সবই গেলোগা গাঙ্গে

মোজাম্মেল হোসেন সজল: বৃদ্ধ খবির বেপারি। পদ্মার ভাঙনে নিঃস্ব। পদ্মার পাড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকেন তিনি। পদ্মার দিকে তাকিয়ে একাগ্র চিত্তে ঢেউয়ের গর্জনের সঙ্গে দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন। শুধু একটাই আহাজরি, “হায় আল্লাহ! সবই গেলোগা গাঙ্গে। আগুনে পুড়লে জমিনের চিহ্ন থাকে কিন্তু গাঙ্গে নিয়া গেলে কিছুই থাকে না। গরু-বাছুর, হাঁস-মুরগি রাখারও জায়গা নাই। বর্ষা আসতাছে, খোলা আকাশের নিচে কেমনে রাখি এইগুলা।” কথা হয় নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পদ্মা পাড়ের জাগু বেগম (৫০), সেলিনা বেগম (৫৫)-এর সঙ্গে।


তারা জানান, শেষ ভিটামাটি সহায় সম্পদ সবই গিল্ল্যা খাইলো গাঙ্গে। ঘরবাড়ি-ছেলে সন্তান নিয়া এহন আমরা কই জামু । বর্ষা না আসতেই লৌহজং উপজেলার মেদিনীমণ্ডল ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে ফের শুরু হয়েছে পদ্মার তাণ্ডব। গিলে খাচ্ছে একের পর এক বসতভিটা, শত বছরের পুরনো গাছপালা আর ফসলি জমি। পাকা সড়ক, রাস্তাঘাট, দোকানপাটসহ বিভিন্ন পাকা স্থাপনা। এরপরও থামেনি পদ্মার তাণ্ডব। নিম্নচাপের কারণে গত কয়েক দিনের অবিরাম বর্ষণে পদ্মা উত্তাল হয়ে পড়ায় আঘাত হানে মাওয়া ফেরিঘাট এলাকার আশপাশের গ্রামগুলোতে। এর ফলে পদ্মায় ধসে পড়ছে একের পর এক প্রাচীন জনপদগুলো।


এতে করে কান্দিপাড়া, যশলদিয়া, মাওয়া, দক্ষিণ মেদেনীমণ্ডল ও কুমারভোগ এলাকার হাজারো বাসিন্দা ভাঙন আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন। সরজমিনে গিয়ে জানা গেছে, গত কয়েকদিনের প্রবল বর্ষণে প্রমত্তা পদ্মার ভাঙনে বিলীন হতে চলেছে উপজেলার মেদিনীমণ্ডল ইউনিয়নের ৪টি গ্রাম। তীব্র ভাঙনের কবলে পড়েছে উপজেলার কান্দিপাড়া, দক্ষিণ মেদিনীমণ্ডল, উত্তর যশলদিয়া, যশলদিয়া, কুমারভোগ ইউনিয়নের শিমুলিয়া গ্রামসহ নদী তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা। প্রমত্তা পদ্মার রুদ্রগ্রাসে ইতিমধ্যে এসব এলাকার কয়েক শ’ একর ফসলী জমি, বসতভিটা ও শত বছরের গাছপালা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। গত কয়েক দিনের ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে মাওয়া ১ নম্বর পুরাতন ফেরিঘাটের দক্ষিণ মেদিনীমণ্ডল গ্রাম থেকে উত্তর যশলদিয়া গ্রাম পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা।


বিলীন হয়ে গেছে কান্দিপাড়া গ্রামের জাতীয় পার্টির সাবেক নৌ-পরিবহনমন্ত্রী মরহুম এম কোরবান আলী, কফিল উদ্দিন হাওলাদার, নিজাম হাওলাদার, আইয়ুব আলী মাতবর, মনসুর আলী মাতবর, রুহুল আমীন মাস্টার, মোসলেম সরদার, আজিম খাঁ, রশিদ খাঁ, নয়ন দর্জি, শেখ সোহরাব, বাচ্চু খলিফা, লতিফ মাঝি, আলেফ মাঝি, তাহের বেপারি, খবির বেপারির বাড়িসহ যশলদিয়া গ্রামের আমির হোসেন মাঝি, সেন্টু খাঁ, শেখ মনির, রতন মোল্লার বসত ভিটামাটি। ভাঙনের কবলে পড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ঘড়বাড়ি ভেঙে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন প্রায় অর্ধশতাধিক পরিবার। নদীগর্ভে আরও চলে গেছে কড়ই, আম, সুপারি, নারকেল গাছসহ বিস্তীর্ণ ফসলী জমি। তীব্র হুমকির মুখে রয়েছে ৪টি গ্রামের ৫ শতাধিক বাড়িঘরসহ বিস্তীর্ণ এলাকা।

এছাড়াও এখনও তীব্র হুমকির মুখে রয়েছে মাওয়া ফেরিঘাট এলাকার ২৫/৩০টি বাড়িঘর ও শতাধিক দোকানপাটসহ পুরো এলাকাসহ কুমারভোগ ইউনিয়নের শিমুলিয়া গ্রামের কুমারভোগ ইউপি কমপ্লেক্স ভবন, শিমুলিয়া বাজার ও ভাওয়াল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সমপ্রতি কয়েক দফায় পদ্মার আকস্মিক ভূমিধসে উপজেলার মাওয়া পুরনো ৩টি ঘাটসহ, অর্ধশতাধিক দোকানপাট, ১০-১৫টি বসতভিটা, ১টি পরিত্যক্ত জামে মসজিদ, সড়ক ও জনপদ বিভাগের প্রায় ২-৩শ’ ফুট পাকা সড়কসহ বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এরপর থেকে শুরু হয় পদ্মার অব্যাহত তাণ্ডব। এ ব্যাপারে লৌহজং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ওহিদুল ইসলাম জানান, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে আমাদের কাছে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত ১৮০ জনের একটি তালিকা পাঠিয়েছে। যা যাচাই বাছাই করে সত্যতা পাওয়া গেছে। সে লক্ষ্যে ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ জানিয়ে লিখিতভাবে জেলা প্রশাসককে জানানো হয়েছে।

মানবজমিন