সিরাজদীখানের মধুপুর হেফাজতে ইসলামের গ্রাম

মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানের একটি গ্রামে আইন-শৃংঙখলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নাস্তিক-মুরদাত প্রবেশ ঠেকাতে রাত জেগে পাহারা দেওয়া হচ্ছে। গ্রামটির নাম মধুপুর। জেলার সিরাজদীখান উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের এ গ্রামে রাত জেগে পাহারা দেওয়া হয় লাঠিসোটা ও ধারালো অস্ত্র হাতে।

ইসলাম হেফাজতের নামে সদ্য আত্নপ্রকাশ করা হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরাই মূলত: এ গ্রামে রাতের পাহারাদার। তারা হেফাজতে ইসলামের প্রশিক্ষিত পাহারাদার বাহিনী বলেও মনে করেন অনেকে। সন্ধ্যা নামতেই লাঠিসোটা, ধারালো রামদা, হকিষ্টিকসহ বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্র হাতে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে হেফাজতের পাহারাদার বাহিনী।


শুরু হয় মধুপুর গ্রামময় পাহারা আর পাহারা। শুরু হয় পাহারাদার বাহিনী তথা হেফাজতের নেতাকর্মীদের রাত জাগা। জেলার ৬ উপজেলার ৬২ ইউনিয়নের মধ্যে সিরাজদীখান উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের এ গ্রামটিই হেফাজতিদের একমাত্র গ্রাম।

পরিচয় গোপন করে আজ বুধবার দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত সরেজমিনে মধুপুর গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে- গ্রামের বুড়ো-জোয়ান সবাই মধুপুরের পীর মাওলানা আব্দুল হামিদকে যাতে পুলিশ গ্রেফতার করতে না পারে-সেই তারা সবাই একাট্টা।

তাই সন্ধ্যার পর থেকে পরদিন ভোর পর্যন্ত রাত জেগে পাহারা দিয়ে বেড়াচ্ছে। গ্রামের প্রবেশ পথ সুরক্ষিত রাখতে ও পুলিশের প্রবেশ ঠেকাতে সক্রিয় পাহারাদার বাহিনী।

জেলার প্রত্যন্ত এ গ্রামের প্রায় শতভাগ জনগোষ্ঠী হেফাজতে ইসলামের কর্মকান্ডে বিশ্বাসী। নারী-পুরুষ, শিশু-আবাল-বৃদ্ধ বনিতা বুকে লালন-পালন করে আসছে হেফাজতে ইসলাম। প্রায় সবাই হেফাজতের নেতাকর্মী, সমর্থক ও শুভান্যুধায়ী।


নারী-পুরুষ মিলে গ্রামের ভোটার সংখ্যা অনুমান আড়াই হাজার। মোট জনসংখ্যা প্রায় ৬ হাজার। গ্রামটির বৃহত জনগোষ্ঠী মনে-প্রানে হেফাজতে ইসলামের প্রতিটি কর্মকান্ডে সক্রিয় ভাবে অংশ নিয়ে আসছে। তাই হেফাজতে ইসলামের গ্রাম হিসেবে মধুপুরকে চিনতে কারো কষ্ট হয় না।

মুন্সীগঞ্জ ও ঢাকার ৮ উপজেলার সমন্বয়ে গঠিত হেফাজতে ইসলামের সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি মধুপুরের পীর মাওলানা আব্দুল হামিদ বসবাস করেন এ গ্রামে। ইতিমধ্যে মুন্সীগঞ্জে হেফাজতে ইসলামের গ্রাম হিসেবে বেশ পরিচিতি পেয়েছে মধুপুর।

এ গ্রামের মধুপুর হালিমিয়া মাদ্রাসা হচ্ছে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। মাদ্রাসাটির শিক্ষার্থী সংখ্যা ৭’শ। মাদ্রাসার শতভাগ শিক্ষার্থী হেফাজতের সঙ্গে সক্রিয় ভাবে জড়িয়ে আছে। মাদ্রাসার ২১ জন মাওলানা-মোয়াজ্জিনের সবাই হেফাজতের পৃষ্ঠপোষক।

মধুপুর হালিমিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হচ্ছেন হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ স্থানীয় নেতা মধুপুরের পীর মাওলানা আব্দুল হামিদ। তিনি একক অধিপতি এ মাদ্রাসার। এদিকে, মধুপুরের পীর মাওলানা আব্দুল হামিদের নেতৃত্বে মধুপুর গ্রামের প্রায় শত ভাগ জনগোষ্ঠী ঢাকা লং-মার্চ ও ঢাকা অবরোধ কর্মসূচীতে অংশ নিয়েছিলেন।

সর্বশেষ ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরে গিয়েছে এ গ্রামের সবাই। এদের অনেকে রাবার বুলেটবিদ্ধ হয়ে মধুপুর হালিমিয়া মাদ্রাসায় চিকিৎসা নিচ্ছে।

মতিঝিলের শাপলা চত্বরে রাতে অবস্থান নেওয়া হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দোর্দান্ত প্রতাপ দেখেছেন।

আর ওই রাতের পর থেকে মধুপুর গ্রামে আইন-শৃংঙখলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নাস্তিক-মুরদাত ঠেকাতে হেফাজতে হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় সিনিয়র নায়েবে আমীর তথা কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ও ঢাকা-মুন্সীগঞ্জের ৮ উপজেলা হেফাজতে ইসলামের সভাপতি মধুপুরের পীর মাওলানা আব্দুল হামিদ এ পাহারাদার বাহিনী নামিয়েছেন গ্রামময়। সন্ধ্যা ৭ টা থেকে ভোর রাত ৪ টা পর্যন্ত মধুপুর গ্রামের পৃথক

৩ টি পয়েন্টে পাহারায় থাকেন হেফাজতে ইসলামের প্রশিক্ষন প্রাপ্ত শতাধিক কর্মী।
সিরাজদীখান উপজেলা হেফাজতে ইসলামের সভাপতি মাওলানা ওবায়দুল্লাহ কাশেমী রাত জেগে গ্রাম পাহারা দেওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।


তিনি জানান, মধুপুর, সৈয়দপুর ও নয়ানগর-এই ৩ পয়েন্টে রাত জেগে অবস্থান নেয় পাহারাদার বাহিনী। গ্র“পে গ্র“পে বিভক্ত হয়ে তারা গ্রাম পাহারা দেয়। একেক গ্র“পে ২৫ থেকে ৩০ সদস্য রয়েছে। শাপলা চত্বরের গভীর রাতের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপের কারনে হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ নেতাসহ নেতাকর্মীদের গ্রেফতার এড়াতেই মূলত: মধুপুর গ্রামে এ পাহারার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন মাওলানা ওবায়দুল্লাহ কাশেমী।

তিনি বলেন- এ গ্রামে কোন নাস্তিক-মুরদাতের ঠাঁই নেই। পুলিশ যদি মধুপুরের পীর মাওলানা আব্দুল হামিদকে গ্রেফতার করতে আসে তবে গ্রামের একজন ব্যক্তিও বাদ যাবে না প্রতিরোধ গড়ে তুলতে। গ্রামের সবাই পুলিশ ও নাস্তিক ঠেকাতে ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসবেন।

অন্যদিকে, মধুপুরের পীর মাওলানা আব্দুল হামিদ সম্প্রতি নিজ সাক্ষরে একটি প্রেসনোটে বলেছেন- শাপলা চত্বরে বর্তমান সরকারের লালায়িত বাহিনী অসংখ্য হেফাজতের কর্মীকে বন্দুকের গুলিতে ঘায়েল করেছে। সিরাজদীখানের মধুপুর হালিমিয়া মাদ্রাসার শতাধিক হেফাজতে কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছে।

এদের শরীরে রক্ত ঝরেছে বলে তিনি দাবী করেন। তিনি বলেন, একজন হেফাজতে কর্মীর রক্ত ঝড়ে থাকলেও সেই রক্তের প্রতিদান দিতে হবে এ সরকারকে।


এ প্রসঙ্গে গতকাল বুধবার রাত সোয়া ৮ টার দিকে মোবাইল ফোনে কথা হলে সিরাজদীখান থানার ওসি আবুল বাসার বলেন- হেফাজতে ইসলামের লোকজন মধুপুর গ্রামময় রাত জেগে পাহারা দেয়-তা পুলিশ প্রশাসনের তথ্য জানা আছে। মূলত: মধুপুরের পীরকে পুলিশ গ্রেফতার করতে পারে-এমন আশংকা থেকে হেফাজতের কর্মীরা গ্রামে পাহারা বসিয়েছে। তবে পুলিশের পক্ষে হেফাজতিদের গ্রেফতার করার কোন পরিকল্পনা নেই।

যমুনা নিউজ