নারীর জন্য জরুরী আইন

মৌলি আজাদ
আমাদের দেশে জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী। আমাদের নারীরা আজ বিভিন্ন দিকেই তাদের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখছেন। তারপরও বিভিন্নভাবেই তারা হচ্ছেন নির্যাতিত। যেমন কেউ ধর্ষিত হচ্ছেন, কেউ পুরষ কর্তৃক প্রতারণার শিকার হচ্ছেন, কেউ গর্ভপাত করাতে বাধ্য হচ্ছেন, কেউ চাকরি ক্ষেত্রে বঞ্চনার শিকার হচ্ছে। কিন্তু কেন তারা এর শিকার হচ্ছেন? তাদের হয়তো জানা নেই যে, নারীদের জন্য আমাদের দেশের আইনে বেশ কিছু প্রতিকার আছে। কিন্তু তারা তাদের জ্ঞানের অভাবে তা জানতে পারছেন না ও সুবিধাও গ্রহণ করতে পারছেন না, যা দুঃখজনক। নিম্নে নারীদের অবগতির জন্যই কিছু আইন তুলে ধরা হল:

সাংবিধানিক আইন:

মনে রাখবেন সংবিধান হল আমাদের দেশের সর্বোচ্চ আইন। আর এই সর্বোচ্চ আইনের বেশ কিছু ধারাই রয়েছে নারীর জন্য।


যেমন ২৮ (২) নং আছে : ‘রাষ্ট্র ও গণজীবনের সকল ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান অধিকার আছে।’ অর্থাৎ একজন মহিলা বলে তাকে কোন কাজ থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। যোগ্যতা থাকলে পুরুষরে মতো তিনিও রাষ্ট্রীয় পদ ধারণ করতে পারবেন।

সংবিধানের ২৮ (৩) ধারানুযায়ী, একজন নারী যে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও ভর্তি হতে পারবেন।

২৯ (২) তো নারীর জন্য মহাসুযোগের অধিকার দেয়।
২৯ (২) তে বলা আছে, নারী- পুরুষভেদে কোন নাগরিকই প্রজাতন্ত্রের কাজে নিয়োগের বা রাষ্ট্রীয় পদ লাভের বিষয়ে অযোগ্য বিবেচিত হবেন না বা তার প্রতি বৈষম্য করা যাবে না।

সংবিধানের ৬৫ (৩) ধারানুযায়ী, নারীর জন্য বাংলাদেশের সংসদে নির্বাচনের জন্য সংরক্ষিত আসনও আছে।

সাংবিধানিক আইনের পর আলোচনা করা যায় বাংলাদেশে প্রচলিত অন্যান্য আইন নিয়ে। যেমন ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি আইন।

যেমন কোন নারী যদি তার সম্মতি ছাড়া গর্ভপাত করতে বাধ্য হন তবে তিনি দণ্ডবিধির আশ্রয় নিতে পারেন। এক্ষেত্রে দোষী ব্যক্তির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা যে কোন বর্ণনার কারাদণ্ডে যার মেয়াদ ১০ বছর পর্যন্ত হতে পারে এবং সেই সঙ্গে অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন (ধারা ৩১৩ বিপিসি) । এরপর কোন নারীকে প্ররোচিত করে কোন ব্যক্তি যদি তার সঙ্গে সহবাস করে থাকে তবে ওই ব্যক্তি যে কোন বর্ণনার কারাদণ্ডে যার মেয়াদ ১০ বছর পর্যন্ত ও সেই সঙ্গে অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন (ধারা ৪৯৩ বিপিসি) । এরপর কোন পুরুষ যদি তার পূর্ববর্তী বিয়ের কথা গোপন করে কোন নারীকে বিয়ে করে, তবে সেই নারী ওই ব্যক্তিকে দণ্ডবিধির ৪৯৫ ধারানুযায়ী ধরিয়ে দিতে পারেন। তাহলে সেই ব্যক্তি যে কোন বর্ণনার কারাদণ্ডে যার মেয়াদ ১০ বছর পর্যন্ত ও সেই সঙ্গে অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

দণ্ডবিধির ৫০৯ ধারাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ধারাটি ইভটিজিংয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আমাদের দেশের নারীরা প্রায়ই রাস্তাঘাটে পুরুষের বিভিন্ন মন্তব্য/অঙ্গভঙ্গি শুনতে বা দেখতে পায় যা নারীর জন্য বিরক্তিকর। এরূপ ক্ষেত্রে নারী দণ্ডবিধির ৫০৯ ধারার আশ্রয় নিতে পারে। এক্ষেত্রে ইভটিজিংকারী ১ বছর মেয়াদী কারাদণ্ডে বা অর্থদণ্ডে বা উভয়বিধ দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

ফৌজদারি আইনে প্রতিকার :

এই আইন নারীকে একটু অন্যরকমভাবে প্রতিকার দিয়েছে। যেমন : ফৌজদারি কার্যাবিধির ৩৮২ ধারানুযায়ী মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত স্ত্রীলোক গর্ভবতী হলে হাইকোর্ট বিভাগ তার দণ্ড স্থগিত রাখার আদেশ দিতে পারেন বা দণ্ড হ্রাস করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিতে পারেন।

দেওয়ানি আইনে নারীর জন্য প্রতিকার :

১৯০৮ সালের দেওয়ানি আইন সাধারণত সম্পত্তি ও অর্থ নিয়েই কাজ করে। এক্ষেত্রে আদালত অর্থের ডিক্রি জারিতে কোন মহিলাকে গ্রেফতার বা দেওয়ানি কয়েদে আটক রাখার আদেশ দিতে পারবেন না। দেওয়ানি কার্যবিধির ১৩২ ধারানুযায়ী, একজন পর্দানশীল মহিলা ব্যক্তিগতভাবে আদালতে উপস্থিত নাও থাকতে পারেন। এই ধারা উপরোক্ত শ্রেণীর মহিলাদের জন্য বিশাল সুযোগ।

উপরে সংক্ষেপে আমাদের দেশের নারীদের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু আইন তুলে ধরা হল যা দেশে প্রচলিত থাকা সত্ত্বেও নারীরা জানেন না, ফলে তার ফলাফলও ভোগ করতে পারেন না।

উপরোক্ত আইনের পাশাপাশি একজন নারীকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০, ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, বিবাহ রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯৩৯ সালের মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখতে হবে। তবেই তা নারীর জন্য হবে মঙ্গলজনক। নারীকে আর কোন ক্ষেত্রেই বাধার সম্মুখীন হতে হবে না।

লেখক: সিনিয়র সহকারী সচিব (লিগ্যাল), বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন।

অপরাজিতা নিউজ