চাঁদ ও কাস্তে

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
মহান মে দিবস শ্রমিক শ্রেণীর সংগ্রামের প্রতীকী দিনই নয় শুধু এই পহেলা মে। দিনটি শ্রমিকদের বিজয় উৎসবের দিন এবং আন্তর্জাতিক সংহতিরও দিন। এবার বাংলাদেশে লাশের বোঝা কাঁধে নিয়ে পালিত হচ্ছে দিনটি। সাভারের ভয়াবহ মর্মান্তিক ঘটনা আবারো প্রমাণ করেছে এ দেশে শ্রমিক জীবন কতবেশি ঝুঁকিপূর্ণ এবং কতিপয় লোভাতুর মানুষ নামধারীদের লোভের আগুনে দগ্ধ। মনে পড়েছে পূর্ণিমার চাঁদকে একদা ঝলসানো রুটি বলেছিলেন সুকান্ত ভট্টাচার্য, কিন্তু তারও আগে, ১৯৩৬-এ দিনেশ দাস লিখেছিলেন, ‘এ যুগের চাঁদ হলো কাস্তে।’ তার পঙ্ক্তি কটি অবিস্মরণীয়, ‘বাঁকানো চাঁদের সাদা ফালিটি/তুমি বুঝি খুব ভালবাসতে?/চাঁদের শতক আজ নহে তো,/এ যুগের চাঁদ হলো কাস্তে।’ সারাজীবন কাস্তের পক্ষে ছিলেন তিনি, বন্ধু ছিলেন কাস্তে-সম্বল মানুষদের এবং সেই মানুষদের একজনের মতোই নিঃশব্দে বিদায় নিলেন জীবন থেকে ১৯৮৬-তে। ৭২ বছর বয়স হয়েছিল তার। অনেকের কাছে একসময়ে তিনি কবি ছিলেন ‘অহল্যা’র। ‘কাস্তে’ নয়, ‘অহল্যা’ই সঙ্কলিত হয়েছে এখানে-সেখানে, আলোচিত হয়েছে বিভিন্ন প্রসঙ্গে। পঞ্চাশের দশকে ওই কবিতার বইটি বের হয়েছিল। কেবল অহল্যার নয়, কাস্তেরও কবি ছিলেন দিনেশ দাস। কাস্তেরই প্রধানত, যে কাস্তের ভেতর হাতুড়ি ছিল উহ্য, কিন্তু অনিবার্য। আর অহল্যাতে-কাস্তেতে বিরোধ ছিল না তো কোনো। প্রস্তরে পরিণত অহল্যা ছিল তার কাছে প্রতীক একটি-প্রতীক একই সঙ্গে আধুনিক সভ্যতার ও বন্ধ্যা প্রকৃতির। তিনি লিখেছেন, ‘জীবন বিশাল স্মরণীয়/প্রাণের গোপন কূপে অনন্ত পানীয়/তবু চাপা পাষাণের অতলে পাষাণ/অহল্যার মতো কাঁদে শিলীভূতপ্রাণ।’ অহল্যা প্রতীক্ষা করেছিল রামের জন্য, রামের পদস্পর্শ পেলে তার ওপর ন্যস্ত অভিশাপ কেটে যাবে, আবার প্রাণ ফিরে পাবে সে। আসবে মুক্তি। ওই যে কাস্তে-সম্বল মানুষেরা, তারাই তো রাম এ যুগের, তারাই এবং কেবল তারাই, পারে শিলীভূত সভ্যতা ও প্রকৃতিকে প্রাণবন্ত করতে। ‘কাস্তে’ কবিতায় প্রত্যয়টি বড় দৃঢ় : ‘দিগন্তে মৃত্তিকা ঘনায়ে/আসে ওই, চেয়ে দেখ বন্ধু/কাস্তেটা রেখেছ কি শানায়ে?/এ মাটির কাস্তেটা বন্ধু।’ কাস্তেই বন্ধু আর কেউ নয়।

অনেক পরে, ১৯৮১-তে তিনি লিখেছেন, ‘রাম গেছে বনবাসে’ এবং রবীন্দ পুরস্কার পেয়েছেন। ‘রাম গেছে বনবাসে’র প্রতীকটা বুঝতে পারি অহল্যাকে মুক্ত করবে যারা, কাস্তের সেই বন্ধুরা, সেই রামচন্দে রা, এখন চলে গেছে বনবাসে। স্বেচ্ছায় নয়, অত্যাচারে। সত্তর দশকে রাজনৈতিক স্বৈরাচারের ছবি আছে ওই বইতে। এতে হতাশার কোনো চিহ্ন নেই। দিনেশ দাসের লেখায় কোথাও কোনো হতাশার ছাপ দেখিনি আমরা কখনো। বহু অভিজ্ঞতা ও দুর্ভোগের ভেতর দিয়ে গেছেন তিনি। সন্তান ছিলেন নিু মধ্যবিত্ত পরিবারের, কিন্তু মানসিকতায় চিহ্ন ছিল না। পলায়ন-তৎপরতার কিংবা ভগ্ন আশার-গ্লানির। যৌবনে যোগ দিয়েছিলেন জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে, পরে মিশে গেছেন বামপন্থি ধারায়। একদা চা বাগানে চলে গিয়েছিলেন তিনি চাকরি নিয়ে, সেখানে পুঁজিবাদী শোষণ দেখলেন এবং তা কখনো ভুললেন না। পরে যেখানেই তাকিয়েছেন ওই একই শোষণ দেখেছেন তিনি। ব্যক্তিগত জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য ছিল না, কখনো সাংবাদিকতা করেছেন, কখনো শিক্ষকতা, কাজ করেছেন বীমা কোম্পানিতেও, রোগে ভুগেছেন অনেক সময়, কিন্তু কি আশ্চর্য রকম নীরোগ ছিল দিনেশ দাসের মনোবল। তার কবিতা নিয়ে প্রকাণ্ড হৈ-চৈ হয়নি। ‘কাস্তে’ কবিতাটি লেখার পরে প্রকাশিত হতে পুরো এক বছর সময় লেগেছে; বামপন্থি যেহেতু, তাই তার গৃহে পুলিশ গিয়ে হানা দিয়েছে, তাকে হাজতবাসীও হতে হয়েছে। সব অভিজ্ঞতার মধ্যে অচঞ্চল ছিলেন এই কবি। তার আশাবাদ সম্পূর্ণরূপে বিশ্বাসযোগ্য, কেননা একদিকে তা ছিল শান্ত, অন্যদিকে দৃঢ় এবং অভিজ্ঞতার দ্বারা পরীক্ষিত। অশুভকে তিনি জানতেন, তাকে তিনি সামনাসামনি দেখেছেন। প্রতিনিয়ত। পুঁজিবাদের গোলামখানার অভিশপ্ত জীবনযাপনের গ্লানি কারণ হয়েছে গভীর মর্মপীড়ার। ‘গোলাম দেশের বাচ্চা সবাই গোলাম ঘরের রক্ত,/গোলামিতেই আমরা অভিশপ্ত/এমনি করেই কোনোক্রমে ভাঙিয়ে শেষ রক্ত, গোলামখানায় গোলাম বনে, আমরা আছি বেশ তো।’ মর্মপীড়া ধিক্কার হয়ে বের হয়ে এসেছে। অন্যত্র শুনি আরো তীব্র ধিক্কার ধ্বনি, ‘আমার দু’পায়ে ঠেকে শত মৃতদেহ/তবু তো বহেছি প্রাণ নিঃসন্দেহ’ এবং ‘আমার কী প্রাণ আছে? যদি বেঁচে থাকি আমি/এর চেয়ে নেই লজ্জা, নেই বড় গ্লানি।’ এই প্রবলতা ও তীব্রতা নাটকীয় নয় আর সেই জন্যই বড় বেশি অন্তর্ঘাতী। লক্ষ্য করার বিষয়, দিনেশ দাসের ভাষা অত্যন্ত সহজ, যেন কথা বলছেন কথোপকথনের বাকবিধিতে, কোনো জটিল উপমা নেই, দেশ-বিদেশের পুরাণের অনুসন্ধান নেই, সাদামাটা একেবারেই। কাস্তের মতো। তেমনি ঋজু, তেমনি ধারালো। তার ‘ভূগোল’ কবিতায় আছে, ‘ধানের গোছার মতো জীবনকে ছেঁচে ফেলে সারা মাঠ/পৌষালি ফসলটুকু নিয়ে যায় কুটিল সময়,/পড়ে থাকে আঁটি আঁটি কড়/অসার অনড়।’ অন্য একটি কবিতাতে, ‘এখানে জীবন ছেঁড়া পালকের মতো শুধু, বাতাসেতে ওড়ে/প্রেতেরা কবর ছেড়ে হানা দেয় গৃহস্থের ঘরে;/আমাদের প্রাণ যেন প্রেত হয়ে ঘোরে ফেরে বিষণœ ছায়ায়/হৃদয়ের শূন্যমঞ্চে সংবাদপত্রেরা পালাগান গায়।’

তিনি দেখেছেন কালো মাকড়সা আকাশে জাল বোনে, গ্রাস করে নেবে বুঝি সূর্যকে। ‘পাথর মূর্তি স্বপ্নহীন’। তবু বলছেন তিনি, ‘তবু দেখি;/কবে সেই আশ্চর্য সকালে শোনা যাবে/শুকতারার গান।’ এই স্বপ্ন দেখাটা থাকে। সবসময়ে। যে কবিতার নাম কিছু না, সেখানেও দেখছি, ‘আমার আত্মা এখনো সূর্যমুখীর মতো আলো চায়,/কবে আকাশের কালো ডিম থেকে/সূর্য পাখির মতো বেরিয়ে আসবে।’ স্বপ্ন নয় কেবল, বিশ্বাসও। ‘আগামী’ কবিতাটিতে ‘তাই তো নামবে ভোর/পৃথিবীর ভগ্নশেষ স্তূপের ওপর,/এবার নামবে ভোর-নতুন সকাল/জানি জানি ভোর হবে কাল।’ এবং কেবল বিশ্বাস নয়, ধিক্কারও। ‘আজ যে পথে আবর্জনার স্বৈরিতা/মহাপ্রভু! বণিক প্রভু! সবই তোমার তৈরি তা।/দেখছি ব’সে দূরবীনে/তোমায় শেষে আসতে হবে তোমার গড়া ডাস্টবিনে।’ এই যে স্বপ্ন, বিশ্বাস ও ধিক্কার-এদের ভিত্তিটা কী? ভিত্তি হচ্ছে কাস্তে, ভিত্তি হচ্ছে ওই ডাক, ‘কাস্তেটা রেখেছ কি শানায়ে’?

এই কাস্তে না মেনে উপায় ছিল না। কাস্তে এসে গেছে বিষ্ণু দে’র কবিতায়, এসেছে সুধীন্দ নাথ দত্তের কবিতাতেও, যদিও তিনি বামপন্থি তো দূরের কথা, বামের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন পর্যন্ত ছিলেন না। সুধীন্দ নাথ দত্ত লিখেছেন, ‘আকাশে উঠেছে কাস্তের মতো চাঁদ/এ যুগের চাঁদ কাস্তে।’ ১৯৩৯-এ লেখা কবিতা এটি। কাব্যমূল্য বিচার এখানে উদ্দেশ্য নয় আমাদের, আমরা কেবল লক্ষ্য করেছি যে, দিনেশ দাসের কাস্তে আর সুধীন্দ নাথের কাস্তে এক নয়। এক হলেই বরঞ্চ বিস্ময়ের কারণ ঘটত। সুধীন্দ নাথ তার কবিতায় বলছেন, বিপ্রলব্ধ প্রেতের আর্তনাদের কথা, যে নাকি মানা করে ভালোবাসতে, বলছেন সেই নিষ্প্রতিকার ধৈর্যের পাকা বাঁধের কথা, যে বাধা দেয় বানে ভাসতে।’ দিনেশ দাসের নিঃসঙ্কোচ ভালোবাসা ও বিশ্বাসের বানেভাসা সুলভ নয়-বাংলা কবিতায়। এমনকি বিষ্ণু দে’কেও তো বলতে হয়েছে জনসমুদ্রের জোয়ারের মুখে ব্যক্তি হৃদয়ের চড়ার কথা। দিনেশ দাসের নৈকট্য কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে। নজরুল সরাসরি লাঙ্গলকে নিয়ে এসেছিলেন কলকাতায় ও আধুনিক সাহিত্যে, সেই ১৯২৫-এ। ‘ধূমকেতু’র পরে তিনি পত্রিকা বের করেছেন ‘লাঙ্গল’ নাম দিয়ে, তারপর আরো এগিয়ে বের করেছেন ‘গণবাণী’। ‘ওঠরে চাষী জগদ্বাসী, ধর কষে লাঙ্গল-” তার এই আহ্বানের মধ্যে কোনো দ্বিধা ছিল না। তবু তফাৎ আছে। নজরুল ইসলামের কবিতা ছিল উন্মুক্ত, তিনি লড়ছিলেন সামনাসামনি, সরাসরি, দিনেশ দাসের যুদ্ধ অনেকটা অন্তর্ঘাতমূলক, যেন গেরিলা তৎপরতা; তিনি ভেতর থেকে, আধুনিক কবিদের একজন হয়ে, অনেকটা তাদেরই কাব্যভাষায় তার সংগ্রামকে অব্যাহত রেখেছেন।


অবশ্যই সত্য এটা যে, না সফল হয়েছে নজরুল ইসলামের স্বপ্ন, না দিনেশ দাসের। পঞ্চাশের মন্বন্তরের সময় দিনেশ দাস লিখেছিলেন, ‘বন্যার হাওয়ার মতো এরা হ-হা করে/দুর্ভিক্ষের ঝড়ে/আসে মন্বন্তরে/মারী নিয়ে, মৃত্যু নিয়ে হাড়ের ভিতরে/তবু এরা আসে/-এগারোশ’ ছিয়াত্তরে/তেরশ’ পঞ্চাশে-/এরা আসে আসে।’ এখনো আসে তারা বন্যায়, ঝড়ে, দুর্ভিক্ষে। বাংলাদেশের ঝড়ের ওপর স্মরণীয় কবিতা লিখেছেন তিনি, ‘প্রতিটি সোনার শীষ পরপর/সয়েছে অনেক মৃত্যু এক-একটি/ধানের ভিতর;/প্রত্যহ উৎকর্ণ হয়ে আহত, আঁতুর/প্রতীক্ষা করেছে শুধু চরম মৃত্যুর। সত্তর সালে ঝড় দেখে ছবি এঁকেছিলেন শিল্পী জয়নুল আবেদীন, যেমন ছবি এঁকেছিলেন তিনি পঞ্চাশের মন্বন্তরের সময়। আজ জয়নুল আবেদীন নেই, দিনেশ দাসও নেই, কিন্তু ঝড় আছে, বন্যা আছে, আছে মন্বন্তর। প্রকৃতি বন্ধ্যা কখনো কখনো জলদস্যু। তার ছোবলে মৃত্যু ঘটে কাদের? ওই কাস্তে-সম্বল মানুষদেরই। চরে ও উপকূলে যারা বারবার প্রকৃতির তাণ্ডবে মারা যায়, তারা চাষিই। নিঃসম্বল চাষি। চাষ করত, ধান কাটত, মাছ ধরত নিজের জন্য নয়, অপরের জন্য। কতজন মারা গেছে তা কোনো দিন জানা যাবে না; কতজন ছিল তারা তা কি জানি, যে বিয়োগ দেব। ইতিমধ্যে তৎপর হয়ে উঠেছে শৃগালেরা, নেমে গেছে টাউট, কারো চোখ সাহায্য সামগ্রীর ওপর, কেউ তৎপর অসহায় মেয়েদের হস্তগত করবে, ধরে নিয়ে বিক্রি করে দেবে বাজারে, কারো লোভ জায়গা জমিতে। ঝড়ের পরে বেরিয়ে পড়ে কুড়াবে বলে। দিনেশ দাস জানতেন এ খবর। লিখেছিলেন তিনি, ‘মানুষেরও থাবা আছে; নির্মম নখরে/সে থাবা রক্তের ডেলা নিয়ে খেলা করে।’ জানা ছিল, ‘আতঙ্ক অবাধে নাচে মাংসাশী লোমশ বুনো ভাল্লুকের মতো।’ ঝড়ের আশঙ্কার খবর চাষিদের কাছে সময়মতো পৌঁছানো সম্ভব হয় না, সাহায্য পৌঁছানো কঠিন হচ্ছে এখনো, আশার বাণী পৌঁছে দেয়া আরো কঠিন বটে। শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের দুর্ভোগ, বঞ্চনা, আয়-রোজগার, সার্বিক জীবনযাত্রার নানামুখী সমস্যা সংকট কতটা প্রকট স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে পদে পদে এর নজির মেলে। সাভার ট্র্যাজেডি যা মনুষ্যসৃষ্ট বিপর্যয়, তা অনেক কিছু আবারো দেখিয়ে দিল অত্যন্ত নির্দয় ও নিষ্ঠুরভাবে। তবু আশা থাকে। জীবনের বিকল্প নেই, বিকল্প নেই আশারও। তাই আবারো লাঙ্গল বাওয়া, আবারো কাস্তে তোলা, জাল ফেলা পানিতে। বাঁচতে চাওয়া বারবার। ‘আমাদের মৃত্যু নেই’ দিনেশ দাস লিখেছেন। ‘আমাদের মৃত্যু নেই’ শ্রমজীবী মানুষ বলে, নিজের নিজের ভাষায় ও কর্মে। ‘যতদিন এখানে ঝরবে এক ফোঁটা রক্ত আমরা আসবো।/যতদিন এখানে ঝরবে এক ফোঁটা চোখের জল আমরা আসবো।’ এও লিখেছেন এই কবি। এখনো তারা আসেনি, তাই বুঝি এত দুর্ভোগ, এমন দুঃসহ পীড়া। তাই তো চাঁদ ওঠে, আবার ওঠেও না। মানবকণ্ঠ ।

লেখক: শিক্ষাবিদ ও সমাজ বিশ্লেষক

আমাদের সময়