আমরা তো চাপা পড়েই আছি

ইমদাদুল হক মিলন
বেঁচে থাকার আশায়, দুবেলা দুমুঠো খাবারের আশায় দুই মেয়ে নিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন ঝর্না বেগম। বড় মেয়ের নাম শরিফা, ছোট মেয়ে পারভিন। সাভার এলাকায় গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি অনেক। গেলেই কাজ পাওয়া যাবে। দুই মেয়েকে গার্মেন্টের কাজে লাগিয়ে দিতে পারলে তাদের শ্রমে জীবন বদলে যাবে। অনাহারে থাকতে হবে না। গরিব মানুষেরা খেয়ে-পরে যেভাবে কোনো রকমে বেঁচে থাকে সেই বেঁচে থাকাটুকু অন্তত হবে।
ঝর্না বেগম সাভার এলাকায় চলে এলেন। শরিফা কাজ নিল আশুলিয়ার তাজরীন গার্মেন্টে। সেখানে লাগল ভয়াবহ আগুন। অগি্নকাণ্ডে বহু শ্রমিকের সঙ্গে পুড়ে ছাই হয়ে গেল শরিফা। শরিফার সঙ্গে ছাই হলো ঝর্না বেগমের বেঁচে থাকার স্বপ্ন।

কিন্তু মানুষ বাঁচতে চায়, কোনো না কোনোভাবে বাঁচতে চায়। মৃত্যুর অন্ধকারে বসেও খোঁজে একটুখানি আলো। সেই আলোর পথ ধরে আবার স্বপ্ন দেখে। ছাই হয়ে যাওয়া মেয়ের শোক ভুলে ছোট মেয়ে পারভিনকে নিয়ে বাঁচতে চাইলেন ঝর্না বেগম। পারভিন কাজ নিল রানা প্লাজার নিউ ওয়েভ স্টাইল গার্মেন্টে। ফিনিশিংয়ের কাজ করত। নয়তলা রানা প্লাজা ধসে পড়ার পর পারভিনের খোঁজে পাগলের মতো ছুটে এসেছেন ঝর্না বেগম। কিন্তু মেয়ের খোঁজ নেই। কোথাও পারভিনকে খুঁজে পাচ্ছেন না

অসহায় মা। এনাম মেডিক্যালসহ এলাকার সব হাসপাতালে খোঁজ নিয়েছেন। দিশেহারা হয়ে ছুটে গেছেন এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে। না, কোথাও নেই তাঁর মেয়ে। কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না তাকে। রানা প্লাজা ধসে পড়ার পর সেখানে উদ্ধারকাজ শুরু করেছে সেনাবাহিনী, বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের সঙ্গে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ। ঝর্না বেগম প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলেন, ‘বাবারা, আমার মাইয়ার লাশটা দেন। ঢাকায় আর থাকুম না। গেরামে চইলা যামু।’ কারণ এই মা ততক্ষণে নিশ্চিত হয়ে গেছেন, তাঁর পারভিন বেঁচে নেই। বড় মেয়ে গার্মেন্টের আগুনে পুড়ে ছাই হয়েছে আর ছোট মেয়ে গেছে গার্মেন্টের ভবনধসে। এ ঘটনা লিখেছেন ‘আমাদের সময়’-এর আলী আজম।

এ রকম কত মায়ের বুক খালি হয়ে গেছে রানা প্লাজা ধসে পড়ার কারণে। কত স্ত্রী হারিয়েছেন স্বামী, কত স্বামী হারিয়েছেন স্ত্রী আর কত সন্তান হয়েছে পিতৃ-মাতৃহীন। কত বোন শোকে নিথর হয়েছেন, কত ভাই হয়েছেন স্তব্ধ আর কত পিতার বুকে চেপে বসেছে নয়তলা ভবনের সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপের চেয়েও ভারী পাথর।


রানা প্লাজার পাঁচটি গার্মেন্টের তিন হাজারের ওপর শ্রমিকের মধ্যে আড়াই শর মতো মানুষের মৃত্যু হয়েছে ভবনধসে। হাজারখানেক আহত মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে বহু মানুষের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাদের কতজনকে বাঁচানো যাবে কে জানে। কতজন পঙ্গু হয়ে বেঁচে থাকবে, কে জানে। পঙ্গু মানুষগুলোর জীবন কাটবে কিভাবে, কে জানে। আর এখনো ধসে পড়া ভবনের তলায় আটকা পড়ে আছে কত মানুষ, কে জানে। আটকা পড়া মানুষের কতজনকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা যাবে, কে জানে। কতজনকে খুঁজে পাওয়া যাবে না, চাপা পড়া শ্রমিকের কতজনের চাপা পড়া লাশে পচন ধরবে, কে জানে!

এ কেমন ভাগ্য আমাদের! এ কেমন নিয়তি! গার্মেন্টে ভবন ধসে মরব আমরা, গার্মেন্টের আগুনে মরব। রাজনৈতিক সহিংসতায় মরব। পুলিশের গুলিতে মরব। মরণ ছাড়া আর কিছুই যেন পাওয়ার নেই আমাদের। আমাদের এক শ্রেণীর মানুষ গার্মেন্টের ব্যবসা করে কোটি কোটি টাকার মালিক হবেন, দেশে-বিদেশে রাজকীয় জীবন তাঁদের। তাঁদের গার্মেন্টে আগুনে পুড়ে ছাই হবে শত শত শ্রমিক, অথচ সেই আগুনের আঁচটুকুও লাগবে না তাঁদের গায়ে। ভবন ধসে মরবে শ্রমিক, চাপা পড়ে থাকবে দু-চার দিন, এরপর লাশ হয়ে যাবে। লাশ পচা গন্ধে বাতাস ভারি হবে, সেই গন্ধ তাঁদের নাকে যাবে না। তাঁরা থাকবেন তাঁদের রাজকীয় জীবনে। টাকার বস্তার ওপর বসে থাকবেন। রাষ্ট্র কোনো ব্যবস্থাই নেবে না তাঁদের বিরুদ্ধে। রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা দল তাদের মতো করে কিছু কথাবার্তা বলবে, বিরোধী দলে থাকা নেতারা আহা-উহু করবেন, কয়েক দিন যাবে, এরপর সব ঠাণ্ডা। অথবা ঠাণ্ডা করার ব্যবস্থা গার্মেন্ট মালিকদের জানা। তাঁরা তাঁদের কায়দায় সব ম্যানেজ করে ফেলবেন। শত শত মানুষের জীবন তাঁদের কাছে তুচ্ছ। মরা পাতার মতো ফুৎকারে উড়ে যাবে। মিডিয়া চিৎকার-চেঁচামেচি করবে, বিবেকের ভূমিকা পালন করবে, এরপর নতুন ইস্যু তৈরি হলে নতুন ইস্যু নিয়ে ব্যস্ত হবে। চাপা পড়ে যাবে আগের সব ঘটনা। কেউ উঁকি দিয়েও দেখবে না, যে পরিবারের একমাত্র রোজগারের মানুষটি চলে গেছে, এখন কিভাবে চলছে পরিবারটি? তাদের ঘরে কি চুলা জ্বলে? যে পোশাক তৈরি করতে গিয়ে জীবন দিয়েছে তারা, তাদের পরিবারের মানুষগুলোর গায়ে কি আছে পোশাক? দুবেলার খাবার কি পায় মানুষগুলো? নাকি তারা এখন পথে পথে ঘুরছে? হাতে ভিক্ষার থালা। ফুটপাতেই কি কাটে তাদের জীবন? অথবা যে মানুষটি পঙ্গু হয়েছেন তাঁর জীবন কাটছে কিভাবে? তাঁর স্ত্রীর পরনে কি শাড়ি আছে, তাঁর সন্তানটি কি খেতে পায়, স্কুলে যেতে পারে?

এ ধরনের দুর্ঘটনার পর কম্পানিগুলো পরিবার পিছু দশ-বিশ হাজার টাকা দিয়েই খালাস। সরকারও কিছু কিছু সাহায্য করে। এসব আমরা খবরের কাগজে পড়ি, টেলিভিশন সংবাদে দেখি। কিন্তু এর পরের ঘটনা আর কিছুই জানি না।

আমাদের জীবন এভাবেই কাটছে। সব দিক থেকেই চাপা পড়ে আছি আমরা, সব দিক দিয়েই আটকা পড়ে আছি। রানা প্লাজার মতো রাজনৈতিক একটি বহুতল ভবনের তলায় আমরা আটকা পড়ে আছি। ইঁদুরের কলে যেভাবে আটকা পড়ে ইঁদুর, আমাদের অবস্থা তেমন। কখনো আমাদের আটকাচ্ছে ক্ষমতাসীন দল, কখনো বিরোধী দল। রানা প্লাজা ধসে পড়ার ফলে, এত এত মানুষের হতাহতের ঘটনায় বিরোধী দল তাদের হরতাল প্রত্যাহার করেছে, ক্ষমতাসীন দল তাদের আবার ধন্যবাদ দিয়েছে। বেশ আহ্লাদি একটা ভাব দুদলেরই। এসব আহ্লাদ বাদ দিয়ে দুটো দলই যদি কঠোর কর্মসূচি নিত এসব হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে, এসব মৃত্যু বন্ধে কঠিন পদক্ষেপ নিত, তাহলে দেশের মানুষ খুশি হতো।

শোক করে কী হবে! এ ধরনের ঘটনায় তো শোক করতেই দেখছি, যাঁদের গার্মেন্টে ঘটনা ঘটছে তাঁদের কারো ক্ষেত্রে তো দেখলাম না কঠিন কোনো শাস্তি! বরং বিবিসিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন_’স্তম্ভ ধরে নাড়াচাড়া ভবনধসের কারণ হতে পারে’। প্রথম আলোয় এই সংবাদ পড়ে আমি বিস্মিত হয়েছি। নয়তলা একটি ভবনের স্তম্ভ ধরে নাড়াচাড়া করলে সেটা ভেঙে পড়বে? কী হাস্যকর কথা! বিরোধী দলের বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে কিংবা কথা বলে তাদের কাবু করতে হবে বলে কি যা মনে আসে তা-ই বলতে হবে! আর হরতাল সফল হয়নি এটা বোঝাবার জন্য গার্মেন্ট শ্রমিকদের ওপর জোর প্রয়োগ করা হবে, ডেকে এনে তাদের বাধ্য করা হবে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে কাজ করার জন্য, চাকরি চলে যাওয়ার হুমকি দেওয়া হবে, মারধর করে ভবনে ঢোকানো হবে? এ কেমন রাজনীতি? যদি কোনো দলের কোনো নেতা এ কাজ করার চেষ্টাও করেন, গার্মেন্ট মালিকরা কেন তাঁর কথা শুনবেন? কেন তাঁরা ঠেলে দেবেন তাঁদের কর্মীদের মৃত্যুকূপে? রানা প্লাজায় যে পাঁচটি গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি ছিল তার মালিকরা কেন শুনেছেন ওই পাতি নেতার কথা?


অনেকেই মনে করেন, রানা প্লাজায় যা ঘটেছে তা দুর্ঘটনা নয়, হত্যাকাণ্ড। প্রথম আলো পরিষ্কার ভাষায় লিখেছে_’ডেকে এনে শত প্রাণ হত্যা’। সৈয়দ আবুল মকসুদ লিখেছেন ‘শোক নয়, শাস্তি চাই’।

দুসপ্তাহ টোকিওতে ছিলাম আমি। ঢাকায় নেমে এই ঘটনা শুনে স্তব্ধ হয়েছি। রাতে টেলিভিশনে আর সকালবেলা খবরের কাগজগুলোতে ছবি দেখে চোখে পানি এসেছে। ধ্বংসস্তূপের তলা থেকে বেরিয়ে আছে পা। সেই পায়ে শখ করে নূপুর পরেছিল মেয়েটি। নূপুর আছে নূপুরের জায়গায়, মেয়েটি নেই। আটকে পড়া একজন মানুষ ভাঙা দেয়ালের ফাঁকে বের করেছেন দুহাত। চিৎকার করছেন, বাঁচাও, বাঁচাও। স্বামীর আইডি কার্ড হাতে নিয়ে কাঁদছেন স্ত্রী। এই মানুষটি কি বেঁচে আছে? বিশাল সাদা চাদরে ঢাকা লাশের সারির এক পাশে বসে চাদর সরিয়ে প্রিয়জনকে খুঁজছেন এক বৃদ্ধ। এ রকম কত মর্মান্তিক ছবি ছাপা হয়েছে কাগজে। দু-চার দিন এসব ছবি ছাপা হবে, সংবাদ ছাপা হবে। মৃতের সংখ্যা আরো বাড়বে। এরপর ধীরে ধীরে সব ভুলে যাবে মানুষ। রাজনীতিই ভুলিয়ে দেবে সব। গার্মেন্ট মালিকদের কিছুই হবে না, ভবন মালিকের কিছুই হবে না। যাঁরা স্বজন হারালেন নিঃস্ব হলেন তাঁরাই। আবারও বলছি, আমাদের রাজনীতির সুউচ্চ ভবনটি আসলে ধসে পড়েছে। আমরা সাধারণ মানুষ সেই ভবনের তলায় আটকা পড়ে আছি। আমাদের বেরোবার কোনো পথ নেই। আমাদের বাঁচাও বাঁচাও চিৎকার কারো কানে যাচ্ছে না।


কিন্তু এভাবে একটি দেশ চলতে পারে না। এ অবস্থায় দেশ চলতে পারে না। অবস্থা বদলাতেই হবে। বড় দুটি রাজনৈতিক দল সমঝোতায় এসে দেশ বদলাবার কাজটি করলে এখনো সময় আছে দেশের মানুষ তাদের স্বাগত জানাবে। তা না হলে মানুষ পথে নামবে। রানা প্লাজায় আটকে পড়া মানুষ উদ্ধার করার জন্য যেমন এগিয়ে এসেছে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ, ঠিক সেইভাবে মানুষ নিজেরাই নিজেদের বেঁচে থাকার পথ বের করে নেবে, নিজেদেরকে উদ্ধারের পথ করে নেবে। কোনো রাজনৈতিক দলের কিংবা নেতা-নেত্রীর তোয়াক্কা করবে না।

কালের কন্ঠ