প্রাণের মেলা টোকিও বৈশাখী মেলা

monijapan11রাহমান মনি
দেখা হবে টোকিও বৈশাখী মেলায়। এতদিন জাপান প্রবাসীদের প্রিয় সেøাগান ছিল এই আয়োজনের। দিন দিন মেলার জনপ্রিয়তা, উৎসাহ-উদ্দীপনা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে ব্যাপকতা। আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যোগ হচ্ছে সেøাগানও। জাপান প্রবাসীদের প্রিয়, পাঠকপ্রিয় সাপ্তাহিক-এ প্রবাস প্রজন্ম জাপান রীতিমতো বিজ্ঞাপন দিয়ে জানান দিয়েছেন নতুন সেøাগানের কথা। ‘আমরা থাকব ইকেবুকুরো মেলা প্রাঙ্গণে, আপনি আসছেন তো? দেখা হবে টোকিও বৈশাখী মেলায়।’ অর্থাৎ বাংলাদেশে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের কথা আসলে যেমন রমনায় বটমূলে ছায়ানটের আয়োজনের কথা সর্বাগ্রে চলে আসে, ঠিক তেমনি জাপান প্রবাসীদের বাংলা নববর্ষ উদযাপন বলতে এক বাক্যে চলে আসে টোকিওর প্রাণকেন্দ্র তোশিমা সিটি ইকেবুকুরো নিশি গুচি কোয়েনের কথা। এই পার্কেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বাঙালি জাতির গর্ব, বাঙালির শ্রেষ্ঠ অর্জন, বিশ্ব মাতৃভাষার স্বাধিকারের প্রতীক, আমাদের মহান শহীদ মিনার। যা দেশের বাইরে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক স্থাপিত প্রথম শহীদ মিনার। এই শহীদ মিনার নির্মাণ সম্ভব হয়েছে এই মাঠে একনাগাড়ে বৈশাখী মেলা সফলভাবে আয়োজন এবং মেলা কমিটির ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়। তাই ইকেবুকুরো নিশি গুচি কোয়েন হয়ে উঠেছে জাপান প্রবাসীদের সবকিছুর প্রাণকেন্দ্র। বাংলাদেশ থেকে বিশিষ্টজনরা জাপান সফর করলে এই স্থান পরিদর্শন করেন। তাদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ।

দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশের সঙ্গে মিল রেখে জাপান প্রবাসীরা একই দিন বৈশাখী মেলা আয়োজন করাতে এ বছর মেলাতে উৎসাহ-উদ্দীপনায় ভিন্ন মাত্রা পায়। আধুনিক প্রযুক্তির ফলে অনেকেই স্কাইপি বা অন্যান্য সুযোগের সুবিধা নিয়ে মেলা প্রাঙ্গণ থেকে সরাসরি আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয় দেশে থাকা প্রিয়জনদের সঙ্গে। জাপানে সাধারণত রোববার প্রবাসীদের আয়োজন করতে হয় বাংলাদেশের জাতীয় দিবসগুলোর আয়োজনগুলোতে। একমাত্র ব্যতিক্রম মহান ভাষা আন্দোলনের প্রভাতফেরি ছাড়া। কারণ, সরকারি ছুটি এক্ষেত্রে বড় বাধা। ১ বৈশাখ বাংলাদেশে ছুটি থাকলেও জাপানে ছুটি থাকে না। কিন্তু এ বছর ১ বৈশাখ রোববার হওয়ায় উভয় দেশে ছুটি মিলে যায়।

জাপান প্রবাসীদের বৈশাখী মেলা আয়োজনের কার্যক্রম শুরু হয়ে যায় তিন মাস পূর্ব থেকেই। একাধিক সভা করে বিভিন্ন কমিটি, উপকমিটি গঠন করে দায়িত্ব বণ্টন করে কাজের তদারক করা হয় কেন্দ্র থেকে। কেন্দ্রীয় কমিটির প্রধান সমন্বয়ক ড. শেখ আলীমুজ্জামান নেতৃত্ব দেন এই তদারকির কাজে। তারই দক্ষ নেতৃত্ব এবং সমন্বয়কারী, সেই সঙ্গে সর্বস্তরের প্রবাসীদের সর্বাত্মক সহযোগিতায় জাপানের মাটিতে এত বড় আয়োজন সম্ভব হয়। যা না দেখলে বিশ্বাস করা সহজ নয়। প্রায় ১০ হাজার দর্শনার্থীর পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে আয়োজন প্রাঙ্গণ। যার অধিকাংশই স্থানীয় জাপানসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকবৃন্দ। সর্বশেষ সরকারি হিসাবে প্রায় ১০ হাজারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশির বসবাস এই জাপানে। জাপানের বিভিন্ন শহর থেকে প্রায় ৫-৭ হাজারের মতো প্রবাসী অংশ নেয় এই বৈশাখী মেলায়। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে জাপানের বিভিন্ন শহরে বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়ে থাকে। তার পরও টোকিও বৈশাখী মেলার স্থান সব আয়োজনের ঊর্ধ্বে।


আনুষ্ঠানিক সকাল ১০টা থেকে শুরু হয়ে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত মেলার নির্দিষ্ট সময় থাকলেও আগের দিন রাত থেকেই উৎসবমুখর হয়ে ওঠে মেলা প্রাঙ্গণ এবং মেলা শেষ হওয়ার পরও মধ্যরাত পর্যন্ত কোলাহলমুখর থাকে মেলা প্রাঙ্গণ। মেলায় ১৯টি খাবার দোকানের পাশাপাশি ১৭টি অন্যান্য স্টল ছিল। ছিল টোকিও বৈশাখী মেলা ২০১৩ স্পনসরদাতা স্টল, পরিচালনা স্টল এবং বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা কেন্দ্র।

বিনামূল্যে স্বাস্থ্য সেবা প্রদান টোকিও বৈশাখী মেলার অন্যতম একটি মানবিক উদ্যোগ। কর্মব্যস্ততার জন্য যেসব প্রবাসী নিয়মিতভাবে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে উঠতে পারেন না এবং বিশেষ করে ভাষাগত সমস্যার কারণে যারা স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে ভয় পান তাদের জন্য এই উদ্যোগ। ভ্রাম্যমাণ হলেও এই স্বাস্থ্য কেন্দ্রে সঠিক পরীক্ষার মাধ্যমে পরবর্তীতে রিপোর্ট জানানো হয়ে থাকে।

কবিগুরুর ‘এসো হে বৈশাখ’ গান দিয়ে মেলার উদ্বোধন হয়। এর পর থেকে একে একে পরিচিতি পর্ব (মেলা পরিচালনা কমিটি, স্টল এবং স্পনসরদের পরিচিতি), বড়দের উন্মুক্ত অনুষ্ঠান (এ আয়োজনে উপস্থিত যে কেউ অংশ নিয়ে প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে পারে), ছোটদের ছবি আঁকা (উন্মুক্ত), ছোটদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান (নাচ, গান, আবৃত্তি, অভিনয়, কৌতুক, যেমন খুশি তেমন সাজ ইত্যাদি দিয়ে অনুষ্ঠান সাজানো হয়), জাপানি অনুষ্ঠান (বৈশাখী থিম সং পরিবেশনায় তাকেও ওজাওয়া, জাপানি নৃত্যদল আরাধনার বাংলা বর্ষবরণ নৃত্য এবং জাপানি ঢাক দলের পরিবেশনা), ভিআইপি অতিথি সংবর্ধনা, মেলার স্পনসরদের সম্মাননা প্রদান, বাংলা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান (স্থানীয় উত্তরণ বাংলাদেশি সাংস্কৃতিক দল, স্বরলিপি কালচারাল একাডেমি এবং বাংলাদেশ থেকে আমন্ত্রিত শিল্পীরা এই পর্বে অংশ নেয়) এবং সবশেষে সমাপনী অনুষ্ঠান দিয়ে শেষ হয়।


এবার বাংলাদেশ থেকে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন ক্লোজআপ ওয়ান-খ্যাত শিল্পী নীলিমা শশী, নুরুজ্জামান বাপ্পি, সঙ্গে বাদক হিসেবে এসেছিলেন আলীম ইমাম, সেলিমুজ্জামান সেলিম, পাপ্পু আখন্দ প্রমুখ।

মেলায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তোশিমা সিটি মেয়র য়ুকিও তাকানো, তোশিমা সিটি সংস্কৃতি ও বাণিজ্য বিভাগীয় প্রধান মাসাকি সাইকি, বাংলাদেশে অবস্থিত জাপান দূতাবাস কর্মকর্তা হিরোয়ুকি মিনামি, ছেতোউচি উৎসব বাংলাদেশে দায়িত্বপ্রাপ্ত তানিগুচি এইজি, আয়োজক সংগঠনের চেয়ারম্যান ওসামু ওৎসুবো। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাপানস্থ বাংলাদেশ রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন। এছাড়াও মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন মেলায় শিল্পীদের স্পনসর, বসুন্ধরা গ্রুপের ইমদাদুল হক মিলন এবং জাপানস্থ বাংলাদেশের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত আশরাফ উদ দৌলা।
শিশু-কিশোরদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে একঝাঁক প্রবাসী শিশু-কিশোর অংশ নিয়ে মাতিয়ে তোলে মেলা প্রাঙ্গণ। শিশু-কিশোরদের হাতে উপহার তুলে দেন রাষ্ট্রদূত পতœী ফাহ্মিদা যাবীন এবং দৈনিক কালের কণ্ঠ সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন।

বরাবরের মতো এবারও উত্তরণ এবং স্বরলিপির সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেছে জাপান প্রবাসীরা। উত্তরণ এবং স্বরলিপির কথা জানে জাপানি বন্ধুরাও। তাই এই সময়ে তাদের উপস্থিতিও ছিল লক্ষণীয়। এর পরপরই মঞ্চে আহ্বান করা হয় আমন্ত্রিত শিল্পীদের। শশী এবং বাপ্পী বাংলাদেশের জনপ্রিয় গান গেয়ে মাতিয়ে তোলেন ইকেবুকুরো মেলা প্রাঙ্গণ। শশী এবং বাপ্পীকে বাদ্যে সহায়তা করেন বাংলাদেশ থেকে আগত কিবোর্ড বাদক আলী ইমাম, গিটারিস্ট সেলিমুজ্জামান সেলিম এবং ড্রামে পাপ্পু আখন্দ।

সবশেষে মেলা কমিটির প্রধান সমন্বয়কারী ড. শেখ আলীমুজ্জামান সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে আগামী বছর একই স্থানে বৈশাখী মেলায় দেখা হবে আশা ব্যক্ত করেন।

টোকিও বৈশাখী মেলার জন্মলগ্ন থেকে সংশ্লিষ্ট আসগর সানী এবং বহ্নী দম্পতিকে এ বছর টোকিও বৈশাখী মেলা কমিটি থেকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানিয়ে বিদায় জানানো হয়। এই দম্পতি এ বছর বাংলাদেশে ফিরে গিয়ে স্থায়ী বসবাসের সিদ্ধান্ত নেন। টোকিও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এ দম্পতির অংশগ্রহণ এবং অবদান অপরিসীম। তাই তাদের বিদায় ঘোষণায় প্রবাসীরা আবেগে আপ্লুত হয়ে উঠেন।

সাপ্তাহিক