জাপান ভারতের পরীক্ষিত পরম বন্ধু

রাহমান মনি
সমসাময়িক সময়ে এশীয় তথা বিশ্ব রাজনীতিতে জাপান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি দেশ; জাপান ভারতের পরীক্ষিত পরম বন্ধু মন্তব্য করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং। তিনদিনের রাষ্ট্রীয় সফরে জাপানের রাজধানী টোকিওতে মনমোহন সিং এ কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, শুধু অর্থনৈতিকভাবেই নয়, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের শান্তি বজায় রাখতে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে জাপান। আর এ কাজে জাপান ভারতকে সবসময় পাশে পাবে।

২৮ মে মঙ্গলবার সফরের প্রথম দিন টোকিওতে জাপান-ভারত অ্যাসোসিয়েশন, জাপান-ভারত পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লিগ এবং ইন্টারন্যাশনাল ফ্রেন্ডশিপ এক্সচেঞ্জ কাউন্সিলের আয়োজিত প্রদত্ত ভাষণে ড. মনমোহন সিং বলেন, ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরের মিলন ঘটাতে হবে। এই সময় তিনি জাপানি জনগণকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ২০০৭ সালের আগস্ট মাসে ভারতের জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে ঠিক এই কথাটিই বলেছিলেন। সেই সময় আমরা দুজনই প্রথমবারের মতো দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী। আবার ২০১৩ তেও আমরা সৌভাগ্যক্রমে দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী। নিজেদের স্বার্থেই আমাদের ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল গড়ে তুলতে হবে।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ড. মনমোহন সিং বলেন, আমার পরম সৌভাগ্য যে, প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে দ্বিতীয়বারের মতো দায়িত্ব নেয়ার পর আমাকে প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন টোকিওতে আসার। কিন্তু সে সময় ইন্ডিয়াতে জাতীয় সংসদ চলার কারণে আমি আসতে পারিনি। আজ আমি এখানে এসেছি, আজ আমি দু’দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন অধ্যায়ের শুরুর আশ্বাস দিয়ে বলতে চাই, ভারত ও জাপান দু’দেশই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া তথা বিশ্ব স্বার্থ রক্ষায় গভীর আলোচনা অব্যাহত রাখবে। আগামী দিনের রণকৌশল শরিকি কূটনীতিকে কার্যকর করতে ভারত বদ্ধপরিকর।


জাপান-ভারত অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট হিরোশি হিরাবায়াশির পরিচালনায় সভায় আরও বক্তব্য রাখেন জাপান-ভারত অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী য়োশিরো মোরি, জাপান-ভারত পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লিগের চেয়ারম্যান নোবুতাকা মাচিমুরা, ইন্টারন্যাশনাল ফ্রেন্ডশিপ কাউন্সিল (এফইসি) এর চেয়ারম্যান ড. চিহিরো কানাগাওয়া, প্রেসিডেন্ট কেন্ মাৎসুজাওয়া প্রমুখ।

ড. মনমোহন সিং প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী য়োশিরো মোরিকে উদ্দেশ করে বলেন, জনাব মোরি শুধু আমার বন্ধু তা নয়, তিনি ভারতের সব নাগরিকের একজন ভালো বন্ধুও। তিনি বলেন, ভারত-জাপানের বন্ধুত্ব দীর্ঘদিনের। এর সূচনা করেছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, স্বামী বিবেকানন্দ, জওহরলাল নেহরুর মতো মনীষীরা। উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর শুরুতেই জাপানের সাফল্যের বিষয়টি অনুধাবন করতে পেরে মৈত্রীর হাত বাড়িয়েছিলেন। তিন শতাব্দী ধরে চলছে তারই ধারাবাহিকতা।

এরপর ড. মনমোহন সিং পদ্মশ্রী পুরস্কারপ্রাপ্ত জাপানি পণ্ডিত প্রফেসর নোবুরু কারাশিমার হাতে পদক তুলে দেন। প্রফেসর কারাশিমা স্বাস্থ্যগত কারণে গত ৫ এপ্রিল ২০১৩ নয়াদিল্লিতে মূল অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারেননি বিধায় টোকিওতে ড. সিং প্রফেসর কারাশিমার হাতে পদ্মশ্রী পদক তুলে দেন। প্রফেসর কারাশিমা দক্ষিণ ইন্ডিয়ার উপর দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক চেন্নাইয়ের মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ে দক্ষিণ ভারতের উপর গবেষণা করেন। তিনি অনর্গল তামিল ভাষায় কথোপকথন করতে পারদর্শী।

ড. মনমোহন সিং তিনদিনের এক রাষ্ট্রীয় সফরে ২৭ মে বিশেষ বিমানযোগে রাত ৯.১৫তে হানেদা এয়ারপোর্ট পৌঁছেন। এরপর তিনি ২৯ মে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের সরকারি কার্যালয়ে জাপান-ভারত শীর্ষ বৈঠক করেন। শীর্ষ বৈঠকে ড. মনমোহন সিং জাপানের সঙ্গে বেশ কয়েকটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। চুক্তিগুলোর মধ্যে মুম্বাই মেট্রো রেল নির্মাণে ৭১০০ কোটি ইয়েন সহজ শর্তে ঋণের চুক্তি হচ্ছে প্রধান আলোচ্য চুক্তি। এছাড়াও ৫০০ কিলোমিটার মুম্বাই-আহমেদাবাদ বুলেট ট্রেন সিস্টেম সহযোগিতা ভারতের জন্য ছিল বড় পাওয়া।


ভারতের বড় বড় কোম্পানিগুলোতে জাপানের অত্যাধুনিক কারিগরি সহায়তা, চেন্নাইতে বেসরকারি পর্যায়ে ইন্ডাস্ট্রি করা, নিউক্লিয়ার সহযোগিতা, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং সংস্কৃতি বিনিময় দুই দেশের শীর্ষ বৈঠক আলোচনায় প্রাধান্য পায়।

জাপান মনে করে ইন্ডিয়ার সঙ্গে চীন, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে, কিংবা জাপান যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া কিংবা অন্যান্য উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে যে পরিমাণ সংস্কৃতি বিনিময় ভাব বজায় আছে সেই তুলনায় জাপান-ভারতের সঙ্গে অনেক কম। তাই আরও বেশি বেশি করে ভারতের যুবকদের জাপান এনে শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। জাপান মনে করে ভারত হচ্ছে অন্যতম বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ। অচিরেই দেশটি অর্থনৈতিক পরাক্রমশালী দেশ হিসেবে আবির্ভূত হতে চলেছে। বর্তমান বিশ্ব হচ্ছে আইটিনির্ভর বিশ্ব আর আইটিতে ভারতের উত্থান বিস্ময়কর।

চীনের সঙ্গে জাপানের বিরোধ অনেক পুরনো। সেনকাকু দ্বীপ নিয়ে জাপানের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক উত্তেজনাপূর্ণ। তাছাড়া ভৌগোলিক কিংবা ঐতিহ্যগত কারণেও চীন-জাপান সম্পর্ক তিক্ততাপূর্ণ। আর এই সুযোগটিকে কাজে লাগাতে চায় সুচতুর ভারত। দুইভাবেই তারা লাভবান হতে চায় এবং হয়েছেও কিছুটা। জাপানের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরিকে জাপান থেকে যেমন কিছু আদায় করা তেমনি ইন্দো-প্যাসিফিক বা ভারত মহাসাগর এবং প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যে আর্থিক ও কৌশলগত যোগসূত্র গড়ে তোলার ডাক (যা ২০০৭ সালে ভারতের জাতীয় সংসদে জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে দিয়েছিলেন)। জাপান-ভারত-অস্ট্রেলিয়া এবং আমেরিকা অর্থাৎ চারটি গণতান্ত্রিক শক্তির সমন্বয়। যেটি চীন কখনোই ভালোভাবে নিবে না অন্তত নিজেদের স্বার্থে। কারণ চীনের একচ্ছত্রে তা বাধা হয়ে দাঁড়াবে।


আর বাস্তবে তা নেয়ওনি চীন। ড. সিং জাপান সফর অবস্থায় চীনের প্রধান প্রধান দৈনিকগুলোতে জাপানকে ছিঁচকে চোর বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। বিষয়টি চীন পূর্বে বুঝতে পেরেছিল। তাই চীনের প্রধানমন্ত্রী কমরেড লি কেচিয়াং তার প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন ভারতকে। পূর্ব নির্ধারিত জাপান-ভারত শীর্ষ বৈঠক জানা সত্ত্বেও চীনের কমিউনিস্ট পত্রিকাগুলো স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছে, জাপান দেশটা ও জাপানের কিছু রাজনীতিক বরাবরই হিঁচকে চোরের মতো কাজ করে থাকেন। তাদের মতে জাপানের কূটনীতি হলো সংকীর্ণ ও নিচু মনের। প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে যে চীনকে ছাড় দিবে না তা চীনও ভালো করেই জানে।

তবে জাপান-ভারত শীর্ষ বৈঠক নিয়ে বিশ্ব মিডিয়া কিংবা চীনা মিডিয়া যাই বলুক না কেন এই বৈঠকে ভারত যে লাভবান হয়েছে তা অনস্বীকার্য। নিজস্ব অবকাঠামো তৈরিতে জাপানের সহযোগিতা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল গড়ে তুলে চীনের একচ্ছত্র মাতব্বরীতে কিছুটা হলেও বাধা হয়ে দাঁড়াবার হুমকি দিতে পারা ভারতের পররাষ্ট্রনীতির সাফল্য বলেই ধরা যায়।

rahmanmoni@gmail.com

সাপ্তাহিক