মুন্সীগঞ্জে ডাকাত আতঙ্ক, রাতভর পাহারা

মোজাম্মেল হোসেন সজল: মুন্সীগঞ্জ শহর এখন ডাকাত আতঙ্কের শহরে পরিণত হয়েছে। একের পর ডাকাতির ঘটনায় শহরবাসীর দিন কাটছে এখন আতঙ্কের মধ্য দিয়ে। বিয়ে বাড়ি, আইনজীবী, কাউন্সিলর ও প্রবাসীর পরিবার কেউই রক্ষা পাচ্ছেন না ডাকাতদের হাত থেকে। এসব ডাকাতির সঙ্গে স্থানীয়রা কেউ জড়িত কিনা-তা সনাক্ত করতে পারেনি মুন্সীগঞ্জ থানা পুলিশ। মাঝে-মধ্যে দু’একজনকে আটক করা হলেও আটককৃত ডাকাতদের কারো বাড়িই মুন্সীগঞ্জে নয়। তবে, স্থানীয়দের সংশ্লিষ্টতা ছাড়া বাইরের জেলার ডাকাতরা কিভাবে ডাকাতি করে পার পেয়ে যাচ্ছে-এ প্রশ্ন এখন সাধারণ মানুষের। তবে, এসব ডাকাতির পেনডিং মামলায় সাধারণ মানুষকে জড়িয়ে হয়রানি করার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে।


সর্বশেষ গত ১৬ মে শহরের মাঠপাড়া গ্রামের জয়ন্ত ভিলার ভাড়াটিয়া সৌদি আরব প্রবাসী মফিজল মাষ্টারের মেয়ে মৌসুমী আক্তারের গায়েহলুদের অনুষ্ঠান শেষে ওই দিন রাত ২ টার দিকে ৮-১০ জনের একদল ডাকাত ওই বাড়িতে হামলে পড়ে। ডাকাতরা বাড়িতে ঢুকে অস্ত্রের মুখে পরিবারের সদস্যদের জিম্মি করে ২৭ ভরি সোনার গহনা ও ১৫টি মোবাইল লুট করে নিয়ে যায়। পরে পুলিশ একই দিন ভোর ৪টার দিকে শহর উপকণ্ঠের মুক্তারপুর সেতুর নিচ সড়ক মালিরপাথর এলাকা থেকে কুমিল্ল্লার লাঙ্গলকোট এলাকার আব্দুর রহমানের ছেলে শফিকুল ইসলাম (৪০) ও গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার বালিগাঁও গ্রামের বজলুর রহমানের ছেলে ইসলাম মিয়া (৩৮)-কে ৩ ভরি স্বর্ণ ও ৪টি মোবাইলসহ ২ ডাকাতকে গ্রেপ্তার করে। পরদিন ১৭ মে মফিজল মাষ্টারের মেয়ে মৌসুমী আক্তারের সঙ্গে মোল্লাকান্দি ইউনিয়নের আশুরান গ্রামের সিদ্দিক মিজির ছেলে শাহীন আলমের বিয়ে হয়।

গত ১৫ এপ্রিল রাতে শহরের পশ্চিম দেওভোগ এলাকায় হাজী দেওয়ানের বাস ভবনে পৃথক ৩ টি ফ্ল্যাটে একসঙ্গে গণ-ডাকাতি সংঘটিত হয়। এ সময় প্রায় ২৫ ভরি স্বর্ণালঙ্কার ও কয়েক লাখ টাকা লুটে নেয় ডাকাতরা। ভবন মালিক হাজী দেওয়ান জানান, সশস্ত্র অবস্থায় কলাপসিবল গেটের তালা ভেঙ্গে তার ও তার ভাড়াটিয়াদের ফ্ল্যাটে প্রবেশ করে ১০-১২ জনের ডাকাত দল। ডাকাত দলের সদস্যরা কেউ কেউ মুখোশ পরিহিত ও কয়েকজন মুখোশ ছাড়াই ছিলেন। এদের কথা-বার্তার ভাষার সঙ্গে এ অঞ্চলের মানুষের ভাষার মিল নেই।


গত ১১এপ্রিল দিবাগত রাতে শহরের বৈখর এলাকায় পৌর কাউন্সিলর বাদশা সিকদার ও রনছ্‌ মাদবর বাড়ি এলাকায় কাশেম মোল্ল্লার বাড়িতে দুর্ধর্ষ ডাকাতি সংঘটিত হয়। এ সময় ডাকাতরা মুখোশ ছাড়াই ওই ২ বাড়িতে হানা দেয়। আগ্নেয়াস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ডাকাতরা অন্তত ৪০ ভরি স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ ২ লাখ টাকা লুটে নেয়।

গত ২৯ জানুয়ারি শহরের ভিটিশীলমন্দি গ্রামের প্রবাসী আলমগীর হোসেনের বাড়ির ভাড়াটিয়া মুন্সীগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আইনজীবি মো. হালিম হোসেনের বাসায় দিন-দুপুর ডাকাতি হয়। এ সময় ডাকাতরা ঘরের দরজার তালা ভেঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করে স্টীলের আলমারি ভেঙ্গে ১২ ভরি সোনার গহনা, ১০-১২ ভরি রূপা, নগদ ৪৫ হাজার টাকাসহ প্রায় ৭ লাখ টাকার মালামাল নিয়ে কেটে পড়ে। ওই দিন বাসায় আইনজীবীর স্ত্রী, বাড়িওয়ালার স্ত্রী বাড়িতে ছিলেন না। আইনজীবীও ছিলেন আদালতে। এ সুযোগে সকাল ১০ টা থেকে বিকেল ৩টার মধ্যে যে কোন সময়ে ওই বাড়িতে ডাকাতি সংঘটিত হয়। এ বিষয়ে আইনজীবী মো. হালিম হোসেন জানান, তার দায়ের করা এ মামলায় নিরীহ লোকদের আটক করে আসামি করে আদালতে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে।


এদিকে, গত ৬ মে দিবাগত রাতে শহর সংলগ্ন সরদারপাড়া ও রামপালের ৩ বাড়িতে গণ-ডাকাতি হয়। ডাকাত দলের হামলায় আইনজীবী শফিকুর রহমানসহ ২ গৃহকর্তা আহত হয়। তাদের মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ সময় ডাকাতরা ২৯ ভরি স্বর্ণালঙ্কার ও লক্ষাধিক টাকার মালামাল লুটে নেয়। ওই দিন দিবাগত রাত ৩টার দিকে শহর লাগোয়া সরদারপাড়া গ্রামের আইনজীবী শফিকুর রহমানের বসত ঘরের দরজা ভেঙ্গে ডাকাত দল ভেতরে প্রবেশ করে। এ সময় আইনজীবী শফিকুর রহমানকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে পরিবারের অপর সদস্যদের জিম্মি করে ৭ ভরি সোনার গহনা লুট করে নিয়ে যায়।

একই কায়দায় রামপালের গৃহকর্তা তোফাজ্জল হোসেনকে পিটিয়ে পরিবারের সদস্যদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে তার বাড়ি থেকে ২০ ভরি স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ ৩৫ হাজার টাকা লুটে নিয়ে ডাকাত দলটি একই এলাকার তোতা মিযার বাড়িতে হানা দেয়। ওই বাড়ি থেকে ২ ভরি স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ ৯ হাজার টাকা লুটে নেয়। এ ঘটনার রাতেই এলাকাবাসী অহিদ আলী (২৭) নামে এক ডাকাতকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। পরে তার দেয়া স্বীকারোক্তি মতে, ৮মে গাজীপুরের টঙ্গি স্টেশন রোড থেকে মুকুল ও মাইনুল নামে আরো ২ ডাকাতকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে।


এদিকে, সামপ্রতিক সংঘটিত গণ-ডাকাতির ঘটনায় শহরের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের মাঝে ডাকাত আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে শহরের মাঠপাড়া, রন্‌ছ, বৈখর, শিলমন্দি, দেওভোগ, পশ্চিম দেওভোগ ও গনকপাড়া ডাকাতি সংঘটিত প্রবন এলাকা হওয়ায় ওই সব এলাকার বাসিন্দাদের এখন দিন কাটছে উদ্বেগ-উৎকন্ঠায়।

এ সব ঘটনায় শহরের বৈখর, দেওভোগ, পশ্চিম দেওভোগ ও গনকপাড়া এলাকায় রাত জেগে পাহারা দেওয়া হচ্ছে ডাকাত ঠেকাতে। স্থানীয় যুবকরা কয়েকটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে লাঠি-বাঁশি নিয়ে রাতভর পাহারা দিচ্ছে। একটি গ্রুপে অন্তত ৫ জন করে যুবক রয়েছে। রাতভর এলাকার রাস্তায় রাস্তায় ‘হুশিয়ার-হুশিয়ার’ বলে সজাগ করে তুলেন শহরবাসীকে। স্থানীয় যুবকরা স্বেচ্ছায় ডাকাত প্রতিরোধে রাত জেগে পালাক্রমে পাহারা দিয়ে আসছেন পাড়া-মহল্লাগুলোতে।

জাস্ট নিউজ