মুন্সীগঞ্জে ৬ মাসে ১৫ গুপ্ত হত্যা, লাশ দাফনে ভোগান্তি

মুন্সীগঞ্জে আবার শুরু লাশের ছড়াছড়ি। যেখানে-সেখানেই পাওয়া যাচ্ছে লাশ আর লাশ। লাশ গুম-গুপ্ত হত্যায় মুন্সীগঞ্জ নিরাপদ জোনে পরিণত হয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই মুন্সীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার খালে বিলে, নদী-ডোবায় পাওয়া যাচ্ছে লাশ আর লাশ। এ থেকে দীর্ঘ হচ্ছে লাশের মিছিল। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে মুন্সীগঞ্জে লাশের হাট বসছে। গত ৬ মাসে জেলার বিভিন্ন স্থানে মিলেছে ১৫টি অজ্ঞাত পরিচয়ের লাশ। এর মধ্যে শ্রীনগরে মিলেছে ৬টি লাশ ও তরুণী রয়েছে ৫জন। বাকি ৯ জন যুবক। এসব অজ্ঞাতনামা লাশের দাফন নিয়ে মুন্সীগঞ্জ পৌরসভা ও মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল কর্তপক্ষকে নানা ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। পৌরসভাকে লাশ দাফনের জন্য চিঠি দিয়েও দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয় হাসপাতাল কর্তপক্ষকে। ওদিকে, লাশ দাফনের জন্য পৌরসভার পর্যাপ্ত টাকা বরাদ্দ না থাকায় তারা লাশ দাফনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামেরও মুন্সীগঞ্জে কোন কর্মকা- নেই। এ অবস্থায় লাশ দাফনে পৌর কর্তৃপক্ষ ও জেনারেল হাসপাতালের ময়নাতদন্ত কর্মকর্তাকে নানা ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

এদিকে, গত ৩১ মাসে জেলায় খুনের শিকার হয়েছেন অন্তত ১২০ জন। এর মধ্যে ৬০ জনের অধিক লাশ গুম-গুপ্ত হত্যার শিকার হয়। এ গুপ্তহত্যা থেকে বাদ পড়ছে না নারীরাও। পরিচয়হীন লাশগুলো পৌরসভার মাধ্যমে দাফন করা হয়। কিন্ত এর পরও এ রকম অসংখ্য গুম হত্যা হচ্ছে। এছাড়া হাইওয়ে সড়কগুলোর আশপাশেও অজ্ঞাত পরিচয়ের লাশ পাওয়া যাচ্ছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও ঢাকা-মাওয়া মহাসড়ক রাতে টহল পুলিশই বা কি করছে। তারা টহল কাজে থাকলে কাউকে খুন করে লাশ এ জেলায় এনে ফেলে রাখা ঘাতকদের পক্ষে সম্ভব হতো না বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা। পুলিশি টহল ব্যবস্থা না থাকায় এসব খুনের ঘটনা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কোন হত্যায় আসামি শনাক্ত, গ্রেপ্তার না হওয়ায় ও মামলার কোন ক্লু-উদ্ঘাটন না হওয়ায় বা পুলিশকে ম্যানেজ করে মুন্সীগঞ্জে নদী-নালা, ডোবায় অনবরত লাশ ফেলে যাচ্ছে অপরাধীরা। নিরাপদ স্থান হিসেবে বেছে নিয়েছে মুন্সীগঞ্জ জেলাকে।


সর্বশেষ শুক্রবার বেলা ১১ টার দিকে শ্রীনগর উপজেলার সমষপুর হেলিপ্যাডে বালু চাঁপা অবস্থায় হাত-পা বাঁধা অজ্ঞাত পরিচয়ের যুবকের (৪০) লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গত ৩০শে জুন জেলার শ্রীগর ও লৌহজংয়ে অজ্ঞাত পরিচয়ের দুই যুবতীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এদিন দুপুর সোয়া একটার দিকে লৌহজং উপজেলার মৌছামান্দ্রা খালের পাড় থেকে অজ্ঞাত পরিচয়ের তরুণীর (১৮) গলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এর আগে সকালে ঢাকা-দোহার মহাসড়কের শ্রীনগর উপজেলার পুসারিপাড়ায় রাস্তার পাশ থেকে অজ্ঞাত পরিচয়ের অপর তরুণীর (২২) লাশ উদ্ধার করা হয়। গত ২৪ শে জুন দুপুরে গজারয়িা উপজেলার দড়িকান্দি গ্রাম থেকে অজ্ঞাত পরিচয় এক যুবতীর (২২) লাশ উদ্ধার করে গজারিয়া থানার পুলিশ। গত ১৭ই জুন রাতে ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের শ্রীনগর উপজেলার সমষপুর বাস স্ট্যান্ড সংলগ্ন সড়কের ডোবা থেকে অজ্ঞাত পরিচয়ের এক যুবকের (৪০) ক্ষত-বিক্ষত লাশ উদ্ধার করে শ্রীনগর থানার পুলিশ। গত ১৭ই জুন দুপুর ১২ টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের গজারিয়া উপজেলার বাউশিয়া এলাকায় মাদ্রাসার পাশ থেকে অজ্ঞাত পরিচয়ের তরুণীর (২০) লাশ উদ্ধার করা হয়।

গত ১০ই জুন সকাল ১০ টার দিকে শ্রীনগর উপজেলার আটপাড়া ইউনিয়নের আটপাড়া গ্রামের বেইলী ব্রিজের নীচে খালের পানিতে ভাসমান অবস্থায় অজ্ঞাত পরিচয়ের এক যুবকের (২০) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। গত ১ লা জুন দিবাগত রাতে লৌহজংয়ে চোর সন্দেহে গণপিটুনিতে আব্দুল জলিল (১৮) নামে এক যুবকের মৃত্যু ঘটে। জলিল মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার কাওড়াকান্দি খলবেপারী এলাকার নূর মোহাম্মদের ছেলে। পরদিন ২ জুন সকাল ১০ টার দিকে পদ্মা সেতু রেস্ট হাউজ সংলগ্ন মাওয়া নতুন মাছঘাট এলাকায় রাস্তার পাশে থেকে জলিলের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। গত ১৪ই এপ্রিল সকালে সিরাজদিখান উপজেলার বালুচর ইউনিয়নের পূর্ব-কয়রাখোলা গ্রামের আক্কাস মোল্লার বাড়ির পুকুর পাড়ের কড়াই গাছে ঝুলন্ত অবস্থায় অজ্ঞাত পরিচয় এক মহিলার (৩০) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তার গলায় ওড়না প্যাচানো কালো দাগ ও শরীরে জখমের চিহ্ন ছিল।গত ১৭ ই মার্চ সকালে শহর সংলগ্ন শাহ সিমেন্ট সংলগ্ন শীতলক্ষ্যা নদী থেকে অজ্ঞাতনামা (৪৫) এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করা হয়।


পরে রাতে তার স্বজনরা মুন্সীগঞ্জ জেরারেল হাসপাতাল মর্গে এসে লাশ শনাক্ত করে নিয়ে যায়। নিহত ফারুক হোসেন চাঁদপুর জেলার মতলব উপজেলার রায়েরকান্দি গ্রামের প্রয়াত খালেক মিয়ার ছেলে। ফারুক আল্লাহর দান নামে বালুবাহী বাল্কহেডের সুকানি ছিলেন। এর আগে ১৫ই মার্চ রাতে ফারুক নিখোঁজ হয়। ২৪ ঘন্টার ব্যবধানে গত ১৯ শে ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৮ টার দিকে শহরের হাটলক্ষীগঞ্জ বেড়িবাঁধ এলাকা ও তার সামান্য অদূরে পরদিন ২০ফেব্রুয়ারি একই সময়ে মোল্লারচর এলাকার ধলেশ্বরী নদী থেকে অজ্ঞাতনামা ২ যুবকের লাশ মুক্তারপুর নৌ-পুলিশ উদ্ধার করে। ৩টি খুন-গুম হত্যাসহ মুন্সীগঞ্জের বিভিন্ন স্থান থেকে গত ২৪ শে জানুয়ারি একদিনে ৬টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। খুন-গুম হত্যার মধ্যে সিরাজদিখানে ২ ও শ্রীনগরে এক যুবক রয়েছে। এদের ৩ জনকেই গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।

গত ২৪ শে জানুয়ারি সিরাজদিখান উপজেলার রশুনিয়া ব্রিজের নীচ থেকে সকাল সাড়ে ৮ টার দিকে ইব্রাহিম, এর ঠিক ১০০ গজ অদূরে দুপুর ১২ টার দিকে গুলিবিদ্ধ কুদ্দুসের লাশ ও দুপুর সাড়ে ১২ টার দিকে শ্রীনগর উপজেলার বাড়ৈখালী শ্রীধরপুর এলাকার রাস্তার পাশে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মাসুদ খানের লাশ পুলিশ অজ্ঞাত পরিচয়ের লাশ হিসেবে উদ্ধার করে। ৩ জনকেই খুব কাছ থেকে মাথার পেছনের দিক থেকে পেশাদার খুনিরা খুন করে লাশ ফেলে রেখে যায়। তাদের প্রত্যেকের গুলিই মাথা ভেদ করে বেরিয়ে যায়।এ কারণে ময়নাতদন্তকারী অফিসার তাদের শরীরের কোথাও কোন গুলি পায়নি। এখানে এনেই যে তাদের হত্যা করা হয়েছে তাও নিহতদের উদ্ধারের পর রক্তমাখা শরীর দেখেই অনুমান করা যায়। তাদের চোঁখ-মুখ নতুন গামছা দিয়ে বাঁধা ছিল। নিহত ইব্রাহিম মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার নওপাড়া গ্রামের খোরশেদ আলমের ছেলে। সে ঢাকার জুরাইনের দারোগা বাড়ি রোডে মামা সালাহউদ্দিনের বাসায় থাকতো। দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের আমবাগিচা এলাকার বাসিন্দা কুদ্দুস মিয়া (৪০) হচ্ছে- মাদারীপুরের হুগলি এলাকার হাজী আব্দুল খালেক বেপারীর ছেলে।

অপর যুবক মাসুদ ওরফে রাঢ়ী মাসুদ (৩০) দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের আমবাগিচা এলাকার মীর জাহান খানের ছেলে। গত ২১শে জানুয়ারি সিরাজদিখানের তেলিপাড়া গ্রামের একটি জমি থেকে অজ্ঞাত তরণীর (২২) লাশ পুলিশ উদ্ধার করে। গত ১৮ই জানুয়ারি রাতে জনতার গণপিটুনির শিকার হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ডাকাত সদস্য আবু হাসান (২৮) মারা যায়। এর আগের দিন দিবাগত রাতে টঙ্গীবাড়ির রাউৎভোগ এলাকায় ডাকাতির প্রস্তÍতিকালে জনতা আটক করে তাকে গণপিটুনি দেয়।

ঢাকা নিউজ এজেন্সি