মুক্তিযুদ্ধে মুন্সিগঞ্জ-বিক্রমপুর

বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব আঃ রউফ মোল্লা
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে হাজার বছরে বাঙালিদের স্বাধীনতা খুঁজে পাওয়া যায় না। বিভিন্ন জাতি বিভিন্ন সময়ে আমাদের শাসন, শোষণ করেছে। শর্ন, হুক, মারাঠা, গুজরাট, ওলন্দাজ, পর্তুগীজ, আর্য, মোঘল, পাঠান, ইংরেজ আমাদের শাসন শোসন করেছে। করেছে আমাদের সম্পদ লুণ্ঠন। ওদের শাসন, শোষণ ও লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে অনেক আন্দোলন সংগ্রাম হয়েছে। সময়ের বিবর্তনে বিভিন্ন আন্দোলন ও সংগ্রামের ফলে, ধর্মের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান নামক একটি দেশের স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম বটে, কিন্তু পাকিস্তানীরাই শ্রেণ্ঠ শোসক হিসেবে আভির্ভূত হল। ওরা সর্বদিক থেকেই আমাদের ন্যার্য্য হিস্সা থেকে বঞ্চিত করল। এমন কি মায়ের ভাষাও কেঁড়ে নিতে চাইল। ভাষার জন্য জীবন দিল আমাদের পূর্ব সুরীরা। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে, ১৯৬২ শিক্ষা আন্দোলনে, ১৯৬৩ সালের শ্রমিক আন্দোলনে, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলনে, ১৯৬৯ গণ অর্ভ্যূত্থানে, ১৯৭০ এর সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আমরা অভুতপূর্ব বিজয় অর্জন করি। সেই উত্তাল দিনগুলিতে ছাত্রলীগের একজন কর্মী হিসাবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করি। ছাত্রলীগের একজন কর্মী হিসাবে সকল কর্মসূচীর সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে অভুতপূর্ব বিজয়ের পর বাঙালির হাতে ক্ষমতা দিতে পাকিস্তানীরা তালবাহানা করায় ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বর্তমান সোরওয়ার্দী উদ্দ্যানে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেন। ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে স্বাধীন সত্বা নিয়ে পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর অঙ্গীকারই ব্যক্ত করা হয়। এই ভাষণে মুক্তিযুদ্ধের দিক নির্দেশনাই ছিল। ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোলার কথা ছিল। দেশকে মুক্ত করার কথা ছিল। আমরাও আমাদের এলাকায় ডেমি রাইফেল ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করেছিলাম। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে পুরু জাতি স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত ছিলাম, কিন্তু আমরা ছিলাম নিরস্ত্র।


২৫শে মার্চ বর্বর পাক বাহিনী রাতের অন্ধকারে বাঙালীর উপর চালালো হত্যাযজ্ঞ। এদেশের কৃষক, কামার, কুমার, জেলে, তাঁতি, শিক্ষক, ছাত্র, বুদ্ধিজীবী, পুলিশ, ইপিআর, বেঙ্গল রেজিম্যান্ট সহ সর্বস্তরের লোকের উপর চালালো হত্যাযজ্ঞ। ওদের পৈশাচিকতায় ও বর্বরতায় প্রতিটি এলাকায় প্রতিরোধ গড়ে উঠল। মুন্সিগঞ্জ বিক্রমপুরে ও জনগণও পিছিয়ে নেই। এম কোরবান আলী, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, কফিল উদ্দিন চৌধুরী, আঃ করিম বেপারী, এড: মোঃ সামছুল হক, প্রফেছার মোঃ সামছুল হুদার নেতৃত্বে মুন্সিগঞ্জ বিক্রমপুরের সংগ্রামী জনতা অত্যন্ত সোচ্ছার ছিল। ২৫শে মার্চ রাত্রে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার সংবাদ মুন্সিগঞ্জে এসে পৌঁছলে শত শত মানুষ রাতভর শহরে বিক্ষোভ মিছিল করে। ২৬শে মার্চ সকাল থেকে আওয়ামী লীগ নেতা তাঁরা মিয়া রিকসায় সারা শহরে মাইকিং করে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার কথা প্রচার করতে থাকে। সকাল থেকেই ঢাকা, নারায়নগঞ্জ হতে হাজার হাজার লোক প্রাণের ভয়ে মুন্সিগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় আসতে থাকে। সংগ্রাম পরিষদের উদ্যেগে শরনার্থীদের মাঝে খিচুড়ি, মুড়ি, চিড়া, গুড় ও পানি সরবরাহ করা হয়।

বিভিন্ন স্কুলে বা বাড়িতে তাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়। আমরা ছাত্রলীগের কর্মী হিসাবে শরণার্থীদের সাহায্য করা ইবাদতের অংশ হিসাবেই মনে করি। ২৬শে মার্চ বিকালে সংগ্রাম পরিষদের নেত্রীবৃন্দ মুন্সিগঞ্জ শহরের ট্রেজারী দখল করে রাইফেল, গোলাবারুদ ছাত্র যুবকদের মধ্যে বিতরণ করে দেয়।

অস্ত্রধারী ছাত্র, যুবক, আনসার, পুলিশ, সাবেক ইপিআর সদস্যরা শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও পাক হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করার শপথ গ্রহণ করে ও মুন্সিগঞ্জ লঞ্চঘাটে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। মুন্সিগঞ্জের বহু তরুণ যোদ্ধারা নারায়নগঞ্জের বীর জনতাকে সহায়তা করার জন্য চাষাঢ়ায় ব্যারিকেট সৃষ্টি করে। টঙ্গিবাড়ীর ছাত্র যুবকেরা থানা ঘেরাও করে অস্ত্র গোলা বারুদ সংগ্রহ করে আবদুল্লাহপুর লঞ্চঘাটে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। আমি সেই দিন আউটশাহী তহশীল অফিসের বন্ধুক নিয়ে সাথী ও বন্ধুদের নিয়ে উপস্থিত ছিলাম। প্রকাশ থাকে যে, টঙ্গিবাড়ী থানার ভার প্রাপ্ত কর্মকর্তা মজিবুর রহমান তার পুলিশদের নিয়ে উপস্থিত ছিলেন। সিরাজদীখানের ছাত্রজনতা সাংসদ ক্যাপ্টেন (অবঃ) জামাল চৌধুরীর নেতৃত্বে তালতলা লঞ্চঘাটে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।


শ্রীনগরের শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনের নেতৃত্বে ছাত্র, যুবক ও জনতা রাইফেল নিয়ে সৈয়দপুর লঞ্চঘাটে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। মুন্সিগঞ্জ মহুকুমায় প্রতিরোধের মুখে পাক সেনারা বিভিন্ন স্থানে আক্রমণ চালিয়ে হত্যা, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ করে। ৯ই মে পাক সেনারা গজারিয়া থানায় অর্তকিত হামলা করে ৪/৫ টি গ্রামে ৩৬০ জন নিরীহ জনতাকে হত্যা করে। মুন্সিগঞ্জে পাক সেনারা ব্যাপক ধ্বংস ও অগি¦কান্ড ঘটাতে থাকে। মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপস্থিতিতে তাদের বাড়িঘর পুঁড়িয়ে দেয়। ডাঃ এম এ কাদের, বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ হোসেন বাবুল, আনিসুজ্জামান আনিসের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়। হরগঙ্গা কলেজে প্রধান সেনাক্যাম্প স্থাপন করা হয়। বিভিন্ন এলাকা থেকে নিরীহ লোকজনকে ধরে এনে এই ক্যাম্পে রাখা হত। মুন্সিগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসের পাশেই তৈরি করা হয় বধ্য ভূমি। এই বধ্য ভূমিতে নিরীহ লোকজনদের নির্মমভাবে হত্যা করে একটা আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করে। ১৪ই মে কেওয়ার চৌধুরী বাড়ীতে আশ্রিত অনিল মুখার্জী, বাদল ভট্টাচার্য, অধ্যাপক সুরেশ, ডাঃ সুরেন্দ্র চন্দ্র সাহা, সুনীল চন্দ্র সাহা, দ্বিজেন্দ্র সাহা, শচীন্দ্র মুখার্জী, হরনাথ চক্রবর্তী ও বাড়ীর মালিক আইনজীবী কেদার চৌধুরীসহ ১৭ জনকে ধরে এনে সিকদার বাড়ীর খালের পাড়ে সারিবন্ধভাবে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে পাক বাহিনীরা হত্যা করে। আইনজীবী মন্থুর মুখার্জিকে কয়েকদিন আটক রেখে লঞ্চ ঘাটে নৃশংসভাবে হত্যা করে ধলেশ্বরী নদীতে ফেলে দেয়। আব্দুল্লাপুরের পালের বাড়ীতে অমুল্যপাল, ঢাকা শাঁখারী বাজার থেকে আগত সাধুসহ ১৩ জন আশ্রিত জনতাকে লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ারে পাক সেনারা হত্যা করে। পাক বাহিনীর নৃশংস হত্যা ও অত্যাচারের কারণে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা সংগঠিত হয়ে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। ১৩ই আগষ্ট দিবাগত রাত্রে মমিন খাঁ, আব্দুল আউয়াল তোতা, পান্নু চৌধুরীসহ কয়েকজন শ্রীনগরের পরশুরাম দাসের পাড়ার একটি বাড়ীতে খানা পিনায় ব্যস্তথাকা অবস্থায় মুক্তিযোদ্ধারা আক্রমন করে মমিন খাঁকে হত্যা করে। গুলির শব্দ পেয়ে তোতাসহ কয়েকজন পুকুরে ঝাপ দেয়। মুক্তিযোদ্ধারা পুকুরে এলোপাতাড়ী গুলি করলে নুরুসহ অপর একজন নিহত হয়। ভোর বেলা তোফাজ্জল খাঁ, আঃ আউয়াল তোতাসহ কয়েকজন থানায় এজাহার করতে গেলে মুক্তি বাহিনী থানা, হাবিব ব্যাংক, পোষ্ট অফিস দখল করে অস্ত্র লুট করে নিয়ে যায় এবং আগুন দিয়ে থানা, পোষ্ট অফিস, ব্যাংক পুড়িয়ে দেয়। গাজী সামসুদ্দিন, হেদায়েতুল ইসলাম কাজল, মোঃ ফকরুদ্দিন চৌধুরী ওরফে পান্নু চৌধুরী, আঃ শহিদ ভুঁইয়া, বাহারসহ মুক্তিযোদ্ধারা এই অপারেশনে অংশ নেয়। কয়েকদিন পর পাক সেনারা পূনরায় শ্রীনগর থানা দখল করে।

সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে নভেম্বরের মধ্যে মুন্সিগঞ্জ বিক্রমপুরের বিভিন্ন এলাকায় অনেকগুলি যুদ্ধ হয় তার মধ্যে উল্ল্যেখ করার মত গালিমপুরের, কমরগঞ্জের, কামারখোলার, গোয়ালীমান্দ্রার, দক্ষিণ পাইকসার, সৈয়দপুরের, টঙ্গিবাড়ী দখলের যুদ্ধ। মুক্তিযোদ্ধারা গোয়ালী মান্দ্রা, বাড়ৈখালী, শেখরনগর, শিবরামপুর ও পঞ্চসারে পাক বাহিনীকে পদর্যুদস্ত করে।


দালাল রাজাকারদের দৌরাত্ম বৃদ্ধি পেলে গোয়ালী মান্দ্রায় ছয় রাজাকারকে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়। এই ঘটনায় পাক সেনাদের আলোরিত করলে মুন্সিগঞ্জ থেকে শতাধিক পাক সেনা গোয়ালী মান্দ্রায় যাওয়ার পথে মুক্তি বাহিনী দ্বারা আক্রান্ত হয়। চারিদিক থেকে মুক্তিযোদ্ধারা পাক সেনাদের উপর আক্রমণ চালায়। প্রায় ৩৮ঘন্টা ব্যাপি এই যুদ্ধে ৩৫ জন পাক সেনা নিহত হয় এবং সাতজন আত্মসমর্পণ করে। ঢালী মোয়াজ্জেম হোসেন ও সোলায়মানের নেতৃত্বে এই যুদ্ধে শহীদুল আলম সাঈদ, ইকবাল হোসেন সহ অনেক মুক্তিযোদ্ধাই গোয়ালীমান্দ্রার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। সেপ্টেম্বর মাসে বাড়ৈখালীর শিবরামপুর হাটে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে পাক সেনাদের সম্মুখ যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে পাকসেনাদের গানবোর্ড নদীতে ডুবিয়ে দেয়া হয় এবং অনেক পাক সেনা নিহত হয়। ফ্লাইট সার্জেন্ট ওমর মিয়ার নেতৃত্বে শহীদুল আলম সাঈদ, জামাল চৌধুরী, আতিকউল্লাহমাসুদ সহ বিক্রমপুরের বহু মুক্তিযোদ্ধা অংশ নেন। আনিসউজ্জামান আর্নিস, মোহাম্মদ হোসেন বাবুল, খালেকউজ্জামান খোকা, শহিদুল আলম সাইদ, মোয়াজ্জেম হোসেন, আওলাদ হোসেন, আঃ শহিদ ভুঁইয়াসহ অনেক মুক্তিযোদ্ধারা ১৪ই আগষ্ট লৌহজং থানা আক্রমণ করে এবং প্রায় দুই ঘণ্টা গোলাগুলির পর লৌহজং থানা দখল করেন। ২০/২৫ নভেম্বর মুন্সিরহাটে পাকসেনাদের সঙ্গে একটি যুদ্ধ হয় ঐ যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন কমান্ডার মিন আল হোসেন ঢালী, পাক সেনাদের উপর প্রচন্ড আক্রমণ চালালে, পাক সেনারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। পরে ঐ যুদ্ধে যারা এগিয়ে আসেন এবং অংশ গ্রহন করেন, তারা হলেন কমান্ডার কলিম উল্লার গ্র“প ও কমান্ডার এনামুল হকের গ্র“প। ১০ই আগষ্ট সন্ধ্যা প্রায় সাড়ে সাতটায় আব্দুল্লাহপুরে জনসভায় ভাষণরত অবস্থায় পাকিস্তান নেজামে ইসলামের নেতা মাদানীসহ ছয় জনকে সাত্তার রুহুল আমিনের স্টেনগ্যানের ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয়। বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে এই সংবাদ পরিবেশিত হয়। এই অপারেশনে গোলাম মুতর্জা চৌধুরী রাজা, মোহাম্মদ হানিফ, সালাউদ্দিন সেলিম, গিয়াসউদ্দিন, ফিরোজ, ছালাম, ও ছাত্তার অংশ নেয়। আমি ৪নং সেক্টরে মেজর সি, আর, দত্তের অধীনে কানাইঘাট থানায় প্রায় সাড়ে তিন মাস যুদ্ধ করি। যুদ্ধজয়ের আনন্দ ও সহ যোদ্ধা হারানোর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাই আছে। ৪ঠা সেপ্টেম্বর কটালপুরের ব্রীজ ভাংতে গিয়ে আমার কমান্ডার খাঁজা নিজামউদ্দিন ভূইয়া বীর উত্তম শহীদ হন। ২২শে সেপ্টেম্বর পাক সেনা দ্বারা আক্রান্ত হলে আমার সহযোদ্ধা আহাম্মদ উল্লাহ, শরীফ ও বেলুচী শহীদ হন। ওদের মৃত্যুর স্বাক্ষর হয়ে আমি চার নম্বর সেক্টর পরিবর্তন করে দুই নম্বর সেক্টরে আসি। ঐ দিন শবে-বরাতের দিন ছিল। দুই নম্বর সেক্টরের অধীনে মুন্সিগঞ্জ বিক্রমপুর আসার পথে কুমিল্লার বাতাকান্দির যুদ্ধ। এই যুদ্ধে মুন্সিগঞ্জ বিক্রমপুরের আমরা ৫১জন মুক্তিযোদ্ধা পাক সেনাদের লঞ্চ আক্রমণ করি। পরবর্তীতে দাউদকান্দি বাতাকান্দির অনেক মুক্তিযোদ্ধাই অংশগ্রহণ করে। পাক সেনাদের লঞ্চ আক্রমণে আমার নেতৃত্বে গোলাম কবির লাবলু, দীপাংকর গুপ্ত, রিয়াজুল ইসলাম বিরাজ, এস. এম আউয়াল, শাহজাহান কবির ও মাধব এবং লৌহজংয়ের কাজলের নেতৃত্বে মিজান, জাহাঙ্গীর ফকির, শ্রীনগরের নাছিরের নেতৃত্বে সর্বমোট আমরা বিক্রমপুরের ৫১জন মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম। ১৩ই নভেম্বর বেতকার শাহাজান, বক্তাবলীর মফিজুল, তালতলার এন.এ করিম বিদ্যুৎ চৌধুরীর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা তালতলার পাক সেনা ক্যাম্প আক্রমণ করে ই,পি.আর, রাজাকাদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করে। ১৯শে নভেম্বর আলী আহম্মদ বাচ্চু, শাহাজান, জামাল চৌধুরীসহ সিরাজদিখানের বীর মুক্তিযোদ্ধারা সিরাজদিখান থানা আক্রমন করে এবং ই.পি,আর, রাজাকারদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করে। এই অপারেশনে ৩৫ জন ই.পি.আর, রাজাকার আত্মসমর্পণ করে। এই অপারেশনে একটি মটার লেন্সার, চারটি এল,এম,জি, বত্রিশটি রাইফেল ও অনেক গোলাবারুদ মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে আসে। কুখ্যাত রাজাকার মজিদ মুন্সিকে ঘটনাস্থলেই গুলি করে হত্যা করা হয়।

১৪ই নভেম্বর দিবাগত রাত্রে আমার গ্রƒপ, সরাফত হোসেন রতনের গ্রƒপ, শাহজাহানের গ্র“প, শামছুল হক কমান্ডারের গ্র“প ও শহীদুল আলম সাঈদসহ টঙ্গিবাড়ী থানা দখল করি। ক্যাপ্টেন হালিম চৌধুরী আমার ক্যাম্পে আসেন। সারা রাত মিটিং করে আমাদের গ্র“ফসহ মানিকগঞ্জ নিয়ে যান। স্বাধীনতার চূড়ান্ত বিজয় পর্যন্ত তার সাথেই যুদ্ধে অংশ নেই বিভিন্ন স্থানে। তাই মুন্সিগঞ্জের চূড়ান্ত বিজয়ের স্বাদ ভোগ করার সৌভাগ্য আমার হয়নি। মুন্সিগঞ্জ থানা অপারেশন ও তিন ঘণ্টার জন্য মুন্সিগঞ্জ শহর দখল অপারেশনটি ছিল একটি উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ, ঐ যুদ্ধে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা অংশ নিয়ে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।


৯ই ডিসেম্বর গজারিয়ার বাউশিয়া ঘাটে মুক্তি বাহিনী ও পাক সেনাদের গোলাগুলিতে মুজিব বাহিনীর কমান্ডার নজরুল শহীদ হন। বাটেরচরে পাকসেনা ও মুক্তিযোদ্ধদের সাথে গোলাগুলিতে মুক্তিযোদ্ধা আঃ সাত্তার আহত হয়। আলীপুরায় মুক্তিযোদ্ধাদের এমবুশে বেশ কয়েক জন ইপিআর ও রাজাকার আত্মসমপন করতে বাধ্য হয়। বাওলাকান্দিতে পাকসেনারা অর্তকিত ভাবে আক্রমন করে কয়েকটি বাড়ী ঘর জালিয়ে দেয়।

নভেম্বর মাসের মধ্যেই পর্যায়ক্রমে সদর থানার বাদে মুন্সিগঞ্জের পাঁচটি থানাই মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে চলে আসে এবং স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলিত হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণের ব্যাপকতায় পাক সেনারা ১০ই ডিসেম্বর দিবা গত রাত্রে মুন্সিগঞ্জ শহর থেকে ঢাকায় পালায়ন করে। ১১ই ডিসেম্বর কাঁক ডাকা ভোরে বিভিন্ন এলাকায় মুক্তিযোদ্ধারা রাইফেলের মাথায় স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়িয়ে জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু শ্লোগানে মুখরিত করে মুন্সিগঞ্জ শহরে প্রবেশ করে এবং জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। মুক্তিবাহিনী ও জনতার আনন্দ মিছিলে মুখরিত হয়ে ওঠে মুন্সিগঞ্জ মহকুমা। আমি মানিকগঞ্জে কৌরী হাইস্কুলে অবস্থান কালে এই সংবাদে আনন্দিত ও উল্লসিত হয়েছি। ১৩ই ডিসেম্বর মানিকগঞ্জ মহকুমা দখলে আমাদের আনন্দ যেন আনন্দের বন্যায় পরিণত হয়। অনেক পাক সেনা পলায়ন কালে জনতার হাতে ধৃত হয়ে ক্যাপ্টেন হালিম চৌধুরীর কাছে পাঠানো হয়। আমরা বাংলাদেশের পূর্ণাঙ্গ বিজয়ের অপেক্ষায় প্রহর গুনছি। অবশেষে ১৬ই ডিসেম্বর সেই মহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত। মুক্তিবাহিনীও মিত্রবাহিনীর প্রবল আক্রমণে দিশেহারা পাক সেনারা (প্রায় ৯৩ হাজার) শত্র“ সেনা যৌথ কমান্ডের কাছে ৪-৩০ মিনিটে বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আত্মসমর্পন করে। অর্জিত হয় বাংলাদেশের চূড়ান্ত বিজয়। চারিদিকে আনন্দের বন্যা, মিষ্টি খাওয়ার ছড়াছড়ি। পৃথিবীর মানচিত্রে স্থান পেল বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের পতাকা। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে মুন্সিগঞ্জে প্রায় ২৪৫০জন মুক্তিযোদ্ধার তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। এই তালিকায় ভারতীয় ট্রেনিং প্রাপ্ত, ট্রানজিট ক্যাম্পে অবস্থানরত যুবক যারা ট্রেনিং নিতে পারেননি এবং স্থানীয় ট্রেনিং প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়েই। এই তালিকাই গ্রেজেট আকারে প্রকাশিত। ২০১০ সালের ২৬ জুন মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতক্ষ্য ভোটে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নির্বাচন হয়ে গেল। আমি এই নির্বাচনে একজন প্রার্থী ছিলাম। আমার এলাকায় মুক্তিযোদ্ধারা আমাকে মূল্যায়ন করেছে। মুক্তিযোদ্ধারা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান। সকলেই স্বরণীয় বরণীয় ব্যক্তিত্ব। সংক্ষিপ্ত এই আর্টিকেল সকলের নাম আনা সম্ভব নয় তাই নেতৃস্থানীয় কিছু নাম উল্লেখ করার ইচ্ছা সত্যেও করলাম না। সকলেই ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।

লেখক:- আলহাজ্ব আঃ রউফ মোল্লা
ডেপুটি কমান্ডার
মুন্সিগঞ্জ জেলা ইউনিট কমান্ড
বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ