মাওয়ায় ট্রাফিক পুলিশের ঈদ বাণিজ্য,তীব্র যানজটে নাকাল যাত্রীরা

রমজানের শুরুতেই যানজটে নাকাল দক্ষিণাঞ্চলের প্রবেশপথ খ্যাত মাওয়া-কাওড়াকান্দি মহাসড়কের যাত্রীরা। চাঁদা তোলার জন্য ইচ্ছেকৃতভাবে পুলিশ যানজট সৃষ্টি করছে যাত্রীদের-এমন অভিযোগ থাকলেও মাওয়া ও কাওড়াকান্দি ফেরিঘাটে তীব্র যানজটের কারণে এ অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে বলে জানালেন বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তারা। এদিকে, মাওয়া-কাওড়াকান্দি নৌ-রুটের মাওয়া ঘাটে শুরু হয়েছে ট্রাফিক ও নৌ-ফাঁড়ির পুলিশ সদস্যদের প্রকাশ্যে বেপরোয়া চাঁদাবাজি। ঈদকে সামনে রেখে পণ্যবাহী ট্রাকের যাতায়াত বেশি হওয়ায় ওই চাঁদাবাজি এখন ঈদ বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে। তবে, মাঝে-মধ্যে চাঁদাবাজ পুলিশদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে দেখা জেলা পুলিশ সুপারকে। চাঁদাবাজির অভিযোগে গত বৃহস্পতিবার মাওয়া ফাঁড়ির কনস্টেবল মজিবর রহমানকে মুন্সীগঞ্জ পুলিশ লাইনে ক্লোজ করা হয়েছে। কনস্টেবল মজিবুর মাওয়া-খুলনা মহাসড়কের মাওয়ায় পণ্যবাহী ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহন থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করছিল।

ওদিকে, গত ৩ দিন ধরে প্রায় ৫ শতাধিক দূরপাল্লার পরিবহন আটকে আছে এ ঘাটে। পণ্য বোঝাই ট্রাকের দীর্ঘ লাইন ক্রমেই বেড়ে চলেছে। এ সুযোগে ঘাটের হাইওয়ে পুলিশ ও পুলিশের সহায়তায় এক শ্রেণীর চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীরা সিরিয়াল দেয়ার নাম করে হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অংকের টাকা। এ অভিযোগ দূরপাল্লার পণ্যবাহী ট্রাক ও যানবাহনের ভুক্তভোগী অনেক গাড়িচালকের।

ট্রাফিক ও পুলিশের দাবি অনুযায়ী চাঁদা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে ড্রাইভিং লাইসেন্স, যানবাহনের কাগজপত্রসহ নানা অজুহাতে যানবাহন আটক করে রাখছে পুলিশ। প্রতিবাদ করলে মামলার ভয় দেখানো হয় বলে অভিযোগ করেন চালকরা। তবে চাহিদা অনুযায়ী টাকা দিলে সবকিছু আইনে পরিণত হয়। তাই বাধ্য হয়ে পণ্যবাহী ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহনের মালিক ও শ্রমিকরা প্রতিদিন চাঁদা দিয়ে যানবাহন চালিয়ে যাচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মাওয়া ঘাটের এক দোকানদার জানান, ঘাটে ফেরি পারাপারের অপেক্ষায় আটকে থাকা শত শত পণ্যবাহী ট্রাক থেকে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করে মাওয়া নৌ-ফাঁড়ির পুলিশ ও ট্রাফিক সদস্যরা। যে সকল যানবাহনের চালকরা ওই পুলিশের চাহিদা মতো টাকা দিচ্ছে তাদের গাড়ি পিছনে থাকলেও ফেরিতে ওঠতে তাদের সিরিয়াল আগে দেওয়া হচ্ছে।


এদিকে,রমজানের দুদিন আগে থেকেই অতিরিক্ত কাঁচামাল ও পণ্য বোঝাই ট্রাকের দীর্ঘ লাইন জমে আছে। এদিকে নদীতে প্রবল স্ত্রোতের কারণে ফেরি চলাচলে সমস্যা তৈরি হওয়ায় ফেরিঘাটে গাড়ির সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। এতে দেখা দিয়েছে তীব্র যানজট। ঘাট এলাকা থেকে আড়াই কিলোমিটারেরও বেশি এলাকাজুড়ে প্রায় ৫ শতাধিক পরিবহন আটকে রয়েছে। এছাড়া কাঁচামাল ও পণ্য বোঝাই শতাধিক ট্রাকক ৫ থেকে ৭ দিন যাবত আটকে থাকায় নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান পণ্যসামগ্রী। আর এ সুযোগে ঘাট এলাকায় দায়িত্বরত হাইওয়ে পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশের সহায়তায় এক শ্রেণীর চাঁদাবাজ ও সন্ত্রসীরা সিরিয়াল (ফেরিতে আগে তুলে দেয়ার শর্ত) দেয়ার কথা বলে চালক ও হেল্পারদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ট্রাক চালকদের অনেকে। এছাড়া ঘাটে ফেরি সংকটের কথাও বলেন তারা।

ভোলা থেকে আসা মাছ বোঝাই এক ট্রাকের চালক জানান, গত ৩ দিন যাবত কাওড়াকান্দি ঘাটে পারাপারের অপেক্ষায় বসে আছেন তিনি। তার পিছনের অনেক ট্রাক বেশি টাকা দিয়ে আগে পার হয়ে গেছে। তার ট্রাকের মালিক অল্পকিছু টাকা দিয়ে পাঠানোর কারণে সে কাউকে টাকা দিতে না পারায় এখনো অপেক্ষায় আছে। এ ব্যাপারে পুলিশকে বারবার বলা হলেও তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। বরং বিচার দিতে গেলে উল্টো শাস্তি দিচ্ছে বলে জানান চালক। কাওড়াকান্দি ফেরিঘাটে দায়িত্বরত ট্রাফিক ইন্সপেক্টর উত্তম কুমার এ ব্যাপারে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে রাজি হননি।


বিআইডব্লিউটিএ’র মাওয়া ফেরিঘাটের সহকারী ব্যবস্থাপক এসএম আশিকুজ্জামান জানান, রমজানের শুরুতেই অতিরিক্ত কাঁচামাল বোঝাই পরিবহন, পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ঘাটের চলাচলকারী অতিরিক্ত পরিবহনের চাপ এবং মাওয়া-কাওড়াকান্দি নৌরুটে নদীতে প্রবল ¯্রােতের কারণে গাড়ির সংখ্যা বেড়ে গেছে। আর তাই যানজট দেখা দিয়েছে। যখনই যানজট তৈরি হয় তখনই কিছু চাঁদাবাজ সিরিয়াল আগে পিছে করার চেষ্টা করে। তবে এরা এখানে প্রশ্রয় পায় না বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, এ রুটে বর্তমানে ৩টি রো-রো ফেরি, ৪টি কে-টাইপ ফেরি এবং ৫টি ডাম্প ফেরি চলাচল করে। কেতকি ফেরিটি প্রায় ৭-৮ দিন ধরে বিকল হয়ে মাওয়া ডকইয়ার্ডে রয়েছে। এছাড়া আরও ছোট ১টি ফেরি রয়েছে। যা বেশির ভাগ সময় ভিআইপি যাত্রীদের পারাপারে ব্যবহৃত হয়। এ রুটে পরিবহন ও যাত্রীদের তুলনায় ফেরির সংখ্যা অনেক কম। বর্তমানে মাওয়া থেকে কাওড়াকান্দি ঘাটের দূরুত্ব প্রায় ১০ কিলোমিটার। কাওড়াকান্দি থেকে মাওয়া যাওয়ার সময় ফেরিগুলোকে তীব্র সোতের প্রতিকূলে যেতে হয়। এ কারণে আগের চেয়ে বর্তমানে প্রায় ২ ঘণ্টা বেশি সময় লাগে। রমজানের শুরুতেই কাওড়াকান্দি ঘাটে এ রকম যানজটের সৃষ্টি হওয়ায় সামনে আরো ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে আতঙ্কিত স্বয়ং বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তারা। তাদের মতে, এখন থেকেই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে এই রুটে যাতায়াতকারী দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়বেন।

চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে মাওয়া নৌ-ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই মো. হাফিজুর রহমান জানান, যানবাহন থেকে টাকা বা চাঁদা আদায়েরর বিষয়ে মাওয়া নৌ-ফাঁড়ির পুলিশ জড়িত নয়। তবে মাওয়া চৌরাস্তায় কর্মরত ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা এ টাকা আদায় করে থাকতে পারে।

ঢাকা নিউজ এজেন্সি