প্রেম্বা শেরপার অবহেলাতেই সজল খালেদের মৃত্যু!

প্রেম্বা! একজন নেপালী শেরপা। সাধারণের চেনা নাম না হলেও পাহাড় জয়ী স্বপ্নবাজরা তাকে এক নামেই চেনে। যেমনটি চিনতেন এভারেস্টজয়ী সজল খালেদ। আর বহুদিনের চেনা এই মানুষটির হাত ধরেই এভারেস্টের শিখরে পা রেখেছিলেন স্বপ্নবাজ সজল। কিন্তু শেষ মুহুর্তে সে হাত ছেড়ে দিয়েছিল প্রেম্বা। বহুদিনের সম্পর্ক ভুলে, পেশাগত দায়িত্ব অবহেলা করে অসুস্থ অবস্থায়ই সজলকে ডেথ জোনে ফেলে দিয়ে আসে সে। আর এমনটি করেছে শুধুই মোটা অঙ্কের অর্থের লোভে। এসব অভিযোগ নিহত সজল খালেদের পরিবারের।

গত ২১ মে এভারেস্ট জয় করে ফিরে আসার পথে সজল খালেদ মারা যান বলে খবর পাওয়া যায়। অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমী এই তরুণ চলচ্চিত্রকার হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। তার মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে আসে সারাদেশে। সরকারি সহায়তায় তার লাশ উদ্ধারে অভিযান চালানো হলেও বৈরি আবহাওয়ার কারণে তার লাশ পাওয়া যায়নি বলে জানান উদ্ধারকারী শেরপারা।

পঞ্চম এভারেস্ট জয়ী বাংলাদেশি সজল খালেদের স্ত্রী তাহমিনা খান শৈলী বাংলানিউজকে বলেন, সজলের নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে আমরা নানাভাবে প্রেম্বার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে আসছি।কিন্তু সে কোনভাবে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। এমনকি নেপালে গিয়ে তাকে দিনের পর দিন ফোন করেও পাওয়া যায়নি।

শৈলী বলেন, প্রেম্বার সঙ্গেই এভারেস্টে উঠেছিল সজল। ২০০৭ সাল থেকেই তার সঙ্গে পরিচয়। এভারেস্ট জয়ী দ্বিতীয় মুহিতেরও গাইড এই প্রেম্বা। সে বাংলাদেশে এসেছে, আমরা নেপালে তার বাড়িতে থেকেছি। এমন পরিচয় থাকলে একটা মানুষ মারা গেল অথচ প্রেম্বা আমার সঙ্গে বা আমার পরিবারের সঙ্গে দেখা করল না এটা স্বাভাবিক নয়।

তিনি বলেন, বহু প্রশ্নের উত্তর মিলছে না। প্রেম্বার একটা কথার সঙ্গে আরেকটা কথা মিলছেনা। মিলছে সঙ্গে থাকা অন্য পর্বতারোহীদের কথার সঙ্গেও। এক অদ্ভূত রহস্যের মধ্যে আছি আমি এবং আমরা।

শৈলী বলতে থাকেন, এবারের সামিটে সজল ছাড়াও প্রেম্বার সঙ্গে থাকা সুদর্শন নামের এক ব্যক্তি এভারেস্ট জয় করে। যার দুই হাত নেই। প্রেম্বার দেওয়া তথ্য মতে, সামিট করে ফেরার পথে সজল খালেদ সবার সামনে ছিল। এক পর্যায়ে সে দুর্বল হয়ে পিছিয়ে পড়ে।

অন্যদিকে, সুদর্শনের বক্তব্য অনুযায়ী, সজল পিছনে ছিল। এবং শেষবার পেছন ফিরে সুদর্শন তাকে ছবি তুলতে দেখেছিল সে।

শৈলী বলেন, যে ব্যক্তি ছবি তুলছিল সে কিভাবে হঠাৎ করে কিভাবে অসুস্থ হয়ে যায়? যদি অসুস্থই হয় তাহলে প্রেম্বা বা তার সঙ্গে থাকা অন্য শেরপারা তাকে হাঁটতে সাহায্য করেনি কেন?

প্রসঙ্গত, গাইড শেরপা হিসেবে প্রেম্বা ছাড়াও ছিলেন তার ছোট ভাই ম্রিংমা ও পূর্বা।

শৈলীর অভিযোগ, এভারেস্ট জয়ী সুদর্শনের স্পন্সর ছিল একটি বড় কানাডিয়ান কোম্পানি। চুক্তি মোতাবেক এভারেস্ট জয় করে ফিরলে সত্তর হাজার মার্কিন ডলার পাবে সুদর্শন। গাইড হিসেবে এর কিছু অংশ পাবে প্রেম্বাও। মূলত এই টাকার জন্যই প্রেম্বার সকল মনোযোগ জুড়ে ছিল সুদর্শন। আর যখনই তাদের সঙ্গে থাকা সজল অসুস্থ হয়ে পড়ে তখন তাড়াহুড়া করে তাকে ফেলে আসে প্রেম্বা ও তার সঙ্গী অন্যান্য শেরপারা। এক পর‌্যায়ে সুদর্শনকে হেলিকপ্টারে করে উদ্ধার করা হলেও অসুস্থ সজলের কথা ভাবা হয়নি।

সজলের বন্ধু ও পাহাড় জয়ী মীর শামসুল আলম বাবু বলেন, নিয়মানুযাযী এভারেস্টে ওঠার বিশেষ দড়ির সঙ্গে আরোহীদের শরীর আটকানো থাকে। সজলেরও ছিল। সে যদি মারা গিয়ে থাকে তাহলে দড়ির সঙ্গে ঝুলে থাকার কথা। গায়েব হয়ে যাওয়ার প্রশ্নই আসেনা। তাহলে সেখান থেকে তাকে খুলে দিল কে?

শৈলী এই ফাঁকে আবারও বলেন, প্রেম্বার কাছে বিস্তারিত জানার জন্য কতবার তাকে ফোন করেছি। দেখা করব বলে। কিন্তু সে ফোন ধরেনি। আমরা যখন কাঠমান্ডু থেকে অন্য শহরে গিয়েছি তখন সে নেপালের বাংলাদেশ দূতাবাসে এসে জবানবন্দি দিয়ে যায়।

সজলের আরেক বন্ধু রিয়াজ আহমেদ বলেন, প্রেম্বা আমাদেরকে চেনে। ও জানে পাহাড় সম্পর্কে আমাদের ধারণা আছে।এজন্যই আমাদের মুখোমুখি না হয়ে দূতাবাসের কর্মকর্তাদের কাছে যা তা জবানবন্দি দিয়ে গেছে।

তবে দেশে ফেরার একদিন আগে প্রেম্বার সঙ্গে শৈলী এবং সজলের বন্ধুদের দেখা হয় বলে জানান তারা।

জানা যায়, সেদিনও নানা বিভ্রান্ত কথা শোনায় প্রেম্বা। সজল অনেক আগে থেকে দূর্বল হয়ে হাঁটতে পারছিল না বলে প্রথম দিকে বললেও শেষের দিকে প্রেম্বা জানায় নিজ হাতে সে সজলের অক্সিজেন মাস্ক, পানির বোতলসহ বেশ কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস খুলে মাথার পাশে রেখে এসেছিল।

শেলী আপত্তির সঙ্গে বলেন, যদি তাই সে করে থাকে তাহলে সেটাও অন্যায় করেছে প্রেম্বা। কারণ, একজন পর্বতারোহীর শরীরের অক্সিজেন মাস্ক সে কোনভাবেই খুলতে পারেনা। এটা শেরপা নীতি বহির্ভূত কাজ।

শৈলী সজলের ফেরত পাওয়া কিছু ব্যবহারর‌্য সামগ্রী নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশর কিছু পতাকা, পানির বোতল, চকলেট, অক্সিজেন রেগুলেটর, বুকস্যাক, মেমরি কার্ড(১৬ জিবি) এবং ছোট একটি ব্যাগ আমাদের হাতে এসেছে। কিন্তু ওই মেমরি কার্ডে বাংলাদেশর কিছু ছবি ছাড়া আর কোন ছবিই ছিল না।

নতুন কোন মেমরি হলে কোন ছবিই থাকবে না। আর সেখানে যেহেতু বাংলাদেশের ছবি ছিল যদি ওই কার্ডে সজল আর কোন ছবি না তুলে থাকে তাহলে নেপালে ওর সামিটের যাওয়ার আগে একই কার্ডে আমরা বেশ কিছু ছবি তুলেছিলাম। সেসব দারুণ মুহুর্তগুলো সজল সঙ্গে করে নিয়ে যেতে চেয়ছিল। এজন্য পরে সে কোনকারণেই এসব ছবি নিজে মুছে ফেলেনি।

কেউ হয়ত কার্ডটি পেয়ে আমাদের হাতে দেওয়ার আগে কিছু ছবি মুছে ফেলেছে। যাতে করে সজল কোন সময় কোথায় অবস্থান করছিল সেটা আমরা জানতে না পারি। কারণ, কোথায় কোন মুহুর্তে সে অবস্থান করছিল এটা জানতে পরেলে সবকিছু স্পষ্ট হয়ে যাবে। নিচের ক্যাম্পগুলো থেকে সজলের যে ব্যাগ পাওয়া গেছে সেটিও সজলের কিনা তাতে সন্দেহ শৈলীর।

এছাড়া সজলের ক্যামেরা, ট্যাবসহ, ডায়েরিসহ আরো কিছু নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস যা সব সময় সজলের কাছে থাকত সেগুলো পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে সেসবগুলো তার পরনের জ্যাকেটের ভিতরেই ছিল। বা আছে।

সজল খালেদের পাসপোর্টটি এখনো তার পরিবারের হাতে আসেনি। তারা জানান, পাসপোর্ট সজল সামিটে নিয়ে যায়নি। নিচে কোথায় রেখে গেছে। প্রেম্বা প্রথমে জানায় বেসক্যাম্পে থাকা ব্যাগে আছে সজলের পাসপোর্ট। কিন্তু সে ব্যাগটি তালা ভাঙ্গা অবস্থায় পাওয়ার পর প্রেম্বা দাবি করে পাসপোর্ট সজল সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু যেখানে একটি সূকোর ওজন বেশি না নেওয়ার চেষ্টা করে অভিযাত্রীরা সেখানে কেন সজল পাসপের্ট নিয়ে যাবে প্রশ্ন তোলেন শৈলী।

বিতর্ক আছে সজল খালেদের এভারেস্ট জয়ের খবর জানানো নিয়েও। নিয়মানুযায়ী বিভিন্ন বেজক্যাম্পে থাকা শেরপাদের মাধ্যমে খবরটি এভারেস্টজয়ীর পরিবারসহ অন্যান্যদের জানানোর কথা। কিন্তু সে কাজটিও প্রেম্বা বা তার ভাইয়েরা করেনি। কিভাবে সজলের খবর আমরা পেয়েছিলাম সেটাতেও অবাক হতে হয়- বলেন শৈলী।

তিনি বলেন, অনেক প্রশ্ন ছিল প্রেম্বার কাছে। যে সজলের সঙ্গে ছিল। কিন্তু সেসব প্রশ্ন এড়িয়ে গেছে প্রেম্বা। তাকে ঘাড় ধরে উত্তর আদায় করার ক্ষমতা আমার নেই। নেই বাংলাদেশ দূতাবাসেরও। তাই সজলের নিখোঁজ হওয়ার রহস্যের সমাধান না হতেই ফিরতে হয়েছে আমাকে। তবে এ রহস্যের শেষ দেখবেন বলে দৃঢ় কণ্ঠে জানান শৈলী।

উল্লেখ্য, বাংলা মাউন্টেইনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাবের (বিএমটিসি) সদস্য সজল খালেদ গত ২০ মে সকাল সাড়ে আটটার দিকে এভারেস্ট চূড়ায় ওঠেন। এরপর সাউথ কোলের ওপরে এসে বিকেলে অসুস্থ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন বলে খবর পাওয়া যায়।

পরে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে তার মরদেহ দেশে আনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও অভিযানে তার মরদেহ খুঁজে পাওয়া যায়নি। বৈরী আবহাওয়ার কারণে উদ্ধার অভিযান স্থগিত করা হয়।

এর আগে ২০১১ সালে তিনি এভারেস্ট অভিযানে গিয়েছিলেন তিব্বত অংশ অর্থাৎ উত্তর দিক দিয়ে।সেবার অসুস্থ হয়ে পড়লে প্রায় ২৩ হাজার ফুট উচ্চতার ক্যাম্প ওয়ান থেকে তিনি নেমে আসেন। গত ১০ এপ্রিল ঢাকা থেকে কাঠমান্ডু পৌঁছান খালেদ। ২৫ এপ্রিল কাঠমান্ডু থেকে এভারেস্টের উদ্দেশে রওনা হন তিনি।

খালেদ এর আগে সিকিমের ফ্রে পর্বত (২০০৬), নেপালের মাকালু (২০০৯), হিমালয়ের বাংলাদেশ-নেপাল ফ্রেন্ডশিপ পিক (২০১০), অন্নপূর্ণা রেঞ্জের সিংগুচুলি পর্বত (২০১১) জয় করেন।

চলচ্চিত্রকার হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেছিলেন তিনি। মুহম্মদ জাফর ইকবালের উপন্যাস অবলম্বনে তিনি তৈরি করেন সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র `কাজলের দিনরাত্রি।`

গত জানুয়ারি মাসে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটির উদ্বোধনী প্রদর্শনী হয়। পর্বতারোহণ নিয়ে এডমান্ড ভিস্টর্সেলের লেখা একটি বইও অনুবাদ করেছেন সজল খালেদ, যার নাম ‘পর্বতের নেশায় অদম্য প্রাণ’। গত বইমেলায় এটি প্রকাশিত হয়।

সজল খালেদের গ্রামের বাড়ি মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগরে। ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট।

জাকিয়া আহমেদ ও জেসমিন পাপড়ি
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম