পদ্মা তীরবর্তী অঞ্চলে নদী ভাঙ্গন: নিম্নঞ্চল প্লাবিত

অবৈধভাবে নদীতে খননের মাধ্যমে বালু উত্তোলন করায় মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ী উপজেলার পদ্মার তীরজুড়ে বিস্তীর্ণ এলাকায় ভাঙ্গন শুরু হয়েছে। বিগত কয়েক বছরের ভাঙ্গনে পদ্মা নদী সংলগ্ন চারটি ইউনিয়নের প্রায় ৩০টি মৌজা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। চলতি বছরে নদীতে ভাঙ্গন শুরু হওয়ায় উপজেলার বাঘবাড়ি, হাইয়ারপাড় ও মূলচর এলাকায় বেশকিছু বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

হুমকির মুখে রয়েছে হাসাইল, কামাড়খাড়া, দিঘিরপাড় ও পাঁচগাঁও এলাকার বিস্তীর্ণ এলাকা। চরম হুমকির মুখে রয়েছে হাসাইল-চিত্রকড়া নদী রক্ষা বাঁধ, বাড়াইল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ও প্রাচীন দিঘিরপাড় বাজারসহ আশপাশের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ন স্থাপনা। তবুও থেমে নেই নদীতে অবৈধ খনন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় গ্রামবাসী জানান, দীর্ঘদিন ধরে চার একটি প্রভাবসারী সিন্ডিকেট পদ্মানদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন করে আসছে। গ্রামবাসী ওই সিন্ডিকেটেন বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে সাহস পাচ্ছে না। বিষয়টি জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি।

তারা আরো জানান, বর্তমানে মূলচর, মাইজগাঁও ও দিঘিরপাড় এলাকায় তীর ঘেঁেষে খননের মাধ্যমে বালু উত্তোলন চলছে। এতে করে ওই অঞ্চলে নদী তীরের ফসলি জমিগুলো ক্রমেই নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণের কারণে নদীতে আকস্মিক ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে গেছে চারটি ইউনিয়নের প্রায় ৩০টি মৌজা।

কামাড়খাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল জলিল জানান, বাঘবাড়ি এলাকায় প্রবল ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। গত কয়েক দিনের ভাঙ্গনে হুমকির মুখে পড়েছে বরাইল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়।

এ বিষয়ে মুন্সীগঞ্জ জেলার জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল হাসান বাদল জানান, পদ্মায় অবৈধভাবে খনন করে বালু উত্তোলনের বিষয়টি খবর পেয়ে সম্প্রতি একজন ম্যাজিস্ট্রেটেও নেতৃত্বে অভিযান পরিচলানা করা হয়েছে। এ সময় খননযন্ত্রের (ড্রেজার) চাবিসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম আটক করা হয়েছে। তিনি আরো জানান, যেসব ব্যক্তি অবৈধভাবে বালু উত্তোলনে জড়িত তাদেও বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহনের পক্রিয়া চলছে।

অপরদিকে গত দুইদিনের পদ্মার ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে গেছে জেলার শ্রীনগর উপজেলার ভাগ্যকুল বাজারের দশটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, পাঁচটি বসতঘর ও বেড়িবাঁধ। ভাঙ্গনের আশংকায় আছে ওই বাজারের প্রায় অর্ধশতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এদিকে বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ায় মাওয়া-ভাগ্যকুল সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। হুমকির মুখে রয়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ অর্ধশতাধিক বসতবাড়ি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নিম্নচাপের কারণে ও অতিবর্ষনে পদ্মায় পানি বেড়ে যাওয়ায় পদ্মা তীরবর্তী গ্রামসহ ওই অঞ্চলে আশপাশের গ্রামগুলোতে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। বাঁশ ও টিন দিয়ে ভাঙ্গন ঠেকাতে আপ্রান চেষ্টা চলিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাসী।

ভাগ্যকুল গ্রামের মো. মজিব রহমান জানান, ভাগ্যকুল বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ায় কয়েকটি গ্রামের কয়েক শতাধিক বসতবাড়িসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় নদী ভাঙ্গনের আশংকা দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যেই গ্রামের দশটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও পাঁচটি বসবাড়ি বিলীন হয়ে গেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ গত পাঁচ বছরে ভাগ্যকুল বাজারের শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ, কয়েক শতাধিক বসতঘর ও বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। কিন্তু ভাঙ্গন রোধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহন করেনি কর্তৃপক্ষ। যথাযথ উদ্যোগ গ্রহন করা হলে ভাগ্যকুর বেড়িবাঁধ রক্ষা করা সম্ভব হতো বলে অভিযোগ করেন তারা।

এ বিষয়ে মুন্সীগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডেও উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আমজাদ হোসেন জানান, ভাঙ্গনের খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে। এছাড়া ভাঙ্গনের ছবিসহ লিখিত আবেদন উর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। তিনি আরো জানান বরাদ্ধ না থাকায় ভাঙ্গন ঠেকাতে কোনো ব্যবস্থা গ্রহন কার যাচ্ছে না।

এদিকে পদ্মার অব্যাহত জোয়ারের পানিতে মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং উপজেলার নদী তীরবর্তী নি¤œাঞ্চলের কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। জোয়ারের পানি ডুকে পড়ায় প্রায় দুইশতাধিক পরিবার পানি বন্দি হয়ে পড়েছে। মাওয়া. কান্দিপাড়া. কামারগাঁও ও যশলদিয়া এলাকায় নদীর তীর ঘেঁষা বাড়ি-ঘর পানিতে তলিয়ে গেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়. নিন্মচাপ ও কয়েক দিনের অতিবর্ষণে পদ্মায় পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় মাওয়া, কান্দিপাড়া. কামারগাঁও ও যশলদিয়া গ্রামের নিম্নঞ্চলের বসতবাড়িতে পানি ডুকে ওই অঞ্চলের মানুষ পানি বন্দি হয়ে পড়েছে। এতে নদী তীরবর্তী জমির ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে। ওই অঞ্চলে নদী ভাঙ্গনের তান্ডবও অব্যাহত রয়েছে। প্রতিদনিই ভাঙ্গছে ফসলি জমিসহ বিস্তীর্ণ এলাকা।

এদিকে লৌহজংয়ের নিম্নঞ্চল প্লাবিত হয়ে ঘরবাড়ি তলিয়ে যাওয়ায় ইতিমধ্যেই স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

এ প্রসঙ্গে লৌহজং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অহিদুল ইসলাম জানান, পদ্মার ভাঙ্গন ও পানিবন্দি হয়ে ক্ষতিগ্রস্থ ১৮০টি পরিবারের তালিকা করা হয়েছে। তাদেরকে সউকারী সাহায্যের আওতায় আনতে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে।

যমুনা নিউজ