পালিত হলো ১১ মার্চ ভয়াবহ বিপর্যয়ের ২য় বার্ষিকী

monijapan17রাহমান মনি
ভাঙা হৃদয়ের গভীর শ্রদ্ধা এবং প্রার্থনার মাধ্যমে জাপান পালন করল স্মরণকালের ভয়াবহ বিপর্যয়ের ২য় বার্ষিকী। ২০১১ সালের ১১ মার্চের এই দিনে (শুক্রবার) বেলা ২.৪৫ এ জাপানের উত্তর-পূর্ব এলাকায় ইতিহাসের ভয়ঙ্করতম ভূমিকম্পে সৃষ্ট সুনামি পরবর্তী বিপর্যয়ে ১৫,৮৮২ জন নিহত হন এবং এখন পর্যন্ত ২,৬৬৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন সরকারি হিসাবমতে। নিখোঁজদের সকলকে মৃত বলে ধরে নেয়া হচ্ছে। তার কারণ পর্বতসম সুনামির ঢেউয়ের টানে এইসব নিখোঁজরা সমুদ্রবক্ষে চলে যান বলে ধরে নেয়া হয়। রিখটার স্কেলে ৯ মাত্রার এই ভূমিকম্প এবং পরবর্তী সুনামির ফলে উত্তর-পূর্ব জাপানের অবকাঠামো ভেঙে পড়ে। সুনামির ঢেউ ঢুকে পড়ে ফুকুশিমা দাইইচি আণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে। বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। বিকল্প বিদ্যুৎ সরবরাহও অচল হয়ে পড়ে। শীতলকরণ পানির অভাবে চুল্লির জ্বালানি রড গলে তেজস্ক্রিয়তা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়লে বিপর্যয়ের ভয়াবহতা আরও বৃদ্ধি পায়। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। যোগাযোগ অবকাঠামো ভেঙে পড়ায় তাৎক্ষণিক উদ্ধার কার্য পরিচালনা সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাই বিপর্যয় পরবর্তীতে বিভিন্ন কারণে আরও ২,৩০৩ জন প্রাণ হারান। যার ফলে নিহত এবং নিখোঁজের সংখ্যা সর্বমোট দাঁড়ায় ২০,৮৫৩ জনে।

এ বছর ১১ মার্চ সোমবার বিপর্যয়ের ২য় বার্ষিকী পালন উপলক্ষে জাতীয়, স্থানীয় প্রশাসন, সামাজিক, পারিবারিক এবং অনেকে ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে নিহতদের স্মরণ, নিখোঁজ এবং ক্ষতিগ্রস্ত, দেশের মঙ্গল ও সংহতি কামনা করে প্রার্থনা করেন।


রাজধানীর টোকিওতে সরকার এবং জাতীয়ভাবে আয়োজিত স্মরণসভায় অংশ নেন সম্রাট আকিহিতো, সম্রাজ্ঞী মিচিকো, প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে, মন্ত্রিপরিষদের সদস্যবৃন্দ, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকগণ। ২.৪৬ মিনিটে পুরো জাতি দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করে।

১১ মার্চ সোমবার প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে এক সংবাদ সম্মেলন করেন। বিকেল ৪.৩০ এ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এই সম্মেলনে বিদেশি সাংবাদিকগণও অংশগ্রহণ করে বিপর্যয় পরবর্তী জাপান পুনর্গঠনে সরকারি উদ্যোগের ব্যাপারে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন। সংবাদ সম্মেলনে স্বীয় বক্তব্যে নিহত, নিখোঁজদের স্মরণ, ক্ষতিগ্রস্তদের সমবেদনা জানিয়ে তিনি বলেন, আপনাদের কথা আমি প্রতিটি মুহূর্তে ভাবি। আমার কানে কেবল একটি কথাই বার বার আসে, আর তা হলো আর কতদিন লাগবে স্বাভাবিক হতে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি আমাকে যা কষ্ট দেয়, ভাবিয়ে তোলে তা হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে শিশু-কিশোররা স্বাভাবিক খেলাধুলা করতে পারছে না। এতে করে বাচ্চারা প্রস্ফুটিত হতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আমি কেবল ভাবি কি করলে কত দ্রুতভাবে কত বেশিসংখ্যক শিশুকে তাদের স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দেয়া যাবে।

আবে বলেন, প্রতিটি ক্ষেত্রে আমি আমাদের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কাজ করছি। আমি চাই স্থায়ী সমাধান। আগামী গ্রীষ্মে গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি যেন আগামী ১১ মার্চ আমরা অনেক স্বাভাবিক একটি দিন প্রত্যাশা করতে পারি। তিনি সাংবাদিকদের মাধ্যমে দেশবাসীর কাছে বিনীত আহ্বান জানিয়ে বলেন, প্রিয় দেশবাসী আপনারাও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার পুনর্গঠনে এগিয়ে আসুন। আপনাদের দুইটি পা, দুইটি হাত কিংবা সদিচ্ছা দেশ গঠনে কাজে লাগাতে পারেন। ফুকুশিমায় উৎপন্ন পণ্য কিনে কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে এ অবদান রাখতে পারেন। তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায়, বিভিন্ন আয়োজনে ইওয়াতে, মিয়াগি কিংবা ফুকুশিমায় উৎপন্ন খাদ্য-বস্ত্র অন্যান্য পণ্যের মেলা করে প্রচার ও প্রসারে অবদান রাখতে পারেন, নিজেরা ব্যবহার করে বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনতে পারেন।


এক প্রশ্নের জবাবে আবে বলেন, আগামী ২ বছরের মধ্যে ইওয়াতে কেন এর ৯০%, মিয়াগি কেন ৭০% স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। তবে ফুকুশিমার ক্ষেত্রে এখনও নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন। নির্ধারিত হওয়ার পর জানানো যাবে। টোকিও সিম্বুন পত্রিকার প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, আগামী এপ্রিলে ফুকুশিমা প্রিফেকচারে তোমিওকা মাটির ৩০ হাজার নাগরিককে নিজ বাসস্থানে ফিরিয়ে নেয়া সম্ভব হবে।

তবে সংবাদ সম্মেলনে যে প্রতিশ্রুতিই দেন না কেন পুনর্গঠন কাজে ধীরগতিতে সাংবাদিকগণ অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। সংবাদ সম্মেলনে আবে তার পূর্বসূরিদের কোনো সমালোচনা না করলেও ১১ মার্চ নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে এক ভিডিও বার্তায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পুনর্গঠনের কাজ ত্বরান্বিত করার ঘোষণা দেন। বিপর্যয়কবলিত লোকদের কষ্টের কথা শোনা তিনি অব্যাহত রাখবেন বলে ঘোষণা দেন। নিজস্ব ওয়েবসাইটেও তিনি বিপর্যয়কবলিত এলাকাগুলোকে সহায়তা দেয়ার জন্য দেশের নাগরিককে আহ্বান জানান। একইভাবে তিনি জাপানিদের ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের পণ্য কেনা এবং বিধ্বস্ত এলাকাগুলো পরিদর্শন করার উদাত্ত আহ্বান জানান।

১১ মার্চ ২০১১ ভূমিকম্প এবং এর ফলে সৃষ্ট সুনামি এবং পরবর্তী বিপর্যয়ে জাপানের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ১৬৯০,০০০,০০,০০০ (ষোল ট্রিলিয়ন নয় হাজার বিলিয়ন ইয়েন)। এর মধ্যে ১০ ট্রিলিয়ন ৪ হাজার বিলিয়ন ইয়েন কেবল ইমারত (ইমারত বলতে বাসস্থান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, কলকারখানা) ধ্বংসের হিসাবে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে অবকাঠামো (নদী, রাস্তাঘাট, বিমানবন্দর ও অন্যান্য) সেক্টর। এই ক্ষেত্রের ক্ষতির পরিমাণ ২ ট্রিলিয়ন ২ হাজার বিলিয়ন ইয়েন এবং তৃতীয় অবস্থানে আছে লাইফলাইন। অর্থাৎ গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ টেলিযোগাযোগ এবং বিনোদন সংযোগ (ঞঠ, জধফরড়) ক্ষেত্রে। এ ক্ষেত্রের ক্ষতির পরিমাণ ১ ট্রিলিয়ন ৩ হাজার বিলিয়ন ইয়েনের সমপরিমাণ। মোট ক্ষতির পরিমাণ বাংলাদেশি হিসেবে কেবল কল্পনায়ই সম্ভব।

এত ক্ষতির পরও জাপান সরকারিভাবে কারওর কাছে হাত পাতেনি। আবার আন্তর্জাতিক ক্ষেত্র থেকে আসা সহায়তা ফিরিয়েও দেয়নি জাপান। রেডক্রসের মাধ্যমে তারা এই অনুদান কৃতজ্ঞতার সঙ্গে গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ থেকেও সাহায্য এসেছে। তবে এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার যতটা না সাহায্য পাঠিয়েছে তার চেয়ে ঢের বেশি সহায়তা করেছে জাপানে বসবাসরত প্রবাসীরা। বিভিন্ন চ্যারিটি কনসার্ট, টোকিও বৈশাখী মেলা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ইসলামিক মিশন, ব্যক্তিগতভাবেও অনেকে জাপানিদের সঙ্গে থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের পার্শ্বে থেকে জাপান পুনর্গঠনে ভূমিকা রেখেছেন। জাপানে অবস্থানরত বিদেশিদের মধ্যে বাংলাদেশিদের অবস্থান সবচেয়ে উপরে বলে জানিয়েছে জাপান।

যুক্তরাষ্ট্র জাপানকে ১১ মার্চের বিপর্যয়ে অনুদান দিয়েছে ৭১ কোটি ২৬ লাখ ডলারের সমপরিমাণ ইয়েন। এছাড়াও আমেরিকা বিভিন্ন সেক্টরে ভলান্টিয়ার পাঠিয়েছে তাৎক্ষণিক। দ্বিতীয় অবস্থানে আছে বিশ্ব রেডক্রস। তাদের দেয়া অনুদানের পরিমাণ ৩১ কোটি ২০ লাখ ডলারের সমপরিমাণ।
১১ মার্চ ২০১১ বিপর্যয়ের পর ইওয়াতে, মিয়াগি এবং ফুকুশিমাতে পাওয়া ১,০৯১ লাশের পরিচয় পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ সর্বশেষ হিসাবে এই সংখ্যা নেমে এই তিন প্রিলচায়ে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩২-এ। ধরে নেয়া হচ্ছে তিনকূলে তাদের কেউ ছিল না অথবা যারা ছিল তাদের সবাই নিহত কিংবা নিখোঁজ রয়েছেন। তার পরও জাপান পুলিশ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে হতভাগ্য এই ১৩২ জনের পরিচয় পাওয়ার।

rahmanmoni@gmailcom

সাপ্তাহিক