শ্রীনগর শিশু সদনটি নিজেই এতিম

srinagar etimভবিষ্যত জীবনে ওরা হয়তো কখনোই হতে পারবে না দৌড়ের রাজা উইসান বোল্ড বা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। তবু মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে একমাত্র সরকারি শিশু সদনের উপজাতি শিশু উইসান অছো, ঝিং সু ওবামা, বাঁশিমমসহ এতিম শিশুরাও ভবিষ্যতে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখে। জেলার শ্রীনগর উপজেলার ভাগ্যকুলে একমাত্র সরকারি শিশু সদনে ১৭ জন উপজাতি শিশুসহ ৪১ জন এতিম শিশুর মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়েছে। ৫ বছর থেকে ১২ বছর বয়সী এ শিশুরা বেড়ে উঠছে শিশু পরিবারের চার দেয়ালের ভেতর। ওদের মধ্যে বেশীর ভাগ শিশুরই বাবা নেই। আবার মা থেকেও নেই অনেকের। শিশু পরিবারের সর্ব-কনিষ্ঠ সদস্য শিশু মোছলেম জানে না তার ‘বাবা-মা’ কে। কি তার পরিচয়। মাত্র ৫ বছরের এ শিশুর মোসলেম নামটি দেওয়া শিশু পরিবার কর্তৃপক্ষের। মোসলেমের মতোই সালমান, মনির, রাব্বির নাম রেখেছে দেওয়া হয়েছে শিশু পরিবারের কর্তৃপক্ষ।

ক্রাচে ভর দিয়ে হাটি হাটি পায়ে চলাফেরা করতে হয় শিশু মুন্নাকে। এক সড়ক দুঘর্টনায় ২ বছর বয়সে মুন্না তার ডান পা হারায়। একই সঙ্গে হারিয়েছে বাবা-মাকে। এরপর মুন্না খুঁজে পায় এই শিশু পরিবারের ঠিকানা। ওর বয়স এখন ৫ বছর। ৩ বছর ধরে মুন্না বেড়ে উঠছে এখানে। মুন্নার মতোই পিতৃ-পরিচয়হীন অসংখ্য শিশু লালিত-পালিত হচ্ছে শিশু পরিবারের বড় ভাই-খালাম্মা ও মাদারের হাতে। তার পরও কি ভালো আছে ওরা-এমন প্রশ্ন অনেকেরই। বাস্তব চিত্রে দেখা গেছে ভালো নেই মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার ভাগ্যকুলের অঁজপাড়া গাঁয়ে অবস্থিত জেলার একমাত্র সরকারি শিশু পরিবারের এতিম শিশুরা। ভালো নেই খোদ শিশু পরিবারটি নিজেই। এতিম শিশুদের লালন-পালনে এ শিশু পরিবারে রয়েছে লোকবল সঙ্কট। শিশুদের লালন-পালনে অযতœ আর অবহেলারও অভিযোগ রয়েছে। শিশুরা এখানে ৩ বেলা খেতে পেলেও সেই খাবারের মান নিয়ে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। একই সঙ্গে শিশুরা বঞ্চিত হচ্ছে চিকিৎসা সেবায়। এক সপ্তাহ আগেও সেখানে ৪৭ জন এতিম শিশু ছিল। ৭ দিনের ব্যবধানে এদের মধ্য থেকে ৬ জন অন্যত্র চলে গেছে।


বর্তমানে ওই শিশু পরিবারের এতিম শিশুর সংখ্যা কমে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৪১-এ। কর্মস্থলে পাওয়া যায়নি শিশু পরিবারের উপ-তত্বাবধায়ক মোশারফ হোসেনকে। তার অধীনস্থ মাদার হিসেবে কর্মরত মেহেরুন্নেছার সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, শিশু পরিবারের ১৯ টি পদের মধ্যে ৯ টি পদই খালি। এতিম শিশুদের চিকিৎসা সেবা প্রদানে খন্ডকালীন ডাক্তারে ১ টি, ডাক্তারের সহকারীর ১টি, সহকারী তত্বাবধায়কের ১ টি, এমএলএসের ৫ টির মধ্যে ৩ টি, কারিগরি প্রশিক্ষকের ২ টির মধ্যে ১টি, বড় ভাইয়ের ২টির মধ্যে ১ টি ও নার্সের ১ টি পদ খালি রয়েছে।এ শিশু সদনে মাথা গোঁজার ঠাঁই পেতে পারতো ১’শ শিশু। কিন্তু ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা ও সুযোগ-সুবিধার অভাবে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এতিম শিশুরা আসছে না সরকারি এ শিশু পরিবারে।এদিকে, শিশু পরিবারের ভেতর খেলার মাঠ থাকলেও এতিম শিশুদের খেলার সুযোগ হয়ে উঠে না। খেলার মাঠটি হয়ে উঠেছে গোচারন ভূমি। সমাজসেবা অধিদপ্তরের আওতাধীন এ শিশু পরিবারে শুরু থেকে আজোবধি ১’শ এতিম শিশুর কোটাপূর্ণ হয়ে উঠেনি। সেখানে বড় ভাই পদে কর্মরত কামাল উদ্দিন লোকবলের অভাবে কখনো উপ-তত্বাবধায়ক কখনো বা সহকারী তত্বাবধায়কের ভূমিকা পালন করে থাকেন। মাদার পদে কর্মরত মেহেরুন্নেছাও দায়িত্ব পালন করছেন ডেপুটেশনে। সেখানে কর্মরত বড় ভাই কামাল উদ্দিন দাবী করেন-এতিম শিশুদের একটি পরিবারের মতোই আদর-যতœ ও স্নেহ ভালোবাসার মধ্য দিয়ে লালন-পালন করা হয়ে থাকে।


এখানে শিশুদের ৩ বেলা খাবার দেওয়া হয়ে থাকে। সপ্তাহের সকালে নাস্তার মেন্যু রয়েছে ২ দিন রুটি-কলা, সেমাই। ২দিন আলু ভর্তা-ভাত ও ৩ দিন সবজি-খিচুরি। দুপুরে ২ দিন মুরগীর মাংস, ৩ দিন ভাত-মাছ ও অপর ২ দিন ভাত-ডিমের তরকারি।এছাড়া রাতের বেলায় ৫ দিনই খাবারের মেন্যুতে রয়েছে ভাত, সবজি ও ডাল। বাকী ২ দিন শুধু ভাত ও ডিমের তরকারি। নিয়োগ প্রাপ্ত ২ জন বার্বুচী রয়েছে শিশুদের জন্য রান্নার কাজে। ৫ তলা বিশিষ্ট ডরমেটরী ভবন ছাড়াও সেখানে রয়েছে উপ-তত্বাবধায়ক, রান্না ও ট্রেনিং সেন্টারের আলাদা আলাদা ভবন। শিশু সদনের কয়েকজন এতিম শিশু জানান, শিশু পরিবারের বিরুদ্ধে কথা বলা নিষেধ রয়েছে। কারোই মুখ খোলার সাহস নেই। কোন এতিম শিশু যদি ভুলেও সাংবাদিকদের সম্মুখে মুখ খুলে থাকে-তাহলে সেই এতিম শিশুকে আশ্রয়ের ঠিকানা হারাতে হয়। এ ব্যাপারে শিশু সদনের উপ-তত্বাবধায়ক মোশারফ হোসেন বলেন- এখানকার এতিম শিশুদের যথা সম্ভব যতœ নেওয়া হয়। ভালো খাবার দেওয়া হয়-এমনটা বলবো না। বরাদ্দ অনুযায়ী খাবার দেওয়া হয় শিশুদের। এছাড়া বিভিন্ন জাতীয় দিবস উপলক্ষ্যে যেমন-স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, একুশে ফেব্রয়ারি প্রভৃতি দিনগুলোতে উন্নত মানের খাবার পরিবেশন করা হয়।

আসন্ন রোজায় প্রতিদিন এতিম শিশুদের থাকবে ভালো ভালো সব খাবার।

ঢাকা নিউজ এজেন্সি