর্ণ ভাবলো নিশ্চিয় কোন জরুরী ফোন হবে তানাহলে নামাজের মধ্যে একবার নয় দুইবার ফোন আসার কথা নয়। নামাজের সালাম ফিরিয়ে পকেট হতে মোবাইটা বের করে তাকাতেই দেখে সেই মেয়েটার নাম্বারটি। এবার মনে মনে খুব বিরক্ত হলো বর্ণ। যাইহোক তারপর আবার নামাজ পড়া শুরু করলো সে । নামাজ শেষ করে মসজিদ হতে বের হতেই আবার সে নাম্বার হতে কল আসতে শুরু করলো বর্ণ বিরক্ত হয়ে মোবাইলটি রিসিভ করলো না। আবারও কল আসলো এবার বর্ণ ভাবলো না মেয়েটির কোন বিপদ হলোনা তো !

মোবাইলটা রিসিভ করতেই ও পাস হতে সেই মেয়েটির কন্ঠস্বর ভেসে আসলো হ্যালো কেমন আছেন?

ভালো, এতোবার রিং করতেছেন কেন! কি হয়েছে আপনার?

কই কিছু হয়নিতো!

তাহলে এতো রিং করছেন কেন?

ভাত খাচ্ছিতো তাই।

মি. বিথি আপনি আসলে কেন আমার কাছে বার বার ফোন করছেন বলবেন কি?

আমি বিথি নই সালমা জাহান সাথি। সালমা জাহান হলো আমার দাদি আর সাথি হলো আমার বাবা সব মিলিয়ে আমার পুরো নামটি হলো সালমা জাহান সাথি।

আচ্ছা ঠিক আছে মি. সাথি এবার বলেন তো আমার কাছে আপনার চাওয়া পাওয়াটা কি?

সাথি-আপনি কি রাগ করছেন, রাগ করলে আর ফোন দিবোনা খুব করুন শুরে বললো সাথি। সাথির করুন শুরটি শুনে খুব মায়া হলো বর্নের।

বর্ণ বললো আচ্ছা বলুনতো নামাজের মধ্যে ফোন দিলে রাগ না হয় কার।

সরি আমি বুঝতে পারিনি আপনি নামাজ পরছিলেন। আচ্ছা ভাইয়া আপনাদের মসজিদে নামাজ শেষ হয় কটায় ?

পৌনে দশটায়।

আচ্ছা ভাইয়া আজ তাহলে রাখি বলেই ফোনটি কেটে দিলো সাথি।

এর পরের দিন তারবীর নামাজ শেষে পৌনে দশটায় মসজিদ হতে বের হতেই সাথির ফোন।

বর্ণ-ফোনটা ধরেই বললো কই আজতো এখোন আর খাচ্ছেন না। ফোন দিলেন কেন?

সাথি- কে বললো আমি খাচ্ছি না মুখে কিছু খাবার নিয়ে তা চিবিয়ে খাবার শব্দ করে বললো এই যে শুনুন আমি খাচ্ছি।

বর্ণÑ আপনি কয়টা হতে কয়টা পর্যন্ত খান একটু বলবেন কি?

সাথি- কেন বলুন তো?

বর্ণ- না কোন দিন রাত ৯টা বাজে ফোন করে বলেন খাচ্ছেন, আজ আবার পৌনে দশটা বাজে ফোন করেও বলছেন খাচ্ছেন এজন্য জিজ্ঞাসা করলাম।

সাথি- আগে নয়টা বাজে খেতাম আজ হতে চিন্তা করছি পৌনে দশটা বাজে খাওয়া শুরু করবো ।

বর্ণ- কেন?

সাথি- আপনার সাথে কথা বলার জন্য।

বর্ণ- আমার সাথে কথা বলার জন্য মানে?

সাথি- আপনার সাথে কথা বলার জন্য যদি রাত ৩ টা বাজেঁ খেতে হয় তাহলে রাত ৩ টা বাজেই খাবো আর কথা বলবো।

বর্ণ- পাগলামী রাখুন।

সাথি- ভাইয়া আপনি আবার রেগে যাচ্ছেন। সারাদিন কি কখনো আমি আপনায় ফোন করে বিরক্ত করি। আমি জানি আপনি সারাদিন ব্যাস্ত থাকেন আর তাই রাতে একটু ফোন করি। তাও যাদি আপনি বলেন, আচ্ছা আর না হয় কোন দিন আপনার মোবাইলে ফোন করবনা বলেই কাদঁতে শুরু করলো সাথি।

বর্ণ- এই আপনি কাদঁবেন না। আপনার যখন মন চায় যতো মন চায় আপনি ফোন করেন, কিন্ত কাঁদবেন না প্লিজ। আমি কান্নাকাটি একদম সহ্য হরতে পরিনা।

সাথি- সত্যি বলছেন তো।

বর্ণ- এতদম সত্য বলছি।

এরপর হতে রাতের বেলাই রোজার মধ্যে প্রতিদিনই ফোন দিতো সাথি।

সেদিন সোমবার বিকেলে চেম্বার বসে আছে বর্ন । হঠাৎ করে বিকেল বেলা সাথির ফোন । মোবাইলের দিকে চেয়ে যেন বিশ্বাস হচ্ছিলোনা বর্নের একবার ভাবছিলো রোজার মধ্যে সাথি দুপুরে ফোন করতে পারেনা কারন ও যখন খাবে তখন আমায় ফোন করার কথা হয়তো ভূলে ঢুকে গেছে। যাই হোক তারপরেও একটু রিসিভ করেই দেখা যাক ভেবেই ফোনটা রিসিভ করলো বর্ণ।

ফোনটা রিসিভ করতেই

হ্যালো কেমন আছেন ভাইয়া?

বর্ণ- একবার সতেজ কন্ঠে এই শব্দটি শুনে চমকে উঠে বললো দুপুর বেলায় ফোন এমন তো হবার কথা ছিলোনা।

সাথি ঃ কি আর করবো ভাইয়া খাচ্ছিলাম তো, তাই আপনার কথা মনে পড়ে গেলো ফোন না করে পারলাম না।

বর্ণ- খাচ্ছিলেন মানে রোজার মধ্যে দুপুর বেলা আপনি খাচ্ছিলেন? দুষ্টমী করার আর জিনিষ পেলেন না।

সাথি- ভাইয়া আজকে রাতে আমাকে সেহেরী খেতে কেউ ডাক দেয়নি তাই রোজা রাখতে পরিনি। এ জন্যই খাচ্ছিলাম। খেতে খুব লজ্জা লাগছে। তার পরও কি করার খাচ্ছি। আর যাই হোক খাচ্ছি বিধায় আপনাকে ফোনও করছি।

বর্ণ- লজ্জা নারীর ভূষণ। তাই নারীদের এ ব্যাপারে অভিজ্ঞতা বেশি আপনারও তাহলে এ দূর্লভ জিনিষটা আছে দেখি। যাই হোক তাহলে আজ কমপক্ষ্যে ইফতারের সময়ে ফোনে কথা বলার থেকে রেহাই পেলাম আমি।

সাথি- না কোন সম্ববনা নাই । আপনার কি ধারণা রোজা রাখি নাই বলে আমি ইফতার করবো না। ইফতার খাওয়া সওয়াবের কাজ আর খেয়ে যদি সোওয়াব অর্জন করা যায় তাহলে এ কাজ্টা কে না করবে। আমি তাই অবশ্যই ইফতার খাবো এবং আপনাকে ফোনও করাবো।

বর্ণ ঃ ও তাই যাই হোক আর যাই করেন ইফতারের একটু পরে ফোন করেন, তা নাহলে মায়ের রোষানলে পরে রোজা রেখে একগুচ্ছ মিথ্যা কথা বলতে হবে।

হু বলে ফোনটা কেটে দিলো সাথি।

তারপর হতে নিয়মিতই বর্নের কাছে ফোন করতো সাথি। বর্ণ মাঝে মাঝে খুব বিব্রত বোধ করতো আর ভাবতো আসলে মেয়ের লক্ষ্য উদ্দেশ্যটা কি? প্রেম টেম কিছু নিবেদন করবে নাতো। সেদিন পূর্নিমা রাত বাড়ির সামনের বাগানের মধ্যে দাড়িয়ে চাদেঁর উপড় দিয়ে মেঘদের উড়ে যাওয়ায় দৃশ্য দেখছে বর্ণ। মেঘগুলো পূর্ব আকাশ হতে পশ্চিম গগনে সাতরিয়ে কোন এক সীমাহীনতায় হারিয়ে যাওয়ার দৃশ্যগুলো বর্নকে বেশ আবেগপ্লুত করে তুললো। বর্ন আপন মনে গান গাইতে শুরু করলো আকাশ পানে ঐ অনেক দূরে যেমন করে মেঘ যায়গো ওড়ে। গান গাওয়ার মধ্যে মোবাইল বেজে উঠলো ওর । মোবাইলটি পকেট হতে বের করে রিসিভ করেও গান গাইতে থাকলো বর্ন । ও পাশে সাথি নিরব হয়ে বর্নর গান শুনতে লাগলো। গান শেষ হতেই শত প্রশংসা সাথির মুখে। সাথি এ প্রথম বর্নকে জিজ্ঞাসা করিলো ভাইয়া ভাবি কোথায়?

বর্ণ ভাবির কথা শুনে হঠাৎ স্তমিত হয়ে গেলো। একটা ভাবনা ওকে গ্রাস করলো ভাবলো এ কেমন অনাকাক্ষিত প্রশ্ন। বর্ন এখোনো বিয়ে করেনি । ভাবি আসবে কোথা হতে ।

সাথি- আবার বলতে লাগলো ভাইয়া আপনি যে আমার সাথে কথা বলেন এতে ভাবি কিছু মনে করেনা।

বর্ণ আবার বিব্রত বোধ করে বললো না সেতো তার বাবার বাড়ি গেছে।

সাথি ও তাই। ভাবি ফিরবে কবে?

বর্ণ-তাতো বলতে পারচ্ছিনা।

সাথি-আপনার ছেলে মেয়ে কয়জন?

বর্ণ-আবার বিব্রত বোধ করে বললো এখনো হয়নি।

সাথি- ও আচ্ছা

বর্ণ ভাবতেছে এতোগুলো মিথ্যা কথা সে কেনো বললো আবার ভাবলো মেয়েটির তার সাথে প্রেম করার ইচ্ছা থাকলে সে কেটে পরবে মিথ্যা কথা বলে ভালোই হয়েছে। কিন্তু না তা কিন্তু হলো না। সাথি আগের চেয়েও বেশি ফোন করতে শুরু করলো। একদিন বর্ন সাথি কে জিজ্ঞাসা করলো আচ্ছা সাথি তুমি একটা সত্যি কথা বলবে ।

সাথি- কি ভাইয়া?

প্রত্যেক মানুষেরইতো একটা চাওয়া পাওয়া বা উদ্দেশ্য থাকে তুমি আমার নিকট আসলে কেন ফোন করো তোমার লক্ষ্য উদ্দেশ্যটা কি?

সাথি-আপনার সাথে প্রেম করার জন্য,বলেই হেসে উঠলো ও।

বর্ণ-আমিতো বিয়ে করে ফেলেছি।

সাথি-তাতে কি বিয়ে করলে কি প্রেম করা যায়না।

বর্ণ -আবার ঠাট্টা করছো।

সাথি- যাই হোক ভাইয়া আপনার আমার সাথে প্রেম করতে হবে না । আমি বিপদে পড়লে একটু উদ্ধার করলেই হবে।

বর্ণ- তোমার আবার কি বিপদ

সাথি- কেন ভাইয়া আমি কি মানুষ না আমার কি বিপদ হতে পারেনা।

বর্ণ- তা পারে তবে কি বিপদ বলো দেখি তোমার কোন উপকার করতে পারি কিনা। আরেক দিন বলবো বলে লাইনটা কেটে দিলো সাথি।

তারপর হতে সাথির ফোন করার পরিমান দিন দিন বড়তে লাগলো। সময় অসময়ে দিনে ১০-১২ বার ফোন করতে লাগলো ও । যদিও অধিকাংশ সময়ই ফোন ধরতাম না বর্ণ। তারপরও নামাজের সময় এমনকি গভীর রাতেও ফোন করতো ও। তবে কোন দিন ওর ফোন বর্ণ রিসিভ করিনাই কেন এর কারন জানতে চায়নি সাথি। বর্ণ প্রায়ই ওকে বলতো তুমি যদি সারাক্ষন আমায় এতো ফোন করো তাহলে আমি কাজ করবো কখন এতো ফোন করোনা। ও সুধু বলতো আচ্ছা ভাইয়া ঠিক আছে বলে গভীর হয়ে থাকতো কিন্তু তারপর সে আবার আগের মতোই নিয়মিত ফোন করতো। মাঝে মাঝে আমি গভীর কন্ঠ করে ফোন ধরে বলতাম কেন ফোন করেছো বলো। ও অনেক ক্ষন চুপ করে থেকে বলতো এমনি । আমি জিজ্ঞাসা করতাম তোমার কি আর কিছু বলার আছে ও চুপ করে থেকে বলতো আরেক দিন বলবো বলেই লাইনটি কেটে দিতো। আমি মনে মনে ভাবতাম সাথির এ আরেকদিন বলবো কথাটা কবে যে শেষ হবে। তবে ইদানিং সাথিকে খুব চিন্তিত মনে হয় । মনে হয় ও কি যেন আমায় বলতে চায় আমি সাথিকে অবয় দিয়ে বলি বলো তোমার কি বলার আছে তুমি নির্ভয়ে বলো আমি কিছু মনে করবোনা। বলো। সে বলতো ভাইয়া আমি আপনায় তেমন কিছু বলবো না যা আপনি ভাবছেন। আমি আপনায় একদিন বলেছিলাম না আমি বিপদে পরলে বলেই সাথির কন্ঠস্বরটা রোধ হয়ে এলো থেমে গেলো ও। আমি বললাম বলো তোমার কি বিপদ বলো আমায়, তুমি যদি না বলো তাহলে আমি কি করে তোমার উপকার করবো বলো আমায়। না থাক আরেকদিন বলবো বলেই চুপ হয়ে গেলো ও। এবার বর্ণ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলো আরেকদিন বলবো এ শব্দটা তুমি এ পর্যন্ত কতদিন বলছো মনে আছে তোমার। হিসাব করলে মনে হয় কয়েকশত বার হবে। তোমার কি এমন বিপদের কথা যে বলা যায়না। আর যদি বিপদের কথা নাই বলতে পারো তাহলে ফোন করো কেন?

তুমি তোমার বিপদ নিয়ে থাকে আরে কোনদিন আমার মোবাইলে ফোন করবানা বলেই লাইনটা কেটে দিলো বর্ণ।

এর পর কাজের মধ্যে কয়েক ঘন্টা সময় কেটে গেছে বর্ণের। বর্ণ ভাবলো না মেয়েটার সাথে এমোন ব্যাবহার করা হয়তো তার ঠিক হয়নি। ছোট মানুষ সাথি আবেগ প্রবন হয়ে হয়তো ওর কথাগুলো ও বলতে পারছে না । একটু ফোন করে ওকে সান্তনা দেওয়া যাক। ফোন বেক করতেই দেখে নাম্বারটি বন্ধ । বর্ণ ভাবলো হয়তো দুপুরের খাবার খেয়ে ঘুমিয়েছে। পরে উঠে ও নিশ্চয় ফোন করবে। সারাদিন ব্যাস্ততার মাঝে কেটে গেলো বর্ণের রাতের খাবার খেয়ে সোপার উপর বসে আছে ও বসে বসে কোথায় কিশের যেন এক অপূর্নতা ওকে গ্রাস করতে লাগলো। মনে হলো কি যেন ওর পাশে নাই কোথায় যেন কিশের একটা অভাব ওকে তারা করে গেলো। পরক্ষনে মনে হলে সাথির কথা মোবাইলটা হাতে নিয়ে ফোন করতেই আবারো সাথির মোবাইল বন্ধ পাওয়া গেলো। কয়েকবার ফোন দিলো ও কিন্তু না নাম্বারটা বন্ধ। ভাবলো হয়তো মোবাইলে চার্জ নেই অথবা শরীর খারাপ ফোন দিবে নিশ্চয়।

পরের দিন যথারিতি কাজের তাগিদে বাড়ি হতে বের হলো সে । সারদিন গড়িয়ে দুপরের খাবারের সময়ও শেষ হয়ে এলো কই একটি বারও সাথির ফোন এলো না। মাঝে মাঝে মোবাইলের দিকে তাকাচ্ছে বর্ণ। ফোন আসলেই মনে হচ্ছে এটা বুঝি সাথির ফোন নাম্বার দিকে চেয়ে হতাশা না সাথি তো না। কোন অচেনা নাম্বার হতে ফোন আসলে গভির আগ্রহ নিয়ে রিসিভ করে ভাবছে হয়তো সাথি হতে পারে।

চেম্বারের ভিতর চেয়ার মধ্যে বসে বর্ণ ভাবছে সত্যি সাথির কোন বিপদ হলো নাতো। ওর বাড়িটা যেন কোথায় ভাবতে লাগলো বর্ণ। না ওর বাড়ি কোথায় তাতো সাথি কোনদিন বলে নাই আমায় ও শুধু বলেছিলো একদিন ওদের বাসায় আমায় দাওয়াত করবে। আমি যাবো কিনা গভির আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলো ও । এর বেশি কিছু মনে পরছেনা বর্ণের। ভাবতে ভাবতে চেয়ারের উপর ঘুমিয়ে পরছে বর্ণ। হঠাৎ করে ঘুমের মধ্যে মোবাইল বেঁজে উঠলো। বর্ণ মোবাইলটা রিসিভ করে কঠিন শুরে এই মেয়ে এই সারাদিন ফোন করোনি কেন? কোথায় ছিলে সারাদিন। তুমি না কি বিপদ আপদের কথা বলছিলে তোমার কোন বিপদ হয়নি তো?

এদিক দিয়ে উৎকন্ঠা ভরে একটি কান্নার আওয়াজ শুনতে পেলো বর্ণ । বর্ণ এ বাবা কি হইছে তোর তুইকি পাগল হয়ে গেলি নাকিরে। হে কি কইতাছস তুই। কইগো তোমরা আমার বর্ণ এটা কি কয় হুইনা যাও বলেই চিৎকার শুরু করছে মা। বর্ণ মায়ের কান্নার আওয়াজ শুনে চেয়ার হতে লাফ দিয়ে দাড়িয়ে মা মা আমার কিছু হয়নি আমি ঠিক আছি মা। আমার কিছু হয়নি। তুই যে একটু আগে কি যেন আবোল তাবোল বলছিলি। সারাদিন বাড়িতে আলিনা রাত হইয়া গেলো এহোন আবার আবোল তাবোল কহতাছোস তোর কি আইছে বাবা সত্যি কইরা কতো আমায়। না মা আমার কিছু হয় নাই আমি দুষ্টামী করতেছিলাম। এমন করে কি কেউ দুষ্টামি করে। এরি মধ্যে মায়ের চারিপাশে একাধিক কন্ঠের শব্দ শুনা যাচ্ছে। মায়ের চিৎকার শুনে বাড়ির চারপাশের লোকজন জমা হয়ে গেছে। ছোট কাকা ফোন ধরে কিরে কি হয়েছে তোর ? তার মারে কি কইছস? সে কানতাছে কে? কই তুই? এমনি হাজারো প্রশ্ন এক সাথে। আমি বললাম আমার কিছু হয়নি । এইতো কিছুক্ষনের মধ্যেই বাড়ি ফিরে আসছি আমি। আসলে বর্ণ গভীর ভাবনার মধ্যে ঘুমিয়ে কখন যে দিন গড়িয়ে রাত হয়ে গেছে তা টের পায়নি ও।

যাই হোক ঘুম থেকে উঠেই খুব ক্ষুদা অনুভব হলো তার। মনে পড়লো দুপুরে কিছু খাওয়া হয়নি। একবার ভাবলো নিচের হোটেল হতে কিছু খেয়ে নিবে। আবার ভাবলো না দেরী ্হলে মা আবার কি লঙ্কা কান্ড ঘটিয়ে বসে বলা যায়না। ভেবে বাড়ির দিকে রওনা হলো সে।

তারপর হতে বেশ কিছু দিন কাজে মন দিতো পারছিলোনা বর্ণ। গভীর কাজের মধ্যে কিসের যেন এক অপূর্ণতা থামিয়ে দিতো তাকে। সারক্ষন তার মনে হতো কি যেন হারিয়ে গেছে তার। বেশ কিছু দিন হয়ে গেছে একটি বারও ফোন করেনি সাথি। শত ব্যাস্ততার মাঝেও সাথির নাম্বারে ফোন করে নাম্বারটি বন্ধ পেয়েছে বর্ণ। ফোন আসলেই গভীর আগ্রহে পকেট হতে মোবাইলটা বের করে অচেনা নাম্বার হলেই চেম্বার হতে বের হয়ে বারেন্দায় এসে রিসিভ করতো বর্ন । ভাবতো এই বুঝি সাথির ফোন। অনেক সময় চেয়ারের মধ্যে বসে মোবাইলটির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে পড়তো চেম্বারে।

সেদিন রাতের বেলা মায়ের সাথে ক্ষেতে বসেছে বর্ণ । হঠাৎ করে অচেনা একটি নাম্বার হতে একটি মিস কল আসলো। অর্ধেক খাওয়া রেখে হাত ধুয়ে বর্ণ ভাবলো নিশ্চিয় সাথির ফোন। কারন সাথিতো এই সময়ই বেশি ফোন করতো। উঠে বাইরে গিয়ে ফোন বেক করতেই স্যার আমাগো ওরা মাইরা ধইরা বাড়ি হতে বের কইরা দিছে নিউজটা একটু কইরা দিবেন স্যার। আরো ঘেন ঘেন করে কি যেন বললো লোকটা। বর্ণ এর আগা মাথা কিছুই বুঝলো না। একটু পরে এমনি কেটে গেলো লাইনটা।

ফোনটা শেষ করে ঘরে আসতেই মা বললো বাবা একটি কথা বলবো।

বর্ণ- বলো ম্

মা- বাবা তোকে ইদানিং খুব চিন্তিত মনে হয়। আমি লক্ষ্য করে দেখেছি তুই ফোন আসলেই দৌড়ে যাস। মাঝে মাঝে ফোনের দিকে তাকাইয়া থাকোস। গভির রাতেও জাই¹া থাকোস। কি হইছে তোর। বাবা তোর কি কেউ পছন্দের আছে থাকলে আমায় বল। কতদিন হইছে তোরে বিয়া করতে কইতাছি তুই বিয়া করোছনা। কেউ প্রছন্দের আছে কিনা তাও কছনা। ইদানিং তোর চলাফেরা আমার ভালো লাগেনা। যদি কেউ থাকে আমারে বল। মেয়ে যে ঘরেরই হোক আমার কোন আপত্তি নাই । আমাদের তো এখোন আর কোন অভাব নাই । তোর সুখই আমার সুখ । বল আমায় বাবা।

মায়ের কথা শুনে বর্ণ যেন বোবা হয়ে গেলো । মায়ের মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে রইলো সে। মাকে জড়িয়ে ধরে বললো তুমি যা ভাবছো মা তানা। আসলে আমার একটি অন্য জরুরী ফোন আসার কথা সেটির জন্য অপেক্ষা করছি।

মা-অন্য কি এমোন জরুরী ফোন আমায় বলা যায়না।

বর্ণ- মা এটা ব্যাবসায়ী ফোন তুমি বুঝবে না।

যাই হোক তার পর হতে আস্তে আস্তে সাথিকে ভূলেই যাচ্ছিল বর্ণ । মাঝে মাঝে মনে হলে ওর নাম্বারে ফোন করতো ও। ফোন করলেই নাম্বারটি বন্ধ পাওয়া যেতো।

সেদিন বিকেল সাড়ে ৪ টা লাঞ্চ সেড়ে চেম্বারে বসে আছে বর্ণ। হঠাৎ করে কলেজ ড্রেস পড়া বই খাতা হাতে দুইটি মেয়ে বর্ণের চেম্বারে প্রবেশ করলো। বর্ণ তাদের বসতে বললো । তারা বললো না বসবো না। আপনার একটি চিঠি আছে এই নিন বলে একটি সাদা খামে চিটি বর্ণের টেবিলের উপর রেখে দিলো । বর্ণ জিজ্ঞাসা করলো কার চিঠি? মেয়ে দুটি বললো সাথির বলেই চলে গেলো। বর্ণ গভির আগ্রহ নিয়ে চিঠিটি হাতে নিয়ে খুলতে লাগলো।

চিঠিটি হাতে নিয়ে পড়তে লাগলো বর্ণ

ভাইয়া আসা করি ভালো আছেন। ভালো থাকেন এই দোয়া করি। তোমার হাতে এ চিঠি পৌছাঁর পর আমি কেমন থাকবো তা কেবল সৃষ্টি কর্তাই ভালো বলতে পারবে। কেননা সে সময় আমি এমোন এক জগতে থাকবো যেখানে মানুষ কেমন থাকে তা তারা বলতে পারেনা। কেবল সৃষ্টিকর্তা বলতে পারে। ভাইয়া আমি তোমায় অনেক বিরক্ত করেছি সে জন্য ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আপনি ব্যাস্ততার মাঝে আমায় অনেক সময় দিয়েছেন অন্য কেউ হলে হয়তো এতোটা সময় দিতো না। তার জন্য কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। ভাইয়া আসলে আপনি বার বার জানতে চেয়েছিলেন আমি কেন এতো আপনায় বিরক্ত করি? আমি আসলে কোন দিন আপনায় বলতে সাহস পায়নি। কারন আমি আপনায় আমার আপন বড় ভাইয়ের মতোই জানতাম এবং শ্রদ্ধা করতাম। আমার জীবনে এমন কিছু ঘটে গেছে যা আসলে বড় ভাইয়ের সামনে সব ছোট বোনেরা বলতে সাহস ও শস্তি বোধ করেনা।

যাই হোক এখোনতো আমি অনেক দূরে বলতে আর কোন বাধা নেই । আমি একটি ছেলেকে ভালোবাসতাম। ভালোবাসা বলতে আমার কলেজে যাতায়াতের পথে একটি ছেলে আমার পিছনে ছায়ার মতো লেগে থাকতো। একদিন দুদিন করে ওর সাথে আমার কিছুটা সর্ম্পক হয়েছিলো। সেটা একবারেই তেমন গভীর নয়। কিন্তু আমি যখন জানতে পারলাম ছেলেটি মাদকাগ্রস্থ সন্ত্রাসী ধরনের একটি ছেলে। আমি ওকে অবজ্ঞা করে চলতে শুরু করলাম। কিন্তু ও বিভিন্নভাবে আমায় বিরক্ত করতে শুরু করলো। আমি ওকে বুঝালাম দেখো আমার বড় কোন ভাই নেই।। আমরা বড় দুটো বোন আর ছোট দুটো ভাই। বাবা বিদেশ থাকে এ ছাড়া এখানে আমাদের আপন আর কেউ নেই। তোমার সাথে আমারতো সে ধরনের কোন সর্ম্পক হয় নাই । যাষ্ট একদিন নদীর পারে আমরা ঘুরতে গিয়েছিলাম। তুমি আমাকে ভালোবাস বলেছো। আমি বলেছি তোমায় ভেবে জানাবো। আমি অনেক ভেবে চিন্তে দেখলাম এখোন যদি আমি তোমার সাথে প্রেম করে বেড়াই তা হলে আমার লেখা পড়ার ক্ষতি হবে। আমার বাবা, আর দু-এক বছরের মধ্যে দেশে ফিরে আসবে তার ভিসার মেয়াদ শেষ। আমার ছোট দুইটি ভাই তাদের উপার্জন করতে অনেক দেরী। আমাকে লেখাপড়া শিখে কিছু উপার্জন করতে হবে। প্লিজ আমায় বিরক্ত করো না। আমায় লেখাপড়া করতে দাও। কিন্তু ঐই ছেলেটি আমার কথা শুনলো না । সে আমায় বললো এ কলেজে যদি পড়তে হয় তাহলে তার সাথে প্রেম করতেই হবে। ডেটিংয়েও যেতে হবে। তা নাহলে লেখাপড়া বন্ধ। আমি তার চোখ ফাঁকি দিয়ে ভোর বেলায় কলেজে চলে যেতাম ফিরার সময় একেক দিন একেক পথ দিয়ে ফিরতাম। কিন্তু তারপরেও ও আমায় বিরক্ত করতে লাগলো। আমায় হাত ধরে টেনে ঘুরতে নিয়ে যেতো চাইতো। বন্ধবিদের মাঝে আমি খুব বিরক্তবোধ করতে লাগলাম। একবার ভাবলাম আম্মাকে কথাটা বলি। আবার ভাবলাম না আম্মাকে বললে হয়তো লেখাপড়া বন্ধ করে দিবে। তাহলেতো আর বড় হয়ে আব্বার দূ:খ ঘোচাঁনোর উপায় থাকবোনা।

ওর তিক্ততার মাঝেই আর হাজারো কুটোক্তি আমায় সহ্য করেই প্রতিদিন কলেজে যেতে হতো। বান্ধবীদের সাথে আলাপ করলাম কি করা যায়। বন্ধবীরা আমায় বললো ও এলাকায় খুবই শক্তিশালী তাই যে কাউকে দিয়ে ওকে সায়েস্তা করা যাবেনা । ওকে সায়েস্তা করতে হলে ক্ষমতাসম্পন্ন কোন ব্যাক্তি প্রয়োজন। আমার কোন ক্ষমত্বা সম্পন্ন ব্যাক্তির সাথে পরিচয় কিংবা কোন আতিœয় আছে কিনা জানতে চাইছিলো ওরা। আমি বলেছিলাম না। এমোন সময় আমার এক বান্ধবী আপনার একটি ভিজেটিং কার্ড বের করে দিয়ে বলেছিলো এ লোকটি সাংবাদিক এবং একজন এডভোকেট। তার সাথে সর্ম্পক গড়তে পারলে সে তোর উপকার করতে পারে। তাই আপনার সাথে সর্ম্পক গড়ার জন্যই ফোন করতাম আমি। কিন্তু আপনার সাথে কথা বলে আপনাকে নিজ বড় ভাইয়ের মতোই মনে হয়েছে আমার। তাই ঔই ছেলের সাথে ঘুড়তে যাওয়া পরবর্তীতে তার উত্যাক্ততার বিষয়টি কেন যেন বারবার বলতে চেয়েও বলতে পারিনি আমি।

সেদিন যেদিন আপনি আমার উপর খুব রাগ করে আমায় আর ফোন করতে নিষেধ করলেন। সেদিন কলেজ হতে ফিরার পথে বান্ধবীদের মধ্যে হতে আমায় তুলে নিয়ে গিয়ে ছিলো বখাটে ছেলেটা। আমায় জোর করে রিক্্রায় উঠিয়ে কলেজ হতে নদীর পরে নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে বলে তুই আমার সাথে প্রেম করবি তা নাহলে তোকে র‌্যাপ করবো আমি, বলেই আমার গায়ে হাত দেয় ও। এদিক দিয়ে আমার বান্ধবীরা এলাকায় খবর দিলে কলেজ শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রী এলাকার লোকজন সবাই এগিয়ে গেলে ও পালিয়ে যায়। এরপর আমার মায়ের সাথে বাড়ি ফিরে আসি আমি। আপনার কাছে সে দিন ফোন করার পর মায়ের কাছে সব কথা খুলে বলি আমি। এরপর মা আমার নিকট হতে মোক্ষাইল ফোনটি নিয়ে যায়। বলে তোমার আর কলেজে যেতে হবেনা মোবাইলোও ব্যাবহার করতে হবেনা। বাড়িতেই থাকবে তুমি। যাই হোক তার পর হতেই এলাকাবাসীর মুখে বিভিন্ন গঞ্জনা শুনতে হয় আমাদের। আমাকে নিয়ে ওরা বিভিন্ন কুটুক্তি করতে থাকে। আমাদের প্রতিবেশীদের সাথে জমির সীমানা নিয়ে বিরোধ চলে আসছিলো তারা আমাদের বিরুদ্ধে চারিপাশের লোকজনদের ক্ষেপিয়ে তুললো। আমি ওই ছেলেটির সাথে স্বেচ্ছায় অনৈতিক কাজ করেছি অপবাদ দিয়ে আমাদের সমাজ থেকে একঘেরে করলো। খবর পেয়ে বাবা বিদেশ হতে ফিরে আসলেন। বাবাকে ওরা নানা গঞ্জনা ও লাঞ্চনা দিতে লাগলো। বাবা আমায় জড়িয়ে ধরে শুধু কাদঁেতা। এরি মধ্যে সে বখাটেটাও এলাকায় ফিরে এলো। সে বাবাকে পেলেই লোকজনের সামনে বলতো তোমার মেয়ের সাথে আমার দির্ঘদিন বিভিন্ন অনৈতিক মিলামিশা হইছে । আমার সাথে তোমার মেয়ের বিয়ে দিয়ে দাও। এ সময় এলাকার লোকজন বাবাকে নানা কুটুক্তি করতো। মাকে বললাম একটি বার শুধু আমাকে মোবাইলটা দিতে আপনার সাথে একটু কথা বলতাম। কিন্তু মা আমায় মোবাইল দিলেন না। বললো তোর মতো মেয়ে জন্ম দিয়ে আজ আমাদের এই দশা। তুই আবার মোবাইল চাস সাহসতো তোর কমনা। আমি নিজের বিবেকের কাছে জানতে চেষ্টা করলাম কি আমার অপরাধ ? কিন্তু কোন উত্তর খুজে পেলামনা। বাবা আমার বিয়ে দিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেন। কোন বিয়ের প্রস্তাব এলেই সেই বখাটে ছেলেটি সহ এলাকার লোকজন ভাংগানি দিতো। কোন ভালো ছেলে খুজেঁ না পেয়ে বাবা ৪০ বছরের বয়স্ক বিবাহিত এক পাত্রের সাথে আমার বিয়ে ঠিক করলেন। যথারিতি বিয়ের আগের দিন সেই বখাটে ছেলেটা আমাদের বাড়িতে এসে হাজির হলো, বললো আমায় বিয়ে দিতে হলে তাদের দুই লক্ষ টাকা চাদাঁ দিতে হবে। বাবা এবার ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলো। ওরা আমার চোখের সামনে বাবাকে পিটিয়ে লাথি মেরে গুরুতর আহত করলো। আমি ও আমার মা এগিয়ে গেলে আমাদের টেনে হেচঁড়ে লাঞ্চিত করে চলে গেলো। বাবা বাকরুদ্ধ হয়ে ঘরের মধ্যে শুয়ে রইলো। আমি বাবার পাশে গিয়ে বসে দেখলাম তার পুড়ো মুখটি ওদের অঘাতে এমোন ফুলে রয়েছে যে বাবাকে চেনা যাচ্ছেনা। বাবা সারাক্ষন শুধু কাঁদতে থাকলো । আমি বাবার পাশে বসে রইলাম আমার গালের মধ্যে ক্ষত চিহ্ণ দেখে বাবা তাতে হাত দিয়ে লজ্জায় হাইমাউ করে কাদঁতে লাগলেন। মা মুখ হতে একটি কথাও বললেন না। গভীর রাত দেখলাম চাদঁটির উপর দিয়ে মেঘ ভেষে যাচ্ছে। আমার কেন জানি ওই মেঘদের মতো ওড়তে ইচ্ছা হলো। কতোদিন যাবৎ ওই মুক্তপথ দিয়ে হেটে কলেজে যাইনা। আকাশের মেঘগুলো আমায় ডাকলো এসো আমাদের সাথে।্

এ জীবনে মুক্তভাবে চলার আর কোন রাস্তা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তাই মুক্তির জন্য আপনার নিকট চিঠিটি লিখে আমার বরের দেওয়া লাল বেনারসি শাড়িটা হাতে নিয়ে মুক্তির রাস্তা খুজতেঁ গেলাম। জানো ভাইয়া আমার হবু বর বিয়ে উপলক্ষ্যে আমায় লাল টুক টুকে একটি শাড়ি দিয়েছে। শাড়িটা আমার বেশ পছন্দ হয়েছে। এই শাড়িটা গাঁেয় জড়িয়ে মুক্ত পথে শশুর বাড়ি যাওয়ার রাস্তাটা আমার জন্য অবরুদ্ধ হয়ে রয়েছে, ভাবতে দম বন্ধ হয়ে এলো আমার। তাই সেই শাড়িটা হাতে নিয়েই মুক্তি খুজঁতে গেলাম। আজ আর একটি অনুরোধ করবো আমার মৃত্যূর পর যদি পারেন, তাহলে আমার মা বাবাকে একটু দেখেন। আপনার বাড়ি হতে আমার বাড়ি বেশি দূরে নয়। রাখিরপুর ব্রীজের পাশেই আমার বাড়ি। সম্বব হলে আমার মা,বাবার পাশে একটু দাড়িয়েন। ইতি-সাথি

চিঠিটা পড়তে পড়তে চোখের পানিতে বর্ণের পুড়ো শরীর ভিজে গেছে। তারপর চোখ বুজেঁ সময় কেটে গেছে বেশ কিছুক্ষন। বর্ণের কানে যেন একটি শব্দ বার বার বাঁজতে শুরু করলো আমার মা বাবা একটু দেখেন আমার মা বাবা, একটু দেখেন। বর্ণ একলাফ দিয়ে চেয়ার থেকে উঠে দাড়ালো। ঘড়ির দিকে চেয়ে দেখে বেলা সাড়ে ৫টা সন্ধা হতে আরো ১ ঘন্টা বাকি। চেম্বারটা খোলা রেখেই মনে মনে বললেন রাখিরপুর ব্রীজ এক দৌড়ে মোটর সাইকেলের উপর গিয়ে বসলেন। তারপর একটানে রাখিরপুর ব্রীজের উপর গিয়ে থামলেন। ব্রীজের পাশেই গরুর জন্য ঘাস কাটছিলেন এক বৃদ্ধা তাকে জিজ্ঞাসা করলেন সাথিদের বাড়িটা কোথায়? বৃদ্ধা বললেন কোন সাথি ঐযে নষ্টা মেয়েটা যে নাহি গলায় দিয়ে মরছে হেই সাথি। বর্ণ এক ধমক দিলো বৃৃদ্ধাকে বাড়িটা কোথায় সেটা বলো? বৃদ্ধা ভয়ে আমতা আমতা করে বললো ঔতো ওই দিকের ঔ বাড়িটা। একটু আগাতেই এক পরিচিত মক্কেলের সাথে দেখা হলো আমার । আমায় দেখে ও যেন আকাশের চাদঁ হাতে পেলো। স্যার এই সন্ধা বেলা আপনি কই যাইতেছেন? তুমিকি সাথিদের বাড়ি চেঁনো । যেই সাথি মইরা গেছে হেগো বাড়ি । বর্ন হু। হ স্যার চিনি। কিন্তু হেই বাড়িতে তো কেউ নাই । হেগো বাড়ি গিয়া কি করবেন। আপনে আমাগো বাড়ি লন স্যার। সাথির বাবা মা কোথায় তুমি কি বলতে পারো?

না স্যার আমি কে এই গ্রামের কেউই কইতে পারেনা। রাতের আন্ধারে বাড়ি তালা দিয়ে চইল্লা গেছে হেড়া। রাতের অন্ধকারে গেছে কেন?

স্যার হেইডা অনেক কথা সাথি মইরা যাওনের পর গ্রামের লোকজন গলায় ফাঁসি দিয়া মরছে দেইখা সমাজের হুজুর ওর জানাজা পরে নাই। এলাকার লোকজনও আগাইয়া আসে নাই। হেরপর সমাজের কবরস্থানেও ও মাটি দিতে দেয়নাই।

ওগো বাড়িও জোর কইরা আরেকজন দহল কইরা আছে। মাটি দেওনের যায়গা না পইয়া ওরে ওগো দরজার মধ্যে কবর খুইরা মাটি দিয়া বাবা মা রাইতের অন্ধকারে কই জানি চইলা গেছে।

আমি বললাম আমাকে সাথির কবরের সামনে নিয়া চলো।

সন্ধা বেলা স্যার গলায় দিয়া মরা মাইনষের কবরে যাওন কি ঠিক অইবো?

ঠিক আছে তুমি না যাও আমায় দেখাও দাও আমি যাবো।

লোকটা আমতা আমতা করে বললো চলেন স্যার আমরা মামলায় পরছিলাম পর আপনে আমাগো কত উপকার করছেন। আপনার জন্য যা অয় অইবো লন আপনারে কবরে লইয়াই যাই। বলেই হাটতে শুরু করলো লোকটি আমি তার পিছু পিছু হাটতে শুরু করলাম। হাটতে হাটতে একটি ঘরের ঠিক দরজার সামনে কবরের কাছে নিয়ে দাড় করিয়ে দিলো আমায়। দেখলাম কবরটি এমন ভাবে করা হয়েছে যার মধ্যে পাড়া না দিয়ে ঘরে প্রবেশ করা সম্ভব না। সাথির কবরের সামনে দাড়াতেই মনে হলো ও যেন আমায় জিজ্ঞাসা করলো কেমন আছেন ভাইয়া? আমি কান্না জড়িত কন্ঠে হেয়ালী মনে ভালো আছি বলে উঠলাম। আমার পাশে থাকা লোকটি ভালো আছি শব্দটি শুনে ভয়ে শিউরে উঠে বললো স্যার ও স্যার আপনারে ভূতে ধরলো নাতো! এ জন্যই কইছিলাম সন্ধ্যা বেলা কবরে আসা দরকার নাই।

আমি ওকে কানাœ জড়িত কন্ঠে ধমক দিয়ে বললাম চুপ কিছু হয়নি আমার । বলেই সাথির কবরের পাশে বসে ওর কবরের মাটিগুলো পরম মমতায় নাড়তে শুরু করলাম। দেখলাম ওর কবরের পাশের বেশ কিছু অংশের মাটি শিয়াল অথবা কুকুর সড়িয়ে ফেলেছে। কয়েকদিনের বৃষ্টিতে কবরের মধ্য খানের মাটিও কিছুটা ধসে পরেছে। এরি মধ্যে চারিপাশের অনেক লোকজন এসে জমেছে আর আমার সেই পরিচিত মক্কেলটি তাদের কাছে আমার পরিচয় তুলে ধরে প্রশংসায় বেশ পঞ্চমূখ হয়ে উঠেছে। সবাই আমার দিকে বেশ উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে তাকাচ্ছে। আমি উপস্থিত লোকজনের উদ্দেশ্যে বললাম আমাকে কেউ একটা কোঁদাল এনে দিবেন। কেউ একজন সাথিদের ঘরের পাশের লোকজনকে উদ্দেশ্য করে বলছে স্যারকে একটি কোঁদাল এনে দাও । মুহুর্তের মধ্যে ৪-৫টি কোঁদাল ও লাইট জোগাড় হয়ে গেলো। আমি একজনের হাত হতে একটি কোঁদাল নিয়ে সাথির কবরে মাটি টেনে তুলে দিতে লাগলাম। আশে-পাশের অনেকে এগিয়ে এসে বললো স্যার আপনি কষ্ট করবেন না। আমরাই মাটি টেনে তুলে দিচ্ছি। আমি বললাম এতোদিনতো কবরটা এখানেই ছিলো এবং এ অবস্থাতেই ছিলো। কেউতো এ কবরটাতে মাটি দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেন নাই। আমার বোনের কবরে আমিই মাটি দিবো। এতে সবাই লজ্জা পেয়ে বিস্মিতভাবে আমার মোখের পানে তাকিয়ে রইলো। মাটি দেওয়া শেষে আমি উপস্থিত সবাইকে সাথির মা বাবা কোথায় গেছে তা তারা জানে কিনা জানতে চাইলাম। সবাই একবাক্যে জানে না বলে জানালো। আমি সাথির কবরের সামনে দাড়িয়ে বললাম পারলাম না সাথি আমি তোমার কোন উপকার করতে পারলাম না। বলে উপস্থিত অনেককে আমার ভিজিটিং কার্ড দিয়ে বললাম তারা সাথির বাবা মার কোন খোঁজ পেলে যেন আমায় জানায়। এর পর উপস্থিত সবাইকে আমি জিজ্ঞাসা করলাম সাথিকে ্একটি ছেলে রাস্তাঘাটে বিরক্ত করতো সেই ছেলেটির নাম ও পরিচয় তারা জানে কিনা। কিন্তু উপস্থিত সকলে সেই ছেলের নাম পরিচয় জানেনা বলে আময় জানালো। এতে আমি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলাম বললাম প্রকাশ্যে দিবালোকে একটি বখাটে ছেলে সাথিদের বাড়িতে এসে তার বাবা মাকে মারধর করে গেলো আর আপনারা বলছেন তার নাম জানেন না তাকে চেনেন না এটা কেমন কথা! আমি ক্ষিপ্ত হয়ে গেছি দেখে সবাই কেটে পড়তে শুরু করলো। ভাবলাম না আজ রাতের বেলা এভাবে কথা বের করা যাবেনা অন্য আরেকদিন আসতে হবে। এরপর বেশ কিছুদিনই সাথির কবরের পাশে সাথিদের গ্রামে গেছি আমি। সেই বখাটে ছেলেটার নাম ও পরিচয়ও জানতে পেরেছি। কিন্তু কেউ সেই বখাটের বিরুদ্ধে স্বাক্ষি দিতে রাজি হয়নি। আইন চায় স্বাক্ষী ও প্রমান। স্বাক্ষী ও প্রমানের অভাবে একটি অপরাধ এভাবেই চাপা পড়ে রইলো ।

লেখক পরিচিতিঃ
ব.ম শামীম
একজন সাংবাদিক,কবি, সাহিত্যিক ও শিক্ষানোবিস আইনজীবী।
সে ১৯৮১ সালে টঙ্গীবাড়ী উপজেলার চাঠাতিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
মোবাঃ ০১৮১৮৪০৫০৮৯