বিক্রমপুর বিহারের খোঁজে

Bikrompur_Biharগোলাম আশরাফ খান উজ্জ্বল: মুন্সীগঞ্জ জেলার প্রাচীন নাম বিক্রমপুর। বিক্রমপুর বঙ্গ-সমতটের রাজধানী। মুন্সীগঞ্জ জেলা পরিচিতি, বিক্রমপুরের ইতিহাস ও বাংলার ইতিহাস গ্রন্থে বিক্রমপুরকে বাংলার প্রাচীন রাজধানী হিসেবে দেখানো হয়েছে।

বিক্রমপুরের ইতিহাসে দেখা যায় মুন্সীগঞ্জ অঞ্চলে ‘বিক্রমপুর বিহার’ ‘বিক্রমণীপুর বিহার’ আবার কোথাও ‘বিক্রমপুরী বিহার’ এর উল্লেখ দেখতে পাই। এ বিখ্যাত বিহারটির অবস্থান কোথায় তা কোন গ্রন্থেই উল্লেখ নেই।


এ ব্যাপারটি নিয়ে আমি, দৈনিক সংবাদের মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি মাহবুব আলম লিটন, টঙ্গীবাড়ী উপজেলার সোনারং গ্রামের সন্তান সালাহউদ্দিন আজাদকে নিয়ে ২০০১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রথমে মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার রামপাল, বজ্রযোগীনি, কেওয়ার, টঙ্গীবাড়ী উপজেলার নাটেশ্বর, হাসকিরা ও পাইকপাড়ায় নিয়মিত কাজ করতে থাকি। এই কাজের মধ্যে আমাদের মনে হলো নাটেশ্বর দেউল হয়তো বা বিক্রমপুর বিহার।

এ ব্যাপারটিকে আরো নিশ্চিত করার জন্য বিক্রমপুর ইতিহাস পরিষদের সভাপতি ফাহিম ফিরোজকে নিয়ে নাটেশ্বর দেঊলবাড়ি পর্যবেক্ষণ করি। সেই সময়টা ২০১০ সালের ১৪ আগস্ট।
Bikrompur_Bihar
এরপর মুন্সীগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ সেলিম ও আমি বিক্রমপুর সংবাদ ও মুন্সীগঞ্জ নিউজ ডটকম-এর জন্য নতুন তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করতে ২০১২ সালের মার্চ মাসে নাটেশ্বর দেঊলবাড়ি পর্যবেক্ষণ করি। এরপর ২০১২ সালের জুন থেকে ২০১৩ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ২৮ বার নাটেশ্বর (মন্দির) দেঊলবাড়ি পর্যবেক্ষণ করি।

সর্বশেষ ২০১৩ সালের ৪ মে শনিবার আমি, কবি অনু ইসলাম ও আতাউর রহমান রানা নাটেশ্বর দেঊল বাড়ির স্তুপ নিয়ে গবেষনা চালাই। আমরা দেঊলের চওড়া দেয়াল, ইটের পরিধি ও ভূমির অবস্থান নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা ও পর্যালোচনা করে একটি সম্ভাব্য সিদ্ধান্তে উপনীত হই যে, নাটেশ্বর দেঊলই ‘বিক্রমপুরী বিহার’। এর কারণ হলো- দেঊলবাড়ির স্তুপটি পূর্ব-পশ্চিমে ১০০০ ফুট। আর উত্তর-দক্ষিণে ১২০০ ফুট। সাধারণ ভূমি হতে কোথাও কোথাও ৫ ফুট, ৮ ফুট এবং ১০ ফুট উঁচু। এ পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রাপ্ত প্রতিটি বিহারই স্তুপ ভূমি খনন করে বিহার, মহাবিহার পাওয়া গেছে। আর নাটেশ্বর দেঊলই মুন্সীগঞ্জের একমাত্র স্তুপাকৃতি দেঊল। এ থেকে মনে হয়েছে এটিই খুব সম্ভবত বিক্রমপুরী মহাবিহার। এ স্তুপে বড় ধরণের কোন বৃক্ষ নেই বা জন্মায় না। ১ ফুট, ৫ ফুট ও ৭ ফুট নিচে এর পাকা স্ট্রাকচার বিদ্যামান। এ দেউলবাড়িটি ৭ একর জমির ঊপর। এ স্তুপের পশ্চিম পাশে একটি খালও রয়েছে। অতীশ দীপংকর তার বাড়ি চিহ্নিত করতে গিয়ে বলেছিলেন বজ্রাসনের পূর্বদিকে আমার বাড়ি। বজ্রাসন মানে বুদ্ধগয়া। যেখানে বুদ্ধের পুজা করা হয়। অতীশ দীপংকরের বাড়ি হতে নাটেশ্বর দেঊলস্তুপ মাত্র দেড় কিলো মিটার পশ্চিমে। তা হলে এ স্তুপটি হয়তো বা বজ্রাসন বা বিক্রমপুরী মহাবিহার। এ স্তুপ ভূমির মালিক হলেন হরিদাস দে ও ডেঙ্গর দে। পাওয়র অব এটর্নি হিসেবে দায়িত্বে আছেন দেবেন্দ্র চন্দ্র দাস ও হর্ষনাথ দে।

ইদানিং একটি ব্যক্তি মালিকানাধিন সংগঠন নাটেশ্বর দেঊল স্তুপ খননে আগ্রহী। কিন্তু এলাকাবাসী চায় এই দেঊল খনন হঊক সরকারিভাবে। কোন ব্যক্তি কেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নয়। এই দেঊলবাড়ির ব্যাপারে আলোচনা হয় সোনারং পাইলট হাইস্কুলের প্রাক্তন শিক্ষক বাবু বিমল চন্দ্র দে (৮৬)র সাথে। তিনি জানালেন, তার বাবা লক্ষীকান্ত দে তাকে বলেছেন প্রায় ১শ’ বছর আগে আশ্রাফ আলী ও মিন্নত আলী নামের দু’জন লোক এই দেঊল স্তুপে কাজ করতে এসে চওড়া দেয়াল দেখতে পায়। ইংরেজরা যদি এই স্তুপ দখল করে নেয় সেই ভয়ে তারা কাউকে কিছু জানাননি।


তবে তিনি বলেন বিভিন্ন সময়ে এখান হতে আটটি কস্টি পাথরের মূর্তি পাওয়া গেছে। এখনো এখানে প্রত্নত্ব সম্পদ রয়েছে। এখানে মুন্সীগঞ্জ বা টঙ্গীবাড়ী প্রশাসনের বিন্দুমাত্র নজরদারী নেই। বিভিন্ন সময়ে ব্যক্তি মালিকানাধীন কিছু সংগঠন নাটেশ্বর স্তুপে চলে আসে খননের জন্য। এখানকার প্রশাসন বা পুলিশ কেঊই এ ব্যাপারে জানেন না। কিন্তু এই প্রত্নতত্ব সম্পদ রক্ষায় সরকারি নজরদারী অতি প্রয়োজন। প্রত্নতত্ব সম্পদ জাতীয় সম্পদ। নাটেশ্বর দেঊলবাড়ি খনন হঊক সরকারিভাবে। কোন ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নয়। মুন্সীগঞ্জ বিক্রমপুরের প্রাচীন শিক্ষালয় বিক্রমপুর বিহার খুঁজে বের করতে সকলেই আগ্রহী। ব্যক্তির মাধ্যমে নয়। প্রশাসনের নজরদারীতে-অন্যথায় নয়।

মুন্সীগঞ্জ নিউজ