হুমায়ুন আজাদের সৃষ্টিশীল সত্তা ॥ একটি শৈল্পিক অনুধ্যান

hz6ড. জাহিদা মেহেরুননেসা
ষাটের দশকের কবি হিসেবে হুমায়ুন আজাদ সামাজিক, রাজনৈতিক এবং প্রথাবিরোধী লেখক ও সমালোচক হিসেবে যেভাবে সামাজিক প্রথাবিরোধী একটি তীব্র আন্দোলনজাত আলোড়নের সূচনা করেছিলেন, একমাত্র তিনি ছাড়া অন্য কারও পক্ষেই তা সম্ভব হয়নি। তবে ষাটের দশক সময়টি বাংলা সাহিত্য, রাজনীতি এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ পরিবর্তনের যুগ। সাতচল্লিশে যে প্রত্যশা, যে স্বপ্ন, যে ধ্যান, যে আকাক্সক্ষা, যে অনুভূতি নিয়ে গণমানুষকে একত্র করবার শক্তি যুগিয়ে ছিল, তা ছিল একটি প্রতারণা মাত্র। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা চলে গেলেও রেখে গিয়েছিল শাসন এবং শোষণের হাতিয়াররূপী আইন-কানুন, বিধি-ব্যবস্থা। শাসকদের পরিবর্তন হয় মাত্র, কিন্তু শোষণযন্ত্রের পরিবর্তন হয় না। এই দশকেই তৎকালীন পাকিস্তানবাসী বাঙালীদের অন্তর্নিহিত সত্তায় তৈরি হয়েছিল শেকল ছেঁড়ার গান।


এই দশকে যাঁরা কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন, তাঁদের মধ্যে হুমায়ুন আজাদ একটি স্বতন্ত্র ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন, কারণ তিনি শুধু কবি হিসেবেই নয়, একজন প্রগতিশীল, প্রতিবাদী, আপোসহীন ও নির্ভীক দুঃসাহসী হিসেবে নিজের কথাগুলোকে গুছিয়ে বলেছেন জীবনের হুমকির প্রতি কোনরকম ভীতি অথবা ভ্রƒক্ষেপ না করে। এখানে তিনি বিশিষ্ট, কারণ একমাত্র তিনিই তীব্রভাবে একগুঁয়ে, বেপরোয়া, নির্ভীক, দুর্দান্ত মনোভঙ্গি নিয়ে সমাজসচেতন একজন কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক এবং অধ্যাপকরূপে জ্ঞানের বিভিন্ন মাধ্যমকে সত্য প্রকাশের ভিত হিসেবে বেছে নিয়েছেন।

তাঁর শিক্ষা এবং শিক্ষক জীবন ছিল অসাধারণ কৃতিত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্পর্কে তাঁর ধারণার অনেক উৎকৃষ্ট উদাহরণ তাঁর লেখায় পাওয়া যায়। যার প্রকৃষ্ট প্রমাণ হিসেবে আমরা তার ভাষাবিষয়ক গবেষণাগ্রন্থ, নারীবিষয়ক গ্রন্থ নারী এবং দ্বিতীয় লিঙ্গ নামক গবেষণাধর্মী সাহিত্যকর্মের উল্লেখ করতে পারি।

সাহিত্যের সমস্ত শাখায়ই তাঁর দৃপ্ত পদচারণার পরিচয় পাওয়া যায়। তবে তিনি কবি হিসেবেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন আন্তরিকভাবে। কবিতাকে বুঝতে চেয়েছেন, সৃষ্টি করতে চেয়েছেন এবং প্রতিটি বিষয়কেই একটু ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে যাচাই-বাচাই করে পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে সংযোজন করেছেন নিজস্ব মননশীল, সৃজনশীলতা, যা ছিল তাঁর সৃষ্টিশীলতার বৈশিষ্ট্য। তাঁর কবিতা একটি বিশেষ শৈল্পিক মাত্রায় প্রতিষ্ঠিত। কবিতার সূক্ষ্মতম বিচার-বিশ্লেষণ ছাড়াও মানুষ তাঁর কবিতা বুঝতে পারে; তার আবেদনে আন্দোলিত হতে পারে।


কবিতা এমন একটি শিল্পকর্ম, যা পড়ে মানুষের ইচ্ছে হয় কবিতার শিল্পের ভিতরে অবগাহন করতে। গোলাপ ফুল ফোটে, এর সৌন্দর্যের যে বিকাশ, অবয়বগত যে প্রকাশ, এর সৌগন্ধে মানুষের চিরন্তন যে উচ্ছ্বাস তার তুলনা মেলা ভার। সামগ্রিকভাবে এই ফুলের সৌন্দর্যের প্রতি ব্যক্তির সামগ্রিক সত্তার যে আকর্ষণ এবং আবেদন তা থেকে মুক্তি মেলা অসম্ভব। কবিতা হল সেই প্রস্ফুটিত পুষ্প, যা কবির হৃদয়ে দীর্ঘ কর্ষণের মাধ্যমে উৎকর্ষের উদাহরণ হিসেবে সৃষ্টি হয়। কবিতার শিল্পের ব্যাখ্যার প্রয়োজন সাধারণের কাছে তেমন গুরুত্ববহ নয়। এর প্রতি মোহমুগ্ধতার বিষয়ে বিশ্লেষণের প্রয়োজন হয় না। মানুষ কবিতাকে মনে রাখে তার লালিত্যে, তার বিষয়গত অন্তর্নিহিত সৌন্দর্যে, তার ছন্দের আনন্দে। অনাস্বাদিত এ আনন্দের স্বাদ চৈতন্যের কোন এক গাঢ়-গভীর-গহীন আলোকিত মেঘমালায় সঞ্চিত সম্পদের মতো সংরক্ষণ করে।
হুমায়ুন আজাদের কবিতার বিচার-বিশ্লেষণের প্রযোজন তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়, যতটা গুরুত্বপূর্ণ এর ভিতরে প্রবাহিত তীব্র আবেগজাত বেগ, রোমান্টিকতা এবং প্রকাশভঙ্গির তীব্র ঝংকার-যা শুনে মানুষর হৃদয়ে, মানুষের রক্তের ধারায়, মানুষের চেতনায়, মানুষের আত্মায় একটি স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের সৃষ্টি হয়। সে আনন্দের প্রবল উচ্ছ্বাসে, শরীরের বীণায় তন্ত্রে তন্ত্রে পুলকিত হওয়ার মতো ঘটনা ঘটে। কবিতার মাধ্যমেই মানুষের মনে সে-ই ধরনের একটি অদ্ভুত ভাললাগার অনুভূতি সৃষ্টি হয়।

একমাত্র কবিতাই মানুষের ভেতরে সংরক্ষিত এবং লালিত অনুভূতি হিসেবে যুগের পরে যুগের প্রথাবদ্ধ ধারণাকে ভাঙতে পারে, কবিতার মাধ্যমেই মানুষ মানুষকে ভালবাসতে পারে; কবিতাই মানুষের গ-িবদ্ধ ধারণাকে অর্থাৎ কামনা-বাসনার জগত থেকে মানুষকে অসীম, বিশেষ থেকে নির্বিশেষে, অন্ধকার থেকে আলোকের উন্মুক্তলোকে, ছবি থেকে গানে, রূপ থেকে অরূপের শাশ্বত সৌন্দর্যলোকের পথে আকর্ষণ করতে পারে।
কবিতাকে হুমায়ুন আজাদ প্রত্যক্ষ করেছেন একটু ভিন্নভাবে। তিনি কবিতাকে দেখেছেন ঝিনুকের জ্যোর্তিময় ব্যাধিরূপে, সম্ভবত এ বিষয়টি হলো তাঁর বিদেশি-কবিতা পাঠের থেকে সৃষ্ট উপমা। এ সম্পর্কে তিনি লিখেছন : ‘যা পুরেপুরি বুঝে উঠবো না, বুকে ওষ্ঠে হৃৎপি-ে, রক্তে মেধায় সম্পূর্ণ পাবো না, যা আমি অনুপস্থিত হয়ে যাবার পর রহস্য রয়ে যাবে রক্তের কাছে, তার নাম কবিতা।’


তিনি কবিতা সম্পর্কে আরও বলেছেন, ‘কবিতা আমার কাছে সৌন্দর্যের বিরামহীন বিস্তার, ইন্দ্রিয়ের অনন্ত আলোড়ন, জীবাশ্মের মতো নির্মোহ, মহর্ষির প্রাজ্ঞতা, ধ্যানের অবিচল উৎসারণ।’

হুমায়ুন আজাদ কবিতা সম্পর্কে যে এ ধরনের একটি সংজ্ঞার্থ নির্মাণ করেছে এককথায় তা অতুলনীয়, একবারেই নিজস্ব উপলব্ধিজাত। হুমায়ুন আজাদের কবিতা আসলে কী? তাঁর ভাষায় :

‘যেহেতু কিছুই নেই করণীয়, ব্যাধিরূপে বেড়ে ওঠা ছাড়া, নিজেকে, ব্যাধিকে-যাদু রসায়নে রূপান্তরিত করছি শিল্পে একরত্তি নিটোল মুক্তোয়।’
কবিকে বিশ্লেষণ করে কিছুই বলতে হয়নি এখানে। অল্প কথায় এত বাঙময়তা অন্য কোথাও আছে কি-না আমার জানা নেই।

তবে আমি কবিতা সমন্ধে যা বুঝি তা হল, কবিতায় আবেগের বেগ, ইমোশন থেকে মোশন, মোশন থেকে ইমাজিনেশন, ইমাজিনেশন থেকে ইমেজ, ইমেজ থেকে এসপ্রেশান এসমস্ত বিষয় থেকে আবার মোশন। কবিতার মতো করে এমন আন্দোলিত করার ক্ষমতা অন্য কোনো কিছুরই নেই। আবেগের বিষয় সম্বন্ধে আলোকিত করতে গেলে উল্লেখ করতে হয়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতায় দীর্ঘস্থায়ী আবেগের প্রভাব সম্পর্কে। বাঙালীর মনে রবীন্দ্রনাথের গান ও কবিতার প্রভাব থাকবে যুগ যুগ ধরে ধমনি ও নিজের ভেতরে প্রবাহিত রক্তধারার মতো। কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে। তাঁর কবিতা মানুষকে এমনভাবে আলোড়িত করেছে যা অন্য কারও কবিতায় নেই। তাঁর কবিতার বিষয়, ভাষা, ছন্দ, অন্তর্নিহিত আলোড়নের বিষয়বস্তু ও তাৎপর্য অতুলনীয়। আন্দোলনে, আলোড়নে, ছন্দে-গানে, রণনে-অনুরণনের ঝংকারে, শিকল ছেঁড়ার দৃপ্ত আহ্বানে তাঁর কবিতা আমাদের রক্তে উন্মাদনা সৃষ্টি করে, এ ক্ষেত্রে তিনি অনন্য।

আমাদের মধ্যে আমরা যারা কবিতাকে ভালবাসি তারা একমাত্র কবিতার মাধ্যমেই আন্দোলিত হই। কবিতাকে যারা ভাল না বাসে তারাও কবিতার মাধ্যমেই অনুরণিত হয়। আমাদের চারপাশে, আমাদের চেতনে-অবচেতনে, আমাদের জানা এবং অজানা জগতের বাইরে এবং ভিতরে সর্বত্র কবিতার অবস্থিতি এবং উপস্থিতি। ব্যক্তিগতভাবেও আমার মাঝে কবিতার একটি জগত আছে বলেই হুমায়ুন আজাদের কবিতার সাথে আমার পরিচয়, তাঁর সাহিত্যকর্মের সাথে পরিচয়, কেন না তিনি ছিলেন আমার শিক্ষক এবং প্রথাবিরোধী চিন্তার দীক্ষাদাতা।

কবিতায় যেমন তেমনি অন্যান্য বিষয়ে নিজ বক্তব্য প্রকাশে হুমায়ুন আজাদ ছিলেন দুঃসাহসী। তাঁর এই সাহসী উচ্চারণ কতটা মারাত্মক হতে পারে তা তিনি জানতেন। তিনি ব্যাঙ্গাত্মক কৌশলে সমস্ত কথা বলতে পারতেন। ২৭ শে ফেব্রুয়ারিতে তাঁর ওপর হামলা হওয়ার পরে তিনি ব্যাংককে চিকিৎসা করে ফিরে আসলেন, ফিরে এসে তিনি বলেছিলেন, “কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহী কবি হয়ে বড়জোর কয়েকটি লাঠির আঘাত খেয়েছিলেন, কিন্তু আমাকে খেতে হয়েছে কোপের পরে কোপ।” প্রতিক্রিয়াশীলদের কাছে তিনি ছিলেন আতঙ্ক, মারাত্মক ব্যঙ্গাত্মক সমালোচক, প্রতিবাদী এবং সাক্ষাৎ হুমকিস্বরূপ।

অন্ধের মতো বাংলাদেশের মধ্যযুগের দিকে যাত্রাপথে তার হৃদয়ে অসহিষ্ণু যন্ত্রণা অনুভব করেছেন। আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম গ্রন্থে তাঁর অসংখ্য প্রশ্ন রয়েছে। তিনি বলেছেন :
‘বাংলাদেশের দেহ ও হৃদয় অপার বেদনার প্রকাশ-হাহাকার নয়, নিঃশব্দ রোদন।’
এই গ্রন্থের উৎসর্গ অংশে তিনি লিখেছেন :
‘আমরা শিল্প সাহিত্যকে নষ্ট করেছি; লেখক বুদ্ধিজীবীরা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের দালাল, পেছনের সারির কর্মী, এমনকি গু-া হয়ে উঠেছি। ধর্ম দিয়ে আমরা সরল মানুষদের প্রতারণা করে চলেছি।
———————————-
এই আমাদের বাংলাদেশ, এই আমাদের সোনার বাংলা
কিন্তু আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম?
এমন দুস্থ, দুর্নীতিকবলিত, মানুষের অধিকার, পথিককুল, বিপদসঙ্কুল, সন্ত্রাসীশাসিত, অতীতমুখী, প্রতিক্রিয়াশীল,
ধর্মান্ধ, সৃষ্টিশীলতাহীন, বর্বর, স্বৈরাচারী বাংলাদেশ
যেখানে প্রতি মুহূর্তে দম বন্ধ হয়ে আসতে চায়’
হুমায়ুন আজাদ বাংলাদেশের দম বন্ধ করা এই দূষিত অবস্থা থেকে বাঁচতে চেয়েছিলেন। এখানের দলে দলে মনুষ্যম-লীর জন্য একটি সমাজতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ দেশ আশা করেছিলাম, যেখানে নিশ্চিন্তে নির্মল বাতাসে প্রাণভরে নিঃশ্বাস নেয়া যাবে। কিন্তু বাংলাদেশের দুরবস্থার অন্ধকারে আলোর পথরেখা নির্মাণ করতে গিয়ে তিনি নিজেই হারিয়ে গেলেন। তবে প্রকৃতপক্ষে তিনি কি হারিয়েছেন?
বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ আধুনিক কবি শামসুর রাহমানকে হুমায়ুন আজাদ আখ্যায়িত করেছেন নিঃসঙ্গ শেরপা অভিধায়।
হুমায়ুন আজাদের মৃত্যুতে শামসুর রাহমান লিখেছেন একটি কবিতা-কবিতার নাম ‘তুমি আজ অধিরাজ’ ‘মূর্খেরা ভেবেছে তুমি অস্ত্রাঘাতে নিষ্প্রাণ হলেই
নিভে যাবে তোমার সৃষ্টির আলোমালা,
অথচ জানে না ওরা, সর্বদা সজীব তুমি, অমর।
তোমার প্রোজ্জ্বল রচনাবলী, তোমার শরীর
কোনকালে বিলুপ্ত হলেও
যুগ যুগ জ্বলজ্বলে রয়ে যাবে বাংলার দলিলে;
কুটিরে, নদীর ঢেউয়ে, দেশপ্রেমী প্রতিটি প্রাণের
আসনে, হে কবি, হুমায়ুন, তুমি আজ অধিরাজ।’

বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ কবি শামসুর রাহমান এ কবিতায় শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাতে গিয়ে হুমায়ুন আজাদকে অধিরাজ বলে অভিহিত করেছেন। বলেছেন বাংলার দেশপ্রেমিক মানুষের হৃদয়ের আসনে তাঁর অবস্থান অত্যন্ত উজ্জ্বল আলো ছড়িয়ে দেবে। হুমায়ুন আজাদ বেঁচে থাকবেন এদেশের মানুষের কুটিরে কুটিরে, নদীর স্রোতে।

জনকন্ঠ