টঙ্গীবাড়ীতে আ’লীগের রাজনীতিতে ত্রি-ধারায় কোন্দল

টঙ্গীবাড়ীতে আ’লীগের রাজনীতিতে দলীয় ও উপদলীয় কোন্দল তুষের আগুনের মতো জ্বলছে। এই আগুনের ছোয়ার প্রভাব আগামী দশম সংসদ নির্বাচনে ব্যাপক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে অনেকেই মনে করছেন। টঙ্গীবাড়ী-লৌহজং উপজেলা নিয়ে মুন্সীগঞ্জ ২ আসন। টঙ্গীবাড়ী মুলত বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। বিগত দিনে সাবেক তথ্যমন্ত্রী এম. শামসুল ইসলাম এখান থেকে একাধিকবার নির্বাচিত হয়েছেন। ৭৫’ রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের পর নবম সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো এখান থেকে আ’লীগের প্রার্থী সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি বিজয়ী হন। আ’লীগের সমর্থকরা দাবী করেন মহাজোট সরকারের সময় এ আসনে সবচেয়ে বেশি কাজ হয়েছে।

এখানে নতুন নতুন অনেক রাস্তার কাজ হয়েছে। কিন্তু দশম সংসদ নির্বাচনে কোন্দলের কারণে এই ভালো কাজের ফসল আ’লীগ ঘরে উঠাতে পারবে না বলে বঞ্চিত আ’লীগ নেতারা মনে করেন। নবম সংসদ নির্বাচনে আ’লীগের যেসব নেতারা বিপুল অর্থ ও কায়িক পরিশ্রম করে সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলিকে বিজয়ী করেছেন, নির্বাচনের পর তারা তার ধারে কাছে আসতে পারেননি বলে বিক্ষুব্দ নেতা কর্মীরা অভিযোগ তুলেছেন। বরং এ সরকারের পুরোটা সময় তার কাছে ভির করে ছিল সুবিধাভোগী নেতা কর্মীরা।


এছাড়া তিনি সবাইকে খুশি করতে গিয়ে আসলেই কাউকেই খুশি করতে পারেননি। এই অভিযোগ আ’লীগ নেতা কর্মীদের। এদিকে আ’লীগের একটি সমর্থক দাবী করেছেন যে, এমিলির নাম ভাঙ্গিয়ে একটি গ্রুপ রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্ঠাকারী নেতা কর্মীদের এমিলি তার ধারে কাছে আসতে দেননি। সেইসব নেতা কর্মীরা এখন এই অপপ্রচার চালাচ্ছে বলে এমিলির সমর্থকরা দাবী করেন। বিক্ষুব্দ নেতা কর্মীদের অভিযোগ, এমিলি বিচক্ষণার সাথে যদি টঙ্গীবাড়ী ইউপি নির্বাচনে আ’লীগ থেকে একজন প্রার্থী হিসেবে সমর্থন দিতেন, তবে এখানে আ’লীগের প্রার্থী বিজয়ী হতো। কিন্তু তার কাছে যেই আর্শিবাদ আনতে গেছেন তিনি সবাইকে সমর্থন দিয়েছেন।

এতে কি হয়েছে? একে একে সবাই প্রার্থী হয়েছেন। একাধিক প্রার্থীর ভারে এখানে বিএনপির প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। তিনি যদি নিজ হাতে এখানে হস্তক্ষেপ করতেন তবে এমনটা হতো না। তাছাড়া তার কথা কেউ ফেলতে পারতো না। এই দু:খবোধ এখানকার আ’লীগ নেতাদের কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার সত্বে এখনকার ত্যাগি আ’লীগ নেতা বলেন, আমি আ’লীগ করি। আমার একটি ভোট আছে। আমি সেই ভোট নৌকার প্রার্থীকে দিবো। কিন্তু আমার স্ত্রীকে বলতে পারবো না তুমি নৌকায় ভোট দেও। তাছাড়া আমি অন্য আরেক জনকেও বলতে পারবো না তুমি বা তোমরা নৌকায় ভোট দেও। এখানকার বর্তমান দৃশ্য এরকম।

এসব কারণে এখানে নৌকার ভোট কমে যাবার আশংকা রয়েছে। এদিকে তাদের দাবী যারা আজীবন আ’লীগ করলো, আজ তারা আ’লীগের কমিটিতে আসতে পারছে না। তিনি কারণ হিসেবে বলেন, টঙ্গীবাড়ী উপজেলা আ’লীগের কমিটি গঠনে সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থী হয়েছেন হাফিজ আল আসাদ। তিনি ৩০ বছর যাবত বিদেশে ছিলেন। স্থানীয় আ’লীগের রাজনীতিতে তার কোন অবদান নেই। অথচ তিনি গুরুত্ব পূর্ণ পদে প্রার্থী হয়েছেন। এ পদে প্রার্থী হওয়ার পিছনে জগলুল হালদার ভুতুর হাত রয়েছে বলে অনেকেই অভিযোগ করছেন।

এই আসাদ ইউনিয়ন আ’লীগ সভাপতি পদে প্রার্থী হলে তার পরাজয় ঘটে। এখানে টঙ্গীবাড়ী উপজেলা আ’লীগের সভাপতি জগলুল হালদার ভুতু টঙ্গীবাড়ী-লৌহজংয়ের সাংসদ সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলির সাথে থেকে কাজ করছেন। কিন্তু তার এই কাজ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে বির্তক শুরু হয়েছে। এই বির্তকের ঢেউ আগামী সংসদ নির্বাচনে প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দীঘিরপাড়ে দিদার হত্যায় জগলুল হালদার ভুতু ও তার পুত্র আরিফ হালদার আসামি হয়েছেন। আরিফ দীঘিরপাড় ইউপি চেয়ারম্যান।


এই হত্যাকান্ডের ঘটনায় এখানে আ’লীগের ইমেজ মারাতœকভাবে ক্ষুন্ন হয়েছে। কাঠাদিয়া-শিমুলিয়া এলাকায় আরেকটি হত্যাকান্ডে অনুুরুপ পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে। এসব ঘটনায় এখানে আ’লীগের ভোট কমে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে। আ’লীগ সরকার ক্ষমতায় আসলে জগলুল হালদার ভুতু সংখ্যালঘুদের একটি বাড়ী দখল করে নেয়। এটিও এখানে ভোট কমে যাবার একটি কারণ হতে পারে। আর জেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ লুৎফর রহমানের সাথে রয়েছেন জেলা আ’লীগের প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক ও টঙ্গীবাড়ী উপজেলা চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার কাজী ওয়াহিদ। স্থানীয়ভাবে তারা একটি গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

এই দু’গ্রুপের কাছ থেকে যারা সুবিধা বঞ্চিত হয়েছেন তারা ভির করছেন মাহাবুবউদ্দিন এসপি মাহবুবের দরবারে। এসব ঘটনায় এখানে আ’লীগ ত্রি-ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে। স্থানীয় ও ঢাকার কোন কাজে এসপি মাহবুবের কাছে কেউ কোন কাজ নিয়ে ফিরে আসেনি। এই উপকারের প্রচার রয়েছে তার সমর্থক শিবিরে। এই কারণে তার সমর্থকদের দাবী আগামী দশম সংসদ নির্বাচনে এসপি মাহবুব এ আসন থেকে মনোনয়ন চাইতে পারেন। ইদানিং এসপি মাহবুব এখানে ঘনঘন আসা যাওয়া করেন। জেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ লুৎফর রহমান ও জেলা আ’লীগের প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক ও টঙ্গীবাড়ী উপজেলা চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার কাজী ওয়াহিদ এই আসন থেকে মনোনয়ন চাইতে পারেন বলে তার সমর্থকরা দাবী করেন। আমজনতা ও বিএনপি শিবিরে সাগুফতা ইয়াসসিন ব্যাপক জনপ্রিয়। এই কারণে এ আসনে আ’লীগের প্রার্থী হিসেবে চুড়ান্ত তালিকায় সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলির নাম জোরেশোরে শোনা যাচ্ছে। এদিকে কোন্দলের জের হিসেবে বেতকা আ’লীগের কাউন্সিল হতে পারেনি। এখানে পুরাতন কমিটি ভেঙ্গে ৬ মাসের জন্য আহবায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে।

এই কমিটি আহবায়ক হচ্ছেন ইদ্রিস খান ও সদস্য সচিব হচ্ছেন সফিকুল ইসলাম সোবহান। বেতকা ইউপি চেয়ারম্যান কেন্দ্র করে এখানে আ’লীগের মধ্যে প্রথম দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এখানকার নির্বাচনে বেতকা ইউনিয়ন আ’লীগের সভাপতি জাহিদ আলম শিকদার বাচ্চু প্রার্থী হন। তার বিপরিতে প্রার্থী হন শওকত আলী খান মুক্তার। বেতকা ইউনিয়ন আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক আক্তার মোল্লা সভাপতিকে সমর্থন না করে মুক্তারকে সমর্থন করে। এতে মুক্তার বিজয়ী হন। এতে বাচ্চুর সমর্থকরা ক্ষুব্দ হন। আক্তার মোল্লা পাইকপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক। এই বিদ্যালয়ে চাকরি পাইয়ে দিতে সেই সময় সফিকুল ইসলাম সোবহান বেশ দৌড় ঝাপ করেন। কোন্দলের কারণে এর ঢেউ এখন স্কুলে এসে তাপমাত্রা ছড়াচ্ছে। ইতোমধ্যে ঘটে গেছে অনেক ঘটনা।

আর শেষ পর্যন্ত এর তাপ পড়ে বেতকা ইউনিয়ন আ’লীগের কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে। জাহিদ আলম শিকদার বাচ্চু বরাবরের মতো সভাপতি পদে প্রার্থী হন। আর আক্তার মোল্লার সমর্থনে বেতকা ইউপি চেয়ারম্যান শওকত আলী খান মুত্তার তার বিপরিতে প্রার্থী হন। এতে দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করে। মুক্তার ইতোপূর্বে আ’লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন না। তিনি দীর্ঘদিন প্রবাস জীবন যাপন করেছেন। কাউন্সিলকে সামনে রেখে তিনি আ’লীগে যোগদান করেন। সদ্য যোগদানকারী কোন গুরুত্বপূর্ন পদে নির্বাচন করতে পারে না বলে অনেকেই দাবী করেন। আ’লীগের নির্বাচনের স্বার্থে বাচ্চু আক্তার কোন্দল এখনি প্রশমিত করা জরুরী। তা না হলে আগামী সংসদ নির্বাচনে আ’লীগ ভোটের রাজনীতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

তাদের এই কোন্দলে স্থানীয় বিএনপি নেপথ্যে বাতাস দিচ্ছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। সাড়ে চার বছরেও টঙ্গীবাড়ী বাইপাস সড়ক নির্মাণ কাজ শেষ হয়নি। এ ঘটনাটির বিষয় আগামী নির্বাচনে প্রভাব পড়ার আশংকা রয়েছে। বেতকা দিয়ে ঢাকা যাতায়াতের সিরাজদিখানের বালুরচরের সেতুটিও সাড়ে চার বছরের নির্মাণ কাজ শেষ হয়নি। এই সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ হলে খুব কম সময়ের মধ্যে টঙ্গীবাড়ী ও মুন্সীগঞ্জের লোকজন ঢাকায় পৌছতে পাড়তো। এ সেতুর ধীর গতি কাজে এখানকার ভোটাররা ক্ষুব্দ হয়ে রয়েছেন।

মুন্সীগঞ্জ নিউজ