কোন্দলে কোন্দলে বিপর্যস্ত মুন্সীগঞ্জ আ’লীগ

al leaderমোজাম্মেল হোসেন সজল: বিভক্তির রাজনীতিতে সাংগঠনিক গতি হারিয়ে ফেলছে মুন্সীগঞ্জ আওয়ামী লীগ। দলীয় উপ-দলীয় কোন্দলে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দলটি। শীর্ষ নেতারা দুই গ্রুপে বিভক্ত।

শীর্ষ নেতাদের দ্বন্দ্বের প্রভাব তৃণমূলের নেতাদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে। এতে করে তৃণমূলের নেতাকর্মীরাও ঝিমিয়ে পড়ছে। দলীয় কর্মসূচিও হচ্ছে না। জেলা যুবলীগ, ছাত্রলীগ, কৃষকলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের নাম সর্বস্থ কমিটি রয়েছে। তাদের দলীয় কোন কার্যক্রম নেই। শহরে জেলা আওয়ামী লীগ দলীয় কোন কার্যালয় করতে পারেননি। জেলা আওয়ামী লীগ, যুবলীগের কমিটির মেয়াদ ফুরিয়ে গেছে দীর্ঘ বছর আগে ।

২০০৩ সালে জেলা যুবলীগের কমিটি গঠিত হয়েছে। কোন কার্যক্রম নেই তাদের । সর্বশেষ জেলা আওয়ামীলীগের সম্মেলন হয় ২০০৪ সালে। দুই বছর মেয়াদী এ কমিটির বয়স এখন ৯ বছর। ১৯৮৮ সাল থেকে ২৫ বছর ধরে মোহাম্মদ মহিউদ্দিন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে ১৯৭৮ সাল থেকে দুই টার্মে ১০ বছর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। দীর্ঘ ৩৫ বছর সময়ে তিনি মুন্সীগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র অধিপতি ছিলেন। তোফায়েল আহমেদের শেল্টারে মোহাম্মদ মহিউদ্দিন আওয়ামী রাজনীতিতে মুন্সীগঞ্জের কর্তা বনে যায়।

২০০৬ সালে আপন ভাতিজা তাপস হত্যাকে ঘিরে পারিবারিক বিরোধ সৃস্টি হওয়ায় মোহাম্মদ মহিউদ্দিন আওয়ামী রাজনীতিতে একা হতে শুরু করেন। ছোট ভাই আনিসুজ্জামান বাদী হয়ে বড় ভাই মোহাম্মদ মহিউদ্দিন ও তার ছেলে ফয়সাল বিপ্লবকে আসামি করলে ওই হত্যা মামলায় পিতা-পুত্র জেল খাটেন। এরপর ২০০৭ সালে ওয়ান ইলেভেন সরকার এলে রাজনীতিতে তার ধস নামতে থাকে। শীর্ষ ৫০ দুর্নীতিবাজের তালিকায় তার নাম এলে তিনি আত্মগোপনে চলে যান। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিনি ফিরে আসেন রাজনীতিতে। কিন্ত এর আগেই তার একচ্ছত্র ক্ষমতা খর্ব হয়ে যায়। একচ্ছত্র রাজনীতিতে ভাগ বসায় দলীয় বিদ্রোহী গ্রুপ। তবে, জেলা, উপজেলা, শহর ও ইউনিয়নসহ বিভিন্ন কমিটিতে তার লোকদের অধিষ্ঠিত করায় দলীয় ক্ষমতা বা কমিটিগুলো এখনো রয়েছে তার নিয়ন্ত্রণেই।
al leader
এদিকে, মহিউদ্দিনের পারিবারিক বিরোধকে কাজে লাগিয়ে লাইম লাইটে চলে আসে বিদ্রোহী গ্রুপটি। দল ক্ষমতায় আসার পর কোন সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি মোহাম্মদ মহিউদ্দিন। তবে, ধীরে ধীরে বালুমহাল, জেলা পরিষদের বিভিন্ন প্রকল্পের টেন্ডার ভাগ-বাটোয়ারা চলে যায় তার নিয়ন্ত্রণে।

দলীয় সূত্র মতে, মুন্সীগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি রয়েছেন মহিউদ্দিনের সঙ্গে। অপর শিবিরে রয়েছেন-মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য এম ইদ্রিস আলী, আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির উপ-দপ্তর সম্পাদক মৃণাল কান্তি দাস, মহিলা এমপি মমতাজ বেগম ও সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মহিউদ্দিনের ছোট ভাই আনিসুজ্জামান আনিস।


এদিকে, এই সুযোগে আগামী জেলা আওয়ামী লীগের কাউন্সিল ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মহিউদ্দিনের ছোট ভাই আনিসুজ্জামান আনিসকে পুঁজি করে কেন্দ্রীয় কমিটির উপ-দপ্তর সম্পাদক মৃণাল কান্তি দাস মুন্সীগঞ্জ আওয়ামী রাজনীতিতে নিজের অবস্থান তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে দলীয় নেতাকর্মীদের অভিমত। ইতোমধ্যে জেলার রাজনীতিতে খবরদারিও করছেন। বিভিন্ন দিবসে ব্যানার, ফেস্টুন, পোস্টার ছেপে নিজেকে পরিচিত করার চেস্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

তবে-দলীয় কতিপয় সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা করার অভিযোগে শুরুতেই তিনি রাজনৈতিক সচেতন মহলে সমালোচনার মুখে রয়েছেন। সন্ত্রাসীদের পক্ষ নিয়ে নিজে ও কেন্দ্রীয় নেতাদের দিয়ে তদবির করায় প্রশাসনও ক্ষুব্ধ। গত ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মহিউদ্দিনের অনুপস্থিতিতে সদর আসনে এম ইদ্রিস আলী দলীয় মনোনয়ন পেয়ে প্রথম বারের মতো আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর উপজেলা নির্বাচনে মহিউদ্দিনের বড় ছেলে যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ফয়সাল বিপ্লব ও চাচা আনিসুজ্জামান চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এতে আনিসুজ্জামান জয় লাভ করেন। এ নির্বাচনে চলাকালীন সময়ে মহিউদ্দিন পলাতক ছিলেন। এরপর মুন্সীগঞ্জ পৌরসভার নির্বাচনে ফয়সাল বিপপ্লব মেয়র পদে প্রার্থী হন।

এ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান, সাবেক মেয়র এডভোকেট মজিবুর রহমানকে নিয়ে সংসদ সদস্য এম ইদ্রিস আলী, মহিলা এমপি মমতাজ বেগম, আনিসুজ্জামান ও মৃণাল কান্তি দাস কোমর বেঁধে মাঠে নামে। কিন্ত শেষাবধি তাদের প্রার্থী সামান্য ভোট পেয়ে তৃতীয় অবস্থানে ছিলেন। বিএনপি এ কে এম ইরাদত মানুকে মেয়র পদে প্রার্থী দিয়ে এ সুযোগ কাজে লাগায় সাবেক সংসদ সদস্য, জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল হাই। নির্বাচনে বিএনপি’র প্রার্থীর সঙ্গে বিপ্লব সামান্য ভোটের ব্যবধানেব পরাজিত হয়। এ নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে মহিউদ্দিন আবার রাজনীতিতে শক্ত অবস্থানে ফিরে আসার চেষ্টা চালায়।

এরপর ২০১১ সালের ২১ ডিসেম্বর মোহাম্মদ মহিউদ্দিন জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ায় মহিউদ্দিন ও তার অনুসারীরা রাজনীতিতে নতুন করে কিছুটা শক্তি ফিরে পায়। কিন্ত গত বছর জেলা পরিষদের অধীনে মাওয়া খেয়াঘাটের ইজারার ডাক ২০১১ সালের চেয়ে তিনগুন কম দিয়ে দলীয় কর্মীকে ইজারা দেয়ায় সমালোচনার মুখে পড়েন। ২০১১ সালে জেলা পরিষদ এ খেয়াঘাটের মাওয়া অংশ ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকায় ইজারা প্রদান করে। কিন্তু এবার মাত্র ১ কোটি ৪ লাখ টাকায় জেলার লৌহজং উপজেলার মেদেনীমন্ডল ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি হামিদুল ইসলামকে ইজারা প্রদান করা হয়।

এদিকে, জেলা আওয়ামী লীগের আসন্ন সম্মেলনকে সামনে রেখে মহিউদ্দিন পুনরায় সভাপতি হওয়ার আশায় তার ক্যাডারদের অনেকটা দুরে সরিয়ে রেখেছেন। পৌরসভা নির্বাচনে বড় ছেলে ফয়সাল বিপ্লব পরাজয়ের পর তাকেও ঢাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। বালুমহাল মহাল থেকে প্রতিদিন হাতিয়ে নিচ্ছেন বিপুল অঙ্কের টাকা।


ওদিকে, গত বছর তোফায়েল আহমেদ মন্ত্রী হচ্ছেন-এ সংবাদে মহিউদ্দিন ও তার অনুসারিরা উৎফুল হয়ে ওঠে। কিন্ত তিনি মন্ত্রীত্বের অফার ফিরিয়ে দিলে মহিউদ্দিন ও তার অনুসারিরা হতাশ হয়ে পড়েন। এদিকে, বিভিন্ন উপজেলা কমিটি গঠন নিয়েও আওয়ামী লীগের বিদ্যমান দু’গ্রুপের রাজনীতি উত্তপ্ত হয়ে উঠে। কোথাও কোথাও পাল্টা কমিটি গঠন করা হয়। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর জেলা শিল্পকলা একাডেমীতে সদর উপজেলা সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের ত্রি-বার্ষিক কাউন্সিল নিয়ে স্থানীয় এমপি এম ইদ্রিস আলী ও জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মোহাম্মদ মহিউদ্দিন প্রকাশ্যে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। এসব কর্মকান্ডে সংসদ সদস্য এম ইদ্রিস আলীর সঙ্গে তার অনুসারি ওই শীর্ষ নেতাদের কাউকে দেখা যায়নি। সম্মেলন স্থল থেকে এমপিকে বের করে দেন মহিউদ্দিন। এ নিয়ে ওই দিন রাত ৯টায় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও সংসদ সদস্য এম ইদ্রিস আলী সিপাহীপাড়াস্থ সুফিয়া প্লাজায় সংবাদ সম্মেলনে তিনি অভিযোগ করে বলেন- মহিউদ্দিন আওয়ামী লীগকে কুক্ষিগত করে রাখতে চায়। মুন্সীগঞ্জের আওয়ামী লীগকে তিনি পেশিশক্তি দিয়ে জিম্মি করে রেখেছেন। সাধারণ মানুষ সন্ত্রাসী কর্মকান্ড, পেশিশক্তির ব্যবহার চায় না। তাদের আবেদন নষ্ট হতে দেবো না।

তিনি সদর উপজেলা ও শহর আওয়ামী লীগের কাউন্সিল সম্পর্কে বলেন, আমি এলাকার নির্বাচিত এমপি। অথচ মুন্সীগঞ্জ শহর ও সদর উপজেলা- ২টি সম্মেলনে আমাকে দাওয়াত পর্যন্ত করা হয়নি। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ও যোগ্য নেৃত্বত্ব তৈরি করার লক্ষ্যে স্থানীয় এমপি হিসেবে সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার জন্য সম্মেলনে গিয়েছিলাম। কাউন্সিলর ছাড়া কেউ থাকতে পারবে না- এমনকি এমপির কাউন্সিলর কার্ড থাকতে হবে বলে তারা অজুহাত তোলেন। তাদের পা চাটা লোক দিয়ে কমিটি গঠনে বাঁধা গ্রস্থ হওয়ায় এ অজুহাত তোলেন। সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশনে মহিউদ্দিন তাকে একাধিকবার সম্মেলনস্থল থেকে চলে যেতে বলেন। মহিউদ্দিনের তীব্র আপত্তিতে অপমান-অপদস্থ হয়ে ওই দিন রাত ৭টার দিকে আমি মাইকে সম্মেলন বয়কট ঘোষণা দিয়ে সম্মেলনস্থল ত্যাগ করতে বাধ্য হই।


তিনি আরও বলেন, সম্মেলন হবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়। তারা কোন কমিটি ঘোষণা দিলে সেটা হবে অবৈধ। এখানে আওয়ামী লীগের নামে কি-হচ্ছে, কারা অপকর্ম করে মুন্সীগঞ্জ আওয়ামী লীগকে কলুষিত করছে সে বিষয়ে তিনি প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করেন। এসব করে মহিউদ্দিন আওয়ামী লীগের মধ্যে পেশিশক্তি ও পরিবারতন্ত্রের রাজনীতি কায়েম করছেন। সম্মেলনে ভোটাভুটি হলে এমপি সমর্থক সভাপতি প্রার্থী সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান, বায়রার সিনিয়র সহ-সভাপতি মনছুর আহামেদ কালাম বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ী হবেন-এ আশঙ্কায় মহিউদ্দিন ও তার অনুসারিরা তাদের সিলেকশন করা ২ প্রার্থীর পরাজয় নিশ্চিত ভেবেই এ ঘটনা ঘটায় বলে তিনি দাবি করেন। পরে নিজের পছন্দের বালু খেকো ও থানার দালাল হিসেবে পরিচিতদের দিয়ে মহিউদ্দিন পকেট কমিটি ঘোষণা করে।

এদিকে, পরদিন ১৯ ডিসেম্বর গজারিয়ার ফুলদী নদীর দু’ধারে সংসদ সদস্য এম ইদ্রিস আলী ও জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মোহাম্মদ মহিউদ্দিন গ্রুপ উপজেলা আওয়ামী লীগের পাল্টাপাল্টি কমিটি গঠন করেন। সংসদ সদস্য গ্রুপ উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে ও আওয়ামী লীগ নেতা মহিউদ্দিন গ্রুপ গজারিয়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আলাদাভাবে সম্মেলন করেন। সম্মেলনে সংসদ সদস্য সমর্থক গজারিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রেফায়েত উল্লাহ খান তোতাকে সভাপতি ও এডভোকেট কামরুল ইসলাম চৌধুরীকে সাধারণ সম্পাদক করে ৬৭ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি ঘোষণা করা হয়।

একই দিন সন্ধ্যায় মোহাম্মদ মহিউদ্দিনের উপস্থিতিতে সোলায়মান দেওয়ানকে সভাপতি ও আমিরুল ইসলামকে সাধারণ সম্পাদক করে ৬৭ সদস্য বিশিষ্ট আরেকটি পাল্টা কমিটি গঠন করেন। এর ২দিন আগে শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহতাবউদ্দিন কল্লোলের অনুপস্থিতিতে শহর কমিটি গঠন করেন আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ মহিউদ্দিন নিজেই।

এদিকে, জেলা আওয়ামী লীগের কাউন্সিল হবে কবে-এ প্রশ্ন এখন দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের আগে জেলা কমিটি গঠনের তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে। কিন্ত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন হবার পর সে তৎপরতা মিইয়ে গেছে বলে দলীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ।

ঢাকারিপোর্টটোয়িন্টিফোর