মাওয়াঘাট বিপন্নের দারপ্রান্তে

mawa2সামসুল হুদা হিটুঃ উজান থেকে ধেয়ে আসা পাহাড়ি ঢলের কারনে পদ্মায় অস্বাভাবিক জোয়ার ও তীব্র স্রোতের মুখে দক্ষিনবঙ্গের প্রবেশ দুয়ার মাওয়াঘাট যে কোন মূহুর্তে বিপন্ন হয়ে উঠার আশংকা দেখা দিয়েছে। পদ্মায় প্রতিদিন অস্বাভাবিক হারে পানি বৃদ্ধি পেয়ে মাওয়াস্থ ৩ টি ফেরীঘাট, লঞ্চঘাট, স্পিডবোট ঘাট ও ট্রলারঘাটে যাত্রী বিড়ম্বনার চিত্র দেখা গেছে। ফেরী পারাপার স্বাভাবিক রাখতে প্রতিদিনই উঁচু করা হচ্ছে ফেরীঘাটগুলো। ট্রলার পারাপারে যাত্রীদের ঘাটে পানি মাড়িয়ে পল্টুনে যেতে হচ্ছে। জোয়ারের পানিতে তলিয়ে স্পিডবোট ঘাটের অস্তীত্বই বিলীন হয়ে গেছে। লঞ্চের পল্টুনে যেতে যাত্রীদের লম্বা সিঁড়ি পথ মাড়াতে হচ্ছে। একই সঙ্গে গোটা মাওয়ায় যত্রতত্র শত শত দোকানপাট প্রতিদিন এক হাত-দু’হাত উপড় দিকে উঠাতে ব্যস্ত দোকান মালিকরা- সরেজমিনে মাওয়াঘাট বিপন্ন হয়ে উঠার এই আশংকার চিত্রই দেখা গেছে সর্বত্র।


বৃহস্পতিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত মাওয়াঘাট ঘুরে দেখা গেছে পদ্মার পানি বিপদসীমা ছুঁই ছুঁই করছে। ৩ টি ফেরীঘাট, লঞ্চ-স্পিডবোট-ট্রলার ঘাটের এপ্রোচ সড়ক ও পল্টুনের র‌্যাম পদ্মার পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। এতে আশংকার কথা হচ্ছে- অস্বাভাবিক জোয়ার ও উজানের ধেয়ে আসা ঢলের কারনে যে কোন মূহুর্তে পদ্মা রুদ্রমূতি রুপ ধারন করতে পারে। ফলশ্রুতিতে আসন্ন ঈদের সামনে পার্কিং ইয়ার্ডসহ গোটা মাওয়াঘাটের চিত্রই বদলে যেতে পারে। যে কোন মূহুর্তে বিপন্ন হয়ে উঠতে পারে দক্ষিনবঙ্গের ব্যস্ততম যোগাযোগ মাধ্যম মাওয়াঘাট।
mawa1
“ছবি কথা বলে”-ক্যামেরায় বন্দি ছবির দৃশ্যে মাওয়াঘাট বিপন্ন হওয়ার আশংকার সচিত্র চিত্রই ফুটে উঠেছে। চিত্র গুলো ধারন করা হয়েছে- মাওয়াঘাটের ৩ টি ফেরীঘাট, লঞ্চঘাট, স্পিডবোট ও ট্রলারঘাট থেকে। ক্যামেরায় ধারন করা ছবিই বলে দিচ্ছে যে, আসন্ন ঈদে এবারও দক্ষিনবঙ্গের লাখো যাত্রীর বাড়ি ফেরার পথ নিস্কনটক হবে না। গেলো বছরের ঈদে ঘরমুখো দক্ষিনবঙ্গের যাত্রীদের দু:খ-কষ্টের মতোই এবারও মাওয়াঘাটে আসন্ন ঈদে বাড়ি ফেরার পথে শত শত দুর্ভোগ আর দুর্গগতি অপেক্ষা করছে লাখো যাত্রীর কপালে।

মাওয়াঘাটের মেরিন অফিসার আলী আহমেদ জানান, মাওয়া-কাওড়াকান্দি নৌরুটে পদ্মায় প্রচন্ড স্রোতের কারণে ফেরী পারাপার মারাত্মক ভাবে বিঘ্ন ঘটছে। প্রবল স্রোতের তোড়ে চলন্ত অবস্থায় ফেরীগুলো ভাসতে ভাসতে নৌরুটের মূল চ্যানেলের বাইরে চলে যাচ্ছে। চ্যানেলের বাইরে অন্তত ৩ থেকে ৪ কিলেমিটার অদুরের দিকে ভেসে যেতে হচ্ছে পারাপাররত ফেরীগুলোকে। স্বাভাবিক পারাপারের মধ্য দিয়ে নৌরুট সচল রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে মাওয়াঘাট কর্তৃপক্ষকে। নৌরুটে যাত্রী পারাপারে প্রতিটি ফেরীই পদ্মা পাড়ি দিতে এক ঘন্টার মতো বেশী সময় ব্যয় করছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় মাওয়াঘাট বন্ধের উপক্রম হওয়ায় নৌরুট ঝুকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে বলে দাবী করেন মাওয়াঘাটের এই মেরিন কর্মকর্তা।
পানি উন্নয়ন বোর্ড ও মাওয়াঘাট সূত্রে জানা গেছে- গেলো কয়েকদিনে ঘন্টায় প্রমত্বা পদ্মায় শ্রীনগর উপজেলার ভাগ্যকুল পয়েন্টে ২৪ সেন্টিমিটার ও মাওয়া পয়েন্টে ১২ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে ভাগ্যকুল পয়েন্টে পদ্মার পানি বিপদসীমা অতিক্রম করার উপক্রম হয়েছে । মাওয়া পয়েন্টে বিপদসীমার মাত্র ২ সেন্টিমিটার নীচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে পদ্মার পানি। দুপুর পর্যন্ত ৮ ঘন্টার ব্যবধানে মাওয়া পয়েন্টে ১১ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়ে ৫ দশমিক ৬৭ মিটার থেকে ৫ দশমিক ৭৮ মিটার এবং ভাগ্যকুল পয়েন্টে ৬ দশমিক ০৬ সেন্টিমিটার থেকে ৬ দশমিক ২৮ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে পদ্মায়।
mawa2
এদিকে, জেলার লৌহজং উপজেলার মাওয়াঘাট পয়েন্টে ও পার্শ্ববর্তী শ্রীনগর উপজেলার ভাগ্যকুল পয়েন্টে প্রতিদিন অস্বাভাবিক হারে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় পদ্মা পাড়ের মাওয়াঘাট বিপন্ন হয়ে উঠছে। এ ঘাটের মাওয়া-কাওড়াকান্দি নৌরুটে ডাম্পু-ফেরি, সিঙ্গেল ফেরিগুলো পানির স্রোতে মাওয়া ঘাটের কাছে ভীড়তে মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে। শনিবার বিকেলে যাত্রীবাহী ফেরি কর্ণফুলী ও লেংটিং ঘাটে ভীড়তে না পেরে নৌরুটের বাইরে ৩-৪ কিলোমিটার দূরে লৌহজং ঘোড়দৌড় নালার দিকে চলে যায়। এতে করে আগের তুলনায় নদী পারাপারে ৩০ থেকে ৪০ মিনিট সময় বেশি নিচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছেন। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকার কারণে মাওয়া তিনটি ফেরিঘাট পন্টুন ও র‌্যামসংলগ্ন সংযোগ সড়ক তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছে সংশ্লিষ্টরা। ফলে যে কোনো মুহূর্তে মাওয়া ফেরিঘাট দিয়ে ফেরি পারাপার বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এদিকে, এতে করে মাওয়া কাওড়াকান্দি নৌরুটে ফেরি চলাচলে অচলাবস্থা সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি লৌহজং উপজেলার কনকসার, মেদিনীমন্ডল ইউনিয়নের নিন্মাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পড়ছে। তীব্র ঝুঁকির মুখে পড়েছে নদীভাঙন কবলিত এসব এলাকাসমূহ।

মাওয়া বিআইডব্লিউটিসির মেরিন অফিসার আলী আহমেদ জানান, মাওয়া-কাওড়াকান্দি নৌরুটে পদ্মায় প্রচন্ড স্রোতের কারণে ফেরিগুলো মাওয়া আসার পথে চলাচলে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটছে। তীব্র স্রোতে নৌরুটের মাওয়া ওয়ার্কশপ থেকে অধিকাংশ ফেরি ঘাটে ভীড়ার আগেই ৩-৪ কিলোমিটার দূরে লৌহজং ঘোড়দৌড় নালার দিকে চলে যাচ্ছে। যার কারণে সময় লাগছে অতিরিক্ত ৩০-৪০ মিনিট। এছাড়া পানির স্রোত ও পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় ঘাটগুলোও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

মাওয়াস্থ বিআইডব্লিউটিসির উপ-সহকারী প্রকৌশলী তারিকুল ইসলাম জানান, অব্যাহত পানি বৃদ্ধিও কারণে মাওয়া ১ ও ২ নম্বর ঘাটের র‌্যাম সংলগ্ন সংযোগ সড়কে পানি লেবেল পর্যায়ে অবস্থান করছে। ফেরীঘাটের এপ্রাচ সড়ক ও পল্টুনের র‌্যাম প্রতিদিনই মেরামত করে করে যানবাহন উঠানামার উপযোগী করতে হচ্ছে।


পদ্মায় বিপদসীমা অতিক্রম করলেই গেলো বারের ঈদ মৌসুমের মতো এবারও মাওয়া-কাওড়াকান্দি নৌরুটে মাওয়াঘাট বিপন্ন হয়ে পড়বে বলে আশংকা প্রকাশ করেছেন বিআইডব্লিউটিসির সহকারী মহা-ব্যবস্থাপক মো: আশিকুজ্জামান।

তিনি বলেন- আরেকটু পানি বাড়লেই নৌরুটে ফেরী পারাপার বন্ধ হয়ে পড়বে। এমনিতেই ফেরী পারাপারে পদ্মার স্রোতের তীব্রতায় ফেরীগুলো ভাটির দিকে চলে যাচ্ছে। নৌ-চ্যানেলে স্বাভাবিক ফেরী পারাপার ব্যহত হচ্ছে। আরেকটু পানি বৃদ্ধি পেলেই মাওয়াঘাট তলিয়ে ফেরী পারাপার যে কোন মূহুর্তে বন্ধ ঘোষনা করা হতে পারে। শিগগির ফেরীঘাট গুলোকে উঁচুতে স্থানান্তর করতে হবে। নইলে মাওয়াঘাট বিপন্ন হয়ে পড়লে মাওয়া-কাওড়াকান্দি নৌরুটে ফেরীসহ সকল ধরনের নৌযান চলাচল ভেস্তে যাবে।

ঘাটে ঘাটে যাত্রীদের কষ্টের বানী- সরেজমিনে মাওয়াস্থ ট্রলারঘাটে গিয়ে দেখা গেছে- দক্ষিনবঙ্গের যাত্রীদের হাটু পানি ঠেলে পল্টনে যেতে হচ্ছে। ষাটোর্ধ্ব আরব আলী কোমড়ে তুলে নিয়েছেন নাতিনকে, আর দু’হাতে কাপড়-চোপড় ও অন্যান্য মালামাল বহন করে ঘাটে যেতে রীতিমত যুদ্ধে সামিল হয়েছেন।

আরব আলী বলেন- নৌরুটে পদ্মা পাড়ি জমাতে কপালে এতই কষ্ট ছিল-জানা ছিল না। এইডার থেকে কি কোন দিনই কুল রক্ষা হবে না দক্ষিনবঙ্গের-এই প্রশ্ন রাখিলাম সাম্বাদিক সাব।

লঞ্চঘাটে ইয়া লম্বা সিঁড়ি দেখে ভয়ে ভয়ে এগুচ্ছেন বুড়োবুড়ি সমিতা দেবী ও বিমল দাস। হাটি হাটি পায়ে ধীরে ধীরে লম্বা সিঁড়িটা পেরুতেই যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলেন ওই দম্পতি। নৌরুটে পদ্মা পাড়ির অভিজ্ঞতা জানতে চাইলে বুড়োবুড়ি একই সঙ্গে বলে উঠলেন-জীবন থাকতে আর এ পথে আসবো না বাবা।

পারাপারে দুর্ভোগের কবলে স্পিডবোট যাত্রীরা। বেশ কয়েকদিন যাবত স্পিডবোট ঘাটের মূল ঘাটই নেই। পদ্মার অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধিতে স্পিডবোট ঘাট তলিয়ে যাওয়ায় অয়ন চৌধুরী নামে এক যাত্রী বলেই ফেললেন- টাকা দিয়ে পদ্মা পাড়ি দেই। গলা কেটে টাকা নেন, আর ১ টি ঘাট দিতে পারেনা কর্তৃপক্ষ। এটা দক্ষিনবঙ্গের যাত্রীদের উপর চরম অত্যাচারই বলবো।

ফেরীর যাত্রী রহমত মিয়া, সুজন পাইক, রহিমা খাতুন বলেন- ফেরীগুলো যেন পদ্মায় অসহায়। স্রোতের তোড়ে একদিক থেকে আরেক দিকে অনেক দুরে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ফেরীগুলোকে। এভাবে ফেরী পারাপার হুমকির সম্মুখীন। গন্তব্যে আসতে-যেতে মাঝ পদ্মায় ফেরীগুলোকে ঘন্টার পর ঘন্টা সময় লেগে যাচ্ছে। আর পদ্মার বুকে বিশাল জলরাশি দেখতে তো রীতিমত ভয় পেতে হচ্ছে।

ওয়ান নিউজ