অস্থির রাজনীতির শিকড় সন্ধানে

ড. মীজানূর রহমান শেলী
আবার শুরু হলো অস্থিরতার পালা। সংসদের বাজেট সেশনে তর্কের বিপুল ঝড় উঠল। তবে এ বিতর্ক বাজেট নিয়ে মোটেও নয়। এবারকার বাগ্‌বিতণ্ডা মূলত দুই প্রধান দলের নেতা-নেত্রীদের নিয়ে ব্যক্তিগত আক্রমণ। এ আক্রমণের বর্শামুখ হিসেবে অবতীর্ণ হলেন দৃশ্যত কোমলমতি অথচ বাক্যবাণ নিক্ষেপে নির্মম সংরক্ষিত আসনের মহিলা সংসদ সদস্যের একাংশ। জাতি স্তম্ভিত ও বিমূঢ় হয়ে দেখল, শুনল, উচ্চতম আইনসভায় কিভাবে কুরুচিপূর্ণ অশ্লীল, অশোভন অলীক তথ্যের ভারবাহী বাক্যবাণ। এতে সামান্য কিছু লোক আনন্দিত হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ হতবাক ও হতাশ হয়ে রইল।

এই অস্থিরতার ঝড় কমতে না কমতে শুরু হয়েছে হরতাল, বিক্ষোভের আরেক তুফান। জুলাই মাসের ১৪ তারিখ থেকে শুরু হয় নয়া অস্থিরতার পর্ব। মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত জামায়াত নেতা গোলাম আযমের মামলার আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের রায়ের প্রাক্কালে জামায়াত ও শিবির হরতাল ঘোষণা করে। পরদিন রায়ের দিনও হরতাল দেয় তারা। রায়ে এ বর্ষীয়ান নেতার সর্বমোট ৯০ বছর কারাদণ্ডের আদেশ দিলে অসন্তুষ্ট ও ক্রোধান্বিত হয় দুই বিরোধী পক্ষ। ফলে একদিকে যেমন জামায়াত-শিবির, অন্যদিকে তেমনি গণজাগরণ মঞ্চ দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতাল অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেয় ১৬ তারিখে। পরিণতিতে দেশ এক অভিনব যুগপৎ হরতালের স্বাদ লাভ করে। কিন্তু এই স্বাদ সাধারণ হরতালের মতোই তিক্ত, অস্বস্তিকর ও বিরক্তিকর। ১৭ জুলাই জামায়াত নেতা আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদের ফাঁসির দণ্ডাদেশ ঘোষিত হওয়ার দিন। সেদিন এবং পরদিনও অর্থাৎ ১৮ জুলাই আবার দেশব্যাপী হরতাল চলতে থাকে। বিভিন্ন বড় শহরে, বিশেষত রাজধানী ঢাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়া নজরদারি ও তদারকির ফলে হরতাল হয় ঢিলাঢালা, শিথিল এবং প্রায় অকার্যকর। কিন্তু হরতাল হরতালই। এর মনস্তাত্তি্বক চাপ ও অভিঘাত দেশ ও জাতিকে বিব্রত, ব্যতিব্যস্ত ও পর্যুদস্ত করে। এ ছাড়া জামায়াত-শিবিরের হরতাল সাধারণত শান্তিপূর্ণ হয় না। সংঘাত ও সংঘর্ষ হরতালকে সহিংস করে। মানুষ আহত হয় বিপুলসংখ্যায়, অনেকে হয় নিহত। এই অবস্থায় মানুষ হরতালের নাম শুনলেই উদ্বেগে আকুল হয়ে ওঠে। ১৯৭১-এর মুক্তিসংগ্রামের সময় আরো মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচারের রায় বাকি রয়ে গেছে। অনুমান করা যায়, এর ফলে আরো কয়েকটি হরতাল এবং সংঘাতপূর্ণ ও সাংঘর্ষিক দিনের সারি আমাদের সহযাত্রী হবে। অদূর ভবিষ্যৎ তাই তেমন আশার আলো দেখাতে পাচ্ছে না।


কিন্তু প্রশ্ন হলো এই যে শুধু কি মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তদের বিচার আজকের রাজনৈতিক বিতর্কের ও দ্বন্দ্বের মূল বিষয়? নাকি তার সঙ্গে বা তার বাইরে জড়িয়ে আছে গভীরতর কোনো কিছু। এর উত্তরে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও তার ১৮-দলীয় জোটভুক্ত মিত্ররা হয়তো বলবেন যে মূল দ্বন্দ্ব তত্ত্বাবধায়ক সরকার সম্পর্কিত বিষয়। ক্ষমতাসীন সরকার উচ্চতম আদালতের রায় অনুসারে সংবিধান সংশোধন করে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ওই রায়ের অংশবিশেষকে ভিত্তি করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে। যদিও ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগই যখন বিরোধী দলে ছিল তখন অর্থাৎ ১৯৯৬ সালে আস্থাহীনতার অভিযোগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ইস্যুকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী তুমুল এবং সফল আন্দোলন গড়ে তোলে। সেই আন্দোলনের ফলেই তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার সংবিধানে সংশোধনী এনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু করে।

সে যাই হোক, ২০০৯ সালে আবার ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে এবং গণতন্ত্রের সঙ্গে তার অসামঞ্জস্যতার কথা বলে নতুন করে বিতর্কের সূচনা করে। ইতিমধ্যে অন্য মামলা প্রসঙ্গে হাইকোর্ট ও পরে সুপ্রিম কোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে গণতন্ত্রের পরিপ্রেক্ষিতে অনভিপ্রেত এবং অবৈধ ঘোষণা করে। কিন্তু একই রায়ে আদালত আরো বিধান দেয় যে জাতীয় নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে ইচ্ছা করলে জাতীয় সংসদ আরো দুই মেয়াদের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে পারে।
সরকার উচ্চতম আদালতের রায়ের আলোকে সংবিধান সংশোধনের উদ্দেশ্যে একটি সংসদভিত্তিক জাতীয় কমিটি গঠন করে। সাজেদা চৌধুরী ও সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের নেতৃত্বে এই কমিটি যেসব ব্যক্তি ও সংস্থার মতামত নেন, তাঁদের বেশির ভাগই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে মত দেন। এমনকি প্রথম দিকে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও এ ব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে বলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁরই নির্দেশে এবং তাঁর দলের সম্মতির পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় সংসদে বিবেচনা না করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। বলা হয়, আর কোনো গণতান্ত্রিক দেশে এমন অগণতান্ত্রিক সাময়িক ব্যবস্থার নজির নেই। কোথাও একটি নির্দলীয় এবং অনির্বাচিত সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের তদারকির সময় তিন মাস ধরে ক্ষমতায় থাকে না।


কথাটি সত্য। তবে এ কথাও মিথ্যা নয় যে এই দেশের সব রাজনৈতিক পক্ষ পরস্পরের প্রতি আস্থাহীনতার অভিব্যক্তি হিসেবে সর্বসম্মতিক্রমে এই ব্যবস্থা চালু করে। এখন বিবেচনা করা প্রয়োজন সেই আস্থাহীনতা কমেছে কি না। বাস্তবতার নিরিখে বলতে হয় যে দুই পক্ষের দ্বন্দ্ব, বিরোধ ও দূরত্ব ক্রমেই বেড়েছে, আদৌ কমেনি। একদল আরেক দলের প্রতি অসহিষ্ণু আচরণ করেছে এবং করছে। যে দল যখনই ক্ষমতায় গেছে, সে দল বিরোধী দলকে তখন দমন-পীড়নে কোণঠাসা করেছে। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতাসীন বিএনপি দল, বিরোধী দল আওয়ামী লীগকে নানাভাবে হেনস্তা ও বিব্রত করে। একই আচরণ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ করে বিরোধী বিএনপির প্রতি। ক্রমান্বয়ে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ এবং একই আচরণ তারা করে চলছে ২০০৯-এ আবার ক্ষমতার আসার পর থেকে। এতে দুই দলই সংসদীয় গণতন্ত্রের মূলমন্ত্র, বিরোধী দলকে যথার্থ মর্যাদা দেওয়ার ও তাকে বিকল্প বা ছায়া সরকার হিসেবে গণ্য করার প্রতিষ্ঠিত প্রথাকে অমান্য করেছে। এতে গণতন্ত্রের মৌলিক চাহিদা মেটানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে এবং তার তাৎপর্যকে অস্বীকার করা হয়েছে। ফলে বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ পায়নি, বিকশিত তো নয়ই।

বিরোধী দলের প্রতি অসৌজন্য, তার অসম্মান, তার মর্যাদা অস্বীকার, সংসদের অকার্যকারিতা, দলগুলোর বিশেষত ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে গণতন্ত্রের অভাব, রাষ্ট্রের নির্বাহী শাখার ওপর সরকারের প্রধান নির্বাহী তথা প্রধানমন্ত্রীর প্রবল প্রভাব গণতন্ত্রকে বিপর্যস্ত করেছে।

এসব কারণে একদিকে গণতন্ত্রের লেবাসে যেমন একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়, অন্যদিকে গণতন্ত্রসম্মত দলীয় সরকার পরিণত হয় দলবাজির সরকারে। বিরোধী দল তো বটেই, জনগণের দুর্ভোগেরও সীমা থাকে না। বাড়ে পারস্পরিক আস্থাহীনতা। দলগুলো একে অন্যের থেকে সরে যায় বহুদূর। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো বিভাজিত হয়। বিভেদ দেখা দেয় আমলাতন্ত্রে ও পেশাজীবীদের মধ্যে। সাংবাদিক, চিকিৎসক ও প্রকৌশলী কেউ এই বিভাজনের প্রক্রিয়ার বাইরে থাকে না। মেরুকরণের পাশাপাশি চলে পৃষ্ঠপোষকতার প্রক্রিয়া। ক্ষমতাসীনরা তাঁদের পদ ও প্রভাবকে এবং তাঁদের হাতে থাকা রাষ্ট্রীয় সম্পদকে পুঁজি করে তাঁদের অনুসারী এবং আশ্রিতদের আশ্রয় দেন, স্বার্থপূরণ করেন পদায়ন ও পদন্নোতি ঘটান। অন্যদিকে ক্ষমতার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে প্রতিহিংসার প্রক্রিয়া, দলীয়, গোষ্ঠীগত ও ব্যক্তিগত কারণে অন্য দল ও দলবহির্ভূত লোকের প্রতি হিংসাত্মক আচরণ করা হয়। বাড়ে দমন, পীড়ন যা কখনো রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা সংস্থার মাধ্যমে, কখনো দলীয় ক্যাডারদের মাধ্যমে চালানো হয়। এদিক দিয়ে বিচার করলে বলতে হয়, ক্ষমতাসীনরা শেষ পর্যন্ত দারুণ দেনার ভারে বিপর্যস্ত হন। তাঁদের গুনতে হয় ‘দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা, শুধিতে হইবে ঋণ।’

এই অবস্থায় কোনো ক্ষমতাসীন দলই চায় না যে তারা ক্ষমতা থেকে অপসারিত হয়ে বিরোধী দলের প্রতিহিংসার শিকার হবে। তাই তারা যেনতেন প্রকারে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকতে চায়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা নির্দলীয় সরকারের আওতায় নির্বাচন পরিচালিত হলে তা ক্ষমতাসীনদের পক্ষে নাও যেতে পারে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষমতাসীন দল কোনোক্রমেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রস্তাবে রাজি হতে প্রস্তুত নয়।
অন্যদিকে বিরোধী দল বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে মনে করে যে তাদের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতায় থেকে নির্বাচনের সময় তদারকি সরকার হিসেবে কাজ করলে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব হবে না। এই অবস্থায় তাদের পক্ষে কোনো দিনই ক্ষমতায় আসা সম্ভব হবে না, বরং নিরন্তর মার খেয়ে খেয়ে তাদের অস্তিত্ব হবে বিলুপ্ত। সম্প্রতি আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত গাজীপুরসহ পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা মেয়র পদে নির্বাচিত হলেও বিএনপি স্থানীয় নির্বাচনে এই জয়কে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ের ওয়াদা বা গ্যারান্টি হিসেবে দেখে না। তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে অনড়।

সুতরাং বাংলাদেশের রাজনৈতিক লড়াই মূলত ক্ষমতার লড়াই। এ যুদ্ধ হচ্ছে ক্ষমতায় থাকার এবং ক্ষমতায় আসার। সংশ্লিষ্ট নেতা-নেত্রী এবং দলগুলো যদি একমত হয়ে ধারাবাহিক প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধ প্রক্রিয়ার অবসান ঘটাতে পারে, তাহলেই মাত্র এই মারাত্মক ও করুণ পরিস্থিতি থেকে জাতি মুক্তি পেতে পারে। তা না হলে হরতালে-হরতালে, দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও সংঘর্ষে কণ্টকিত হতে থাকবে আমাদের রাজনীতি। ফলে দেশের অর্থনীতি দারুণভাবে মার খাবে এবং দেশ হবে এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখোমুখি। সামাজিক স্থিতি, শান্তি ও শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হয়ে আসবে অনন্ত অশক্তির দুঃসহ প্রহরের রাশি।

লেখক চিন্তাবিদ, সমাজবিজ্ঞানী ও সাহিত্যিক
mrshelley43@gmail.com

কালের কন্ঠ